হোমারের ‘ইলিয়াড’ ও ‘দ্য ওডিসি’ প্রায় ২৮০০ বছরের পুরোনো। ব্লেক স্নাইডারের ‘সেভ দ্য ক্যাট!’ প্রকাশিত হয়েছে ২০০৫ সালে। ড্যান হারমনের ‘স্টোরি সার্কেল’ আরও সাম্প্রতিক। তবু এই তিনটির নিচে একই নকশা দেখা যায়: মানুষ পরিচিত জগৎ ছেড়ে যায়, অজানার মুখোমুখি হয় এবং ফিরে আসে পরিবর্তিত হয়ে। হাজার হাজার বছর ধরে আমরা নতুন গল্প লিখেছি, কিন্তু গল্পের কিছু মৌলিক আকৃতি বদলায়নি। হয়তো আমরা গল্পের চেয়ে বেশি বদলেছি গল্পের পোশাক।
হোমারের নায়ক পৃথিবীর মধ্য দিয়ে যাত্রা করেন। রুমির ‘মসনবি’-তে যাত্রাটি অন্যরকম। তার শুরু একটি বাঁশির কণ্ঠে—নদীতীর থেকে বিচ্ছিন্ন, কেটে ফেলা, ফাঁপা করে দেওয়া একটি বাঁশ। তার শূন্যতার মধ্য দিয়ে বাতাস প্রবাহিত হলে জন্ম নেয় সুর। বিচ্ছেদই কণ্ঠের জন্ম দেয়।
ওডিসিউস ঘর ছেড়ে পৃথিবীকে আবিষ্কার করেন। রুমির বাঁশি বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে নিজের অর্থ খুঁজে নেয়। একটির যাত্রা ভূগোলের, অন্যটির চেতনার। কিন্তু দুটির কেন্দ্রেই আছে একই প্রশ্ন: ঘর কী? ‘দ্য ওডিসি’ ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষায় চালিত। ‘মসনবি’ জিজ্ঞেস করে, চলে যেতে হলো কেন। সম্ভবত এই দুই প্রশ্ন একই যাত্রার দুই দিক।
গল্প কেবল ঘটনা সাজায় না। গল্প স্মৃতি তৈরি করে এবং মানুষকে নিজের অভিজ্ঞতার মধ্যে অন্যের অভিজ্ঞতা বসাতে শেখায়। আদম ও হাওয়া শুধু অতীতের চরিত্র নয়; তারা প্রলোভনের মুখোমুখি মানুষের প্রতিরূপ। ওডিসিউস শুধু ইথাকার রাজা নন; তিনি দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ফিরে আসতে চাওয়া মানুষের প্রতিচ্ছবি। তাই এখানে গল্প যুক্তির চেয়ে ভিন্নভাবে কাজ করে। যুক্তি কোনো ধারণা বোঝায়; গল্প সেই ধারণার মধ্যে আমাদের বসবাস করায়। অ্যারিস্টটল ‘পোয়েটিক্স’-এ এই শক্তির কাঠামো বিশ্লেষণ করেছিলেন। কাহিনি, চরিত্র, বিপর্যয়, স্বীকৃতি, ক্যাথারসিস—গল্পের শরীরকে তিনি খুলে দেখেছিলেন। পরে ক্যাম্পবেল পুরাণের মধ্যে পুনরাবৃত্ত নকশা খুঁজলেন। লুকাস সেই নকশাকে ‘স্টার ওয়ার্স’-এ প্রযুক্তির যুগে পুনর্লিখলেন।
তলোয়ার বদলে গেল লাইটসেবারে, রাজ্য বদলে গেল গ্যালাক্সিতে। নায়ক বদলালেন না। এরপর গল্প আরও পদ্ধতিগত হলো। সিড ফিল্ড তিন অঙ্কে, স্নাইডার ১৫টি বিটে, হারমন আটটি ধাপে গল্পকে বিন্যস্ত করলেন। রবার্ট ম্যাকি গল্পকে দেখলেন শৃঙ্খলিত কারুশিল্প হিসেবে। রহস্য তখন পদ্ধতিতে পরিণত হলো। কিন্তু রহস্য হারিয়ে গেল না। শুধু তাকে মাপার উপায় তৈরি হলো।
হলিউড গল্পকে শিল্পে রূপ দিল। বিজ্ঞাপন তাকে বাজারের ভাষায় অনুবাদ করল। মানুষ বুঝল, সে শুধু পণ্য কেনে না; পণ্যের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য জীবনও কেনে। রাষ্ট্র, শহর, বাজার ও রাজনৈতিক আন্দোলনও নিজেদের গল্প তৈরি করে। গল্প তখন বিনোদন নয়; বাস্তবতা সংগঠনের একটি পদ্ধতি। ইন্টারনেট এসে এই পদ্ধতিকে বদলে দিল। একসময় গল্পের শত্রু ছিল বিস্মৃতি। এখন তার শত্রু প্রাচুর্য। পৃথিবীতে গল্পের অভাব নেই; অভাব মনোযোগের। এই কারণে ‘হুক’ নতুন কোনো আবিষ্কার নয়। হোমারের প্রথম পঙ্ক্তি, ‘মবি-ডিক’-এর ‘কল মি ইসমাইল’, রুমির বাঁশির আহ্বান—সবই পাঠককে গল্পের দরজায় দাঁড় করায়। নতুন হলো প্রতিযোগিতার মাত্রা। আজ একটি গল্পকে কেবল অন্য গল্পের সঙ্গে নয়, পরবর্তী হাজার গল্পের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হয়।
এই নতুন পরিবেশকে বলা যায় ডিজিটাল পোলিস। ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, পডকাস্ট—এগুলো আর শুধু মাধ্যম নয়; এগুলো এমন পরিবেশ, যার মধ্যে আমরা পরিচয় তৈরি করি এবং পৃথিবীকে বুঝি। এর শাসকেরা অ্যালগরিদম।অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দ দেখে, তারপর সেই পছন্দের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আমাদের সামনে হাজির করে। আমরা তাকে ব্যবহার করি; একই সঙ্গে সে আমাদের পরবর্তী ব্যবহারের ধরন তৈরি করে। এখানে গল্পকারের সঙ্গে মেশিনের একটি অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়। মানুষ গল্প বানায়। অ্যালগরিদম দেখে কোন গল্প মানুষকে ধরে রাখে। সেই তথ্য আবার নতুন গল্পের নকশাকে প্রভাবিত করে। কে কাকে লিখছে? এ প্রশ্নের উত্তর আর সরল নয়।

এআই এই সমস্যাটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। এআই একই গল্পের বহু সংস্করণ তৈরি করতে পারে, চরিত্র বদলাতে পারে, ভাষা বদলাতে পারে, পরিণতি পরীক্ষা করতে পারে। গল্পের উৎপাদন প্রায় সীমাহীন হয়ে উঠতে পারে।তখন প্রশ্নটি আর ‘এআই কি গল্প লিখতে পারে?’ নয়। প্রশ্ন হলো—গল্প যদি অসীম পরিমাণে তৈরি করা যায়, তাহলে কোন গল্পটি আমাদের কাছে পৌঁছাবে? ক্ষমতা তখন গল্পের ভেতর থেকে গল্পের পরিবেশে সরে যায়। গল্প কে লিখল—এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার আগে জানতে হবে, গল্পটি কে বেছে দিল। এখানেই ‘কগনিটিভ স্টোরিটেলিং’-এর ধারণা জরুরি। গল্প শুধু বিনোদন দেয় না; এটি মানুষের উপলব্ধি, স্মৃতি ও সমষ্টিগত বাস্তবতা সংগঠিত করে। রাষ্ট্র, বাজার, ধর্ম, রাজনৈতিক আন্দোলন—সবাই এই ক্ষমতা ব্যবহার করেছে। এআইও করবে। কিন্তু এআইয়ের বিশেষ ক্ষমতা হলো ব্যক্তিভেদে আলাদা গল্প তৈরি করা। একই পৃথিবীর জন্য হাজারটি সংস্করণ। তখন একটি পুরোনো প্রশ্ন নতুন রূপ নেয়— আমাদের যৌথ বাস্তবতা কোথায়?
এই কারণেই ওডিসিউস এখনও সমকালীন। তার সমস্যা জাহাজ বা সমুদ্র নয়। তার সমস্যা হলো অনিশ্চয়তা, প্রলোভন, পরিচয় এবং ফিরে এসে দেখা—ঘরও বদলেছে, নিজেও বদলেছে। আজকের সাইক্লপস হয়তো অ্যালগরিদম। সাইরেন হতে পারে নোটিফিকেশন। গোলকধাঁধা হতে পারে তথ্যের অসীম জাল। দানবের চেহারা বদলেছে। মানবিক আকাঙ্ক্ষা বদলায়নি। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। প্রাচীন নায়ক যাত্রা শেষে ফিরে আসতেন। আধুনিক মানুষ প্রায় কখনোই সম্পূর্ণ ফিরে আসে না। তার পেশা, পরিচয়, প্রযুক্তি ও সামাজিক বাস্তবতা ক্রমাগত বদলায়। পুরোনো গল্পের ছিল সমাপ্তি।আমাদের গল্পের আছে আপডেট। এই কারণেই সমকালীন সংস্কৃতি সমাপ্তির বদলে ধারাবাহিকতা পছন্দ করে। সিরিজ শেষ হয় না, পডকাস্ট চলতে থাকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবন একটি অসমাপ্ত গল্পে পরিণত হয়। আমরা যেন গল্পের মধ্যে বাস করছি, গল্পের শেষে নয়।
তাহলে এআইয়ের যুগে গল্পকার কে? সম্ভবত একজন মানুষ নয়। গল্পকার এখন মানুষ, মেশিন, অ্যালগরিদম, প্ল্যাটফর্ম এবং দর্শকের সমন্বয়ে তৈরি একটি ব্যবস্থা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি বিষয় বদলায়নি। মানুষ এখনও নিজের সম্পর্কে জানতে গল্পের কাছে ফিরে যায়। হোমারের ওডিসিউস, রুমির বাঁশি, আধুনিক চলচ্চিত্রের নায়ক এবং এআইয়ের তৈরি চরিত্র—তারা ভিন্ন যুগের সৃষ্টি। তবু প্রত্যেকের ভেতরে আছে একই পুরোনো আকাঙ্ক্ষা: বিচ্ছেদের অর্থ খুঁজে পাওয়া এবং কোনো এক ধরনের ঘরে ফিরে যাওয়া। আমরা গল্প লিখি পৃথিবীকে বোঝার জন্য। পরে আবিষ্কার করি, গল্পই আমাদের বোঝার পদ্ধতি তৈরি করেছে। হয়তো এআইয়ের যুগে গল্পকারের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এখানেই: আমরা আর শুধু গল্প লিখছি না; আমরা এমন যন্ত্র তৈরি করছি, যা আমাদের হয়ে গল্প বেছে নেবে, বদলাবে এবং নতুন গল্প তৈরি করবে।
গল্পের ভবিষ্যৎ তাই হয়তো মানুষের হাতে লেখা কোনো একক কাহিনি নয়। বরং অসংখ্য সম্ভাব্য কাহিনির এক গোলকধাঁধা। আর তার কেন্দ্রে এখনও সেই পুরোনো প্রশ্ন— আমি কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি, এবং ঘর বলে যে জায়গাটিকে মনে করি—সেটি কি সত্যিই কখনও ছিল?’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









