স্টিভেন পিঙ্কারের নতুন বইটি পড়ার পর পৃথিবীকে দেখার আমার দৃষ্টিভঙ্গিই যেন একটু বদলে গেল। বইটি খুব শক্তিশালী একটি প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করায়—পৃথিবী কি সত্যিই দিন দিন খারাপ হচ্ছে, নাকি আমরা তা সেভাবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি?
অনেক বছর ধরে আমি বলে আসছি, গত এক দশকে পড়া বইগুলোর মধ্যে স্টিভেন পিঙ্কারের ‘দ্য বেটার এঞ্জেলস অব আওয়ার নেচার’ আমার সবচেয়ে প্রিয়। কাউকে যদি মাত্র একটি বই পড়তে বলার সুযোগ দেওয়া হয়, আমি প্রায়ই এই বইটির কথাই বলেছি। পিঙ্কার বিপুল পরিমাণ তথ্য ও গবেষণা ব্যবহার করে দেখিয়েছেন, মানব ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলায় সহিংসতা কীভাবে কমেছে এবং কেন আমরা ইতিহাসের তুলনায় এখন তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ সময়ে বাস করছি। মানুষের অগ্রগতির এত পরিষ্কার ব্যাখ্যা এর আগে খুব কমই পড়েছি।
এখন অবশ্য ‘বেটার এঞ্জেলস’-এর এত প্রশংসা করা আমাকে বন্ধ করতে হবে। কারণ পিঙ্কার নিজেকেই ছাড়িয়ে গেছেন।
তার নতুন বই ‘এনলাইটেনমেন্ট নাউ’ আমার কাছে আরও ভালো লেগেছে। ‘বেটার এঞ্জেলস’-এ তিনি ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ের সহিংসতা বিশ্লেষণ করেছিলেন। নতুন বইয়ে সেই একই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন আরও অনেক বিস্তৃত ক্ষেত্রে—জীবনযাত্রার মান, স্বাস্থ্য, জ্ঞান, নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি থেকে শুরু করে মানব অগ্রগতির মোট ১৫টি সূচক নিয়ে। ফলে শুধু পৃথিবী কীভাবে বদলেছে তা নয়, কেন বদলেছে—তার একটি সামগ্রিক ছবি পাওয়া যায়।
এক কথায় বললে, এটি ‘বেটার এঞ্জেলস’-এর আরও বড় পরিসরের সংস্করণ।
বইটি প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ আগেই পিঙ্কার আমাকে একটি কপি পাঠিয়েছিলেন। বইটি এত ভালো লেগেছিল যে আমি ইচ্ছে করেই ধীরে ধীরে পড়েছি। তবে অধিকাংশ পাঠকের কাছে এটি বেশ সহজ ও দ্রুতপাঠ্য মনে হবে। এত বিপুল তথ্য তিনি এমনভাবে সাজিয়েছেন যে পড়তে গিয়ে মনে হয়, কেউ যেন কঠিন কোনো গবেষণার ফলাফল নয়, বরং খুব পরিচিত একটি গল্প বলছেন—যে গল্পের প্রতিটি বাঁকে নতুন কিছু জানার আছে।

বইটির শুরু আলোকায়ন যুগের কিছু মৌলিক আদর্শের পক্ষে যুক্তি দিয়ে। সেই সময় যুক্তি, বিজ্ঞান ও মানবতাবাদকে মানুষের অগ্রগতির প্রধান শক্তি হিসেবে দেখা হয়েছিল। এসব মূল্যবোধের আরও বেশি চর্চা হওয়া দরকার—এ বিষয়ে আমার দ্বিমত নেই। কিন্তু বইটির যে অংশটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে, তা হলো পরের ১৫টি অধ্যায়, যেখানে পিঙ্কার একে একে মানব অগ্রগতির বিভিন্ন দিকের দিকে তাকিয়েছেন।
তথ্য ও ইতিহাসকে পাশাপাশি রেখে অতীতকে নতুনভাবে দেখানোতেই পিঙ্কারের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁর দেওয়া অনেক তথ্য আমার আগে থেকেই জানা ছিল—বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও জ্বালানি বিষয়ে। কিন্তু প্রতিটি বিষয় তিনি এত গভীরভাবে বোঝেন যে পরিচিত তথ্যও তাঁর ব্যাখ্যায় নতুন অর্থ পায়।
আরেকটি বিষয় আমার বিশেষ ভালো লেগেছে। পিঙ্কার শুধু বড় বড় পরিবর্তনের দিকে তাকাননি। তিনি মূল তথ্যসূত্রে গিয়ে এমন কিছু ছোট পরিবর্তন খুঁজে বের করেছেন, যেগুলো প্রথম দেখায় হয়তো খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। কিন্তু সেগুলো একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, মানুষের জীবন কতটা বদলেছে।
আমি সাধারণত দারিদ্র্য কমে যাওয়া বা শিশুমৃত্যুর নাটকীয় হ্রাসের মতো বিষয়কে অগ্রগতির বড় সূচক হিসেবে দেখি। পিঙ্কারও সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। কিন্তু তাঁর বইয়ে আরও কিছু মজার তথ্য আছে।
‘প্রথমত, বজ্রপাতে মৃত্যুর সম্ভাবনা।’ আজ একজন মানুষের বজ্রপাতে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা শতাব্দীর শুরুর সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৭ গুণ কম। এর কারণ এই নয় যে এখন আকাশে বজ্রঝড় কম হয়। আমরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনেক ভালোভাবে দিতে পারি, মানুষকে নিরাপত্তা সম্পর্কে বেশি জানাতে পারি এবং আগের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ শহরে বাস করে।
‘দ্বিতীয়ত, কাপড় ধোয়ার সময়।’ ১৯২০ সালে একজন মানুষকে সপ্তাহে গড়ে প্রায় সাড়ে ১১ ঘণ্টা কাপড় ধোয়ার কাজে ব্যয় করতে হতো। ২০১৪ সালে সেই সময় কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র দেড় ঘণ্টার মতো। শুনতে খুব সাধারণ একটি বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু ওয়াশিং মেশিনের মতো প্রযুক্তি মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন এনেছে, এটি তার একটি ভালো উদাহরণ। বিশেষ করে নারীদের জন্য এটি সপ্তাহে প্রায় অর্ধেক দিনের সমান সময় ফিরিয়ে দিয়েছে। সেই সময় কেউ বই পড়তে পারেন, নতুন কিছু শিখতে পারেন, পরিবারকে দিতে পারেন, বিশ্রাম নিতে পারেন—অথবা চাইলে নতুন একটি ব্যবসাও শুরু করতে পারেন।
‘তৃতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি।’ যুক্তরাষ্ট্রে এখন প্রতি বছর কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় প্রায় ৫ হাজার মানুষ মারা যান। সংখ্যাটি ভয়াবহ। কিন্তু ১৯২৯ সালে, যখন দেশটির জনসংখ্যা আজকের তুলনায় অর্ধেকেরও কম ছিল, কর্মক্ষেত্রে প্রায় ২০ হাজার মানুষ মারা যেতেন। তখন অনেকেই এটিকে ব্যবসার স্বাভাবিক খরচ হিসেবে মেনে নিতেন। এখন আমরা জানি, মানুষের জীবনকে এভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা অপরিহার্য নয়। প্রযুক্তি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতি আমাদের এমনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে, যাতে একই কাজ করতে গিয়ে এত মানুষের জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে।
‘চতুর্থত, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা।’ পিঙ্কার লিখেছেন, বিশ্বে গড় আইকিউ প্রতি দশকে প্রায় তিন পয়েন্ট করে বাড়ছে। উন্নত পুষ্টি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং শিক্ষায় বিশ্লেষণী চিন্তার বেশি ব্যবহার এর পেছনে ভূমিকা রাখছে। একটু ভেবে দেখুন—প্রতিদিন ফোনের পর্দায় কত প্রতীক আমরা বুঝি, কত সংকেত পড়ি, কত মানচিত্র দেখি, কত তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজি। আমাদের চারপাশের পৃথিবী ছোটবেলা থেকেই বিমূর্তভাবে চিন্তা করার অভ্যাস তৈরি করছে। এরও প্রভাব আছে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে।
‘পঞ্চমত, যুদ্ধের ব্যাপারে পৃথিবীর ধারণা বদলেছে।’ একসময় একটি দেশ অন্য দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে তাকে থামানোর মতো কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। অবশ্য যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায়নি, ব্যতিক্রমও আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ এবং বিভিন্ন ধরনের হস্তক্ষেপ রাষ্ট্রগুলোর জন্য যুদ্ধ শুরু করার খরচ বাড়িয়েছে। যুদ্ধ যে কেবল কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনেরও বিষয়—এই ধারণাটি নিজেই মানব ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন।
পিঙ্কার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন। বাস্তব অগ্রগতি যদি এতটাই স্পষ্ট হয়, তাহলে আমাদের মনে হয় কেন পৃথিবী ক্রমেই খারাপ হয়ে যাচ্ছে?
এই প্রশ্নটি আমাকেও অনেক ভাবিয়েছে। পৃথিবীর মানুষ আগের তুলনায় দীর্ঘজীবী হচ্ছে, স্বাস্থ্যকর জীবন পাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি নিরাপদ ও সমৃদ্ধভাবে বেঁচে আছে। তবু আমরা খারাপ খবরের দিকে বেশি তাকাই। ভালো খবর অনেক সময় আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।
পিঙ্কার ব্যাখ্যা করেছেন, মানুষের মন কেন নেতিবাচক খবরের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয় এবং কীভাবে সেই প্রবণতা পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে প্রভাবিত করে। এখানে আমি অবশ্য আরও বিস্তারিত মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আশা করেছিলাম। মনোবিজ্ঞানী হিসেবে পিঙ্কারের এই জায়গায় আরও গভীরে যাওয়ার সুযোগ ছিল। হ্যান্স রসলিংয়ের ‘ফ্যাক্টফুলনেস’ বইটি এই প্রশ্নের আরেকটি চমৎকার ব্যাখ্যা দেয়।
পিঙ্কারের সঙ্গে বেশির ভাগ বিষয়ে আমি একমত। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আমার কাছে একটু বেশি আশাবাদী মনে হয়েছেন। মানুষের তৈরি রোবট একদিন মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে—এ ধরনের ‘টার্মিনেটর’ কাহিনি আমি খুব একটা বিশ্বাস করি না। কিন্তু তার চেয়েও বাস্তব একটি প্রশ্ন আছে: ‘রোবট বা এআইকে নিয়ন্ত্রণ করবে কে?’
এই প্রশ্নটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এআই এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি যেখানে এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের প্রতিদিনের জীবনে বড় হয়ে উঠবে। কিন্তু একদিন এমন সময় আসতে পারে, যখন কোন দেশ, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি এআইয়ের ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখে—তা বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে। অটোমেশন নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন আছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করতে পারে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। আবার একই সময়ে কাজের ধরন বদলে দিতে পারে, কিছু মানুষকে নতুন দক্ষতা অর্জনে বাধ্য করতে পারে এবং ক্ষমতার ভারসাম্যও পাল্টে দিতে পারে।
তাই অগ্রগতি সব সময় সরল রেখায় এগোয় না। এর মধ্যে জটিলতা আছে, অনিশ্চয়তা আছে, কখনো কখনো অস্বস্তিও আছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমরা ভুল দিকে এগোচ্ছি। ‘এনলাইটেনমেন্ট নাউ’-এর শেষ দিকে পিঙ্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন: আমরা কখনোই একটি নিখুঁত পৃথিবী তৈরি করতে পারব না, আর সেই নিখুঁত পৃথিবী তৈরির চেষ্টা বিপজ্জনকও হতে পারে। কিন্তু মানুষের কল্যাণ বাড়ানোর জন্য জ্ঞানকে কাজে লাগাতে থাকলে উন্নতির কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই।
এই কথাটিই বইটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা বলে আমার মনে হয়েছে। পৃথিবী নিখুঁত নয়। হয়তো কখনো হবে না। আমাদের সামনে যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈষম্য, প্রযুক্তির ঝুঁকি এবং আরও অনেক বড় সমস্যা আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে মানুষ বহু সমস্যার সমাধান করেছে, যেগুলো একসময় অসম্ভব মনে হতো।
কখনো কখনো পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে—এই সত্যটি অনুভব করা কঠিন। খবরের কাগজ বা ফোনের পর্দায় আমরা যে পৃথিবী দেখি, সেখানে প্রতিদিন নতুন সংকট হাজির হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের দিকে তাকালে ছবিটি বদলে যায়। তখন দেখা যায়, কোটি কোটি মানুষের জীবন এমনভাবে বদলেছে, যা এক শতাব্দী আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল।
এই বড় ছবিটি দেখতে আমাদের সাহায্য করেন স্টিভেন পিঙ্কারের মতো চিন্তকেরা। ‘এনলাইটেনমেন্ট নাউ’ শুধু পিঙ্কারের লেখা সেরা বইগুলোর একটি নয়। আমার কাছে এটি এখন পর্যন্ত পড়া সবচেয়ে প্রিয় বই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









