প্রিয় মুস্তাফা,
তোমার চিঠি পেয়েছি। লিখেছ, স্যাক্রামেন্টোতে তোমার সঙ্গে থাকার জন্য তুমি সব ব্যবস্থা করে ফেলেছ। আরও লিখেছ, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে আমার ভর্তি হয়েছে। তোমার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই, বন্ধু। তুমি যা করেছ, তার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু এখন যে কথাটি তোমাকে বলতে যাচ্ছি, তা শুনে তুমি হয়তো অবাক হবে। আমি আসছি না।
না, মুস্তাফা। আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলেছি।
অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না? অথচ আমার ভেতরে কোনো দ্বিধা নেই। বরং মনে হচ্ছে, জীবনে এই প্রথম কোনো একটি বিষয়কে এত পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। তুমি লিখেছিলে—‘যেখানে সবুজ আছে, পানি আছে, সুন্দর মুখ আছে।’ তুমি আমাকে সেই দেশে নিয়ে যেতে চেয়েছিলে। আমি যাব না। আমি এখানেই থাকব। আর কোনোদিন চলে যাব না।
এ কথা লিখতে গিয়ে আমার বুকের ভেতর একটা পুরোনো ব্যথা জেগে উঠছে। আমাদের জীবন আর একই পথে চলবে না। মনে পড়ছে, আমরা একসময় কীভাবে বলতাম—আমরা একসঙ্গে যাব, একসঙ্গে বাঁচব, একদিন ধনী হব।
‘আমরা ধনী হব!’
শৈশবের সেই কথাগুলো এখন কত দূরের মনে হয়। তবু আমি ভুলিনি সেই দিনটিকে। কায়রো বিমানবন্দরের হলঘর। তোমার হাত আমার হাতে। সামনে বিমানের উন্মত্ত শব্দ। চারপাশ যেন সেই শব্দের সঙ্গে ঘুরছে। তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে। তোমার গোল মুখ। নীরব। শাজাইয়ার সেই ছেলেটির মুখই ছিল তোমার মুখে। শুধু কয়েকটি রেখা তখন তাতে যোগ হয়েছিল।
আমরা তো সেখানেই বড় হয়েছিলাম। একই গলিতে, একই ধুলোয়, একই পরাজয়ের মধ্যে। আমরা একে অন্যকে এতটাই চিনতাম যে অনেক কথা বলার প্রয়োজন হতো না।
তখন তুমি বলেছিলে—‘আর পনেরো মিনিট। এভাবে তাকিয়ে থেকো না। শোনো, আগামী বছর তুমি কুয়েতে যাবে। টাকা জমাবে। তারপর গাজা থেকে নিজেকে তুলে ক্যালিফোর্নিয়ায় নিয়ে আসবে। আমরা একসঙ্গে শুরু করেছি। একসঙ্গেই শেষ করব।’
তোমার কথাগুলো তখনও আগের মতোই ছুটে চলছিল। কোনো কমা নেই, কোনো দাঁড়ি নেই। কিন্তু আমি তোমার চোখে কিছু দেখেছিলাম। তুমি খুশি ছিলে না। কেন, তা তুমি বলতে পারতে না। আমিও পারতাম না। শুধু মনে হচ্ছিল—আমরা এখান থেকে পালিয়ে যাই না কেন?
গাজা ছেড়ে যাই না কেন?
তখন তোমার ভাগ্য একটু বদলেছিল। কুয়েতের শিক্ষা মন্ত্রণালয় তোমাকে চাকরি দিয়েছিল। আমাকে দেয়নি। তুমি আমাকে টাকা পাঠাতে শুরু করলে। বললে, এগুলো ঋণ। তুমি জানতেই, আমার পরিবার কী অবস্থায় আছে। আমার সামান্য বেতনে মা, আমার ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী আর তার চার সন্তানকে চালানো যায় না।
তুমি সব জানতে। সব। তারপর বিমানের সময় হলো। ‘আমাকে লিখবে,’ তুমি বলেছিলে। ‘প্রতিদিন। প্রতি ঘণ্টায়। প্রতি মিনিটে। বিমান ছাড়ছে। বিদায় নয়—আবার দেখা হবে।’
তোমার ঠান্ডা ঠোঁট আমার গাল ছুঁয়েছিল। তারপর তুমি মুখ ফিরিয়ে বিমানের দিকে তাকালে। আবার যখন আমার দিকে তাকালে, তোমার চোখে জল। পরে কুয়েতের চাকরিটা আমিও পেলাম। সেখানে আমি তোমাকে চিঠি লিখতাম। সব লিখতাম। কিন্তু আমার জীবন ছিল এক অদ্ভুত জীবন।
গরম। আঠালো। ফাঁপা।
মনে হতো, আমি যেন একটি ছোট ঝিনুক—একটি বিশাল, অন্ধকার নিঃসঙ্গতার মধ্যে পড়ে আছি। প্রতিদিন একই কাজ। একই ঘর। একই সময়। মাসের শেষ দিনের অপেক্ষা। সময় যেন আমাকে খেয়ে ফেলছিল।
তারপর সেই বছর এল। ইহুদিরা সাবহার কেন্দ্রীয় এলাকায় বোমা ফেলল। গাজায় হামলা হলো। আমাদের গাজায়। কিন্তু আমি তখনও ভাবছিলাম—আমি তো চলে যাব। আমি ক্যালিফোর্নিয়ায় যাব। সবুজ ক্যালিফোর্নিয়া। সেখানে আমি নিজের জন্য বাঁচব।
গাজাকে তখন আমার ভালো লাগত না। গাজার মানুষদেরও না। শহরটাকে মনে হতো কোনো অসুস্থ মানুষের আঁকা ধূসর ছবি—যার কোনো ছবিই শেষ হয়নি। মাকে টাকা পাঠাব। ভাইয়ের স্ত্রীকে পাঠাব। তার সন্তানদের পাঠাব।
তারপর? তারপর আমি মুক্ত। আমি ভেবেছিলাম, এইটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু মানুষ কি তার বাড়ি থেকে এত সহজে বেরিয়ে যেতে পারে? আমি জানি না। জুন মাসে ছুটি নিয়ে গাজায় ফিরলাম। আমার জিনিসপত্র গুছানো। মনে হচ্ছিল, এবার সত্যিই চলে যাব।
কিন্তু গাজা তখনও সেখানে। সেই সরু রাস্তা। সেই বেরিয়ে থাকা বারান্দা। সেই দেয়াল। সেই ধুলো। মনে হচ্ছিল, আমি একটি মরচেধরা শামুকের খোলসের ভেতর ঢুকে পড়েছি। তবু আমি মায়ের কাছে গেলাম। সেদিন আমার ভাইয়ের স্ত্রী আমাকে দেখে কাঁদতে শুরু করল।
বলল, নাদিয়া আমাকে দেখতে চায়। তুমি নাদিয়াকে চেনো? আমার ভাইয়ের মেয়ে। তেরো বছর বয়স। সুন্দর একটি মেয়ে। গাজা হাসপাতালে শুয়ে আছে। সেদিন সন্ধ্যায় আমি এক পাউন্ডের আপেল কিনলাম। হাসপাতালে গেলাম।
মা আর তার মা আমার কাছ থেকে কিছু লুকিয়েছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম। এমন কিছু, যা তারা বলতে পারছিল না।
নাদিয়াকে আমি ভালোবাসতাম। হয়তো অভ্যাসের মতো।
আমাদের সেই প্রজন্মের সবাইকে যেমন ভালোবাসতাম—যে প্রজন্ম পরাজয় আর উদ্বাস্তু জীবনের মধ্যে বড় হয়েছে। যে প্রজন্মের কাছে সুখও কখনো কখনো অস্বাভাবিক বলে মনে হয়।
হাসপাতালের ঘরটি সাদা ছিল। নাদিয়া বিছানায় শুয়ে ছিল। তার পিঠের নিচে বড় একটি বালিশ। তার ওপর চুল ছড়িয়ে আছে। চোখ দুটি বড়, কালো। চোখের গভীরে একটি অশ্রু যেন স্থির হয়ে আছে। তার মুখ শান্ত। অদ্ভুত শান্ত। কিন্তু সেই মুখে এত কথা ছিল যে, মনে হচ্ছিল কোনো নির্যাতিত মানুষের মুখ দেখছি।
আমি বললাম— ‘নাদিয়া!’ হয়তো আমি বলেছিলাম। হয়তো অন্য কেউ। সে আমার দিকে তাকাল। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, গরম চায়ের মধ্যে ফেলে দেওয়া চিনির টুকরোর মতো আমি গলে যাচ্ছি।
সে বলল—‘চাচা! আপনি কি কুয়েত থেকে এসেছেন?’ আমি তার পাশে বসলাম। বললাম— ‘তোমার জন্য অনেক উপহার এনেছি। তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে। আমার বাড়িতে আসবে। তখন তোমাকে সব দেব। তুমি যে লাল প্যান্ট চেয়েছিলে, সেটাও এনেছি।’
আমি মিথ্যা বলছিলাম। আমি জানতাম, লাল প্যান্টটি আমি আনিনি। কিন্তু সেই মুহূর্তে বুঝলাম, এই মিথ্যাই আমার জীবনের প্রথম সত্য কথা। নাদিয়া কেঁপে উঠল। তার মাথা নিচু হয়ে গেল। তারপর তার চোখের জল আমার হাতের ওপর পড়ল।
আমি বললাম— ‘কিছু বলো, নাদিয়া। লাল প্যান্টটা কি তোমার পছন্দ হয়নি?’
সে আমার দিকে তাকাল। কিছু বলতে চাইল। পারল না।
তারপর বলল— ‘চাচা!’ সে হাত বাড়াল। সাদা চাদরটি একটু সরাল।
তারপর তার পায়ের দিকে ইশারা করল। সেখানে কোনো পা নেই। উরুর একেবারে ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়েছে।
মুস্তাফা,
সেদিন আমি প্রথম বুঝলাম, মানুষের শরীরের একটি অঙ্গ হারানো আর একটি শহরের অঙ্গ হারানো কখনো কখনো একই ঘটনা হতে পারে।
আমি নাদিয়ার পা ভুলব না। কখনো না। তার মুখও না। সেই মুখে যে শোক জমে গিয়েছিল, তা আর শুধু একটি মেয়ের শোক ছিল না। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলাম। আমার হাতে তখনও সেই দুই পাউন্ড। নাদিয়ার জন্য এনেছিলাম।
দেওয়া হয়নি। বাইরে রোদ ছিল। প্রচণ্ড রোদ। রাস্তাগুলো রক্তের মতো লাল দেখাচ্ছিল। আর তখনই গাজা বদলে গেল।
না, গাজা বদলায়নি। আমি বদলে গিয়েছিলাম। শাজাইয়ার কাছে জমে থাকা পাথরগুলোর দিকে তাকালাম। এতদিন তারা শুধু পাথর ছিল। সেদিন মনে হলো, তারা কথা বলছে।
তারা বলছে—এখান থেকেই শুরু। আমি যে রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম, হঠাৎ মনে হলো সেটি শুধু একটি রাস্তা নয়। এটি একটি দীর্ঘ পথের শুরু। হয়তো সাফাদের দিকে যায়।
গাজার দুঃখ তখন আর শুধু কান্না ছিল না। তার মধ্যে ছিল প্রতিরোধ। তার মধ্যে ছিল ফিরে পাওয়ার দাবি। যে পা কেটে ফেলা হয়েছে, তারও যেন ফিরে আসার একটি অধিকার আছে।
পরে জানতে পারলাম, নাদিয়া নিজের ভাইবোনদের বাঁচাতে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বোমা আর আগুন তখন তাদের বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল।
সে চাইলে পালাতে পারত। নিজেকে বাঁচাতে পারত। তার পা বাঁচাতে পারত। কিন্তু সে পালায়নি। কেন? এই প্রশ্নের উত্তর আমি এখন জানি না। হয়তো কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর শব্দে দেওয়া যায় না।
মুস্তাফা, তাই আমি স্যাক্রামেন্টোতে যাচ্ছি না।
আমার কোনো অনুশোচনা নেই। আমরা শৈশবে যে পথচলা শুরু করেছিলাম, সেটি তোমার সঙ্গে শেষ করতে পারব না। তোমার মনে আছে তো, গাজা ছাড়ার সময় তোমার ভেতরে যে অদ্ভুত অনুভূতিটি ছিল? সেই অনুভূতিটিকে আর ছোট করে রেখো না। তাকে বড় হতে দাও। তার ভেতরে ঢুকে যাও। নিজেকে খুঁজে দেখো। কারণ হয়তো নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জায়গাটি ক্যালিফোর্নিয়ার সবুজে নয়।
হয়তো তা এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই। এই পাথরগুলোর মধ্যে। এই ক্ষতগুলোর মধ্যে। এই গাজার মধ্যে।
আমি তোমার কাছে যাচ্ছি না। তুমিই ফিরে এসো।
ফিরে এসো, মুস্তাফা।
ফিরে এসো আমাদের কাছে। নাদিয়ার সেই পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে শিখে নাও—জীবন কী। শিখে নাও, অস্তিত্বের মূল্য কোথায়।
ফিরে এসো, বন্ধু।
আমরা অপেক্ষা করছি।
আমরা সবাই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









