ফ্রানৎস কাফকা তার মৃত্যুর আগে বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে নির্দেশ দিয়েছিলেন—তার অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি, ডায়েরি, চিঠিপত্র, অসমাপ্ত উপন্যাস—সব পুড়িয়ে ফেলতে। ব্রড সেই নির্দেশ মানেননি। ফলে ‘দ্য ট্রায়াল’, ‘দ্য ক্যাসল’, ‘আমেরিকা’সহ কাফকার বহু লেখা পৃথিবীর সামনে এসেছে। তার ফেলিসে বাউয়ারকে লেখা দীর্ঘ প্রেমপত্রগুলোর ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন ওঠে— এগুলো কি প্রকাশ করা উচিত ছিল? ব্যক্তিগত চিঠি কি লেখকের মৃত্যুর পর পাঠকের সম্পত্তি হয়ে যেতে পারে?
কিন্তু কাফকার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও জটিল। কারণ তার ‘উইল’ বা শেষ ইচ্ছার ভাষার মধ্যেই ছিল এক গভীর দ্বন্দ্ব। তিনি একদিকে নিজের লেখাকে ধ্বংস করতে চেয়েছেন, অন্যদিকে সারাজীবন এমনভাবে লিখেছেন যেন লেখাই তার অস্তিত্বের একমাত্র সত্য। তাই তার শেষ ইচ্ছাকে শুধু আক্ষরিক অর্থে পড়লে কাফকার মানুষটিকে বোঝা যায় না।
কাফকার প্রথম নির্দেশটি ছিল কালিতে লেখা একটি অনির্দিষ্ট তারিখের কাগজে। ১৯২৪ সালে তার মৃত্যুর পর সেটি পাওয়া যায়। তিনি চেয়েছিলেন তার ডায়েরি, পাণ্ডুলিপি, চিঠি—সব ‘না পড়েই’ পুড়িয়ে ফেলা হোক। কিন্তু ম্যাক্স ব্রড আগেই জানিয়েছিলেন, তিনি এই নির্দেশ পালন করবেন না। পরে ডেস্কে পাওয়া যায় আরেকটি পেন্সিলে লেখা ‘উইল’, সম্ভবত ১৯২২ সালের। সেটিও ধ্বংসের কথা বলেছিল, যদিও কয়েকটি লেখা—‘দ্য জাজমেন্ট’, ‘দ্য স্টোকার’, ‘দ্য মেটামরফোসিস, ‘ইন দ্য পেনাল কলোনি, ‘আ কান্ট্রি ডক্টর’ এবং ‘আ হাঙ্গার আর্টিস্ট’—রেহাই পেয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয়, এর কিছু লেখা কাফকা নিজেই মৃত্যুর আগে প্রকাশ করেছিলেন।
তাহলে তিনি আসলে কী চেয়েছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কাফকার নিজের স্বভাবের দিকে তাকাতে হয়। ম্যাক্স ব্রডকে ১৯২২ সালের এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, নিজের লেখাকে নিন্দা করার মধ্যে যেমন সত্য ছিল, তেমনি ছিল এক ধরনের কৌশলও। তিনি হয়তো সত্যিই মনে করতেন তার লেখা খারাপ; কিন্তু একই সঙ্গে এমনভাবে নিজের লেখা নিন্দা করতেন, যাতে প্রকাশক সেটি ফিরিয়ে দিতে সাহস না পান। তার আত্মনিন্দার মধ্যেও তাই ছিল এক অদ্ভুত ‘পদ্ধতি’। তার কথা ও কাজের মধ্যে এই বাঁক, এই গোপন পথ, এই পরস্পরবিরোধী ইচ্ছাই কাফকার ব্যক্তিত্বের অন্যতম রহস্য।
তার শেষ গল্প ‘জোসেফিন দ্য সিঙ্গার’–এর জোসেফিনের কথাও এখানে মনে পড়ে। সে চায় তার শিল্পের স্থায়ী স্বীকৃতি; অথচ একদিন গান গাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং অদৃশ্য হয়ে যায়, যেন মানুষ তাকে খুঁজতে বাধ্য হয়। কাফকার নিজের ক্ষেত্রেও যেন একই কৌশল কাজ করে—‘আমাকে ভুলে যাও’, বলার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ‘আমাকে মনে রেখো’।
কাফকার জীবনের কেন্দ্রে ছিল এই দ্বন্দ্ব: তিনি কি সংসার করবেন, নাকি লেখার জন্য নিজেকে একা রাখবেন? ফেলিসে বাউয়ারকে তিনি দুবার বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দুবার বাগদান করেছিলেন, এবং দুবারই সম্পর্ক ভেঙে যায়। ১৯১২ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত তাদের চিঠিপত্রে প্রেম যেমন আছে, তেমনি আছে প্রেম থেকে পালানোর প্রবল আকাঙ্ক্ষা।
কাফকা মনে করতেন, লেখালেখি তার জীবনের কেন্দ্র। ১৯১৩ সালে তিনি ফেলিসেকে লিখেছিলেন, তিনি সাহিত্যে ‘আগ্রহী’ নন; বরং তিনি নিজেই সাহিত্য—“আমি সাহিত্য দিয়ে তৈরি, আমি আর কিছু নই।” তার কাছে লেখা কোনো পেশা বা শখ ছিল না। এটি ছিল তার অস্তিত্বের অংশ। তিনি এমনকি বলেছিলেন, তার স্ত্রীকে যেন এক সন্ন্যাসীর মতো জীবন কাটাতে হবে এমন এক মানুষের পাশে, যে অদৃশ্য সাহিত্যের শিকলে বাঁধা।
এ কারণেই বিবাহ তার কাছে শুধু সামাজিক সম্পর্ক ছিল না; তা ছিল নিজের গভীরতম সত্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার সম্ভাবনা। তার মনে হতো, সংসার, চাকরি, যৌনতা, সামাজিক জীবন—সবই তাকে লেখার সেই অন্তর্গত অঞ্চল থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। অথচ লেখার মধ্যেই তিনি আবার নিজেকে খুঁজে পেতেন।
এই দ্বন্দ্বের আরেকটি দিক ছিল ‘বাস্তবতা’ ও ‘সাহিত্য’-এর সম্পর্ক। কাফকার কাছে বাস্তব জীবন যেন সবসময় একটু দূরের, অনিশ্চিত এক জগৎ। ফেলিসেকে লেখা চিঠিগুলোতে তিনি তার প্রতিদিনের জীবন, ছবি, ছোটখাটো ঘটনা, এমনকি তুচ্ছ বিষয়েরও বিস্তারিত বিবরণ চাইতেন। যেন ভাষার সাহায্যে বাস্তবতাকে ধরে রাখা যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই বাস্তবতাকে ধরে রাখার চেষ্টাই ক্রমে সাহিত্য হয়ে উঠত।
প্রথম দেখা হওয়ার কয়েক মাস পর তিনি ফেলিসের সঙ্গে সেই সাক্ষাতের প্রতিটি মুহূর্ত এমন নিখুঁতভাবে লিখেছিলেন, যেন স্মৃতির কোনো ক্ষুদ্র অংশও হারিয়ে যেতে না পারে। কিন্তু সেই অতিরিক্ত নির্ভুলতাই বাস্তবতার নিশ্চয়তা নয়; বরং বাস্তবতাকে হারিয়ে ফেলার ভয়। ফেলিসে যেন একই সঙ্গে একজন বাস্তব নারী এবং কাফকার কল্পনার এক চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন।
তার প্রেমপত্রগুলোও তাই এক অদ্ভুত দ্বৈত জীবন বহন করে। তিনি ফেলিসেকে কাছে টানছেন, আবার দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন। তাকে বিয়ে করতে চান, আবার মনে করছেন বিয়ে করলে তার লেখক-সত্তা ধ্বংস হবে। তার কাছে প্রেম সত্য, কিন্তু সেই প্রেমের বাস্তব রূপ যেন অসহনীয়।
১৯১৬ সালে মারিয়েনবাদে ফেলিসের সঙ্গে কয়েকটি দিন কাটানোর পর কাফকা কিছুটা অন্যরকম বাস্তবতার স্পর্শ পেয়েছিলেন। ফেলিসে পূর্ব ইউরোপের ইহুদি উদ্বাস্তু ও শিশুদের নিয়ে কাজ করছিলেন; কাফকা তার সেই কাজের সঙ্গে যুক্ত হন, বই পাঠান, পরামর্শ দেন। কিছু সময়ের জন্য মনে হয়েছিল, তাদের জীবন হয়তো কোনো বাস্তব ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে। কিন্তু সেই শান্তি স্থায়ী হয়নি। আবার ফিরে আসে উদ্বেগ, দ্বিধা, বিচ্ছিন্নতা।
কাফকার লেখার প্রতিও তার মনোভাব ছিল একই রকম দ্বিধায় পূর্ণ। কখনো তিনি মনে করতেন, লেখাই তার সত্যিকারের জীবন; আবার কখনো মনে করতেন, সাহিত্যই তার অভিশাপ। ১৯২২ সালে ম্যাক্স ব্রডকে লেখা চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, লেখা তাকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু এই পুরস্কার যেন শয়তানের কাছে দেওয়া পুরস্কার। লেখার মধ্যে তিনি অনুভব করতেন এক ধরনের অন্ধকার শক্তির টান—যা তাকে পৃথিবীর স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে নিয়ে যায়।
তবু তার লেখাই ছিল তার সত্যের সবচেয়ে কাছের আশ্রয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পের মাধ্যমে পৃথিবীকে ‘শুদ্ধ, সত্য এবং অপরিবর্তনীয়’ করে তোলার চেষ্টা করা যায়। তার কাছে ভাষা ছিল শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ছিল অস্তিত্বের গভীরে পৌঁছানোর উপায়।
এই কারণেই কাফকার ‘সত্যিকারের উইল’ নিয়ে প্রশ্নের কোনো সরল উত্তর নেই। তার লিখিত উইল বলেছিল—ধ্বংস করো। কিন্তু তাঁর জীবন যেন বলেছিল—লিখে যাও। তিনি নিজেকে সাহিত্যের সঙ্গে এমনভাবে এক করে ফেলেছিলেন যে সাহিত্যকে ধ্বংস করার নির্দেশ দেওয়া মানে যেন নিজের একটি অংশকে ধ্বংস করার নির্দেশ দেওয়া।
হয়তো কাফকার আসল ইচ্ছা ছিল এমন এক জগৎ তৈরি করা, যেখানে ‘শেষ ইচ্ছা’ বলে কিছু লিখতে হবে না—যেখানে জীবন, শিল্প ও সত্যের মধ্যে কোনো বিভাজন থাকবে না। তিনি একবার লিখেছিলেন, ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভূত এই পৃথিবী আধ্যাত্মিক জগতের এক ধরনের অশুভ রূপ; আর শিল্পের কাজ সেই গভীরতর জগতকে ভাষায় প্রকাশ করা।
ফেলিসেকে লেখা তার চিঠিগুলো তাই নিছক প্রেমপত্র নয়। এগুলো এক মানুষের নিজের অস্তিত্বকে বোঝার দীর্ঘ সংগ্রামের দলিল। সেখানে প্রেম আছে, কিন্তু প্রেমের চেয়েও বড় আছে নিজেকে নিয়ে সংশয়; বিবাহের আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু তার চেয়েও প্রবল আছে একাকিত্বের প্রয়োজন; সাহিত্য আছে, আবার সাহিত্যের বিরুদ্ধে অভিযোগও আছে।
শেষ পর্যন্ত কাফকার জীবন যেন দুই শক্তির টানাপোড়েনে ক্ষতবিক্ষত এক নৌকা। একদিকে বাস্তব পৃথিবী—প্রেম, বিবাহ, পরিবার, সমাজ; অন্যদিকে সেই অদৃশ্য জগৎ, যেখানে ভাষা ও লেখার মধ্যে তিনি নিজের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজতেন। কোনটি তার ‘সত্যিকারের জীবন’—তার উত্তর তিনি নিজেও শেষ পর্যন্ত দিতে পারেননি।
তাই কাফকার ‘উইল’কে হয়তো তার শেষ নির্দেশ হিসেবে নয়, তার অন্তহীন দ্বন্দ্বের আরেকটি প্রকাশ হিসেবে পড়াই বেশি অর্থবহ। তিনি বলেছিলেন, তিনি সাহিত্য ছাড়া আর কিছু নন। আবার সেই সাহিত্যকেই কখনো অভিশাপ বলেছেন। তার চিঠি পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন, অথচ সেই চিঠিগুলোই আজ তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ সত্যের দরজা খুলে দেয়।
কাফকার সত্যিকারের ইচ্ছা সম্ভবত কোনো একটি বাক্যে লেখা ছিল না। তার ‘উইল’-এর কোনো একক পাঠ নেই। তার সত্য ছিল সেই দ্বন্দ্বেই—লিখবেন, অথচ লেখাকে অস্বীকার করবেন; ভালোবাসবেন, অথচ ভালোবাসার বাস্তবতা থেকে পালাবেন; পৃথিবীকে প্রত্যাখ্যান করবেন, অথচ ভাষার মাধ্যমে সেই পৃথিবীকে চিরস্থায়ী করে তুলবেন। আর সেই কারণেই, মৃত্যুর এক শতাব্দী পরও, কাফকার লেখা আমাদের কাছে শুধু সাহিত্য নয়—নিজেকে বোঝার এক অস্বস্তিকর, অথচ অনিবার্য আয়না।
দৈনিক এদিন অনলাইন ‘লেটার্স টু ফেলিস বাই ফ্রান্ৎস কাফকা’ বই থেকে ধারাবাহিকভাবে তার চিঠিগুলো বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য প্রকাশ করবে। পাঠক আসনু আমরা কাফকার চিঠির মধ্য দিয়ে তার মনোলোকে প্রবেশ করি
প্রাগ, ২০ সেপ্টেম্বর ১৯১২
প্রিয় ফ্রয়লাইন বাউয়ার,
হয়তো আমাকে আপনার আর মনে নেই। এটাই স্বাভাবিক। মানুষ সাধারণত সেই মুখগুলো মনে রাখে না, যাদের সঙ্গে তার জীবনের কোনো নিশ্চিত সম্পর্ক তৈরি হয়নি। তাই আবার পরিচয় দিচ্ছি। আমার নাম ফ্রানৎস কাফকা। সেই সন্ধ্যায় পরিচালক ব্রডের বাড়িতে যে মানুষটি প্রথম আপনাকে অভিবাদন জানিয়েছিল, সেই মানুষটিই আমি। পরে টেবিলের ওপার থেকে থালিয়ার ভ্রমণের ছবিগুলো একে একে আপনার হাতে দিয়েছিলাম। শেষে যে হাত দিয়ে আপনাকে বিদায় জানাতে চেয়েছিলাম, সেই হাতেই আপনার হাত ধরেছিলাম। আর সেই হাতই তখন আপনার কাছ থেকে একটি প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল—পরের বছর আপনি তার সঙ্গে প্যালেস্টাইনে যাবেন।
আপনার সেই ইচ্ছা যদি এখনো বদলে না থাকে—সেদিন আপনি বলেছিলেন, আপনি সহজে মত পাল্টান না, এবং তখন আপনার কথায় আমি তার বিপরীত কোনো লক্ষণও দেখিনি—তাহলে আমাদের এখনই এই ভ্রমণ নিয়ে কথা বলা দরকার। শুধু দরকার বললে কম বলা হয়; এখনই শুরু না করলে পরে হয়তো আর সময় থাকবে না। আমাদের ছুটি এমনিতেই খুব অল্প। প্যালেস্টাইনে যাওয়ার জন্য তো আরও অল্প। তাই ছুটির প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব আগে থেকেই করতে হবে। কোথায় যাব, কীভাবে যাব, কী সঙ্গে নেব, কতটা সময় কোথায় কাটাব—সবকিছু যেন যাত্রার আগেই আমাদের জানা থাকে। কারণ অপ্রস্তুত অবস্থায় রওনা হলে পথ আমাদের হয়ে যাবে, অথচ আমরা পথের জন্য প্রস্তুত থাকব না।
একটি কথা অবশ্য আগে থেকেই স্বীকার করে নেওয়া ভালো। কথাটি আমার এই চিঠির উদ্দেশ্যের সঙ্গে কিছুটা অসংগত, তবু না বললে পরে হয়তো আরও অসংগত হয়ে উঠবে: আমি ভালো চিঠিলেখক নই। বরং বলা যায়, আমি একেবারেই অনিয়মিত চিঠিলেখক। কোনো দিন চিঠি লিখতে ইচ্ছা করে, কোনো দিন করে না। আর কোনো দিন যদি ইচ্ছাটুকুও না থাকে, তখন আমার টাইপরাইটারটি আমাকে বাঁচায়। মন না থাকলেও আঙুলগুলো অন্তত কাজ করতে পারে।
চিঠির উত্তর নিয়েও আমার অভ্যাস অদ্ভুত। আমি কখনো আশা করি না যে একটি চিঠির উত্তর সঙ্গে সঙ্গে এসে পৌঁছাবে। এমনকি কোনো চিঠির অপেক্ষায় দিনের পর দিন থাকলেও, প্রতিদিন নতুন করে অপেক্ষা করলেও, চিঠি না এলে আমি বিশেষভাবে হতাশ হই না। আর যখন শেষ পর্যন্ত চিঠিটি আসে, তখন বরং একটু অবাক হই—যেন যার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, সে আসলে আসবে বলে কখনো বিশ্বাসই করিনি।
এই মুহূর্তে টাইপরাইটারে নতুন একটি কাগজ ঢোকাতে গিয়ে মনে হচ্ছে, হয়তো নিজের সম্পর্কে আপনাকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কঠিন একটি ধারণা দিয়ে ফেলেছি। যদি তা হয়ে থাকে, তাহলে দোষ আমারই। কারণ অফিসে ছয় ঘণ্টা কাটানোর পর, এমন একটি টাইপরাইটারের সামনে বসে যার সঙ্গে আমার কোনো ঘনিষ্ঠ পরিচয় নেই, কেন আমি এই চিঠি লিখতে শুরু করলাম—এই প্রশ্নের উত্তর আমার নিজের কাছেও খুব স্পষ্ট নয়।
তবু, তবু—টাইপরাইটারের একটি সুবিধা যেমন আছে, তেমনি একটি বিপদও আছে। আঙুলগুলো লিখতে থাকে, অথচ মানুষটি কখনো কখনো ভুলে যায় সে কী বলতে চেয়েছিল। একটি বাক্য আরেকটি বাক্যকে ডেকে আনে, তারপর তৃতীয়টি এসে প্রথম দুটিকে সরিয়ে দেয়। এভাবে চিঠি এগোয়, কিন্তু ভাবনাটি কোথায় ছিল, তা আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
তবে যদি আমার সঙ্গে ভ্রমণে যাওয়ার ব্যাপারে আপনার কোনো বাস্তব সংশয় থাকে—আমি কেমন ভ্রমণসঙ্গী হব, পথপ্রদর্শক হিসেবে কতটা সহনীয় হব, আপনার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াব কি না, অথবা অজান্তেই কোনো একসময় স্বৈরাচারী হয়ে উঠব কি না—এসব নিয়ে আপনার এখনই ভাবা উচিত নয়। এসব প্রশ্নের উত্তর পথেই হয়তো পাওয়া যাবে, অথবা কোনোদিনই পাওয়া যাবে না।
এই মুহূর্তে শুধু একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: চিঠির লেখক হিসেবে আমাকে আপনি সহ্য করতে পারেন কি না। এই ভূমিকায় অন্তত আমাকে একবার সুযোগ দিয়ে দেখতে পারেন।
আপনার আন্তরিক,
প্রিয় ফ্রানৎস কাফকা
পোর্জিচ ৭, প্রাগ
#
প্রাগ, ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯১২
প্রিয় ফ্রয়লাইন বাউয়ার,
টাইপরাইটারে লিখছি না বলে আমাকে ক্ষমা করবেন। যন্ত্রটি করিডরে পড়ে আছে, আর আমার কাছে আপনাকে বলার মতো এত কিছু জমে আছে যে, সেখানে গিয়ে তার সামনে বসা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া আজ ছুটির দিন। জানালা খোলা। বাতাস ঘরে ঢুকছে। দীর্ঘদিন পর অফিসে আসার সময় আমি গুনগুন করে গান গেয়েছি। আপনার চিঠি নিতে না হলে এই ছুটির দিনে এখানে আসার আর কোনো কারণ আমি খুঁজে পেতাম না।
আপনার ঠিকানা পাওয়ার ঘটনাটি আপনাকে বলা উচিত কি না, জানি না। আপনি হয়তো জানতে চাইবেন, কীভাবে পেলাম। কিন্তু প্রশ্নটি আসলে ঠিকানা নিয়ে নয়; আপনি জানতে চাইবেন, কেন আমি এতদিন লিখিনি।
প্রথমে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম পেয়েছিলাম। সেটি আমার ভালো লাগেনি। তারপর আপনার বাড়ির ঠিকানা পেলাম, কিন্তু বাড়ির নম্বর ছিল না। পরে নম্বরও পেলাম। তখন মনে হলো, সবকিছু সম্পূর্ণ হয়েছে। অথচ আমি লিখলাম না।
একটি ঠিকানা কখনো কখনো চিঠির চেয়েও বেশি কিছু হয়ে ওঠে। তাকে কাগজে লিখে ফেললেই যেন তার সম্ভাবনাগুলো শেষ হয়ে যায়। তাছাড়া ঠিকানাটি ভুলও হতে পারত। ইমানুয়েল কির্শ নামে কোনো মানুষকে আমি চিনতাম না। সন্দেহজনক ঠিকানায় পাঠানো চিঠি আসলে চিঠি নয়—এটি এমন এক দীর্ঘশ্বাস, যার কোনো শ্রোতা নেই।
পরে জানতে পারলাম, আপনার রাস্তায় ইমানুয়েল নামে একটি গির্জা আছে। তখন কিছুক্ষণের জন্য পৃথিবী আবার সুশৃঙ্খল হয়ে উঠল।
শুধু একটি বিষয় থেকে গেল। বার্লিনের ঠিকানাগুলোতে দিকনির্দেশ থাকে। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব কিংবা পশ্চিম। আমি জানতে চেয়েছিলাম, আপনি কোন দিকে থাকেন। আপনাকে উত্তরে কল্পনা করেছিলাম। যদিও শুনেছি, উত্তর দিকটি খুব সমৃদ্ধ নয়।
এতসব ঠিকানা, নম্বর, রাস্তা আর দিকের কথা বলছি, কারণ আমাদের মধ্যে একটি দরজা আছে। দরজাটি হয়তো নড়ছে। অথবা আমরা দুজনেই তার হাতল ধরে আছি, কিন্তু কেউ জানি না দরজাটি কোন দিকে খুলবে।
এই অবস্থায় মানুষ কী করে? আমি জানি না।
এক মুহূর্তে যা চাই, পরের মুহূর্তে তা থেকে পালাতে চাই। সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছেও জানি না, দরজা খুলে ঘরে ঢোকার পর আমার মন আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে। আমার ভেতরে অনিশ্চয়তাগুলো জমতে থাকে। তারা একে অপরের ওপর পড়ে, ভারী হয়ে ওঠে, তারপর কোনো এক অদ্ভুত মুহূর্তে একটি বাক্য হয়ে যায়। কখনো একটি চিঠি।
আমার প্রথম চিঠিটি লেখার আগে প্রায় দশটি সন্ধ্যা কেটে গেছে। আমি ঘুমাতে যাওয়ার আগে তাকে লিখেছি, মুছে ফেলেছি, আবার লিখেছি। কিন্তু আমার একটি অদ্ভুত দুর্বলতা আছে: আগে থেকে ভেবে রাখা কোনো বাক্য আমি সহজে কাগজে লিখতে পারি না।
স্মৃতি আমার ভালো নয়। তবে ভালো স্মৃতিশক্তি থাকলেও লাভ হতো না। কারণ একটি বাক্যের ভেতরে এমন কিছু অদৃশ্য সেতু থাকে, যেগুলো লেখা হওয়ার আগে কিছুক্ষণ ঝুলে থাকতে হয়। আমি যখন মনে মনে প্রস্তুত করা বাক্যটি লিখতে বসি, তখন দেখি বাক্যটি আর নেই। তার কিছু টুকরো মেঝেতে পড়ে আছে, কিছু টেবিলের নিচে, কিছু হয়তো আমার মাথার ভেতরেই রয়ে গেছে। তাদের ভেতর দিয়ে আমি দেখতে পাই না।
তখন কলম ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। কিন্তু আমি তা-ও পারি না। আমার দ্বিধা আমাকে শেষ কাজটিও করতে দেয় না।
একবার গভীর রাতে তোমার জন্য ভেবে রাখা একটি কথা লিখতে বিছানা থেকে উঠেছিলাম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে গেলাম। মনে হলো, এত উদ্বিগ্ন হওয়ার কী আছে? যা এখন এত পরিষ্কার মনে হচ্ছে, সকালে নিশ্চয়ই লিখতে পারব।
মধ্যরাতে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো সাধারণত সকাল পর্যন্ত টিকে থাকে না। কিন্তু কখনো কখনো তারা রাতের মধ্যেই আমাদের পরাজিত করে।
আমি আবার আগের চিঠির কথায় ফিরে যাচ্ছি। অথচ তোমাকে যা বলার ছিল, তার কিছুই বলা হয়নি।
তোমার প্রথম উত্তরটি আমার পাশে পড়ে আছে। আমি মাঝে মাঝে তার ওপর হাত রাখছি। যেন চিঠিটি আমার কিনা, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য। এটি আমাকে এমন এক আনন্দ দিয়েছে, যার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। অথবা কারণটি এতটাই যুক্তিহীন যে, তাকে আর কারণ বলা যায় না।
তুমি আমাকে আবার লিখবে কি?
খুব বেশি পরিশ্রম করে নয়। যদিও চিঠি লেখা কখনো পরিশ্রম ছাড়া হয় না। বরং আমার জন্য একটি ছোট ডায়েরি রাখো। সেখানে প্রতিদিনের সামান্য ঘটনাগুলো লিখে রেখো। এতে তোমার কম কষ্ট হবে, আর আমি অনেক বেশি কিছু জানতে পারব।
তুমি কখন অফিসে পৌঁছাও। সকালের নাশতায় কী খাও। জানালা দিয়ে কী দেখতে পাও। কী কাজ করো। তোমার বন্ধুদের নাম কী। কেন তোমাকে উপহার দেওয়া হয়। কে তোমাকে মিষ্টি খাইয়ে তোমার স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে চায়।
এইসব সামান্য বিষয়। অথচ মানুষের জীবন হয়তো এই সামান্য বিষয়গুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। আমি তোমার সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানি না। এই অজ্ঞতাই হয়তো আমার কৌতূহলের সবচেয়ে বড় কারণ।
আর প্যালেস্টাইনে যাওয়ার পরিকল্পনার কী হলো?
আগামী বসন্তে? না হলে শরতে? ভবিষ্যৎকে আমরা যত দূরে ঠেলে দিই, সে তত বেশি নির্দিষ্ট হয়ে ওঠে। অন্তত ক্যালেন্ডারের পাতায়। ম্যাক্সের অপেরাটা এখন ঘুমিয়ে আছে। সে ইতালিতে। ফিরে এসে তোমাদের জার্মানির ওপর একটি বিশাল সাহিত্যবর্ষপঞ্জি নিক্ষেপ করবে বলে মনে হচ্ছে।
আমার ছোট বইটিও শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়েছে। বই বলব, না পুস্তিকা, তা জানি না। তবে এটুকু জানি, এটি যথেষ্ট ভালো নয়। আরও ভালো কিছু লিখতে হবে।
এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেই তোমাকে বিদায় জানাচ্ছি। কারণ কোনো চিঠিই শেষ হয় না; আমরা কেবল একসময় কলম নামিয়ে রাখি।
তোমার,
ফ্রানৎস কাফকা
#
১৩ অক্টোবর ১৯১২
প্রিয় ফ্রয়লাইন বাউয়ার,
পনেরো দিন আগে, সকাল দশটায়, তোমার প্রথম চিঠিটি আমার হাতে এসেছিল। কয়েক মিনিট পরেই আমি বসে পড়েছিলাম। চার পৃষ্ঠা লিখেছিলাম—পাতাগুলো এত বড় ছিল যে, এখন মনে হয় চিঠির চেয়ে সেগুলোই হয়তো বেশি জায়গা দখল করেছিল।
এ নিয়ে আমার কোনো অনুতাপ নেই। ওই সময়টুকু এর চেয়ে আনন্দের সঙ্গে আর কীভাবে কাটাতে পারতাম, জানি না।
তবে চিঠিটি শেষ করার পর একটি অদ্ভুত ব্যাপার বুঝলাম। এত কিছু লিখেও প্রায় কিছুই বলা হয়নি। যে কথাগুলো বলা হয়নি, তারাই বরং আমার সঙ্গে থেকে গেল। কয়েক দিন তারা আমার ঘরে, অফিসে, বিছানায়—সব জায়গায় ঘুরে বেড়াল। তাদের এড়াতে পারলাম না। তারা আমাকে অস্থির করে রাখল।
তারপর সেই অস্থিরতার জায়গা নিল তোমার উত্তরের অপেক্ষা। প্রথমে অপেক্ষার মধ্যে আশা ছিল। পরে আশাটিও ধীরে ধীরে ছোট হতে লাগল। শেষ পর্যন্ত শুধু অপেক্ষাটুকু রয়ে গেল।
কিন্তু তুমি আমাকে লিখলে না কেন?
আমি অনেকগুলো কারণ খুঁজে পেয়েছি। প্রত্যেকটিই সম্ভব, যতক্ষণ না তাকে সত্যি বলে মেনে নিতে হয়। হয়তো আমার চিঠিতে এমন কিছু বোকামি ছিল, যা তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। তোমার আগের চিঠির ভঙ্গি দেখে এমনটা ভাবা অসম্ভব নয়। কিন্তু আমার প্রতিটি কথার পেছনে যে ভালো ইচ্ছা ছিল, সেটি কি তোমার চোখ এড়িয়ে যেতে পারে?
হয়তো চিঠিটি হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমার চিঠি এত তাড়াহুড়ো করে পাঠানো হয়েছিল যে, তার পথ হারানোর কথা নয়। আর তোমার উত্তরের জন্য আমি এত অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিলাম যে, মনে হচ্ছিল আমার চিঠি নিজেই তার গন্তব্য খুঁজে নেবে।
তবু কি চিঠি হারিয়ে যায়? নাকি চিঠি কেবল সেই মানুষের মনেই হারিয়ে যায়, যে তার অপেক্ষায় থাকে এবং অপেক্ষার আর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পায় না?
আরেকটি সম্ভাবনাও আছে। প্যালেস্টাইনে যাওয়ার সেই ভ্রমণের কথা কি তোমার পরিবারে এতটা অপছন্দের ছিল যে, আমার চিঠিটিও তার সঙ্গে আটকে গেছে?
কিন্তু একটি পরিবারের ভেতরে এমন ঘটনা কি সত্যিই ঘটতে পারে? আর তোমার ক্ষেত্রে? আমার হিসাব বলছে, চিঠিটি রবিবার সকালেই তোমার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল।
তাহলে আর একটি সম্ভাবনাই বাকি থাকে। সবচেয়ে দুঃখজনকটি। তুমি হয়তো অসুস্থ।
কিন্তু এটাও আমি বিশ্বাস করতে চাই না। নিশ্চয়ই তুমি সুস্থ আছ। নিশ্চয়ই তোমার দিনগুলো স্বাভাবিকভাবেই কাটছে। নিশ্চয়ই তুমি আনন্দিত।
এর পর আর আমার যুক্তি কোনো দিকে যেতে পারছে না। সে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। তাই তোমার উত্তরের আশায় যতটা না এই চিঠি লিখছি, তার চেয়ে বেশি লিখছি নিজের কাছে একটি দায়িত্ব পালন করার জন্য।
যদি আমি ইমানুয়েলকির্শস্ট্রাসের ডাকপিয়ন হতাম এবং এই চিঠি তোমার বাড়িতে নিয়ে যেতাম, তাহলে তোমাদের পরিবারের কেউ অবাক হয়ে আমাকে থামাতে চাইলে আমি থামতাম না। কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতাম না। সোজা একের পর এক ঘর পেরিয়ে তোমার ঘরে চলে যেতাম।
চিঠিটি তোমার হাতে দিতাম। তবে হয়তো সেটিও যথেষ্ট হতো না। বরং তোমার দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ঘণ্টা বাজাতে থাকতাম।
একবার নয়। বারবার। যতক্ষণ না দরজা খুলত।
আর যদি কেউ এসে জিজ্ঞেস করত, আমি কেন এভাবে ঘণ্টা বাজিয়ে চলেছি, তাহলে হয়তো কোনো উত্তর দিতাম না। কারণ উত্তর দিতে গেলে অপেক্ষার যে সামান্য আনন্দটুকু আছে, সেটিও নষ্ট হয়ে যেত।
আমি শুধু ঘণ্টা বাজিয়ে যেতাম। নিজের আনন্দের জন্য। কারণ সেই শব্দের মধ্যে এমন এক আনন্দ আছে, যা অপেক্ষার সমস্ত অস্থিরতা থেকে আমাকে মুক্ত করতে পারে।
তোমার,
ফ্রানৎস কে.
পোরিৎস ৭, প্রাগ


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









