ফ্রয়লাইন ফেলিস, এখন সেই চিঠিগুলো ছাপা হয়ে গেছে—পাঁচ বছরের যন্ত্রণার সাক্ষ্য বহন করা চিঠি। বইটির প্রচ্ছদে বড় করে লেখা ফেলিৎসে বাওয়ারের নামও। অথচ দীর্ঘদিন তার পরিচয় ছিল শুধু একটি আদ্যক্ষরে— ‘এফ’। কাফকার ‘কে’-এর মতোই অস্পষ্ট। এত দিন কেউ জানত না তার নাম কী; সম্ভাব্য অসংখ্য নামের মধ্যে সঠিকটি অনুমান করাও প্রায় অসম্ভব ছিল।
চিঠিগুলোর প্রাপক ফেলিসে ১৯৬০ সালে মারা যান। মৃত্যুর পাঁচ বছর আগে তিনি চিঠিগুলো কাফকার প্রকাশকের কাছে বিক্রি করেছিলেন। এতে তার সেই বাস্তববুদ্ধির পরিচয় মেলে, যা কাফকার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং কখনো কখনো তাকে কোমলও করে তুলত। চিঠিগুলো প্রকাশের সময় অবশ্য কাফকার মৃত্যুর তেতাল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে।
তবু এগুলো পড়তে গিয়ে অনেকের অস্বস্তি হয়েছিল। মনে হয়েছিল, তারা এমন এক ব্যক্তিগত জায়গায় ঢুকে পড়ছেন, যেখানে প্রবেশের অধিকার তাদের নেই। আমি সেই অনুভূতি বুঝি, কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। বহু বছরের মধ্যে পড়া প্রায় সব সাহিত্যকর্মের চেয়ে এই চিঠিগুলো আমাকে বেশি টেনেছে। এগুলো সেই বিরল আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা ও চিঠিপত্রের সঙ্গে এক সারিতে দাঁড়ায়, যেগুলো থেকে কাফকা নিজেও শক্তি নিতেন। ক্লাইস্ট, ফ্লবেয়ার ও হেবেলের চিঠি তিনি বারবার পড়তেন।
জীবনের এক বিপর্যস্ত সময়ে তিনি গ্রিলপার্জারের একটি অভিজ্ঞতা থেকেও সান্ত্বনা পেয়েছিলেন। বহু অপেক্ষার পর ক্যাথি ফ্র্যোলিশকে কোলে নিতে পারার মুহূর্তে গ্রিলপার্জারের মনে হয়েছিল, তাতে বিশেষ কিছুই ঘটেনি।
জীবনের আতঙ্কের সামনে—যা অধিকাংশ মানুষ কেবল কখনো কখনো অনুভব করে, কিন্তু কিছু মানুষ যেন সারাক্ষণ তার সাক্ষী হয়ে থাকে—একটি সান্ত্বনা আছে: আগে যারা এই আতঙ্কের মুখোমুখি হয়েছে, তাদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার যোগ খুঁজে পাওয়া। এই কারণে ফেলিসে বাওয়ারের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তিনি কাফকার চিঠিগুলো সংরক্ষণ করেছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত সেগুলো বিক্রি করেছিলেন।
এসবকে শুধু ‘নথি’ বলা যথেষ্ট নয়। তাহলে পাস্কাল, কিয়ের্কেগার্দ কিংবা দস্তয়েভস্কির জীবন-সাক্ষ্যকেও একই নামে ডাকতে হয়। আমার কাছে এই চিঠিগুলো যেন একটি জীবন্ত জীবন—একই সঙ্গে পরিচিত ও রহস্যময়। মানুষের চরিত্রকে বুঝতে গিয়ে যে মানসিক জগৎ আমরা তৈরি করি, এই চিঠিগুলো তার অনেক আগে থেকেই যেন সেখানে ছিল।
১৯১২ সালের ১৩ আগস্ট। রাত। ম্যাক্স ব্রডের পরিবারের ফ্ল্যাটে প্রথম দেখা হলো কাফকা ও ফেলিসে বাওয়ারের।
সেই সাক্ষাতের নানা বিবরণ পরে কাফকা লিখেছেন। পরদিন ব্রডকে পাঠানো চিঠিতে তিনি ‘মেডিটেশন’ বইয়ের পাণ্ডুলিপির কথা বলতে গিয়ে লিখলেন, আগের রাতে ফেলিসে উপস্থিতি তার ওপর এমন প্রভাব ফেলেছিল যে লেখাগুলোর বিন্যাসে হয়তো “কোনো বোকামি, কোনো গোপনে হাস্যকর ব্যাপার” ঢুকে গেছে।
১৫ আগস্টের ডায়েরিতে আরও সংক্ষিপ্ত নোট: “নাম লিখতে কী সংকোচ— ‘এফ. বি.’। ২০ আগস্ট তিনি প্রথম সাক্ষাতের একটি নিরপেক্ষ ছবি আঁকার চেষ্টা করেন। ফেলিৎসের চেহারা বর্ণনা করতে গিয়ে তার মনে হয়, শারীরিকভাবে যেন তার খুব কাছে চলে যাচ্ছেন। তবু অপরিচিত এই মেয়েটির উপস্থিতি তার কাছে স্বাভাবিকই লেগেছিল। প্রথম দেখাতেই তার মনে একটি “অটল সিদ্ধান্ত” তৈরি হয়েছিল। বাক্যটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পাঁচ সপ্তাহ পর, ২০ সেপ্টেম্বর, তিনি ফেলিসেকে প্রথম চিঠি লেখেন। মনে করিয়ে দেন সেই সন্ধ্যার কথা—তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি টেবিলের ওপার থেকে তাকে একে একে কয়েকটি ছবি দিয়েছিলেন এবং শেষে তার হাত ধরেছিলেন। সেই করমর্দনের মধ্যেই ছিল পরের বছর তার সঙ্গে প্যালেস্টাইনে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি।
এই দ্রুততা কাফকাকে মুগ্ধ করেছিল। সিদ্ধান্ত নিতে তার নিজের স্বভাব ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। কোনো লক্ষ্যের দিকে এগোতে গেলেই সংশয় সেটিকে আরও দূরে সরিয়ে দিত। আর এখানে একটি করমর্দন যেন ভবিষ্যৎকে হঠাৎ স্পষ্ট করে দিয়েছে। তার ওপর সেই ভবিষ্যতের নাম প্যালেস্টাইন—প্রতিশ্রুত ভূমি। কিন্তু সেই সন্ধ্যার ছবিগুলোরও একটি ইতিহাস ছিল। জুলাইয়ের শুরুতে কাফকা ম্যাক্স ব্রডের সঙ্গে ভাইমারে গিয়েছিলেন। গ্যোটের বাড়িতে তার পরিচয় হয়েছিল তত্ত্বাবধায়কের সুন্দরী মেয়েটির সঙ্গে। কথা হয়েছিল, তাঁর ছবি তুলেছিলেন, আবার আসার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। ছোট শহরের পথে পথে তার সঙ্গে দেখা হতো। একবার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেও ব্যর্থ হন। কিছুদিনের মধ্যেই বুঝেছিলেন, মেয়েটির পছন্দ ছাত্রদের প্রতি।
ভ্রমণের দ্রুত গতি ঘটনাগুলোকে আরও তীব্র করেছিল। পরে কাফকা একা চলে যান হার্জ পর্বতমালার ইয়ুংবর্নের স্যানাটোরিয়ামে। সেখানকার ডায়েরিতে ‘থালিয়া’র প্রেমিকসুলভ আগ্রহ নেই; বরং আছে পর্যবেক্ষণের অসাধারণ ক্ষমতা। তবু ভাইমারের মেয়েটিকে তিনি পোস্টকার্ড পাঠাতেন, উত্তরও পেতেন। ব্রডকে লেখা এক চিঠিতে তিনি তার একটি উত্তর নকল করে লিখেছিলেন: “আমি তাকে অপছন্দের না হলেও, তার কাছে নিশ্চয়ই খুব সাধারণ মানুষ বলে মনে হই। কিন্তু তাহলে সে আমার ইচ্ছামতো লিখছে কেন? লেখার মাধ্যমে কি কোনো মেয়েকে নিজের দিকে টেনে নেওয়া যায়?”
ভাইমারের সেই অভিজ্ঞতা তাকে সাহস দিয়েছিল। ফেলিসের সামনে তিনি সেই ভ্রমণের ছবিগুলোই তুলে ধরেছিলেন। পুরোনো আকাঙ্ক্ষার স্মৃতি যেন নতুন এক সম্পর্কের ওপর এসে পড়ল। এই ভ্রমণেই আর্নস্ট রোভোল্টের সঙ্গে তার পরিচয় হয়; রোভোল্ট তার প্রথম বই প্রকাশ করতে আগ্রহী হন। একই সময়ে ‘মেডিটেশন’-এর জন্য ডায়েরি থেকে লেখা বাছাই করছিলেন কাফকা। নিজের কাজ নিয়ে তার সংশয় ছিল, ম্যাক্স ব্রড তাকে চাপ দিচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৩ আগস্টের সন্ধ্যায় পাণ্ডুলিপি সঙ্গে করে তিনি ব্রডদের বাড়িতে যান। সেদিন তার হাতে ছিল তিনটি জিনিস—প্রথম বইয়ের পাণ্ডুলিপি, ভাইমারের ভ্রমণের ছবি এবং ‘প্যালেষ্টিনা’ পত্রিকার একটি সংখ্যা। এগুলো যেন তার জীবনের তিনটি সম্ভাবনা: সাহিত্য, প্রেম এবং প্যালেস্টাইন।
ব্রড পরিবারের বাড়িতে কাফকা স্বচ্ছন্দ ছিলেন। নিজের পরিবার থেকে এখানে তিনি আশ্রয় পেতেন। সাহিত্য নিয়ে কথা বলা যেত; ব্রডের বাবা-মা তাদের ছেলের লেখকজীবনকে গুরুত্ব দিতেন এবং তার বন্ধুদেরও। এই সময় কাফকার লেখায়ও নতুন বিস্তার দেখা যায়। ইয়ুংবর্নের ডায়েরি তার প্রমাণ। তার স্মৃতিশক্তির সূক্ষ্মতা আরও স্পষ্ট হয় ফেলিসেকে লেখা ষষ্ঠ চিঠিতে, ২৭ অক্টোবর। প্রথম সাক্ষাতের পঁচাত্তর দিন পরও সেই সন্ধ্যার খুঁটিনাটি তার মনে অক্ষত ছিল।
এভাবেই কাফকার লেখকসত্তার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আমাদের চোখে ধরা পড়ে যায়। কোনো বিবরণ তার কাছে তুচ্ছ নয়, যদি সেটি যথাযথ হয়। আবার কিছু বিবরণ তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ সেগুলো তার নিজের চরিত্রের সঙ্গে মিলে যায়, কোনো ঘাটতি পূরণ করে, অথবা বিস্ময়ের মধ্য দিয়ে ফেলিসের শারীরিক উপস্থিতিকে তার কাছে আরও বাস্তব করে তোলে। পরবর্তী সাত মাসে ফেলিসের যে প্রতিকৃতি তাঁর মনে তৈরি হয়েছিল, তার ভিত্তি ছিল এই ক্ষুদ্র ঘটনাগুলো।
ফেলিসে ভ্রমণের ছবিগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখেছিলেন। খেতে ভুলে গিয়েছিলেন। ম্যাক্স মন্তব্য করলে তিনি বলেছিলেন, সারাক্ষণ খাওয়া মানুষের চেয়ে ঘৃণ্য আর কিছু নেই। তিনি বলেছিলেন, ছোটবেলায় ভাই ও কাজিনদের হাতে তাকে প্রায়ই মার খেতে হতো। নিজের বাঁ হাত দেখিয়ে বলেছিলেন, একসময় তা কালশিটেতে ভরা থাকত। কিন্তু কথাটিতে আত্মদয়া ছিল না। এটাই কাফকাকে বিস্মিত করেছিল। তার নিজের শৈশবের ভঙ্গুরতার বিপরীতে ফেলিসে যেন সেই দুর্বলতাকে পেছনে ফেলে এসেছেন। তিনি আরও জানালেন, হিব্রু পড়েছিলেন। কাফকা বিস্মিত হলেন। পরে যখন তিনি তেল আবিব অনুবাদ করতে পারলেন না, কাফকা গোপনে আনন্দ পেয়েছিলেন। ফেলিসে জায়নবাদী—এটিও তার ভালো লেগেছিল।
ফেলিসে পাণ্ডুলিপি নকল করতে ভালোবাসেন বললে কাফকা এতটাই অবাক হয়েছিলেন যে টেবিলে হাত চাপড়ে ছিলেন।আরেকটি ছোট ঘটনা তার মনে রয়ে গেল। সেদিন ফেলিৎসের জুতো ভিজে যাওয়ায় তিনি ফ্রাউ ব্রডের চটি জোড়া পরেছিলেন। অন্ধকার মাঝের ঘর দিয়ে হাঁটার সময় বলেছিলেন, তিনি হিলওয়ালা চটিতে অভ্যস্ত। কাফকার কাছে এই তথ্যটি অদ্ভুতভাবে ঘনিষ্ঠ মনে হয়েছিল। পরে যখন তিনি দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের জুতো পরে ফিরে এলেন, কাফকা আবার মুগ্ধ হলেন। কারণ তার নিজের রূপান্তর সবসময় ধীর। প্রতিটি পরিবর্তন তিনি পরীক্ষা করে তবে বিশ্বাস করেন। ফেলিসের পরিবর্তন ছিল মুহূর্তের। প্যালেস্টাইনের প্রসঙ্গ উঠলে ফেলিসে তার হাত বাড়িয়েছিলেন। কাফকার কাছে এই করমর্দন যেন প্রতিশ্রুতির একটি দৃশ্যমান রূপ। ফেরার পথে তিনি নিজের অর্ধ-সম্মোহিত অবস্থায় চলে যান। ফেলিসে ট্রেনে ছাতা ফেলে এসেছেন—এই তুচ্ছ ঘটনাটিও তার স্মৃতিতে জায়গা করে নেয়।
পরদিন ভোরে ফেলিসের চলে যাওয়ার কথা ছিল। তিনি তখনো ব্যাগ গোছাননি; বরং বিছানায় শুয়ে পড়তে চেয়েছিলেন। আগের রাতে ভোর চারটা পর্যন্ত পড়েছিলেন। কাফকা এই অভ্যাসেও নিজের সঙ্গে একটি মিল খুঁজে পেলেন—তিনিও রাতে লিখতেন। এইভাবেই ফেলিসে তার কাছে ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট মানুষ হয়ে উঠলেন—দ্রুত সাড়া দেন, নিজের মতামত স্পষ্টভাবে জানান, সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পান না। চিঠিপত্রও দ্রুত হয়ে উঠল। কাফকা প্রায় প্রতিদিন লিখতেন, কখনো দিনে দুবার। ফেলিসেও শিগগিরই প্রতিদিন উত্তর দিতে শুরু করলেন।
কাফকার চিঠিতে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়গুলোর একটি তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে অবিরাম উদ্বেগ। দ্বিতীয় চিঠিতেই তিনি লিখছেন, তার মেজাজ মুহূর্তে বদলে যায়; সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছেও জানেন না ঘরে ঢোকার সময় কেমন থাকবেন; অনিশ্চয়তাকে জমিয়ে তবে তা সামান্য নিশ্চয়তায় পরিণত করতে পারেন। নিজের স্মৃতিশক্তি ও সিদ্ধান্তহীনতার কথাও বলেন। এই সিদ্ধান্তহীনতার মধ্য দিয়েই তার প্রেম নিবেদন শুরু হয়। কিন্তু শিগগিরই শরীর ও লেখালেখি তার চিঠির প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। তিনিফেলিসের প্রতিটি ব্যাপার জানতে চান—কখন অফিসে পৌঁছান, কী খান, জানালা দিয়ে কী দেখা যায়, কী কাজ করেন, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কে তাকে বেশি মিষ্টি খাওয়াচ্ছে। তার ঘর, কাজ এবং সময়ের বিন্যাস—কিছুই তার কৌতূহলের বাইরে নয়। এগুলো শুধু প্রেমের কৌতূহল ছিল না। কাফকা ফেলিসের সুস্থতা ও কর্মদক্ষতার সঙ্গে নিজের দুর্বলতার একটি সম্পর্ক তৈরি করছিলেন। প্রাগ ও বার্লিনের দূরত্ব তার কাছে বাধা নয়; বরং প্রয়োজনীয় দূরত্ব। ফেলিসের দৃঢ়তা তিনি দূর থেকেই নিজের মধ্যে টেনে নিতে চাইছিলেন। তার দুর্বল কথাগুলো লিখে পাঠালে সেগুলো যেন আরও শক্ত হয়ে ফিরে আসত।
তিনি উত্তরের জন্য জেদ ধরতেন। ফেলিসে প্রথমে তার মতো আবিষ্ট ছিলেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে কাফকার ছন্দ তার ওপরও কাজ করতে শুরু । চিঠির নিয়মিততা কাফকাকে শক্তি দিল—এবং সেই শক্তি সরাসরি তার লেখায় গিয়ে পৌঁছাল। ফেলিসেকে প্রথম চিঠি লেখার দুই রাত পর তিনি এক বসায়, দশ ঘণ্টায় লিখলেন ‘দ্য জাজমেন্ট’। এই গল্প তার লেখকসত্তার ওপর আস্থা ফিরিয়ে দিল। বন্ধুদের পড়ে শোনালেন এবং পরে আর কখনো গল্পটিকে প্রত্যাখ্যান করেননি।
পরের সপ্তাহে লিখলেন ‘দ্য স্টোকার’। পরবর্তী দুই মাসে ‘আমেরিকা’-র আরও পাঁচটি অধ্যায়। এরপর ‘দ্য মেটামোরফিসস’। কাফকার জীবনে এটি ছিল এক বিরল সৃষ্টিশীল সময়। এর কারণও স্পষ্ট। ফেলিসে তার কাছে এমন এক দূরবর্তী নিরাপত্তার উৎস হয়ে উঠেছিলেন, যা তাকে স্থির রাখত কিন্তু তার সংবেদনশীলতাকে আচ্ছন্ন করত না। তিনি ছিলেন এমন একজন নারী, যার কাছে কাফকা শব্দের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করতে পারতেন। এখানে পরিবারের দূরত্বও গুরুত্বপূর্ণ। নিজের পরিবারের কাছাকাছি থাকা তাকে যেভাবে পীড়া দিত, ফেলিসেকে সেই জগতের বাইরে রাখাই তার প্রয়োজন ছিল। তাকে নিজের কথা সম্পূর্ণ গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হতো। কথায় কাফকা ছিলেন সংযত; চিঠিতে তিনি নিজের জন্য একটি দীর্ঘ পরিসর তৈরি করতে পারতেন। নিজের ভয়, দুর্বলতা, দ্বিধা, লেখার অগ্রগতি—সবকিছু সেখানে বলা যেত।
এই সময়ে তার ডায়েরিও প্রায় থেমে যায়। কারণ ফেলিসেকে লেখা চিঠিগুলোই হয়ে ওঠে তার বিস্তৃত ডায়েরি। পার্থক্য হলো, ডায়েরির একটি পাতায় কথা শেষ করতে হয়; চিঠিতে একই কথা আবার বলা যায়, সংশোধন করা যায়, প্রত্যাহার করা যায়, অন্যভাবে বলা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পুনরাবৃত্তির সুযোগ। কাফকার লেখায় পুনরাবৃত্তির যে বিশেষ ভূমিকা, চিঠিগুলো তার স্বাভাবিক ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। একই উদ্বেগ বারবার ফিরে আসে, একই প্রশ্ন নতুন ভাষায় বলা হয়। এই পুনরাবৃত্তিই কখনো কখনো তার রচনাকে ধর্মীয় বা ‘মিস্টিক’ বলে ব্যাখ্যা করার কারণ হয়েছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়— ১৯১৩ সালের জানুয়ারিতে তার লেখার গতি হঠাৎ থেমে গেল কেন?
শুধু ‘সৃষ্টিশীল সময়’ ও ‘অসৃষ্টিশীল সময়’-এর কথা বলে এর উত্তর পাওয়া যায় না। একজন লেখকের উৎপাদনশীলতার যেমন কারণ থাকে, থেমে যাওয়ারও কারণ থাকে। প্রথম পর্যায়ের চিঠিগুলোকে প্রচলিত অর্থে প্রেমপত্র বলা কঠিন। কিন্তু তাতে প্রেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল: ফেলিসেকে কাফকার কাছ থেকে কিছু প্রত্যাশা করতেন। প্রথম সাক্ষাতের দিন কাফকার সঙ্গে ছিল তার প্রথম বইয়ের পাণ্ডুলিপি। ফেলিসেকে তাকে চিনেছিলেন একজন লেখক হিসেবে—শুধু কোনো লেখকের বন্ধু হিসেবে নয়। তার চিঠি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও তাই একটি স্বীকৃতি কাজ করছিল: তিনি কাফকাকে লেখক হিসেবে গ্রহণ করছেন। আর যে গল্পটির মাধ্যমে কাফকা প্রথম নিজের লেখকসত্তার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা পেয়েছিলেন—‘দ্য জাজমেন্ট’—সেটি তিনি ফেলিসেকেই উৎসর্গ করেছিলেন।
অবশ্য ফেলিসের সাহিত্যরুচি সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। তাই চিঠির মধ্যেই তার ওপর কিছুটা প্রভাব বিস্তার করতে চাইতেন। তার কাছে কী কী বই আছে, তার একটি তালিকাও চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই তালিকা আর কখনো পাননি।
এলিয়াস কানেত্তি ‘কাফকা’র আদার ট্রায়াল’ বইয়ের ভূমিকায় লেখাটি লিখেছিলেন।
দৈনিক এদিন অনলাইন ‘লেটার্স টু ফেলিস বাই ফ্রান্ৎস কাফকা’ বই থেকে ধারাবাহিকভাবে তার চিঠিগুলো বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য প্রকাশ করছে। পাঠক আসনু আমরা কাফকার চিঠির মধ্য দিয়ে তার জগতে প্রবেশ করি।

৪ নভেম্বর ১৯১২
সোমবার সকাল সাড়ে দশটা। শনিবার সকাল সাড়ে দশটা থেকে একটি চিঠির অপেক্ষায় আছি। আবারও কিছু এল না। আমি প্রতিদিন লিখেছি—এ নিয়ে তোমাকে কোনো অভিযোগ করছি না; বরং লিখতে পেরে আমি আনন্দ পেয়েছি। কিন্তু তার বিনিময়ে কি একটি শব্দও প্রাপ্য নয়? একটি মাত্র শব্দ? এমনকি যদি সেই শব্দটি হয়—‘আমি আর কখনো তোমার কাছ থেকে কোনো চিঠি পেতে চাই না।’
আমি ভেবেছিলাম, আজকের চিঠিতে হয়তো কোনো সিদ্ধান্ত থাকবে। কিন্তু চিঠি না আসাটাও এক ধরনের সিদ্ধান্ত। চিঠি এলে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতাম। আর সেই উত্তরের শুরুতেই থাকত অভিযোগ—এই দুই অন্তহীন দিন এত দীর্ঘ হলো কেন? অথচ তুমি আমাকে আমার দুর্ভাগা ডেস্কের সামনে বসিয়ে রেখেছ, আর আমি ক্রমেই আরও দুর্ভাগা হয়ে উঠছি।
#
৫ নভেম্বর ১৯১২
প্রিয় ফ্রয়লাইন ফেলিসে,
তুমি যদি সত্যিই চাও আমি সবকিছু যেমন ঘটে, তেমনই লিখি, তাহলে গতকালের সেই নিষ্ঠুর, অপ্রয়োজনীয়, আতঙ্কিত চিঠিটিকে ক্ষমা করা তোমার পক্ষে সহজ হবে। কারণ কাগজের সেই ছোট টুকরোয় আমি যা লিখেছিলাম, সবই সত্যি ছিল।
আজ অবশ্য তোমার আগের দুটি চিঠি এসে পৌঁছেছে—একটি সকালে, অন্যটি দশটার দিকে। অভিযোগ করার কোনো অধিকারই আমার নেই। বরং তোমার কাছ থেকে প্রতিদিন একটি চিঠি পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েছি। প্রতিদিন একটি চিঠি! আমার হৃদয়, এই কথাটি শোনো। এখন শুধু তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে পারি। তবে একটি অনুরোধ আছে। তুমি যখন আমার জন্য চিঠি শেষ করবে, তখন ডাকটিকিট নেই বলে আমাকে শাস্তি দিও না। টিকিট না থাকলে টিকিট ছাড়াই চিঠিটি ডাকবাক্সে ফেলে দিও। আমার জন্য সেটিই ভালো।
দুঃখের বিষয়, রবিবার ছাড়া তোমাকে লেখার মতো সময় পাই কেবল দিনের সবচেয়ে নিরানন্দ সময়ে—বিকেল তিনটা থেকে চারটার মধ্যে। অফিসে বসে লেখা প্রায় অসম্ভব। তোমার চিঠি পড়ার পর নিজেকে কীভাবে সামলাই, তা তুমি জানো না। তবু এখন যদি না লিখি, অসন্তোষ আমাকে রাতে ঘুমোতে দেবে না। আর আজ না লিখলে তুমি কাল আমার চিঠি পাবে না। সন্ধ্যার পর আমার সময়ও এমনভাবে বাঁধা যে সেখানে তোমার জন্য জায়গা করা কঠিন। তোমার চিঠি থেকে বুঝলাম, ছুটির দিনেও আমি নাকি অযৌক্তিকভাবে লিখি। আমার হৃদয় হয়তো মোটামুটি সুস্থ। কিন্তু ভালো লেখা থেকে পাওয়া আনন্দ এবং খারাপ লেখার দুঃখ—এই দুইয়ের ভার কোনো মানুষের হৃদয়ের পক্ষেই সহজ নয়।
আমি স্যানাটোরিয়ামে গিয়েছিলাম মূলত পেটের অসুখ ও সাধারণ দুর্বলতার জন্য। তার সঙ্গে ছিল আমার নিজের অসুস্থতা নিয়ে অতিরিক্ত মুগ্ধতা—আমার সেই আত্মমগ্ন হাইপোকন্ড্রিয়া। একদিন এসব নিয়ে তোমাকে দীর্ঘ করে লিখব। বিখ্যাত ডাক্তারদের আমি বিশ্বাস করি না। তারা যখন বলেন, তারা কিছুই জানেন না, তখনই তাদের বিশ্বাস করতে পারি। আর যাই হোক, আমি ডাক্তারদের পছন্দ করি না। আশা করি, তুমি কোনো ডাক্তারকে ভালোবাসো না। আমার জন্য যদি কেউ বার্লিনে একটি মুক্ত, শান্ত জীবন প্রেসক্রাইব করত! কিন্তু এমন ক্ষমতা আছে—এমন ডাক্তার কোথায়?
তোমার ইমানুয়েল-কির্শস্ট্রাসে নিশ্চয়ই ক্লান্ত মানুষের জন্য ভালো জায়গা। চাইলে আমি জায়গাটিকে কল্পনা করে তোমাকে বর্ণনা করতে পারি। আলেকজান্ডারপ্লাৎস থেকে একটি দীর্ঘ কিন্তু ব্যস্ত নয় এমন রাস্তা ধরে এগোতে হয়—প্রেনৎসলাউয়ার স্ট্রাসে, তারপর প্রেনৎসলাউয়ার আলি। দুপাশে সরু সরু গলি। তারই একটি ইমানুয়েল-কির্শস্ট্রাসে। শান্ত, নির্জন, বার্লিনের অবিরাম কোলাহল থেকে দূরে। রাস্তার শুরুতেই একটি সাধারণ গির্জা। তার বিপরীতে ৩৭ নম্বর বাড়ি—খুব সরু, কিন্তু বেশ উঁচু। রাস্তাটিও সরু। সেখানে দাঁড়ালে সবসময় শান্ত লাগে। তখন মনে হয়, এ কি সত্যিই বার্লিন?
অভিনেতা লোয়ি আমাকে গতকাল চিঠিতে এভাবেই তোমার রাস্তার বর্ণনা দিয়েছে। শেষ প্রশ্নটি আমার কাছে কবিতার মতো লেগেছে। বাকি অংশটিও যথেষ্ট নির্ভুল। আমি কিছুদিন আগে কোনো কারণ না জানিয়েই তাকে এই বর্ণনা লিখতে বলেছিলাম। সেও কোনো প্রশ্ন না করে লিখেছে। আসলে আমি ৩০ নম্বর বাড়িটির কথা জানতে চেয়েছিলাম। এখন দেখছি, তুমি সম্ভবত ২৯ নম্বরে থাকো। সে কেন আমার জন্য ৩৭ নম্বর বেছে নিল, জানি না। তবে ভাবতে গিয়ে মনে হলো, যে পোস্টারের কথা বলেছিলাম, তার ছাপাখানা হয়তো ওই বাড়িতেই। তার শেষ চিঠি থেকে মনে হচ্ছে, রবিবার বার্লিনে তাদের শেষ অভিনয় হয়েছে। তবে সম্ভবত আগামী রবিবার আরেকটি অভিনয় হতে পারে। আগের কথাটি শুধু সংশোধন করলাম। তোমাকে সেখানে যাওয়ার যে পরামর্শ দিয়েছিলাম, তার সঙ্গে তখন যে সতর্কতাগুলো জানিয়েছিলাম, সেগুলোও থাকল।
আর একটি কথা।
তোমার আগের চিঠিগুলোর একটিতে সেই জাদুর শব্দটি এসে পড়েছে। তুমি নিজেও হয়তো জানো না যে শব্দটি সেখানে আছে। অনেক অন্য শব্দের ভিড়ে সে হারিয়ে গেছে। আমার ভয় হয়, আমাদের চিঠিপত্রে সে কখনো তার প্রাপ্য জায়গা পাবে না। কারণ আমি কোনোভাবেই শব্দটি প্রথম উচ্চারণ করব না। আর তুমি যদি অনুমানও করে থাকো, তবু প্রথমে বলবে না।
হয়তো এটাই ভালো। কারণ শব্দটি একবার উচ্চারিত হলে আমার সম্পর্কে এমন কিছু তুমি জানতে পারবে, যা হয়তো তোমার ভালো লাগবে না। তখন আমি কী করব? তার চেয়েও ভয়ংকর, আমার লেখালেখি সম্পর্কে তোমার ধারণা বদলে যাবে। তুমি আর আমাকে সংযত হতে বলবে না। অথচ মানুষের দুর্বলতাই তো যথেষ্ট সংযম তৈরি করে। আমি যে একমাত্র কাজটি করতে পারি, তার ওপর কি আমার সবকিছু বাজি রাখা উচিত নয়? না রাখলে আমি কী ভয়ংকর বোকা হব! আমার লেখা যদি মূল্যহীন হয়, তাহলে আমিও নিঃসন্দেহে সম্পূর্ণ মূল্যহীন। এই জায়গায় নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা মানে নিজেকে বাঁচানো নয়—আত্মহত্যা করা।
আচ্ছা, বলো তো, তোমার ধারণায় আমার বয়স কত? হয়তো সেদিন সন্ধ্যায় এ নিয়ে কিছু কথা হয়েছিল। তুমি খেয়াল করেছ কি না, জানি না। বিদায়। আমার প্রতি সদয় থেকো। আর ফ্রাউ সোফির জন্য যে চিঠিগুলো অসম্পূর্ণ রেখে দাও, সেগুলো জমিয়ে রেখো। ফ্রাউ ফ্রিডমানকে আমি খুব পছন্দ করি, কিন্তু এতটা নয় যে তোমার চিঠিগুলো তাঁকে দিয়ে দেব।
না, তার সঙ্গে আমার নিয়মিত পত্রালাপ নেই। তাকে মাত্র তিনটি চিঠি লিখেছি। প্রথমটি তোমার জন্য অভিযোগ। দ্বিতীয়টি তোমার জন্য উদ্বেগ। তৃতীয়টি তোমার জন্য কৃতজ্ঞতা।
তোমার
ফ্রানৎস কে.
#
৬ নভেম্বর ১৯১২
প্রিয় ফ্রয়লাইন ফেলিসে,
আমি যেন তোমাকে আমার চোখের সামনে টুকরো টুকরো হতে দেখছি। তুমি কি খুব বেশি মানুষের সঙ্গে দেখা করছ না? অপ্রয়োজনীয়ভাবেও? তোমার যদি আরও সময় থাকত, তাতে আপত্তি ছিল না। কিন্তু এমন কিছু কাজ করছ না তো, এমন কিছু জায়গায় যাচ্ছ না তো, এমন কিছু পার্টিতে যোগ দিচ্ছ না তো—যেগুলোর শেষে শুধু অস্থিরতা থেকে যায়?
আমি হয়তো অধ্যাপকের মতো কথা বলছি, অথচ তোমার পরিস্থিতি সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানি না। কিন্তু তোমার শেষ চিঠিতে তুমি এতটাই স্নায়ুচাপে ছিলে যে মনে হচ্ছিল, এক মুহূর্তের জন্য তোমার হাত ধরে রাখি। আমি কোনো বিশেষ কিছুর বিরুদ্ধে নই। অধ্যাপকের বাড়ির আনন্দের আয়োজনগুলোর বিরুদ্ধেও নই—যদিও ‘পানি ও গ্যাস’-এর কথা পড়ে একটু ভ্রু তুলেছিলাম। সেই বার্ষিক অনুষ্ঠানটির বিরুদ্ধেও নই। বরং এমন অনুষ্ঠানে প্রায়ই দলবদ্ধ ছবি তোলা হয়। নিজের ছবি আলাদা করে কাউকে দিতে না চাইলেও সেই ছবিগুলো উপহার হিসেবে দেওয়া যায়। আর দূরে থাকা কেউ চাইলে তাতে খুব আনন্দ পেতে পারে।
ইদ্দিশ থিয়েটার নিয়ে আমার কথায় কোনো ব্যঙ্গ ছিল না। হয়তো হেসেছিলাম, কিন্তু সেটাও ভালোবাসারই একটি রূপ। আমি এত মানুষের সামনে—এখন মনে হয় সংখ্যাটি অসীম—একটি ছোট বক্তৃতাও দিয়েছিলাম। তারপর লোয়ি মঞ্চে উঠেছিল। অভিনয় করেছিল, গান গেয়েছিল, আবৃত্তি করেছিল। দুঃখের বিষয়, সেই অসীম মানুষের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ অসীম ছিল না। বার্লিনের অভিনয় সম্পর্কে গতকাল যা জানতাম, আজও তার বেশি জানি না। লোয়ির শেষ চিঠিতে ছিল কেবল অভিযোগ আর হতাশা। তার একটি অভিযোগ অবশ্য বার্লিনবাসীর কাছে লুকিয়ে রাখা উচিত নয়—সপ্তাহের কর্মদিবসে বার্লিনে অর্থ উপার্জন করা প্রায় অসম্ভব।
লোয়ি স্বভাবতই প্রবল উৎসাহী মানুষ। পূর্ব ইউরোপে তাকে ‘হট ইহুদি’ বলা হয়। এখন অবশ্য নানা কারণে সে খুব অসুখী। কারণগুলো বলতে গেলে দীর্ঘ গল্প হয়ে যাবে। সবচেয়ে খারাপ হলো, তাকে কীভাবে সাহায্য করব, আমি জানি না। রবিবার তোমার চিঠি আসবে বলে কেন ভেবেছিলাম, তার ব্যাখ্যা সহজ। অফিসে গিয়ে আবার ডাক দেখলাম। প্রথমে অবশ্য খুব হতাশ হইনি। আশার সঙ্গে নয়, বরং অন্যমনস্কভাবে চিঠিগুলো উল্টেপাল্টে দেখছিলাম।
আমার বাড়ির ঠিকানা নিকলাসস্ট্রাসে ৩৬। কিন্তু তোমার ঠিকানা কী? তোমার চিঠির পেছনে তিনটি আলাদা ঠিকানা দেখেছি। তুমি কি সত্যিই ২৯ নম্বরে থাকো? রেজিস্ট্রি চিঠি পেতে তোমার বিরক্তি হয়?
আমি শুধু উদ্বিগ্ন বলে রেজিস্ট্রি চিঠি পাঠাই না—যদিও সেটি একটি কারণ। আমার মনে হয়, এতে চিঠিটি সরাসরি তোমার হাতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বেশি। সাধারণ চিঠিগুলো যে কীভাবে ঘুরে বেড়ায়, তা ভাবলেই আমার অস্বস্তি হয়। আর আমি সবসময় কল্পনা করি, এক চতুর বার্লিন ডাকপিয়নের বাড়ানো হাত তোমার সামনে এসে গেছে; তুমি নিতে না চাইলেও সে কোনোভাবে চিঠিটি তোমার হাতে দিয়ে যাবে। একজন নির্ভরশীল মানুষের মিত্রের সংখ্যা কখনো বেশি হয় না।
বিদায়।
এই চিঠিতে একটিও অভিযোগ নেই—এতে আমি গর্বিত। যদিও তোমার কাছে অভিযোগ করতে আমার ভালোই লাগে।
তোমার
ফ্রানৎস কে.
#
৭ নভেম্বর ১৯১২
প্রিয় ফ্রয়লাইন ফেলিসে,
গতকাল তোমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার ভান করেছিলাম। তোমাকে উপদেশ দেওয়ারও চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন বুঝছি, আমি আসলে কী করছি—তোমাকে কষ্ট দিচ্ছি? ইচ্ছা করে নয়। সেটা কল্পনাও করা যায় না। আর ইচ্ছা করে করলেও তোমার শেষ চিঠির সামনে সেই অন্ধকার মুহূর্তেই মিলিয়ে যেত। তবু আমি তোমাকে আমার অস্তিত্ব দিয়েই কষ্ট দিচ্ছি। শুধু এই কারণে যে আমি আছি।
মৌলিকভাবে আমি বদলাইনি। একই বৃত্তে ঘুরে চলেছি। শুধু আমার অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার তালিকায় আরেকটি অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা যোগ হয়েছে। আর এই হারিয়ে যাওয়ার ভেতরেই এক ধরনের নতুন আত্মবিশ্বাস পেয়েছি—হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী আত্মবিশ্বাস। কিন্তু তুমি অস্থির হয়ে পড়েছ। তোমার ঘুমের মধ্যে তুমি কাঁদো। জেগে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকার চেয়েও এটি খারাপ। যে সন্ধ্যায় তুমি সবাইকে এত শান্তভাবে দেখেছিলে, তার পর থেকে তুমি বদলে গেছ। এখন এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়ে ছুটে বেড়াও। এক চিঠিতে বিশজন মানুষের কথা বলো, পরের চিঠিতে কারও নয়।
সংক্ষেপে, আমাদের মধ্যে লাভগুলো অসমভাবে ভাগ হয়েছে। অন্যায়ভাবে। অত্যন্ত অন্যায়ভাবে। এই মুহূর্তে তুমি কি আমার সামনে বসে আছ? এই শান্ত ঘরেও কি তুমি বসে আছ? অথচ ঘরটি তো তোমারই। আমি আবার বলছি—দোষটা আমার ভেতরে নেই। আমি-ই বা কী? দোষ সেই এক জিনিসটির, যার দিকে আমার অচেতন আকাঙ্ক্ষা বরাবর ধাবিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। আর সেই আকাঙ্ক্ষার দিকেই তোমাকেও টেনে নিতে হবে, যদি তোমাকে হারাতে না চাই।
কী ভয়ংকর অন্যায়ই না তোমার স্বভাবের ওপর আমাকে চাপিয়ে দিতে হচ্ছে! এতদিনের বিরতির পর আবার লিখতে বসেছি। যদি সময় থাকত! যদি একটু সময় থাকত! তাহলে আমি শান্ত হতে পারতাম। জিনিসগুলোকে সঠিক দূরত্ব থেকে দেখতে পারতাম। তোমাকে আরও সাবধানে লিখতে পারতাম। এখন যেমন করছি, তেমন করে তোমাকে আঘাত করতাম না—যদিও তোমাকে আঘাত করা এ মুহূর্তে আমার সবচেয়ে অপছন্দের কাজ। আমি শান্ত থাকতাম। অফিসে তোমার কথা মনে পড়লে ফাইলের ওপর কাঁপতাম না। কয়েক মুহূর্ত আগেও যেমন কেঁপেছি। এখন এই তুলনামূলক শান্ত ঘরে বসে অর্ধেক নামানো পর্দার ফাঁক দিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতাম না।
এমনকি আমরা যদি প্রতিদিন একে অন্যকে লিখতে থাকি, তবু কি আজকের মতো দিন ছাড়া অন্য কোনো দিন আসবে? অসম্ভবের পেছনে ছুটে চলা, কোনো অদৃশ্য শক্তিতে ছিন্নভিন্ন হওয়া এবং সেই একই শক্তিতে আবার একসঙ্গে বাঁধা পড়া—এই কি আমাদের নিয়তি? দীর্ঘ বিরতির কথা শুধু উল্লেখ করতে পারলাম। আর কিছু নয়।
এখন বিকেল। প্রায় সন্ধ্যা।
তোমার চিঠিটি আবার পড়তে গিয়ে হঠাৎ বুঝলাম, তোমার শৈশব সম্পর্কে আমি প্রায় কিছুই জানি না। শুধু মনে করতে পারি, তুমি ছোটবেলায় মাঠের ওপার থেকে আইভির লতার ভেতর দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তাকিয়ে আছ। তোমার মুখটুকু ছাড়া আর কিছুই যেন আমার কাছে পৌঁছায়নি। এবং তোমার অতীত জানার একমাত্র পথ সম্ভবত লেখা। এ বিষয়ে কোনো ভুল কোরো না। আমি যদি তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়াই, তুমি আমাকে অসহ্য মনে করবে। হোটেলের দিকে যাওয়ার পথে আমি যেমন ছিলাম, সেটিই আমার আসল চেহারা। আমার জীবনযাপন তোমার কাছে পাগলামি বলে মনে হবে। যদিও তাতে আমার পেটের অসুখ অনেকটা সেরেছে।
কয়েক মাস ধরে, যতদিন না বাবা অভ্যস্ত হয়েছিলেন, আমি যখন রাতের খাবার খেতাম, তাঁকে সংবাদপত্রের আড়ালে মুখ লুকিয়ে রাখতে হতো। বহু বছর ধরে আমার পোশাকও প্রায় একই রকম। অফিস, রাস্তা, বাড়ির লেখার টেবিল—সব জায়গায় একই পোশাক। গ্রীষ্ম-শীতও আলাদা কিছু নয়। ঠান্ডা আমি কাঠের টুকরোর চেয়েও ভালো সহ্য করতে পারি। কিন্তু সে জন্য এমনভাবে ঘোরার কোনো কারণ নেই। এখন নভেম্বর। চারপাশে সবাই মোটা কাপড়ে মোড়ানো। আর আমি যেন কোনো উন্মাদ, গ্রীষ্মের পোশাক পরে তাদের মাঝ দিয়ে হাঁটছি—গায়ে ওভারকোট নেই, হালকা বা ভারী কিছুই নেই, মাথায় ছোট গ্রীষ্মের টুপি। নীতিগতভাবে আমি ভেস্টও পরি না। ভেস্টহীন পোশাকের আবিষ্কারক আমি।
আমার অন্তর্বাসের অদ্ভুত বিষয়গুলো নিয়ে না বলাই ভালো। এখন কল্পনা করো, তোমার রাস্তার শুরুতে যে গির্জাটির কথা বললাম, তার কাছে হঠাৎ তুমি এমন একজন মানুষকে দেখতে পেলে। কেমন লাগত? আমার এই অভ্যাসগুলোর কয়েকটি ব্যাখ্যা আছে। আর সত্যি বলতে, এগুলো গ্রহণ করার পর আমি আগের চেয়ে অনেক সুস্থও হয়েছি। কিন্তু তুমি কোনো ব্যাখ্যাই মেনে নেবে না। বিশেষ করে আমার জীবনযাপনের স্বাস্থ্যকর দিকগুলোকে ঘুমের অভাব সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়।
আমি ধূমপান করি না। মদ পান করি না। কফি বা চা-ও নয়। সাধারণত চকলেটও খাই না—যদিও এ বিষয়ে আমার নীরবতা কিছুটা ভণ্ডামি। প্রিয় ফ্রয়লাইন ফেলিস, এসব কারণে আমার দিকে পিঠ ফিরিয়ে নিও না। আমাকে সংশোধন করার চেষ্টা কোরো না। এই দূরত্বের ওপার থেকে আমাকে একটু সদয়ভাবে সহ্য করো। গত রাতের কথাই ধরো। প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে আমার স্বাভাবিক পোশাকে বাড়ি ফিরলাম। রাতের খাবার খেলাম—যা প্রায় প্রতিদিন একই রকম। ভগ্নীপতি এবং যে শিগগিরই সেই সম্পর্ক পেতে যাচ্ছে, তাদের কথা শুনলাম।
বিদায় নেওয়ার সময় সবাই যখন হলঘরে, আমি ঘরে একা হয়ে গেলাম। তখন তোমার জন্য এমন এক আকাঙ্ক্ষা আমাকে গ্রাস করল যে মাথাটাকে কোনোভাবে ঠেকিয়ে রাখার জন্য শুধু টেবিলের ওপর রেখে দিতে ইচ্ছে করছিল। তুমি আমাকে আমার বয়সের চেয়ে অনেক কম মনে করো। প্রায় মনে হয়, নিজের বয়স লুকিয়ে রাখি। কারণ বয়সের সংখ্যাটি যত বাড়ে, তোমাকে আমার মধ্যে যা যা অস্বস্তিকর মনে হয়, সেগুলোও যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আসলে আমি ম্যাক্সের চেয়ে প্রায় এক বছর বড়। আগামী ৩ জুলাই আমার ত্রিশ হবে। তবে দেখতে আমি ছেলের মতো। অপরিচিত কেউ আমাকে দেখে আঠারো থেকে পঁচিশ—এই সীমার যেকোনো বয়সের বলে ধরে নেয়। গতকাল অধ্যাপকের সম্পর্কে এমন কিছু বলেছিলাম, যা অহংকার বলে মনে হতে পারে। ছি! ওটা কিছুই নয়। শুধু ঈর্ষা। আজই প্রথম সত্যিকার অর্থে তার বিরুদ্ধে আমার কিছু আছে—কারণ তিনি তোমাকে বাইনডিং পড়তে বলেছেন। তার কাজ সম্পর্কে আমি খুব কম জানি। কিন্তু যতটুকু পড়েছি, একটি লাইনও আমার কাছে সত্য বলে মনে হয়নি। সবকিছুই অতিরঞ্জিত, কৃত্রিম।
আর সেই মানুষটি তোমার স্বপ্নে ঢুকে পড়ছে! এখন খুব দ্রুত কয়েকটি প্রশ্ন। তুমি চলন্ত ট্রাম থেকে লাফিয়ে নামো কেন?পরেরবার চেষ্টা করলে আমার আতঙ্কিত মুখটি যেন তোমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আর চোখের ডাক্তার? তোমার মাথাব্যথা?
তোমার পরের চিঠি যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে শুরু না হয়, আমি সেটি পড়ব না।
তোমার
ফ্রানৎস কে.


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









