১৯৪৩ সালে এলিয়াস কানেত্তি লিখেছিলেন, “আমি বিনয়ী হতে পারি না। আমার ভেতরে অনেক কিছু জ্বলছে। পুরোনো সমাধানগুলো ভেঙে পড়ছে; নতুনগুলোর কিছুই এখনো তৈরি হয়নি। তাই আমি সব জায়গায় একসঙ্গে শুরু করি—যেন আমার সামনে আরও এক শতাব্দী পড়ে আছে।” এই দুটি বাক্যের মাঝখানেই কানেত্তির প্রকৃত স্বরটি ধরা পড়ে। তিনি একই সঙ্গে অস্থির এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আত্মসচেতন এবং আত্মমগ্ন, জ্ঞানলোভী এবং মৃত্যুভীত। তিনি পৃথিবীকে বুঝতে চান, কিন্তু শুধু বোঝা তাঁর কাছে যথেষ্ট নয়। তিনি চান সবকিছু নিজের ভেতর ধারণ করতে। যেন পৃথিবীকে সম্পূর্ণভাবে অনুভব করার জন্য তাঁর এক জীবন যথেষ্ট নয়। ১৯৩৬ সালের নভেম্বরে ভিয়েনায় হারমান ব্রখের পঞ্চাশতম জন্মদিন উপলক্ষে কানেত্তি যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তা অন্য এক লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের চেয়েও বেশি কিছু। সেখানে তিনি আসলে নিজের লেখকসত্তার মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিলেন। একজন মহান লেখক কেমন? তিনি মৌলিক। তিনি তাঁর সময়কে ধারণ করেন। আবার নিজের সময়ের বিরুদ্ধেও দাঁড়ান। ব্রখকে প্রশংসা করতে গিয়ে কানেত্তি নিজের জন্যও একটি নৈতিক অবস্থান বেছে নিচ্ছিলেন। তিনি এমন লেখক হতে চেয়েছিলেন, যিনি সময়ের সঙ্গে মিশে যাবেন না, বরং তাকে প্রতিরোধ করবেন। আরও একটি বিষয় তাকে ব্রখের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল—বয়স। পঞ্চাশ বছর বয়সকে কানেত্তি মনে করেছিলেন জীবনের অর্ধেক মাত্র। তখন তার নিজের বয়স একত্রিশ। মৃত্যুর প্রতি তার এই গভীর বিরাগ, দীর্ঘজীবনের প্রতি তার আকুলতা, পরবর্তী প্রায় সব লেখাতেই ফিরে এসেছে।
কানেত্তি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি অন্যের শ্রেষ্ঠত্বের সামনে নিজেকে নত করতে পারতেন। এই নত হওয়া তার কাছে দুর্বলতা ছিল না। বরং নিজেকে বড় করে তোলার একটি পদ্ধতি। কার্ল ক্রাউসের প্রতি তার যৌবনের মুগ্ধতা নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, একজন গুরু বা শক্তিশালী লেখকের প্রভাবের অধীনে কিছু সময় থাকা একজন গুরুতর লেখকের জন্য কতটা প্রয়োজনীয় হতে পারে। কানেত্তির কাছে শ্রদ্ধা ছিল এক ধরনের নৈতিক অনুশীলন। কাফকা সম্পর্কে তার একটি অসাধারণ বাক্য আছে: “তাকে পড়লে মানুষ ভালো হয়ে যায়—কিন্তু তার জন্য গর্ব করার কিছু থাকে না।” কাফকা ছিলেন তার সবচেয়ে গভীর সাহিত্যিক মুগ্ধতাগুলোর একটি। কেন? কারণ কাফকার লেখায় ক্ষমতার প্রতি এক ধরনের প্রত্যাখ্যান আছে। মানুষ যখন ক্ষমতার কাছে নিজেকে বড় করতে চায়, কাফকা সেখানে দেখেন সরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা। কানেত্তির কাছে দুর্বলতার একটি নৈতিক মর্যাদা আছে—বিশেষত যখন তা ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। কিন্তু কানেত্তি নিজে দুর্বল মানুষ ছিলেন না। তার আকাঙ্ক্ষা ছিল বিপুল। তিনি সবকিছু জানতে চেয়েছেন, সবকিছুকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে চেয়েছেন। তার এই তীব্র জ্ঞানলোভের সঙ্গে আবার ক্ষমতার প্রত্যাখ্যানের একটি অদ্ভুত সম্পর্ক আছে। তিনি ক্ষমতা ঘৃণা করেন, কিন্তু জ্ঞানকে নিজের মধ্যে সঞ্চয় করার ক্ষেত্রে প্রায় ক্ষমতালিপ্সুর মতোই তীব্র। এ দ্বন্দ্বই তাকে আকর্ষণীয় করে। তার আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড ‘দ্য টাং সেট ফ্রি’ আসলে এক ধরনের মুক্তির ইতিহাস। ১৯০৫ সালে বুলগেরিয়ার রুসে শহরে জন্ম। পরিবারটি ছিল সেফার্দি ইহুদি; পিতৃপরিবারের শিকড় তুরস্কে। শৈশব কেটেছে একাধিক দেশ ও ভাষার মধ্যে—বুলগেরিয়া, ইংল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি। পরে ভিয়েনা হয়ে তিনি প্যারিসে যান, তারপর লন্ডনে স্থায়ী হন। তার কাছে একটি স্থান মানে একটি ভাষা। আর বহু ভাষা জানা মানে বহু পৃথিবীর নাগরিক হওয়া। তিনি লাদিনো, বুলগেরিয়ান, জার্মান, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার মধ্যে বড় হয়েছেন। তার দাদা নাকি সতেরোটি ভাষা জানতেন। জন্মশহরের রাস্তায় প্রতিদিন সাত-আটটি ভাষা শোনা যেত। এই বহুভাষিক পরিবেশ তার মনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা তৈরি করেছিল— পৃথিবী একক কোনো ভাষার সম্পত্তি নয়। কিন্তু তার চিন্তার ভাষা হয়ে উঠেছিল জার্মান। একজন ইহুদি লেখক হিসেবে তিনি নাৎসিবাদের ভয়াবহতা দেখেছেন। ১৯৩৮ সালে ভিয়েনা ছেড়ে নির্বাসনে যেতে হয়েছে। তবু তিনি জার্মান ভাষা ত্যাগ করেননি। ১৯৪৪ সালে লিখেছিলেন, “আমি জার্মান ভাষাতেই লিখব—কারণ আমি ইহুদি।” এই সিদ্ধান্তের মধ্যে এক ধরনের নৈতিক জেদ ছিল। তিনি ঘৃণার দ্বারা জার্মান সংস্কৃতিকে বিচার করতে চাননি। যে সংস্কৃতি থেকে তিনি গ্যেটে, ব্রখ, ক্রাউসের মতো লেখকদের পেয়েছেন, তাকে তিনি পরিত্যাগ করতে চাননি শুধু তার রাজনৈতিক ইতিহাসের কারণে। বরং সেই সংস্কৃতিকে এমনভাবে বহন করতে চেয়েছেন, যাতে তার ভেতরের মহৎ টিকে থাকে।
কানেত্তির প্রথম এবং একমাত্র উপন্যাস ‘অটো-দা-ফে’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ সালে। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রফেসর কিয়েন—পঁচিশ হাজার বইয়ের মালিক এক সিনোলজিস্ট, যিনি নিজের বইয়ের জগতের বাইরে প্রায় কিছুই জানেন না। কিয়েনের সমস্যা বই নয়। সমস্যা হলো বইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক। তিনি পৃথিবীকে নিজের মাথার ভেতর সম্পূর্ণ করে তুলতে চান। বইগুলো তার কাছে জ্ঞানের বস্তু নয়; তার নিজের মনের সম্প্রসারণ। ফলে যখন তিনি বই থেকে বিচ্ছিন্ন হন, তখন শুধু একটি গ্রন্থাগার হারান না—নিজের পৃথিবী হারান। কানেত্তি এই চরিত্রের মাধ্যমে যে জ্ঞানলোভকে উপহাস করেছেন, সেটিই আবার তার নিজের জীবনের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা। কিয়েনের পৃথিবীকে কানেত্তি তিনটি অবস্থায় ভাবেন— “একটি পৃথিবীহীন মাথা”, “একটি মাথাহীন পৃথিবী”, এবং শেষে “মাথার ভেতরের পৃথিবী”। এই ত্রিভুজের মধ্যে তার নিজের চিন্তার ছায়াও দেখা যায়। তিনি নিজেও একসময় লিখেছিলেন, তার জীবনের মরিয়া চেষ্টা হলো সবকিছু নিয়ে ভাবা—যাতে সবকিছু একটি মাথার মধ্যে এসে আবার এক হয়ে যায়। ‘অটো-দা-ফে’ তাই কেবল একজন পাগল পণ্ডিতের গল্প নয়। এটি জ্ঞানের প্রতি অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষার একটি ব্যঙ্গচিত্র। পৃথিবীকে বোঝার চেষ্টা কখন এমন এক আবেশে পরিণত হয়, যখন পৃথিবী থেকে নিজেকেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হয়? কানেত্তি এর উত্তর দিতে চান না।
তার পরবর্তী কাজগুলোতে এই অস্থিরতা আরও সংক্ষিপ্ত, আরও তীক্ষ্ণ রূপ নেয়। ‘ইয়ারউইটনেস’-এ তিনি পঞ্চাশ ধরনের একগুঁয়ে মানসিকতার ছোট ছোট প্রতিকৃতি তৈরি করেন। কোনো দীর্ঘ কাহিনি নেই। আছে চরিত্রের বিচিত্র মানসিক আবেশ। যেন মানুষের মনকে একটি অভিধানে সাজানোর চেষ্টা। এই ধরনের শ্রেণিবিন্যাস কানেত্তির একটি বড় বৈশিষ্ট্য। তিনি পৃথিবীকে বোঝার জন্য নাম দেন, ভাগ করেন, তুলনা করেন, নতুন সম্পর্ক তৈরি করেন। তার দীর্ঘ বই ‘ক্রাউডস অ্যান্ড পাওয়ার’ এই প্রবণতার সবচেয়ে বিশাল উদাহরণ। ‘ক্রাউডস অ্যান্ড পাওয়ার’ লেখা শুরু করার পর তিনি প্রায় পঁচিশ বছর প্রকাশনা থেকে দূরে ছিলেন। ১৯৩৮ সালের পর ১৯৬০ সালে বইটি প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি প্রায় কিছুই প্রকাশ করেননি। যেন তিনি একটি বইয়ের ভেতর পুরো শতাব্দীকে ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বইয়ের মহাকাব্যিক বর্ণ নার ভাষা পড়লেই এটা সহজে আন্দাজ করা যায় —
‘এখানে আবার ফিরে আসা যায় সেই সরলরৈখিক রূপান্তরের কথায়, যার একটি অদ্ভুত উদাহরণ আমরা পাই জর্জীয় লোককাহিনিতে—গুরু ও তার শিক্ষানবিশের গল্পে। ছেলেটি পালিয়ে গিয়েছিল ইঁদুরের রূপ নিয়ে। গুরু তাকে ধরতে নিজেও বিড়াল হয়ে গেলেন। কিন্তু শিকার সেখানেই শেষ হলো না। একের পর এক তিনি রূপ বদলাতে লাগলেন—জাল, বাজপাখি, ছুরি, শেষে বাচ্চাসহ একটি মুরগি। প্রতিটি নতুন রূপ তাঁকে নতুনভাবে শিকার করার সুযোগ দিল।
এখানে রূপান্তর কোনো অলৌকিক বিস্ময় নয়; এটি আক্রমণের কৌশল। শিকার যেখানে পালায়, শিকারিও সেখানে বদলে যায়। শুধু তার শরীর বদলায় না, বদলে যায় শিকারের পদ্ধতি, বদলে যায় স্থানও। এক মুহূর্তে যে ঘটনা যেখানে ঘটছিল, পরের মুহূর্তে তা অন্য কোথাও। ঘটনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে যেন কোনো বন্ধনে বাঁধা নেই। তারা হঠাৎ আসে, হঠাৎ ছুটে যায়, এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ তাদের মধ্যে একটি জিনিস অপরিবর্তিত: শত্রুতাপূর্ণ উদ্দেশ্য। শিকারিকে চালিত করছে একটিই ইচ্ছা—ধরা।
এই কারণেই গল্পটির সঙ্গে ম্যানিয়ার একটি গভীর সাদৃশ্য দেখা যায়। ম্যানিয়াগ্রস্ত মানুষের চিন্তা ও আচরণও যেন এক রূপ থেকে আরেক রূপে দ্রুত সরে যায়। তার মধ্যে পরিবর্তনের জন্য কোনো প্রস্তুতি লাগে না। সে এক মুহূর্তে এখানে, পরের মুহূর্তে সেখানে। তার লক্ষ্য বদলায়, কিন্তু লক্ষ্য করার প্রবণতা বদলায় না। একটি উদ্দেশ্য ব্যর্থ হলে আরেকটি উদ্দেশ্য তার জায়গা নেয়। তবু সে থামে না। সে শিকার চালিয়ে যায়।
এই মানুষটির মধ্যে শিকারির মতো এক ধরনের উচ্ছ্বাসও থাকে। সে যেখানে পৌঁছাক, তার উত্তেজনা তাকে ছেড়ে যায় না। তার চারপাশের পৃথিবী বদলাতে পারে, কিন্তু তার তীব্রতা বদলায় না। তার সামনে সবসময় কিছু না কিছু আছে—কোনো বস্তু, কোনো মানুষ, কোনো কাজ, কোনো আকাঙ্ক্ষা—যাকে তাকে অবশ্যই পেতে হবে। তার কাছে পৃথিবী যেন ক্রমাগত নতুন শিকারের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
গল্পের ছেলেটি তাই শুধু একটি ছেলে নয়। সে শিকার। তার রূপ বদলাতে পারে, তার অবস্থান বদলাতে পারে, তাকে যে নামে ডাকা হবে তাও বদলাতে পারে; কিন্তু তার মূল পরিচয় একটিই—সে ধরা পড়ার জন্য নির্ধারিত শিকার। ম্যানিয়ার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। তার সামনে শিকার কী, সেটি শেষ পর্যন্ত তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো শিকার থাকা। আকাঙ্ক্ষা কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর সঙ্গে স্থির হয়ে থাকে না; সে নতুন বস্তুকে নিজের লক্ষ্য বানিয়ে নেয়।
ম্যানিয়া হলো শিকার পাওয়ার এক উন্মত্ত তৃষ্ণা। প্রথমে তাকে দেখতে হবে। তারপর তার কাছে পৌঁছাতে হবে। তারপর তাকে ধরতে হবে। এই তিনটি ক্রিয়া—দেখা, ধাওয়া করা, ধরা—তার কাছে প্রায় একটিই ক্রিয়া। শিকারকে পাওয়া মানেই তাকে নিজের দখলে আনা। কিন্তু তাকে খেয়ে ফেলা, অর্থাৎ সম্পূর্ণ নিজের মধ্যে টেনে নেওয়া, এখানে প্রধান বিষয় নয়। ভক্ষণের চেয়ে দখল গুরুত্বপূর্ণ। শিকারকে পাওয়া পর্যন্ত উত্তেজনা থাকে; শিকার ধরা পড়ার পর সেই উত্তেজনার প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতে পারে।
এই দিক থেকে গল্পটির শিকারও বিশেষ অর্থ বহন করে। গুরু ছেলেটিকে ধরতে চান। ছেলেটি পালিয়েছে বলেই শিকার শুরু হয়েছে। সে যদি পালিয়ে না যেত, তবে এই দীর্ঘ রূপান্তরের প্রয়োজন হতো না। বিড়াল হতে হতো না, জাল হতে হতো না, বাজপাখি বা ছুরি হতে হতো না। পালিয়ে যাওয়াই শিকারিকে চলমান রাখে।
তাই গল্পের কেন্দ্র আসলে ছেলেটি নয়, তার পালিয়ে যাওয়া। তার অনুপস্থিতিই শিকারির সমস্ত রূপকে জন্ম দেয়। সে যত দূরে সরে যায়, শিকারির তত নতুন রূপের প্রয়োজন হয়। শিকার যতক্ষণ অধরা, ততক্ষণ শিকারির আকাঙ্ক্ষা জীবন্ত। ধরা পড়ার মুহূর্তে সেই আকাঙ্ক্ষার নাটক শেষ হয়ে যায়।
ম্যানিয়ার ক্ষেত্রেও যেন একই নিয়ম কাজ করে। তার আক্রমণ, তার উত্তেজনা, তার অবিরাম পরিবর্তন—সবকিছুর অস্তিত্ব নির্ভর করে একটি অধরা লক্ষ্যের ওপর। লক্ষ্যটি যদি অবশেষে ধরা পড়ে, আক্রমণের সেই উন্মত্ত গতি থেমে যেতে পারে। তখন আর নতুন রূপের প্রয়োজন নেই। আর কোনো নতুন শিকারও দরকার নেই।
কিন্তু যতক্ষণ শিকার পালিয়ে যায়, শিকারিও বদলাতে থাকে। সে নিজের রূপ বদলায়, স্থান বদলায়, পদ্ধতি বদলায়—শুধু তার ইচ্ছা বদলায় না। তার সমস্ত রূপান্তরের অন্তরে থাকে একই ক্ষুধা: শিকারকে দেখতে হবে, তার পিছু নিতে হবে, তাকে ধরতে হবে।’
এই বইয়ের বিষয় জনতা ও ক্ষমতা। কিন্তু কানেত্তি প্রচলিত রাজনৈতিক ইতিহাসের পথে হাঁটেননি। তিনি শ্রেণি, জাতি বা রাষ্ট্রের ইতিহাস দিয়ে শুরু করেননি। তার আগ্রহ মানুষের দলবদ্ধ হওয়ার প্রাচীন ও প্রায় জৈবিক প্রবণতায়। তার কাছে জনতা কখনো আগুন, কখনো বৃষ্টি, কখনো বন, কখনো মৌমাছির ঝাঁক, কখনো সাপের দল। তিনি মানুষের সমষ্টিকে প্রাণীজগতের বিভিন্ন গতিবিধির সঙ্গে তুলনা করেন। জনতা চলতে পারে, থেমে যেতে পারে, ফুলে উঠতে পারে, সংকুচিত হতে পারে। তার নিজস্ব ছন্দ আছে। এখানে কোন প্রচলিত সমাজবিজ্ঞান নেই। বরং এক ধরনের অদ্ভুত কাব্যিক নৃতত্ত্ব ঘিরে ধরে। কানেত্তি ক্ষমতাকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেন না। তিনি ক্ষমতার গভীরতম প্রক্রিয়াটি খুঁজতে চান—কেউ আদেশ দেয়, অন্য কেউ মানে কেন? মানুষের শরীর, ভয়, আকাঙ্ক্ষা, আনুগত্য ও সমষ্টিগত আচরণের মধ্যে ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে?
এরকম ভাবনার মধ্য দিয়ে তিনি ফ্রয়েডের কাছাকাছি চলে আসেন, যদিও কানেত্তিকে কোনভাবে ফ্রয়েডীয় বলার সুযোগ নেই।। ধর্ম, ভিড়, ভয়, আনুগত্য—সবকিছুকে তিনি মানুষের মানসিক জীবনের গভীর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করেন। কিন্তু তার পদ্ধতি ইতিহাসনির্ভর নয়। বরং তিনি ইতিহাসকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেন। এই কারণে তাঁর চিন্তা মার্কস বা হেগেলের বিপরীত দিকে চলে যায়। ইতিহাস তাঁর কাছে এমন কোনো ধারাবাহিক প্রক্রিয়া নয়, যার ভেতর দিয়ে মানবসমাজ নিজেকে পরিবর্তন করে। বরং ইতিহাস যেন মানুষের প্রাচীন প্রবৃত্তিগুলোর নানা প্রকাশের সংগ্রহ। তিনি ক্ষমতার বিরুদ্ধে, কিন্তু রাজনীতির নির্দিষ্ট ইতিহাস থেকে দূরে। তিনি নিপীড়িতের পাশে দাঁড়াতে চান, কিন্তু সামাজিক শ্রেণি বা ঐতিহাসিক কাঠামো দিয়ে নিপীড়নকে ব্যাখ্যা করতে অনাগ্রহী। তিনি হিটলারকে প্রায় সরাসরি নাম না নিয়েও বিশ্লেষণ করেন। তার সর্বজনীনতার আকাঙ্ক্ষা কখনো কখনো ইতিহাসের নির্দিষ্ট নিষ্ঠুরতাকে অতিরিক্ত বিমূর্ত করে ফেলেন। তবু তার ভাবনার শক্তিকে অস্বীকার করা যায় না। তিনি যে প্রশ্নটি তুলেছেন তা এখনও আমাদের পিছু ছাড়েনি— মানুষ কেন ক্ষমতার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে? কাফকা তার কাছে এই প্রশ্নের আরেক উত্তর।
‘কাফকার আদার ট্রায়া’-এ কানেত্তি কাফকার ফেলিসে বাউয়ারের সঙ্গে সম্পর্ককে এক ধরনের নৈতিক উপাখ্যান হিসেবে পড়েছেন। কাফকার সরে দাঁড়ানো, ব্যর্থতার দিকে নিজেকে ঠেলে দেওয়া, ক্ষমতা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করা—এসব কানেত্তির কাছে নৈতিক তাৎপর্য বহন করে। কাফকা ছোট প্রাণীদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতেন। দুর্বলতার সঙ্গে তার এই আত্মপরিচয় কানেত্তিকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। কানেত্তির কাছে ক্ষমতার সবচেয়ে নিখুঁত বিপরীত হলো ক্ষমতাহীনতা। কিন্তু তার ক্ষমতাহীনতার ধারণা রাজনৈতিক নয়; বরং অস্তিত্বগত। তিনি নিপীড়িত মানুষের বদলে প্রায়ই প্রাণীর মধ্যে ক্ষমতাহীনতার আদর্শ দেখতে পান।
এখানে এসে আশ্চর্যজনকভাবে সিমোন ভেইলের সাথে তার অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি হয়—যদিও কানেত্তি তাকে উল্লেখ করেননি। উভয়ের চিন্তাতেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে দুর্বলতার এক নৈতিক মর্যাদা আছে। কানেত্তির বড় হল শত্রু মৃত্যু। তিনি মৃত্যুকে গ্রহণ করতে চান না। মৃত্যু তার কাছে জীবনের স্বাভাবিক সমাপ্তি নয়; বরং একটি অন্যায়। কারণ মৃত্যু মানুষের সম্ভাবনাকে মাঝপথে থামিয়ে দেয়। “আমি এখনো মৃত্যুর বিরুদ্ধে কিছু করতে পারিনি”—১৯৬০ সালে তিনি লিখেছিলেন।এই বাক্যটি রসিকতার মতো শোনাতে পারে। কিন্তু কানেত্তির কাছে তা ছিল একেবারে আক্ষরিক সত্য। তিনি একশ বছর বাঁচতে চান। কেন? আরও ভালো কাজ করার জন্য নয়। আরও বেশি অনুভব করার জন্য। আরও বেশি জানার জন্য। আরও বেশি পৃথিবীকে নিজের মধ্যে ধারণ করার জন্য। এ আকাঙ্ক্ষা তাকে কেবল দীর্ঘজীবনপ্রত্যাশী করে না; বরং তাকে এক ধরনের চিরশিক্ষার্থীতে পরিণত করে। তার নোটবই তাই তার সবচেয়ে স্বাভাবিক সাহিত্যিক রূপ। সেখানে কোনো একক বিষয় নেই। বিষয় হলো “সবকিছু”। প্রবাদ, মৃত্যু, বন্ধুত্ব, ক্ষমতা, প্রেম, একাকিত্ব, সমাজের ভণ্ডামি—সবকিছু সেখানে পাশাপাশি। একটি বাক্য কখনো কয়েক পৃষ্ঠা দীর্ঘ চিন্তার দরজা খুলে দেয়, কখনো একটি ছোট বাক্যই যথেষ্ট।
কানেত্তি ছিলেন একজন “শ্রোতা”—দর্শকের চেয়ে শ্রোতা। তিনি চোখের চেয়ে কানের ওপর বেশি আস্থা রাখতেন। কারণ চোখ দূরত্ব তৈরি করে; কান অপেক্ষা করে। কানেত্তির কাছে শোনা মানে কেবল শব্দ শোনা নয়। শোনা মানে উপস্থিতিকে স্বীকার করা। ‘দ্য ভয়েসেস অব ম্যারাকেশ (মারাকেশ)’-এ তিনি ভিক্ষুক, দরিদ্র, অন্ধ শিশু, প্রাণী—সবকিছুর শব্দ শুনতে চেষ্টা করেন। তিনি লিখেছিলেন, “আমি সেই পুঁটলিটির জন্য গর্বিত ছিলাম, কারণ সেটি জীবিত ছিল।” এই বাক্যের মধ্যে তার নৈতিকতা আছে। জীবন যত ক্ষীণই হোক, তার অস্তিত্বের প্রতি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তার মা তাকে বই, ভাষা ও জ্ঞানের প্রতি এই অস্থির আকাঙ্ক্ষা দিয়েছিলেন। সম্পর্কটি ছিল ভালোবাসা ও নিষ্ঠুরতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। তার মা মহান লেখকদের পূজা করতেন, বই নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করতেন, মতভেদ হলে তীব্র বিতর্কে যেতেন।
কানেত্তির শিক্ষা ছিল বই পড়া নয়; বইকে নিয়ে বেঁচে থাকা। কিন্তু তিনি মায়ের কাছ থেকেই নিজেকে পৃথক করলেন। তিনি বিজ্ঞান পড়লেন। প্রাণী ও আদিম সংস্কৃতি নিয়ে আগ্রহী হলেন। তিনি বললেন, “সব জাতির সব মিথকে জানা আমার জীবনের একটি গুরুতর লক্ষ্য।” এই আকাঙ্ক্ষা তাকে শেষ পর্যন্ত একটি অদ্ভুত সর্বজনীনতার দিকে নিয়ে যায়। তবু কানেত্তির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো তার জ্ঞান নয়। বরং তার মনোযোগ। তিনি আমাদের শেখাতে চান—পৃথিবীকে বোঝার আগে তাকে শুনতে হয়। মানুষের দিকে তাকানোর আগে তার কণ্ঠ শুনতে হয়। ইতিহাসের আগে উপস্থিতিকে অনুভব করতে হয়। এ কারণেই তার লেখায় এত তীব্রতা। তিনি কখনো পাঠককে আরাম করতে দেন না। যেন প্রতিটি বাক্য আমাদের ঘুম থেকে টেনে তুলতে চায়। “শেকসপিয়রকে কেউ যদি বলে, ‘আরাম করুন’—আমি সেই দৃশ্য কল্পনা করার চেষ্টা করি।” কানেত্তির এই বাক্যে তার সাহিত্যিক নৈতিকতা স্পষ্ট। তিনি আরামকে সন্দেহ করেন। আত্মতুষ্টিকে ভয় পান। চিন্তার কাজ তার কাছে শ্রম, উত্তেজনা, সতর্কতা। তবু তার চিন্তার শেষ কথা উত্তেজনা নয়। ব্রখকে প্রশংসা করতে গিয়ে কানেত্তি বলেছিলেন, একজন মহান লেখক আমাদের শেখান কীভাবে শ্বাস নিতে হয়। গ্যেটের লেখাতেও তিনি যেন শুনেছিলেন একই আহ্বান: “শ্বাস নাও।” এ অদ্ভুত এক সমাপ্তি।
যে মানুষ সবকিছু জানতে চেয়েছেন, সবকিছু নিজের মাথায় ধারণ করতে চেয়েছেন, যিনি মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রায় অসম্ভব যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন, তার সাহিত্য শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায় একটি খুব সাধারণ কাজের কাছে—শ্বাস নেওয়া। হয়তো এখানেই কানেত্তির সবচেয়ে গভীর শিক্ষা। জ্ঞান সংগ্রহ করা, ক্ষমতাকে বুঝতে চাওয়া, পৃথিবীকে শ্রেণিবদ্ধ করা, নিজেকে ক্রমাগত অতিক্রম করা—এসবেরও একটি সীমা আছে। কারণ সব অর্জন শেষ পর্যন্ত আরেক ধরনের বোঝা তৈরি করে। কখনো কখনো মুক্তি মানে আরও কিছু অর্জন করা নয়। মুক্তি মানে অর্জনের তাড়না থেকে সামান্য দূরে সরে দাঁড়ানো। যাকে আমরা সত্যিই প্রশংসা করি, তার শক্তিকে নিজের মধ্যে জমা করার চেষ্টা না করে, সেই প্রশংসা থেকে তৈরি হওয়া শূন্য জায়গাটিতে কিছুক্ষণ থাকা। তারপর— শুধু শ্বাস নেওয়া। কানেত্তির দীর্ঘ জীবনের, বিপুল জ্ঞানলোভের এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে তার অবিরাম আপত্তির শেষে এই শ্বাস নেওয়াই হয়তো সবচেয়ে শান্ত, সবচেয়ে কঠিন স্বাধীনতা।
সুসান সন্টাগ (গ্রানাটায় প্রকাশিত)
দৈনিক এদিন অনলাইন ‘লেটার্স টু ফেলিস বাই ফ্রান্ৎস কাফকা’ বই থেকে ধারাবাহিকভাবে তার চিঠিগুলো বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য প্রকাশ করবে। পাঠক আসনু আমরা কাফকার চিঠির মধ্য দিয়ে তার জগতে প্রবেশ করি।
১ নভেম্বর ১৯১২
প্রিয় ফ্রয়লাইন ফেলিস,
এই সম্বোধনে নিশ্চয়ই তুমি কিছু মনে করবে না—অন্তত এবার নয়। কারণ তুমি যখন বারবার আমাকে আমার জীবনযাপনের কথা লিখতে বলেছ, তখন এমন কিছু সূক্ষ্ম কথা হয়তো আমাকে বলতে হবে, যা ‘ফ্রয়লাইন বাওয়ার’-কে বলা আমার পক্ষে কঠিন। তা ছাড়া এই নতুন সম্বোধনটি নিশ্চয় এতটাও খারাপ নয়; নইলে এত যত্ন আর এত দীর্ঘস্থায়ী আনন্দ নিয়ে আমি এটি ভাবতে পারতাম না।
আমার জীবন মূলত লেখার চেষ্টা দিয়েই গঠিত—বেশির ভাগ চেষ্টাই অবশ্য ব্যর্থ। কিন্তু যখন লিখি না, তখনই মনে হয় আমি যেন মেঝেতে পড়ে আছি, আবর্জনার ঝুড়িতে ফেলে দেওয়ার মতো অবস্থায়। আমার শক্তি বরাবরই করুণ রকমের কম। যদিও শুরুতে বিষয়টি আমি পুরোপুরি বুঝিনি, খুব তাড়াতাড়িই বুঝতে পেরেছিলাম—সব দিক থেকেই নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে হবে, সর্বত্র কিছু না কিছু ছেড়ে দিতে হবে, যাতে অন্তত সেই সামান্য শক্তিটুকু বাঁচিয়ে রাখা যায়, যেটুকু আমার কাছে জীবনের প্রধান কাজ বলে মনে হয়।
যখন তা করিনি—হায় ঈশ্বর, এমনকি ছুটির দিনেও নয়, যেমন এই ছুটিতেও, যখন আমাকে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে আর একের পর এক অতিথি এসে হাজির হচ্ছে, যেন ছোট্ট এক নরক খুলে গেছে—তখন নিজের সামর্থ্যের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলেই আমি যেন অনিবার্যভাবে পিছনে ছিটকে পড়েছি। আহত, অপমানিত, আরও দুর্বল হয়ে। অথচ যে বিষয়টি সাময়িকভাবে আমাকে কষ্ট দিত, শেষ পর্যন্ত সেটিই আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। ধীরে ধীরে মনে হতে শুরু করল, কোথাও না কোথাও—যদিও সেটি খুঁজে পাওয়া কঠিন—এমন একটি সৌভাগ্যের নক্ষত্র নিশ্চয় আছে, যার নিচে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে।
একবার আমি খুব বিস্তারিতভাবে একটি তালিকা করেছিলাম—লেখার জন্য আমি কী কী বিসর্জন দিয়েছি, আর লেখার কারণে আমার কাছ থেকে কী কী কেড়ে নেওয়া হয়েছে; কিংবা বলা ভালো, যেসব হারানো জিনিসকে লেখার জন্য প্রয়োজনীয় ত্যাগ বলে ব্যাখ্যা করেই কেবল সহনীয় করে তুলতে পেরেছি।
আমি যেমন রোগা—এবং আমার পরিচিত মানুষের মধ্যে আমিই সবচেয়ে রোগা, যা বলাটা কম কথা নয়, কারণ স্যানাটোরিয়ামের সঙ্গে আমার পরিচয় কম নয়—তেমনি লেখার ক্ষেত্রে আমার মধ্যে ‘অতিরিক্ত’ বলেও কিছু নেই। এমন কিছু নেই যা উদ্বৃত্ত। যদি কোনো উচ্চতর শক্তি আমাকে ব্যবহার করতে চায়, অথবা সত্যিই ব্যবহার করে থাকে, তবে আমি তার হাতে সম্পূর্ণ সমর্পিত—অন্তত একটি ভালোভাবে প্রস্তুত যন্ত্র হিসেবে। আর যদি তা না হয়, তবে আমি কিছুই নই; এক মুহূর্তে এক ভয়াবহ শূন্যতার মধ্যে পরিত্যক্ত হয়ে যেতে পারি।
এখন তোমাকে নিয়ে আমার ভাবনাকে জায়গা করে দিতে গিয়ে আমি আমার জীবনটাকেই যেন আরও বড় করে ফেলেছি। জেগে থাকার সময়ের এমন কোনো পনেরো মিনিটও খুব কমই আছে, যখন তোমার কথা আমার মনে পড়ে না। আর এমন পনেরো মিনিটের সংখ্যাও কম নয়, যখন আমি আর কিছুই করি না—শুধু তোমার কথাই ভাবি।
তবু এটিও আমার লেখার সঙ্গে জড়িত। আমার জীবনকে আসলে লেখার উত্থান-পতন ছাড়া আর কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে না। আর লেখার এমন এক অনুর্বর সময়ে, তোমার দিকে ফিরে তাকানোর সাহস আমার কখনোই হতো না। এটি যেমন সত্য, তেমনি এটিও সত্য যে সেই সন্ধ্যার পর থেকে আমার মনে হয়েছে, বুকের ভেতর যেন একটি দরজা খুলে গেছে—সেখান দিয়ে অবাধে বাতাস ঢুকছে আর বেরিয়ে যাচ্ছে। এক রাতে বিছানায় শুয়ে বাইবেলের একটি গল্প মনে করার পর হঠাৎ বুঝতে পারলাম, এই অনুভূতিটি কেন প্রয়োজনীয়—এবং একই সঙ্গে মনে হলো, বাইবেলের সেই গল্পটির সত্যতাও যেন নিশ্চিত হয়ে গেল।
ইদানীং বিস্ময়ের সঙ্গে বুঝতে পারছি, তুমি আমার লেখার সঙ্গে কত গভীরভাবে জড়িয়ে গেছ। অথচ কিছুদিন আগেও আমি ভাবতাম, একমাত্র লেখার সময়ই তোমার কথা আমার মনে থাকে না।
একটি ছোট অনুচ্ছেদে, যেমন, তোমার এবং তোমার চিঠিগুলোর কয়েকটি ছায়া এসে পড়েছিল। কাউকে এক টুকরো চকলেট দেওয়া হয়েছিল। কাজের সময় কেউ কীভাবে ছোটখাটো আনন্দ খুঁজে নিত, তার কথা ছিল। তারপর একটি টেলিফোন এসেছিল। শেষে কেউ একজন আরেকজনকে ঘুমাতে যেতে বলেছিল এবং সে কথা না শুনলে তাকে সোজা ঘরে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিল। নিঃসন্দেহে এটি তোমার মায়ের সেই বিরক্তির স্মৃতি থেকে এসেছিল, যখন তুমি অফিসে অনেক রাত পর্যন্ত থেকে যেতে।
এই ধরনের অংশই আমার সবচেয়ে প্রিয়। সেখানে তোমাকে আমি ধরে ফেলি—তুমি তা টেরও পাও না, ফলে তোমার প্রতিরোধ করারও কোনো প্রয়োজন হয় না। তুমি যদি আমার লেখা পড়োও, এই ছোট ছোট ইঙ্গিত নিশ্চয়ই তোমার চোখ এড়িয়ে যাবে। কিন্তু বিশ্বাস করো, পৃথিবীর আর কোথাও তোমাকে এত নিশ্চিন্তে ধরা দেওয়া সম্ভব নয়।
আমার জীবনযাপন পুরোপুরি লেখার জন্য তৈরি। আর যদি তাতে কোনো পরিবর্তন ঘটে, সেটিও লেখার সঙ্গে আরও ভালোভাবে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। সময় অল্প, শক্তি সীমিত, অফিস ভয়াবহ, বাড়ি কোলাহলপূর্ণ। আর যদি আনন্দময়, সরল জীবনযাপন সম্ভব না হয়, তবে সূক্ষ্ম কৌশলে কোনোভাবে পথ করে নিতে হয়।
নিজের সময়সূচিকে সামান্য কৌশলে সাজিয়ে সফল হওয়ার আনন্দের সঙ্গে সেই স্থায়ী দুর্ভোগের তুলনা চলে না—এই জ্ঞান যে ক্লান্তি যে কোনো কিছুর চেয়ে লেখায় বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লেখায় আমি যা বলতে চাই, তার চেয়েও স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমার ক্লান্তি।
গত ছয় সপ্তাহ ধরে—শেষ কয়েক দিনে অসহনীয় দুর্বলতার কারণে সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া—আমার দিন কাটছে এভাবে: সকাল আটটা থেকে দুপুর দুইটা বা আড়াইটে পর্যন্ত অফিস। তারপর তিনটা বা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত দুপুরের খাবার। এরপর বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা। সাধারণত সেটি শুধু চেষ্টা হয়। এক সপ্তাহ ধরে ঘুমের মধ্যে আমি শুধু মন্টেনিগ্রিনদের দেখেছি—অদ্ভুত, অসহ্য স্পষ্টতায়। তাদের জটিল পোশাকের প্রতিটি খুঁটিনাটি পর্যন্ত দেখেছি। মাথাব্যথা নিয়ে ঘুম ভেঙেছে।
সাড়ে সাতটা পর্যন্ত এভাবে থাকার পর দশ মিনিট ব্যায়াম করি—খোলা জানালার সামনে, সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে। তারপর এক ঘণ্টা হাঁটি—একা, ম্যাক্সের সঙ্গে, অথবা অন্য কোনো বন্ধুর সঙ্গে। এরপর পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার খাই। আমার তিন বোন—একজন বিবাহিত, একজনের বাগদান হয়েছে। অবিবাহিত বোনটিকে, অন্যদের প্রতি আমার ভালোবাসা অক্ষুণ্ন রেখেই বলছি, সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি।
তারপর সাড়ে দশটায়—অনেক সময় সাড়ে এগারোটায়—লিখতে বসি। আমার শক্তি, ইচ্ছা আর ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে রাত একটা, দুইটা, তিনটা পর্যন্ত লিখি। একবার তো ভোর ছয়টা পর্যন্ত লিখেছিলাম।
তারপর আবার আগের মতো ব্যায়াম, অবশ্যই কোনো রকম অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়িয়ে। তারপর ধোয়া-মোছা, এবং সাধারণত হৃদয়ে সামান্য ব্যথা ও পেটের পেশিতে টান নিয়ে বিছানায় যাই।
এরপর শুরু হয় ঘুমিয়ে পড়ার সবরকম চেষ্টা—অর্থাৎ এমন এক অসম্ভব কাজ, যা সম্ভব করার চেষ্টা। কারণ মানুষ একই সঙ্গে ঘুমাতেও পারে না, আবার নিজের কাজ নিয়ে ভাবতেও পারে না; এমনকি সেই প্রশ্নটির নিশ্চিত উত্তর খুঁজতেও পারে না, যার কোনো উত্তরই সম্ভবত নেই—পরদিন তোমার কাছ থেকে চিঠি আসবে কি না, আর এলে কখন আসবে।
তাই রাত দুই ভাগে বিভক্ত—এক ভাগ জেগে থাকা, আরেক ভাগ ঘুমহীন থাকা। এ নিয়ে যদি তোমাকে বিস্তারিত বলতে শুরু করি, আর তুমি শুনতে রাজি থাকো, তবে আমার লেখা শেষ হবে না।
সুতরাং অবাক হওয়ার কিছু নেই যে পরদিন সকালে অফিসে গিয়ে সামান্য যে শক্তিটুকু অবশিষ্ট থাকে, তা দিয়ে কোনোমতে কাজ শুরু করি।
যে করিডর দিয়ে আমি প্রতিদিন আমার টাইপিস্টের কাছে যাই, সেখানে আগে নথিপত্র বহনের জন্য একটি কফিনের মতো ছোট ট্রলি রাখা থাকত। প্রতিবার সেটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার মনে হতো, ওটা যেন আমার জন্যই তৈরি—আমার অপেক্ষায় আছে।
তবে একটি কথা ঠিক করে বলা দরকার। আমি শুধু কেরানি নই, একজন কারখানা-মালিকও। আমার ভগ্নিপতির একটি অ্যাসবেস্টস কারখানা আছে। আর আমি—যদিও সেখানে আমার অংশীদারিত্ব এসেছে বাবার বিনিয়োগ করা অর্থের মাধ্যমে—তার একজন অংশীদার এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্য।
এই কারখানাটি আমাকে যথেষ্ট যন্ত্রণা ও দুশ্চিন্তা দিয়েছে। কিন্তু এখন সে কথা বলতে চাই না। যাই হোক, বেশ কিছুদিন ধরে আমি সেটিকে যতটা সম্ভব অবহেলা করছি—অর্থাৎ আমার এমনিতেই অপ্রয়োজনীয় সহযোগিতাটুকুও আটকে রেখেছি—এবং কোনোভাবে দিন কাটিয়ে দিচ্ছি।
আবারও তোমাকে খুব সামান্যই বললাম, তোমাকে কোনো প্রশ্নও করলাম না। আবারও আমাকে চিঠি শেষ করতে হচ্ছে।
তবে তোমার কোনো উত্তর—আর তার চেয়েও বেশি, তোমার কোনো প্রশ্ন—আমার কাছে হারিয়ে যাবে না।
এক ধরনের জাদু আছে, যার সাহায্যে দুজন মানুষ একে অন্যকে না দেখে, কথা না বলেও, এক ঝলকে একে অন্যের অতীতের অনেকখানি জেনে ফেলতে পারে—একজনকে তার সব কথা বলতে হয় না। কিন্তু সেটি প্রায় কালোজাদুর মতো—এমন এক জাদু, যার মধ্যে কোনো পুরস্কার না থাকা অসম্ভব, আবার শাস্তি ছাড়া তার আশ্রয় নেওয়াও অসম্ভব।
তাই আমি সে কথা বলব না—যদি না তুমি আগে নিজেই তা অনুমান করতে পারো।
জাদুমন্ত্রটির মতোই এটি খুব ছোট।
বিদায়। আর তোমার হাতের ওপর একটু বেশি সময় ধরে হাত রেখে এই বিদায়টিকে আরও দৃঢ় করি।
তোমার,
ফ্রানৎস কে.
#
২ নভেম্বর ১৯১২
প্রিয় ফ্রয়লাইন বাওয়ার,
কী আশ্চর্য! তুমিও ক্লান্ত হয়ে পড়ো? সন্ধ্যায় অফিসে তোমাকে একা ক্লান্ত অবস্থায় কল্পনা করাটা আমার কাছে বড়ই অস্বস্তিকর।
অফিসে তুমি কী পরো? তোমার কাজের মূল অংশটাই বা কী? তুমি কি লেখো, নাকি অন্যকে দিয়ে লেখাও? তবে নিশ্চয়ই তোমার পদটি বেশ ভালো, কারণ তোমাকে এত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়। নিচু পদের কর্মচারীকে তো নীরবে ডেস্কে বসে থাকতে হয়। আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম, তোমার অফিসটি কোনো কারখানার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সেখানে কী তৈরি হয়? শুধু পারলোগ্রাফ? কেউ কি সত্যিই সেগুলো কেনে?
আমি খুশি যে আমাকে একজন জীবন্ত মানুষের কাছে বলে বলে লেখা যায়—মাঝে মাঝে, যদিও খুব কম, নিজেই টাইপ করি। সেটিই আমার প্রধান কাজ। আমি যখন কিছু ভাবতে পারি না, তখন সে মানুষটি কখনো একটু ঘুমিয়ে নেয়, হাত-পা টানটান করে, কিংবা পাইপ ধরায়, আর আমাকে চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকার সুযোগ দেয়।
আজ যেমন হয়েছিল—আমি যখন তাকে ধীরে লেখার জন্য বকছিলাম, তখন সে আমাকে শান্ত করতে মনে করিয়ে দিল যে আমি একটি চিঠি পেয়েছি। এমন কাজ কি কোনো পারলোগ্রাফ করতে পারে? কিছুদিন আগে আমাদের কাছে একটি ডিক্টাফোন দেখানো হয়েছিল। তখন তোমাদের প্রতিযোগীদের পণ্যের প্রতি আজকের মতো পক্ষপাত ছিল না আমার। তবু যন্ত্রটিকে আমার ভীষণ বিরক্তিকর ও অবাস্তব মনে হয়েছিল।
তাই তোমাদের এই ব্যবসাটি আমি ঠিক কল্পনা করতে পারি না। শুধু আশা করি, আমি যেমন কল্পনা করছি, বাস্তবেও ব্যবসাটি তেমনই অর্থহীন ও হালকা ধরনের; আর তোমার জীবনও যেন সেই প্রতিষ্ঠানে ততটাই সহজ ও নির্ভার।
যাই হোক, তোমাদের প্রাগ শাখাটি আমি খুঁজে পাচ্ছি না। আমার মনে আছে, তোমার কোনো এক কথায় তুমি বলেছিলে, সেটি অবস্টগাসে বা ফার্দিনান্ডস্ট্রাসেতে কোথাও। কয়েকবার খুঁজেছি—আশায় ছিলাম, প্রতিষ্ঠানের নামফলকটি হয়তো তোমার কোনো চিহ্ন, কোনো ধারণা আমার সামনে এনে দেবে।
অফিসে আমার কাজের কথা বলতে ভালো লাগে না। কাজটি নিজে জানার মতো নয়, লেখার মতোও নয়। কারণ এটি আমাকে তোমাকে চিঠি লেখার সময় ও শান্তি কোনোটাই দেয় না। এই মুহূর্তে যেমন আমাকে অস্থির ও নির্বোধ করে তুলেছে। অথচ তোমার কথা ভাবলেই আমার মধ্যে এক ধরনের প্রতিশোধস্পৃহা জেগে ওঠে, আর সেটি আমাকে সত্যিই আনন্দ দেয়।
বিদায়। আগামীকাল সম্ভবত শান্ত রবিবার হবে। তাই অনেক লিখব। আর নিজেকে কাজ করতে করতে ক্লান্ত করে ফেলো না! আমাকে দুঃখ দিও না! —এ কথাগুলো লিখছি সেই দিনেই, যেদিন তুমি আমার আগের বিলাপভরা চিঠিটি পেয়েছ।
আমরা সবাই কত দুর্বল!
তোমার,
ফ্রানৎস কে.
#
৩ নভেম্বর ১৯১২
প্রিয় ফ্রয়লাইন ফেলিস,
পাশের ঘরে আমার ভাগনে কাঁদছে। মা তাকে চেক ভাষায় কখনো বলছেন, ‘ভালো ছেলে’, কখনো ‘ছোট ছেলে’। সন্ধ্যা ছয়টা হয়ে গেছে—না, ঘড়িতে দেখছি সাড়ে ছয়টা। আজ বিকেলে ম্যাক্সের সঙ্গে আমি বেশিক্ষণ কাটিয়েছি। সে আমাকে তার নতুন গল্প ‘একটি সেলাইয়ের স্কুল’ থেকে দুটি অধ্যায় পড়ে শোনাল।
গল্পটি ভালো হয়েছে, নারীর অনুভূতিতে ভরপুর। তবু কিছু জায়গা আমার মন ছুঁতে পারেনি। কারণ আমি তখন এই চিঠিতে পৌঁছানোর জন্য অস্থির হয়ে ছিলাম। হিসাব করে দেখলে, নিজের কাজ থামানোর পর থেকেই—দুপুর দুইটার পর থেকে—আমি যেন এই চিঠির দিকে টেনে আসছিলাম।
কিন্তু এখন অনেক রাত। আমার অত্যাচারী সময়সূচি অনুযায়ী এক ঘণ্টা আগেই আমার ঘুমিয়ে পড়ার কথা ছিল। তার ওপর, সবাই ঘুমিয়ে পড়ার আগে এটাই বাড়ির শেষ তুলনামূলক শান্ত সময়। আর কয়েক দিন ধরে আমার টেবিলে ছাপার প্রুফ পড়ে আছে; এখনো তাকাইনি। আগামীকাল সেগুলো পাঠাতে হবে। ফলে সন্ধ্যা ও রাতের যে সামান্য সময়টুকু আমার হাতে আছে, সেটিও হয়তো চলে যাবে।
এই সব—মূলত নির্বোধ—কারণের জন্য চিঠিটি রবিবারের উপযোগী যতটা গোছানো ও পদ্ধতিগত হওয়া উচিত ছিল, তেমন হচ্ছে না। কিন্তু এই সব কারণেই, শেষ কারণটিও ধরে বলছি, আমি অসন্তুষ্ট ও বিষণ্ন। রান্নাঘর থেকে ছোট্ট বিড়ালছানাটির মিহি ডাক ভেসে আসছে—মনে হচ্ছে যেন সেটি আমার হৃদয় থেকেই উঠছে।
এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় আছে—তোমার কাছ থেকে কোনো চিঠি পাইনি। অবশ্য এখনই পাওয়ার আশা করাও যায় না। তোমার চিঠি সব সময় দ্বিতীয় ডাকের সঙ্গে আসে, আর রবিবার দ্বিতীয়বার ডাক বিলি হয় না। তাই সবচেয়ে ভালো হলে কাল সকালে পাব। তার আগে আমাকে দীর্ঘ একটি রাত কাটাতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে, এর সামান্য ক্ষতিপূরণ হিসেবেও কি কেউ আমাকে তোমাকে আগের মতো সম্বোধন করা থেকে আটকাতে পারে? আর এই সম্বোধনটি কি এতটাই যথাযথ নয়—আংশিকভাবে এবং সম্পূর্ণভাবেই—যে একবার ব্যবহার করার পর আর কখনো তা ত্যাগ করা সম্ভব নয়? প্রিয় ফ্রয়লাইন ফেলিস, এই সুন্দর অথচ ভয়াবহ রকম ছোট রবিবারটি তুমি কীভাবে কাটালে?
তুমি যদি এমন মানুষের একজন হতে, যাদের ব্যাপারে অন্য কেউ ভাবলে তার প্রভাব তাদের ওপর পড়ে, তবে মাঝরাতে তুমি চমকে ঘুম থেকে উঠতে। সকালে বিছানায় শুয়ে এই চিঠি পড়তে গিয়ে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে আসত। নাশতার সময় তোমার চোখ কোকো আর রুটির ওপারে চলে যেত—এমনকি তোমার মায়ের উপস্থিতিকেও পেরিয়ে। নতুন একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য হাতে যে অর্কিডগুলো ছিল, সেগুলোও হয়তো তোমার হাতে শুকিয়ে শক্ত হয়ে যেত। আর এখন ‘শিলিংস ফ্লাইট’ পড়তে বসে তুমি হয়তো কিছুটা শান্তি পেতে—কারণ এই মুহূর্তে আমি তোমার কথা ভাবছি না; আমি যেন তোমার সঙ্গেই আছি।
কিন্তু সত্যিই কি আমি তোমার সঙ্গে আছি? বাক্যটির শেষে দাঁড়ি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাশের ঘরে বাবার কণ্ঠ শুনলাম। তিনি সবে বাড়ি ফিরেছেন এবং খুব খারাপ ব্যবসায়িক খবরের কথা বলছিলেন। আমি সেখানে গেলাম এবং কিছুক্ষণ বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম—বিষণ্ন, অন্যমনস্ক। গত কয়েক দিনে সেই সন্ধ্যাটি নিয়ে আরও দুটি কথা মনে পড়েছে। একটি তোমারই একটি চিঠিতে হঠাৎ খুঁজে পেয়েছি, আর অন্যটি নিজেই মনে করেছি।
সেদিন তুমি বলেছিলে, হোটেলে একা থাকলে তোমার অস্বস্তি লাগে। আমি সম্ভবত বলেছিলাম, আমার ঠিক উল্টো—হোটেলের ঘরে আমি বরং খুব স্বস্তি বোধ করি।
সত্যিই তাই। গত বছর উত্তর বোহেমিয়ার শহর ও গ্রামগুলো দিয়ে শীতের গভীরে আমাকে কিছুদিন ভ্রমণ করতে হয়েছিল। তখন বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বুঝেছিলাম।
একটি হোটেলঘরের বিস্তৃত জায়গা নিজের করে পাওয়া—চারটি দেয়াল ও একটি দরজা, যা ভেতর থেকে বন্ধ করা যায়; নিজের জিনিসপত্রের নির্দিষ্ট জায়গা জানা—কোনোটি আলমারির নির্দিষ্ট কোণে, কোনোটি টেবিলে, কোনোটি জামাকাপড় রাখার জায়গায়—এসবের মধ্যে আমার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি জাগে।
মনে হয়, জীবন যেন নতুন করে শুরু হয়েছে—অব্যবহৃত, শক্তিতে পূর্ণ, আরও ভালো কিছুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি। অবশ্য সেটি হয়তো নিঃসঙ্গতার চরম হতাশা, যা ঠান্ডা হোটেলঘরটির মধ্যে এসে নিজেকেই বাড়ি বলে মনে করে।তবু যাই হোক, হোটেলে আমি সব সময় স্বস্তি পেয়েছি। প্রায় প্রতিটি হোটেলঘর সম্পর্কেই আমার বলার মতো ভালো কিছু আছে। সামগ্রিকভাবে হয়তো আমাদের দুজনের কেউই খুব বেশি ভ্রমণ করি না। কিন্তু তোমার সেই অস্বস্তির কথা কী বলবে—যার কারণে রাতের বেলায় একা সিঁড়ি দিয়ে নিজের ঘর পর্যন্ত উঠতেও তোমার ভয় করে?
তা ছাড়া তোমাদের বাড়িটি নিশ্চয় খুব নিচু তলায়, নইলে রাস্তার লোকের হাততালির শব্দ তুমি শুনতে পেতে কীভাবে? জানালা বন্ধ থাকার পরও সেটি কী করে সম্ভব, সেটাও আমি বুঝি না। আর সেই কয়েকটি সিঁড়ি একা উঠে যেতে তোমার এত ভয়? তুমি—যাকে বাইরে থেকে এত শান্ত, এত আত্মবিশ্বাসী মনে হয়! না, বাড়ির দরজা খোলার ব্যাপারে তুমি যা লিখেছ, তাতে আমি সন্তুষ্ট হতে পারছি না। সেদিন সন্ধ্যায় ইহুদি নাট্যশালা নিয়েও কিছু কথা হয়েছিল। তুমি একবার এমন একটি নাটক দেখেছিলে, কিন্তু নাটকটির নাম মনে করতে পারোনি।
আমার মনে হয়, এখন বার্লিনে এমন একটি দল অভিনয় করছে। তাদের সঙ্গে আমার এক মহান বন্ধু আছে—একজন মানুষ, যার নাম ওয়াই. লোভি। তোমার প্রথম ও দ্বিতীয় চিঠির মাঝখানে দীর্ঘ অপেক্ষার সময় এই মানুষটিই, নিজের অজান্তে এবং আমার কৃতজ্ঞতার যথেষ্ট কারণ হয়ে, তোমার কিছু খবর আমাকে দিয়েছিল। সে আমাকে প্রায়ই চিঠি লেখে এবং ছবি, পোস্টার, সংবাদপত্রের কাটিং ইত্যাদি পাঠায়।
একবার সে আমাকে লাইপজিগে তাদের অতিথি অভিনয়ের একটি পোস্টার পাঠিয়েছিল। আমি সেটি ভাঁজ করা অবস্থায় টেবিলে রেখে দিয়েছিলাম, প্রায় দেখিইনি। কিন্তু টেবিলের জিনিসপত্রের অদ্ভুত নিয়ম আছে—নিচের জিনিস কোনো একদিন ওপরে উঠে আসে। একদিন সেই পোস্টারটিই, অন্য কোনোটি নয়, আমার টেবিলের ওপরে এসে পড়ল—এবং আশ্চর্যের বিষয়, সেটি খোলাও ছিল। এরপর আরও একটি কাকতালীয় ঘটনা ঘটল। পোস্টারটি আমি মন দিয়ে পড়লাম। তাতে বেশ কিছু মজার বিষয় ছিল। যেমন, একজন বিবাহিত ও বয়স্ক অভিনেত্রী—যাকে আমি খুবই পছন্দ করি—তাকে ‘প্রিমাডোনা’ বলা হয়েছে। আর লোভি নিজেকে ‘নাট্যকার’ বলে পরিচয় দিয়েছে।
কিন্তু এক কোণে হঠাৎ চোখে পড়ল একটি নাম—বার্লিনের ইমানুয়েলকির্শস্ট্রাসে। পোস্টারটি সেখানেই ছাপা হয়েছিল।আজ, কৃতজ্ঞতা থেকে—এখন অবশ্য তোমার খবর পাওয়ার জন্য এমন পোস্টারের ওপর নির্ভর করতে হয় না—ভাবছিলাম, তুমি কি ওই অভিনেতাদের দেখতে চাইবে? তাদের নিয়ে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারি। আমি ইহুদি নাট্যশালাকে ভালোবাসি। গত বছর হয়তো তাদের বিশটি নাটক দেখেছি। সম্ভবত একবারও জার্মান থিয়েটারে যাইনি। তবে আমি এখানে তোমাকে সেখানে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছি না। সত্যি বলছি, তা নয়।
বার্লিনে তোমাদের আরও ভালো থিয়েটার আছে। আর সম্ভবত—বরং প্রায় নিশ্চিতভাবেই—সেই থিয়েটারের অপরিষ্কার, জীর্ণ পরিবেশ তোমার সেখানে যাওয়ার ইচ্ছাটাই নষ্ট করে দেবে। এখন তো মনে হচ্ছে, আমি এই বিষয়ে যা লিখেছি, সব ছিঁড়ে ফেলি। এ থেকেই বুঝতে পারো, আমি কোনোভাবেই তোমাকে সেখানে যেতে বলছি না।
আর রবিবারের যে সময়টুকু তোমাকে চিঠি লিখে কাটাই, তার শেষটাও কি এভাবেই করব? কিন্তু সময় চলে যাচ্ছে। আরও দেরি হচ্ছে। আর রাতের লেখার পালা শুরুর আগে যদি সামান্য ঘুমও পেতে চাই, তবে আমাকে তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। একটি কথা অবশ্য নিশ্চিত—এই চিঠিটি না লিখলে আমি ঘুমাতেই পারতাম না, চিঠিটি যতই অসম্পূর্ণ বা অসন্তোষজনক হোক না কেন।
এখন বিদায়।
ওই হতভাগা ডাকঘর! হয়তো সারাদিন তোমার চিঠি প্রাগেই পড়ে ছিল, আর আমি সেটি থেকে বঞ্চিত হলাম!
বিদায়।
তোমার,
ফ্রানৎস কে.


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









