পোটেমকিনের কথা দিয়ে শুরু করা যাক। কথিত আছে, রুশ রাষ্ট্রনায়ক পোটেমকিন নিয়মিত গভীর বিষণ্নতায় ডুবে যেতেন। সেই সময় তার ঘরে কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। একবার এমন একটি অবস্থা এত দীর্ঘ হলো যে সরকারি দপ্তরে কাগজপত্রের স্তূপ জমে গেল। সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিন সইয়ের জন্য তাগাদা দিচ্ছেন, অথচ পোটেমকিন কারও সঙ্গে দেখা করছেন না।
একদিন শুয়ালকিন নামের এক সামান্য কেরানি রাজপ্রাসাদের অপেক্ষাকক্ষে এসে কর্মকর্তাদের অসহায় অবস্থায় দেখল। সে বলল, কাগজগুলো তাকে দেওয়া হোক। কেউ বাধা দিল না। কাগজের গুচ্ছ হাতে নিয়ে সে পোটেমকিনের ঘরে ঢুকে পড়ল। ঘর অন্ধকার। পোটেমকিন বিছানায় বসে আছেন, পরনে জীর্ণ রাতের পোশাক, দাঁত দিয়ে নখ কাটছেন। শুয়ালকিন কোনো কথা না বলে কলমে কালি ডুবিয়ে তার হাতে দিল এবং একটি কাগজ হাঁটুর ওপর রাখল। পোটেমকিন শূন্য চোখে তার দিকে তাকালেন। তারপর যেন ঘুমের মধ্যে একটির পর একটি কাগজে সই করতে লাগলেন। সবশেষে শুয়ালকিন কাগজগুলো নিয়ে ফিরে এল।
কর্মকর্তারা ছুটে এসে কাগজগুলো পরীক্ষা করলেন। তারপর নীরবতা। প্রতিটি কাগজে একই স্বাক্ষর— শুয়ালকিন।
এই গল্পটি যেন কাফকার জন্মের বহু আগে লেখা একটি কাফকাসুলভ গল্প। এর দপ্তর, অন্ধকার ঘর, কাগজ, স্বাক্ষর, ক্ষমতার নাগালের বাইরে থাকা মানুষ—সবই কাফকার জগতের উপাদান। শুয়ালকিন যেন কাফকার কে.—যে মানুষ সবকিছু সহজ করে নিতে চায় এবং শেষ পর্যন্ত নিজের হাতেই নিজের অসহায়তার প্রমাণ বহন করে ফিরে আসে। আর পোটেমকিন সেইসব অদৃশ্য ক্ষমতাধর মানুষের পূর্বপুরুষ, যারা কাফকার উপন্যাসে কখনো দুর্গের কক্ষে, কখনো আদালতের ওপরতলায়, কখনো কোনো অজানা দপ্তরের অন্তরালে বসে থাকে।
কাফকার ক্ষমতাবান মানুষগুলো অদ্ভুতভাবে দুর্বল। তারা যেন ক্ষমতার চূড়ায় থেকেও ভেঙে পড়ছে। তাদের শরীর ক্লান্ত, পোশাক ময়লা, ঘর অন্ধকার। তবু তাদের একটি অঙ্গভঙ্গি, একটি নির্দেশ, একটি স্বাক্ষর—অন্য মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
কেন তারা এমন?
হয়তো কারণ তাদের কাঁধে পৃথিবীর কোনো দৃশ্যমান গোলক নেই; আছে সাধারণ জিনিসের অসহনীয় ভার। কাফকার মানুষ একটি ছোট কাজও যেন এমন এক ইতিহাসের মধ্যে করে, যার শুরু সে জানে না এবং শেষও দেখতে পায় না। জর্জ লুকাচ বলেছিলেন, আজকাল একটি ভালো টেবিল বানাতেও মানুষের মিকেলাঞ্জেলোর স্থাপত্যবোধ দরকার। কাফকা যেন এর চেয়েও দূরে যান। তাঁর কাছে একটি দেয়াল সাদা করার কাজও যুগের পর যুগ সরিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা। তার চরিত্ররা তাই ধীরে ধীরে ওঠে, নামে, ঝুঁকে পড়ে, আবার উঠে দাঁড়ায়। তাদের অঙ্গভঙ্গি কখনো বাস্তবতার তুলনায় অতিরিক্ত বড়। একটি হাত যেন বাষ্পচালিত হাতুড়ি। একটি মাথা এত নিচু যে চোখ দেখা যায় না। একটি দরজার ঘণ্টা এত জোরে বাজে যে তার শব্দ শহর পেরিয়ে আকাশে উঠে যায়। কাফকার জগতে অঙ্গভঙ্গি কেবল অঙ্গভঙ্গি নয়। সেটি একটি ঘটনা।
পিতা, আদালত ও অপরাধ
কাফকার পিতার চরিত্রগুলো এবং তাঁর দপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে অদ্ভুত মিল আছে। উভয়েই ভারী, ক্লান্ত, নোংরা এবং বিচার করার ক্ষমতাসম্পন্ন। পিতা একই সঙ্গে অভিযুক্তকারী ও বিচারক। সন্তান তার সামনে অপরাধী হয়ে জন্মায়।
‘দ্য জাজমেন্ট’-এ পিতা হঠাৎ বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ান। যে বৃদ্ধকে ছেলে একটু আগে শুইয়ে দিয়েছে, সে কম্বলের ভার ছুড়ে ফেলে এমন শক্তিতে উঠে দাঁড়ায় যে মনে হয় তার শরীরের সঙ্গে অন্য কোনো শক্তিও জেগে উঠেছে। তারপর সে ছেলেকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
এখানে পিতার শরীর যেন ইতিহাসের শরীর। সে শুধু নিজের কম্বল সরায় না; সরিয়ে ফেলে এক পুরোনো ভার। পিতা-পুত্রের সম্পর্ক তখন ব্যক্তিগত থাকে না। তা হয়ে ওঠে উত্তরাধিকার, অপরাধ ও বিচারের এক দীর্ঘ ইতিহাস।
কাফকার আদালতও একইভাবে কাজ করে। আইন আছে, কিন্তু আইন দেখা যায় না। বই আছে, কিন্তু সেগুলো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ‘দ্য ট্রায়াল’-এর কে. বুঝতে পারে, মানুষকে শুধু অপরাধী অবস্থায় নয়, অজ্ঞ অবস্থাতেও দণ্ড দেওয়া যায়। এখানে অপরাধের চেয়েও ভয়াবহ হলো—কী অপরাধ, তা জানা যায় না।
কাফকার আইনের জগৎ তাই প্রাগৈতিহাসিক। লিখিত আইন সভ্যতার একটি বিজয়; কিন্তু কাফকার জগতে আইন আবার গোপন হয়ে সেই প্রাচীন অন্ধকারে ফিরে যায়। মানুষ এমন একটি নিয়ম ভঙ্গ করতে পারে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। তবু শাস্তি অবধারিত। এই কারণেই কাফকার আদালত এবং তার পরিবার পরস্পরের কাছাকাছি। উভয় ক্ষেত্রেই মানুষ অপরাধী হয়ে জন্মায়। উভয় ক্ষেত্রেই বিচারকের মুখ অস্পষ্ট। এবং উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতা নিজেকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন বোধ করে না।
সৌন্দর্য কোথায়?
কাফকার জগতে সুন্দর মানুষ খুব কম। বরং সৌন্দর্য দেখা দেয় অভিযুক্তদের মধ্যে। ‘দ্য ট্রায়াল’-এ এমন একটি অদ্ভুত ধারণা আছে—অভিযোগ যেন মানুষের মুখে সৌন্দর্য এনে দেয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কাফকার পৃথিবীতে সৌন্দর্য কোনো পুরস্কার নয়। তা আসে বিপদের কাছ থেকে। যে মানুষটি বিচারের অপেক্ষায়, যে মানুষটি জানে না তার অপরাধ কী, তার মুখেই যেন মানুষের সবচেয়ে গভীর সম্ভাবনা ফুটে ওঠে।
ম্যাক্স ব্রডের স্মৃতিতে কাফকার একটি কথা আছে। পৃথিবী সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে কাফকা বলেছিলেন, পৃথিবী যেন ঈশ্বরের একটি খারাপ দিন। ব্রড আশার কথা তুললে কাফকা হেসে বলেছিলেন—আশা আছে, অসীম আশা আছে; ‘কিন্তু আমাদের জন্য নয়।’ এই বাক্যের মধ্যে কাফকার সমগ্র জগতের এক অদ্ভুত আলো আছে। আশা নেই—এ কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে, আশা আছে, কিন্তু মানুষ তার নাগালের মধ্যে নেই।
সহকারীরা
তবু কাফকার রচনায় কিছু মানুষ আছে যারা পুরোপুরি এই অন্ধকারের অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা হলো তাঁর ‘সহকারীরা’—অর্ধসমাপ্ত মানুষ, অদ্ভুত দূত, ছাত্র, বোকা, ভবঘুরে, এমন সব প্রাণী যারা কোনো একটি পরিচয়ে পুরোপুরি স্থির হতে পারে না।
তারা যেন এক জগত থেকে আরেক জগতে যাওয়ার বার্তাবাহক। তাদের শরীরও অসম্পূর্ণ। তারা নিজেদের যতটা সম্ভব ছোট করে ফেলে। অন্ধকার কোণে দুই বৃদ্ধার স্কার্টের ওপর বসে তারা হাত-পা গুটিয়ে একটি বলের মতো হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে কিছু শিশুসুলভ, কিছু হাস্যকর, কিছু নির্বোধ। কিন্তু সম্ভবত কাফকার পৃথিবীতে আশার সবচেয়ে কাছের জিনিস তারাই। কারণ তাদের কোনো স্থির পরিচয় নেই। কাফকার মানুষ হয় ওঠে, নয় পড়ে। কেউ সম্পূর্ণ নয়। কেউ পরিণত নয়। কেউ শেষ হয়ে যায়নি, আবার কেউ শুরু করেও শেষ করতে পারেনি। এই অসম্পূর্ণতাই তাদের একমাত্র মুক্তির সম্ভাবনা।
কাফকার পৃথিবী একটি মঞ্চ
কাফকার রচনা পড়লে বারবার মনে হয়, পৃথিবী যেন একটি বিশাল মঞ্চ। মানুষ সেখানে নিজের ভূমিকাই অভিনয় করে, অথচ জানে না নাটকটির নাম কী। ‘আমেরিকা’-র শেষে ওকলাহোমার ন্যাচার থিয়েটার সবাইকে গ্রহণ করে। সেখানে অভিনয় করার যোগ্যতা প্রায় কোনো বিষয়ই নয়। প্রত্যেককে শুধু নিজের ভূমিকাটি পালন করতে হবে। এখানে ‘নিজের ভূমিকা’ এবং ‘নিজের জীবন’ এক হয়ে যায়।
কাফকার চরিত্ররা তাই অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নিজেদের প্রকাশ করে। তাঁর গল্পে একটি হাত তোলা, মাথা নোয়ানো, কাগজ এগিয়ে দেওয়া, দরজার দিকে হাঁটা—এসব কখনোই নিছক দৈনন্দিন আচরণ নয়। প্রতিটি অঙ্গভঙ্গির মধ্যে একটি অদৃশ্য নাটক চলছে। এই কারণে কাফকার প্রাণীদের গল্পও মানুষের গল্প থেকে আলাদা নয়। বানর, কুকুর, ইঁদুর, গর্তে থাকা প্রাণী—তারা মানুষের ভাষা থেকে দূরে সরে গিয়ে মানুষের আচরণকে আরও স্পষ্ট করে। কাফকা মানুষের অঙ্গভঙ্গি থেকে তার সামাজিক ব্যাখ্যাগুলো সরিয়ে দেন। তারপর সেটিকে আমাদের সামনে রেখে দেন। আমরা তাকিয়ে থাকি। অর্থ খুঁজতে থাকি। কিন্তু অর্থ পুরোপুরি ধরা দেয় না।
উপকথা, কিন্তু কোনো শিক্ষা নেই
‘দ্য ট্রায়াল’-এর ‘বিফোর দ্য ল’ বা ‘আইনের সামনে’ গল্পটি এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ। একজন মানুষ আইনের দরজায় এসে দাঁড়ায়। দরজারক্ষী তাকে প্রবেশ করতে দেয় না। সে সারা জীবন অপেক্ষা করে। মৃত্যুর আগে জানতে পারে, দরজাটি কেবল তার জন্যই ছিল। এই গল্পের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কাফকা নিজেই আরেকটি গল্পের মধ্যে সেটিকে খুলে দেন। কিন্তু তা ব্যাখ্যা করার সঙ্গে সঙ্গে আরও রহস্য তৈরি হয়।
কাফকার উপকথা তাই ফুলের মতো খুলে যায়। একটি কুঁড়ি যেমন পাপড়ি মেলে, তেমন। কিন্তু কাগজ ভাঁজ খুলে সমতল করে দেওয়ার মতো নয়। তার অর্থ যত খোলা হয়, তত নতুন স্তর তৈরি হয়। এই কারণেই তার গল্পের সঙ্গে কবিতার সম্পর্ক আছে। এগুলো কোনো নির্দিষ্ট নৈতিক শিক্ষা দেয় না। বরং এমন একটি অনুপস্থিত শিক্ষার দিকে ইঙ্গিত করে, যার অস্তিত্ব আমরা অনুভব করি, কিন্তু ধরতে পারি না। কাফকার লেখার বড় প্রশ্ন হয়তো এখানেই— ‘মানুষ কীভাবে এমন একটি পৃথিবীতে বাঁচে, যার নিয়ম তার কাছে অদৃশ্য?’
সংগঠনই ভাগ্য
কাফকার কাছে সংগঠন নিজেই এক ধরনের ভাগ্য। ‘দ্য ট্রায়াল’ ও ‘দ্য ক্যাসল’-এর দপ্তর, আদালত, কর্মচারী—সবই একটি বিশাল ব্যবস্থার অংশ। কিন্তু ব্যবস্থাটি এত বড় যে কেউ জানে না তার উদ্দেশ্য কী। ‘দ্য গ্রেট ওয়াল অব চায়না’-তে এই ধারণা আরও স্পষ্ট। প্রাচীর নির্মাণে অসংখ্য মানুষ কাজ করছে। প্রত্যেকেই নিজের ছোট কাজটি করে, কিন্তু সম্পূর্ণ পরিকল্পনা কারও কাছে স্পষ্ট নয়। একজন সাধারণ শ্রমিক জানে না তার শ্রম কোথায় গিয়ে যুক্ত হবে। এখানেই সংগঠন ভাগ্যের মতো হয়ে ওঠে। মানুষ এমন এক ব্যবস্থার অংশ, যার প্রয়োজন সে বোঝে না, কিন্তু যার বাইরে সে নিজেকে কল্পনাও করতে পারে না। কাফকা এই রহস্যকে সমাধান করেননি। বরং তার মধ্যে বাস করেছেন। তিনি জানতেন, মানুষ কোনো রহস্যের ব্যাখ্যা না পেয়েও তার অধীন হতে পারে। আইন, পরিবার, রাষ্ট্র, দপ্তর—সবই কখনো কখনো একই অদৃশ্য কাঠামোর রূপ।
ভুলে যাওয়া এবং স্মৃতি
কাফকার রচনায় ভুলে যাওয়া একটি গভীর শক্তি। ‘দ্য ট্রায়াল’-এর আসল নায়ক যেন অপরাধী কে., এমনকি আদালতও নয়—ভুলে যাওয়া। মানুষ যা ভুলে যায়, তা কখনো পুরোপুরি অদৃশ্য হয় না। তা অন্য কিছুর সঙ্গে মিশে নতুন রূপ নেয়। অতীত, অপরাধ, পরিবার, ধর্ম, আইন—সবই সেই বিস্মৃতির মধ্যে থেকে ফিরে আসে।
এই কারণেই কাফকার প্রাণীরা এত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যেন মানুষের ভুলে যাওয়া অংশের ধারক। ওড্রাডেক, সেই অদ্ভুত তারার মতো প্রাণী, ঘরের চিলেকোঠা, সিঁড়ি, করিডর ও বারান্দায় ঘুরে বেড়ায়। সে কোনো পরিচিত বস্তু নয়, আবার পুরোপুরি প্রাণীও নয়। ওড্রাডেক হলো বিস্মৃত জিনিসের রূপ। চিলেকোঠায় পড়ে থাকা পুরোনো বস্তু যেমন আমাদের অতীতের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেয়, তেমনি কাফকার প্রাণীরা মানুষের সেই অংশের সামনে দাঁড়ায়, যা মানুষ নিজেই ভুলে গেছে।
কুঁজো মানুষ
কাফকার পৃথিবীতে কুঁজো মানুষ বারবার ফিরে আসে। মাথা বুকের ওপর ঝুঁকে আছে। শরীর ভারে নত। যেন মানুষ নিজের অতীত, অপরাধ ও বিস্মৃতির ভার বহন করছে। জার্মান ও ইহুদি লোককথার ‘লিটল হাঞ্চব্যাক’-এর সেই ছোট মানুষটির কথা মনে পড়ে। সে ঘরে ঢুকে পড়ে, হাসে, তারপর শিশুটিকে বলে—আমার জন্যও প্রার্থনা করো। কাফকার গভীরতম জায়গায় এই লোককথার মাটি আছে। সেখানে দর্শনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মনোযোগ। ম্যালব্রঁশ যাকে বলেছিলেন আত্মার স্বাভাবিক প্রার্থনা—‘অ্যাটেনটিভনেস’, অর্থাৎ গভীরভাবে লক্ষ্য করা। কাফকা তাকান। মানুষের দিকে, প্রাণীর দিকে, ময়লা দপ্তরের দিকে, আদালতের দিকে, পরিবারের দিকে, ভুলে যাওয়া জিনিসের দিকে। তার দৃষ্টি সরে যায় না।
সাঞ্চো পাঞ্জা
এক হাসিদিক গল্পে এক ভিখারি তার একমাত্র ইচ্ছার কথা বলে। সে যদি শক্তিশালী রাজা হতো, একদিন শত্রু তার রাজ্য দখল করত, তাকে ঘুম থেকে উঠে পালাতে হতো, পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে শেষে সে ফিরে আসত সেই একই বেঞ্চের কোণে—যেখানে এখন বসে আছে।
কেউ জিজ্ঞেস করে, তাহলে লাভ কী? ভিখারি উত্তর দেয়—‘আমার অন্তত একটা জামা থাকত।’ কাফকার পৃথিবী এমনই। জীবন কখনো এত দীর্ঘ যে একটি গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছানো যায় না; আবার এত সংক্ষিপ্ত যে একটি ইচ্ছাও পূরণ করার সময় থাকে না। এই অসম্ভব দূরত্বের মধ্যেই তার চরিত্ররা হাঁটে।
বুসেফালুস ও সাঞ্চো
কাফকার ‘নিউ অ্যাটর্নি’ গল্পের বুসেফালুস আলেকজান্ডারের ঘোড়া ছিল। এখন তার পিঠে কোনো আরোহী নেই। যুদ্ধের শব্দ থেকে দূরে, শান্ত আলোয় বসে সে পুরোনো আইনবই পড়ছে।
এটি হয়তো কাফকার সবচেয়ে সুন্দর প্রত্যাবর্তনের দৃশ্য। ঘোড়া এগিয়ে যাচ্ছে না। সে ফিরে যাচ্ছে। আলেকজান্ডার নেই। বিজয়ের ভার নেই। কেবল পড়া আছে। আইন এখন আর প্রয়োগের বিষয় নয়; তা অধ্যয়নের বিষয়। ন্যায়বিচারের দরজা হয়তো ক্ষমতার হাতে নয়, শেখার মধ্যে।
কিন্তু কাফকা এখানেও কোনো প্রতিশ্রুতি দেন না। তার ছাত্ররা এমন এক পবিত্র গ্রন্থ হারিয়েছে যার ওপর ভর করে তারা এগোতে পারত। তাঁর সহকারীরা এমন এক উপাসনালয় হারিয়েছে যেখানে তারা ফিরে যেতে পারত। তবু তারা পড়ে। অপেক্ষা করে। শেখে। হয়তো এটাই কাফকার ক্ষীণতম আশা।
সাঞ্চো পাঞ্জার শেষ শিক্ষা
শেষে সাঞ্চো পাঞ্জার কাছে ফিরে আসা যাক। কাফকার ছোট্ট এক লেখায় সাঞ্চো পাঞ্জা বহু বছর ধরে নানা রোমাঞ্চকর গল্প শুনিয়ে নিজের ভেতরের দানবকে—ডন কিহোতেকে—বশে রাখে। তারপর ডন কিহোতে নিজের মতো করে উন্মত্ত সব অভিযান চালায়। সাঞ্চো তাকে অনুসরণ করে, কিছুটা দায়িত্ববোধে, কিছুটা বিনোদনের জন্য।
দুজনের কেউই আর পুরোপুরি মুক্ত নয়। কিন্তু সাঞ্চো তার আরোহীকে নিজের পিঠ থেকে নামিয়ে দিয়েছে। বুসেফালুসও তার আরোহীকে হারিয়েছে। এখানে মানুষ বা ঘোড়া—কে তা আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘পিঠের ভারটি সরে গেছে কি না’। কাফকার রচনায় মুক্তি কোনো বিজয় নয়। কোনো দরজা খুলে যাওয়া নয়। কোনো ঈশ্বরের করুণা নেমে আসাও নয়। মুক্তি কখনো কখনো শুধু এইটুকু—যে ভারটি এতদিন আমাদের চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, এক মুহূর্তের জন্য তা আর আমাদের ওপর নেই। কাফকা সেই মুহূর্তের লেখক। তার পৃথিবী অন্ধকার, কিন্তু নিস্তব্ধ নয়। সেখানে কাগজে স্বাক্ষর পড়ে, দরজা বন্ধ হয়, আদালত অপেক্ষা করে, প্রাণীরা কথা বলে, ছাত্ররা রাত জেগে পড়ে, ঘোড়া পুরোনো বই খুলে বসে। আর মানুষ—নিজের অপরাধ না জেনেও—চলতে থাকে।
সম্ভবত কাফকার সবচেয়ে গভীর সত্য এখানেই: আমরা যে পৃথিবীকে বুঝতে পারি না, তার অর্থ এই নয় যে আমরা তার বাইরে আছি। বরং আমরা তারই অঙ্গ। আর সাহিত্য হয়তো সেই অদৃশ্য ব্যবস্থার মানচিত্র নয়; তার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকার এক অসাধারণ, নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ।
‘ইলুমিনেশনস’ ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের প্রবন্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম মৌলিক ও প্রভাবশালী চিন্তাবিদ। এই গ্রন্থে তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘দ্য ওয়ার্ক অব আর্ট ইন দি এইজ অব মেকানিক্যাল রিপ্রোডাকশন’, ‘দ্য টাস্ক অব দ্য ট্রান্সলেটর’ এবং ‘ থিসিজ অন দ্য ফিলসফি অব হিস্ট্রি’-এর পাশাপাশি কাফকা, বোদলেয়ার, প্রুস্ত এবং ব্রেখটের এপিক থিয়েটার নিয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলোও রয়েছে। হান্না আরেন্ট এই প্রবন্ধগুলো নির্বাচন ও সম্পাদনা করে গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছেন। দৈনিক এদিন অনলাইন সেই বই থেকে কফকা নিয়ে লেখা ‘কাফকা: ল, গিল্ট, অ্যান্ড দ্য ইমপসিবিলিটি অব লিবারেশন’ প্রবন্ধটি বাংলাভাষী পাঠকের জন্য ভাষান্তর করল।

পরিচিতি
ওয়াল্টার বেঞ্জামিন (১৮৯২–১৯৪০) ছিলেন জার্মান দার্শনিক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যসমালোচক ও সংস্কৃতিচিন্তক। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম মৌলিক চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি দর্শন, সাহিত্য, ইতিহাস ও শিল্প নিয়ে গভীর ও ব্যতিক্রমী চিন্তা রেখে গেছেন। ১৮৯২ সালের ১৫ জুলাই বার্লিনে এক সচ্ছল ইহুদি পরিবারে তার জন্ম। ছাত্রজীবন থেকেই দর্শন, সাহিত্য ও শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরে লেখালেখি ও গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। বেঞ্জামিনের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল আধুনিক সমাজ, শিল্প, প্রযুক্তি, ইতিহাস ও মানুষের অভিজ্ঞতা। তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘দ্য ওয়ার্ক অব আর্ট ইন দি এইজ অব মেকানিক্যাল রিপ্রোডাকশন’-এ তিনি দেখিয়েছেন, যন্ত্রের মাধ্যমে শিল্পকর্মের অসংখ্য অনুলিপি তৈরি হলে শিল্পের স্বাতন্ত্র্য ও মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক কীভাবে বদলে যায়। ইতিহাস ও স্মৃতি নিয়েও তার ভাবনা ছিল গভীর।
জার্মানিতে নাৎসিদের উত্থানের পর ইহুদি পরিচয়ের কারণে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্স থেকে পালানোর চেষ্টা করে ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বরে স্পেনের সীমান্তবর্তী শহর পোর্টবুতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তার চিন্তার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। আজও দর্শন, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতিচর্চায় বেঞ্জামিনের লেখা গভীরভাবে আলোচিত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









