পোলিশ নোবেলজয়ী লেখক ও মনোবিজ্ঞানী ওলগা তোকারচুক মনে করেন, সাহিত্যের কাজ শুধু গল্প বলা নয়। সাহিত্য পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগাবে, সন্দেহ তৈরি করবে, এমন কিছু বিষয়ের দিকে তাকাতে শেখাবে, যা এত দিন আমাদের কাছে একেবারে স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে তার উপন্যাসগুলো ইতিমধ্যেই পরিচিত। ১০ অক্টোবর তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান—২০১৮ সালের জন্য। তার বইয়ে রূপকথা ও কল্পনার সঙ্গে মিশে যায় পুরাণ ও ইতিহাস; আর বাস্তবতার সঙ্গে তাদের সীমারেখা ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে তার খণ্ডিত আখ্যানের উপন্যাস‘ফ্লাইটস’ নোবেল কমিটির বিশেষ প্রশংসা পায়। আধুনিক মানুষের ভ্রমণপিপাসা ও যাযাবর জীবনের গল্প বলা হয়েছে সেখানে—ভ্রমণকাহিনি, পৌরাণিক আখ্যান ও দার্শনিক ভাবনার টুকরো টুকরো বিন্যাসে।
তোকারচুক সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও সক্রিয়। তিনি নারীর অধিকার এবং যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে কথা বলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজের দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে তাকে প্রায়ই সরব হতে দেখা গেছে। এই সময় তিনি তার উপন্যাস ‘জেকব্স স্ক্রিপচার্স’ নিয়ে জার্মানিতে পাঠসফরে ছিলেন। এ সময় সাক্ষাৎকারে পোলস্কার ওলগা তোকারচুকের সঙ্গে কথা বলেছেন, ডিডব্লিউ-এর গেস্ট এডিটর মিখাল গোস্তকিয়েভিচ ও তার সহযোগী উইর্তুয়ালনা । সাক্ষাৎকারটি ১০ নভেম্বর ২০১৯ ডিডব্লিউ’- প্রকাশিত হয়।(https://www.dw.com/en/olga-tokarczuk-literature-is-meant-to-provoke-thought/a-50795204) দৈনিক এদিন-এর পাঠকের জন্য সাক্ষাৎকারটি আমরা এখানে তুলে রাখরাম।
ডিডব্লিউ: বৃহস্পতিবার পটসডামে গাড়িতে ওঠার সময় আপনি ছিলেন লেখক ওলগা তোকারচুক—জার্মানিতে নতুন বই নিয়ে পাঠসফরে। তারপর গাড়ি থেকে নামলেন পরের গন্তব্য বিলেফেল্ডে, একজন নোবেলজয়ী হিসেবে!
ওলগা তোকারচুক: ঠিক তাই! সত্যি বলতে, এখনো ব্যাপারটি আমার কাছে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। আমার নামের পাশে এই নতুন পরিচয়টি আমি যেন দেখতেই পারছি না।
ডিডব্লিউ: আপনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফ্লাইটস–এর জন্য। সেই বইয়ে আপনি লিখেছিলেন, মানুষের শরীরের সবচেয়ে শক্তিশালী পেশি হলো জিহ্বা। বর্তমান পোলিশ সরকারের সঙ্গে কি আপনার জিহ্বার কোনো সংঘাত চলছে? সংস্কৃতিমন্ত্রী পিওত্র গ্লিনস্কি তো বলেছেন, আপনার কিছু বই—‘জেকব্স স্ক্রিপচার্স’–সহ—এবার তাকে শেষ পর্যন্ত পড়তেই হবে।
ওলগা তোকারচুক: তিনি বলেছেন, বইটি পড়ে শেষ করবেন? ভালো কথা। আমার বইগুলো আসলে ‘রাজনৈতিক’ নয়। আমি কোনো রাজনৈতিক দাবি নিয়ে বই লিখি না। আমি মানুষের জীবন নিয়ে লিখি। কিন্তু মানুষের জীবনকে গভীরভাবে দেখলে রাজনীতি সেখান থেকে দূরে থাকে না।
আমার ‘ড্রাইভ ইয়োর প্লাউ ওভার দ্য বোন্স অব দ্য ডেড’–এর কথাই ধরুন। এটি আসলে এক বৃদ্ধ নারীর গল্প। পশু হত্যা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। সেই কারণে তার ভেতরে এক ধরনের উন্মাদনা তৈরি হয়। কিন্তু পোল্যান্ডের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বইটির অর্থ হঠাৎ বদলে গেল। সেটি যেন সরাসরি রাজনৈতিক একটি বই হয়ে উঠল।
কিন্তু আমি কখনো সেটিকে রাজনৈতিক বই হিসেবে লিখিনি।
আমি বই লিখি মানুষের মন খুলে দেওয়ার জন্য। নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেখানোর জন্য। মানুষ যা এত দিন একেবারে স্বাভাবিক ও স্পষ্ট বলে ধরে এসেছে, তাকে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করার জন্য। একটি সাধারণ ঘটনাকেও অন্য একটি দিক থেকে দেখা যায়। আর সেই অন্য দিক থেকে তাকালেই হঠাৎ তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে পারে নতুন অর্থ, নতুন স্তর।
আমার কাছে সাহিত্যের কাজ এটাই—আমাদের চেতনার পরিসর বাড়ানো। আমরা যে জীবন যাপন করছি, আমাদের সঙ্গে যা ঘটছে, সেগুলোকে বোঝার ও ব্যাখ্যা করার ক্ষমতাকে আরও বিস্তৃত করা।

ডিডব্লিউ: ‘ড্রাইভ ইয়োর প্লাউ ওভার দ্য বোন্স অব দ্য ডেড’–এর প্রধান চরিত্রটির কথা। পশুদের রক্ষা করতে গিয়ে সে মানুষ হত্যা করে। অর্থাৎ সে একটি অপরাধ করেছে। কিন্তু এমনও কি হতে পারে যে শেষ পর্যন্ত সে অপরাধী নয়? আপনি কি মনে করেন সে দোষী?
ওলগা তোকারচুক: হ্যাঁ, অবশ্যই। সে হত্যার অপরাধে দোষী।
কিন্তু সে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল, তা দেখার পর তার অপরাধ স্বীকার করতে আমার নিজেরই সমস্যা হচ্ছিল।সেটাই তো আমি করতে চেয়েছি। আমি তার গল্প এমনভাবে বলেছি, যাতে পাঠকের মনে সন্দেহ তৈরি হয়। সাহিত্যের কাজই তো এটি—উসকানি দেওয়া, প্রশ্ন তোলা, সন্দেহ তৈরি করা, এমন বিষয় নিয়ে কথা বলা যেগুলোকে আমরা অবলিলায় ‘স্পষ্ট’ বলে মেনে নিই।
ডিডব্লিউ: অর্থাৎ সাহিত্য পাঠকের চিন্তাকে উসকে দেওয়ার জন্য?
ওলগা তোকারচুক: হ্যাঁ। সাহিত্য মানেই ভাবনার উসকানি।
ডিডব্লিউ: পোল্যান্ডের সংস্কৃতিমন্ত্রী আপনার বই পড়ে শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর। আপনি কি তার সঙ্গে দেখা করতে চাইবেন?
ওলগা তোকারচুক: অবশ্যই!
তিনি আমার বই পড়তে পারেননি—এ নিয়ে আমি বিশেষ চিন্তিত ছিলাম না। আমি জানি, আমার বই সবার জন্য নয়। একজন মানুষের স্বভাব, সাহিত্যরুচি এবং জীবনের কিছু অভ্যাসের ওপরও এটি নির্ভর করে। তাই আমি কখনো সবাইকে তোকারচুক পড়তেই হবে বলে চাপ দিই না।
ডিডব্লিউ: আজকের পৃথিবীকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ওলগা তোকারচুক: আমার মনে হয় পৃথিবী এখন দুই ভাগে বিভক্ত। একদল মানুষ মনে করেন, আমাদের পিছনের দিকে ফিরে তাকানো উচিত। পুরোনো পথে ফিরে গিয়ে ‘ঐতিহ্য’ নামে যে মূল্যবোধগুলোকে আমরা চিনতাম, সেগুলো আবার ফিরিয়ে আনা দরকার।
আরেক দল বলছেন, না, শুধু পুরোনো পৃথিবীতে ফিরে যাওয়া যথেষ্ট নয়। আমাদের পৃথিবীকে অন্যভাবে তৈরি করতে হবে পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা আমাদের গ্রহকে ধ্বংস করেছে। বৈষম্য তৈরি করেছে। মানুষের মধ্যে এত অসমতা নিয়ে এসেছে। এখন আমরা তার উত্তর খুঁজছি।
ডিডব্লিউ: এই প্রশ্নের উত্তর কি একজন লেখক দিতে পারেন না?
ওলগা তোকারচুক: এটা লেখকের জন্য খুব বড় প্রশ্ন। বরং পোপকে জিজ্ঞাসা করুন। অথবা বড় কোনো দার্শনিককে। আমি গল্প বলি। চেষ্টা করি যতটা সম্ভব সততার সঙ্গে গল্প বলতে, যাতে মানুষ গল্পে আগ্রহ পায়, আনন্দ পায়।কিন্তু তার চেয়েও বেশি চাই, আমার বই পড়ে মানুষের চিন্তার পরিসর একটু বড় হোক। তারা যেন অস্থির হয়। যে বিষয়গুলো এত দিন কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সত্য বলে মেনে এসেছে, সেগুলো নিয়ে যেন নতুন করে ভাবতে শুরু করে।
কারণ আমার কাছে সাহিত্য মানে শুধু উত্তর দেওয়া নয়। কখনো কখনো সাহিত্যের সবচেয়ে বড় কাজ হলো—মনের ভেতর একটি প্রশ্ন রেখে যাওয়া।

পরিচিতি
ওলগা তোকারচুক পোল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমকালীন লেখক। তিনি ১৯৬২ সালের ২৯ জানুয়ারি পোল্যান্ডের সুলেখুফ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান পড়ার পর কিছুদিন মনোবিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেন। পরে লেখালেখিকেই জীবনের প্রধান কাজ হিসেবে বেছে নেন।
তোকারচুকের লেখায় বাস্তবতা, স্বপ্ন, ইতিহাস, পুরাণ ও মানুষের স্মৃতি একসঙ্গে মিশে যায়। তিনি সরল পথে গল্প বলেন না; বরং ছোট ছোট ঘটনা, চরিত্র ও স্মৃতির টুকরো জুড়ে মানুষের জীবনের একটি বড় ছবি তৈরি করেন। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে আছে ‘ফ্লাইটস’ (২০০৭), ‘দ্য বুকস অব জেকব, (২০১৪) ‘হাউস অব ডে, হাউস অব নাইট’ (২০২৫), ‘ড্রাইভ ইয়োর প্লাউ ওভার দ্য বোনস অব দ্য ডেড’ (২০০৯)।
২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার তাকে দেওয়া হয়; পুরস্কারটি ঘোষণা করা হয় ২০১৯ সালে। তার সাহিত্য মানুষের পরিচয়, ভ্রমণ, সীমান্ত, ইতিহাস ও স্বাধীনতার প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে শেখায়। তোকারচুকের কাছে সাহিত্য শুধু গল্প নয়—এটি মানুষের চিন্তাকে উসকে দেওয়ার একটি উপায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









