আট দশক পেরোনো এক লেখক ফিরে গেলেন তার প্রথম উপন্যাসের চরিত্রদের কাছে। স্পেনের প্রিমিও প্লানেতা পুরস্কারজয়ী নতুন বইয়ে আবার খুলে যাচ্ছে নির্বাসন, স্মৃতি, নির্যাতন ও ইতিহাসের দরজা। কিছু চরিত্র লেখকের কাছ থেকে বিদায় নেয় না। বই শেষ হয়, মলাট বন্ধ হয়, পাঠক অন্য বইয়ে চলে যান। কিন্তু চরিত্রগুলো থেকে যায়—কোনো অসমাপ্ত প্রশ্নের মতো। কয়েক দশক পর তারা আবার ফিরে আসে। জানতে চায়, তাদের জীবনে এরপর কী ঘটেছিল।
চিলীয়-মার্কিন লেখক ইসাবেল আলেন্দে, বয়স ৮৪, তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য হাউস অব দ্য স্পিরিটস’–এর চরিত্রদের কাছে ফিরে গেছেন এভাবেই। আর সেই প্রত্যাবর্তন তাকে এনে দিয়েছে স্পেনের প্রিমিও প্লানেতা পুরস্কার—এক মিলিয়ন ইউরো, যা বিশ্বের সবচেয়ে অর্থমূল্যবান সাহিত্য পুরস্কারগুলোর একটি।
বৃহস্পতিবার বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত পুরস্কারের ৭৫তম আসরে আলেন্দের হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়া হয়। তার পুরস্কারজয়ী উপন্যাসের নাম ‘লা ওরা আনতেস দেল আলবা’। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাসের প্রায় চার দশক পরের এই বইয়ে ফিরে এসেছে সেই পরিচিত চরিত্রেরা। তবে আয়েন্দে এবার পুরোনো গল্পের দরজা খুলেছেন নতুন এক অন্ধকারের দিকে।

উপন্যাসের কেন্দ্রে আলবা—এস্তেবান ত্রুয়েবা ও ক্লারা দেল ভায়ের নাতনি। পিনোচে স্বৈরশাসনের সময় কারাবাস ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে সে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে আলেন্দে ‘দ্য হাউস অব দ্য স্পিরিটস’–এর জগৎকে বিদায় জানাতে চান। বইটিকে প্রায়ই ডটার অব ফরচুন ও পোর্ট্রেট ইন সেপিয়া–র সঙ্গে একটি আলগা ত্রয়ীর অংশ হিসেবে পড়া হয়—তিনটি আলাদা উপন্যাস, অথচ তাদের পারিবারিক ইতিহাস পরস্পরের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফেলিপে ও রানি লেতিসিয়া। আয়েন্দে তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বললেন, এটি যেন নোবেল জয়ের মতো।
“আমি কখনো কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিইনি। ভয় ছিল, যদি সবার শেষে থাকি, সেই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে,” তিনি বলেন। “এই বয়সে এসে হারানোর মতো আর খুব বেশি কিছু নেই।”
বহু বছর ধরে পাঠকেরা তাকে একটি প্রশ্ন করে আসছিলেন: আলবার কী হয়েছিল? সেই প্রশ্নই তাকে উপন্যাসটি লিখতে উৎসাহিত করেছে। কখনো কখনো পাঠকের কৌতূহল লেখকের নিজের কৌতূহলের চেয়েও দীর্ঘজীবী হয়। একটি চরিত্রের পরিণতি জানতে চাওয়ার অর্থ শুধু তার ভবিষ্যৎ জানা নয়; তার মধ্য দিয়ে পাঠক নিজের অতীতেরও কোনো হিসাব মেলাতে চান।
আলেন্দের নতুন উপন্যাসের রাজনৈতিক পটভূমি অবশ্য কেবল অতীতের চিলিতে আটকে নেই। সমকালীন পৃথিবীতে উগ্র জাতীয়তাবাদ, কর্তৃত্ববাদ ও ফ্যাসিবাদের উত্থানের সঙ্গে তিনি বইটির সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন।
১৯৭৩ সালে জেনারেল অগুস্তো পিনোচের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানে চিলির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে ক্ষমতাচ্যুত হন। সালভাদর ছিলেন ইসাবেল আলেন্দের বাবার চাচাতো ভাই। লাতিন আমেরিকার প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মার্ক্সবাদী নেতা হিসেবে পরিচিত সালভাদরের সরকার উৎখাতের পর ইসাবেলকে দেশ ছাড়তে হয়। পিনোচে শাসনামলে আনুমানিক ৪০ হাজার মানুষ নির্যাতনের শিকার হন এবং তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন।
“এখন যখন দেখি, এতগুলো গণতন্ত্র কর্তৃত্ববাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, এমনকি ফ্যাসিবাদের হুমকির মুখে, তখন আবার সেই ভয় অনুভব করি, যে ভয় আমাকে নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল,” বলেন আলেন্দে।

এখানে নির্বাসন শুধু একটি দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাওয়ার নাম নয়। নির্বাসন হলো নিজের পরিচিত পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া—যে পৃথিবীকে স্মৃতিতে বহন করা যায়, কিন্তু যেখানে ফিরে গেলেও আর আগের মানুষ হয়ে ফেরা যায় না। আয়েন্দের লেখায় সেই বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবার, নারী, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং ব্যক্তিগত স্মৃতির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত।
স্প্যানিশ ভাষার অন্যতম পরিচিত লেখক আয়েন্দের বই বিশ্বজুড়ে আট কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে এবং চল্লিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অথচ প্রিমিও প্লানেতার জন্য তিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখেছিলেন। পুরস্কারটিতে অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি ছদ্মনামে জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আলেন্দে নিজের নামের বদলে ব্যবহার করেন ‘লুস ভেন্তুরা’; পাণ্ডুলিপির কাল্পনিক শিরোনাম ছিল ‘লোস কে ফালতান’।
তবে ছদ্মনামের আড়াল কতটা কার্যকর হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের স্প্যানিশ স্টাডিজ বিভাগের প্রধান এবং অ্যাসোসিয়েশন অব হিস্পানিস্টস অব গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড আয়ারল্যান্ডের ভাবী সভাপতি অধ্যাপক ডানকান হুইলার মনে করেন, বিচারকেরা আলেন্দের লেখার ধরন চিনতে পেরেছিলেন—এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। তার ভাষায়, স্প্যানিশভাষী জগতে প্রিমিও প্লানেতা অন্যতম অর্থমূল্যবান পুরস্কার হলেও মর্যাদার বিচারে একে সবচেয়ে শীর্ষস্থানীয় বলা যায় না।
পুরস্কারটির স্বচ্ছতা ও সাহিত্যিক মর্যাদা নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০২১ সালে লা বেস্তিয়া নামের একটি থ্রিলার পুরস্কার জিতেছিল ‘কারমেন মোলা’ ছদ্মনামে। প্রচারে তাকে নারী লেখক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। পরে জানা যায়, এই নামে লিখেছেন তিন পুরুষ—হোর্হে দিয়াস, আগুস্তিন মার্তিনেস ও আন্তোনিও মেরসেরো।
প্রকাশনা সংস্থা প্লানেতা পরিচালিত এই পুরস্কারের একটি শর্ত হলো, বিজয়ী বইটি তাদের প্রকাশ করতে হবে। আলেন্দের ‘দ্য হাউস অব দ্য স্পিরিটস’ থেকে তার বই প্রকাশ করে আসছে পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউসের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্লাজা অ্যান্ড জানেস। ফলে আয়েন্দেকে নিজেদের প্রকাশনার আওতায় আনা প্লানেতার জন্য বড় অর্জন।
অতীতে এই পুরস্কার পেয়েছেন হুয়ান মার্সে ও মানুয়েল ভাসকেস মন্তালবান–এর মতো উল্লেখযোগ্য লেখক। আবার টেলিভিশনে পরিচিত ব্যক্তিত্ব হুয়ান দে ভালের মতো বিজয়ীকে ঘিরেও বিতর্ক হয়েছে। টেলিভিশন-খ্যাত ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্লানেতা গ্রুপের সভাপতি হোসে ক্রেউয়েরাস বলেন, অতীতের তুলনায় পুরস্কারটির মর্যাদা বেড়েছে না কমেছে, তা নির্ধারণ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সমকালীন সাহিত্যের বড় লেখকদের বিজয়ী ও চূড়ান্ত তালিকাভুক্তদের মধ্যে পাওয়া যায়, আর পুরস্কারটি নিয়ে মানুষের আগ্রহও বাড়ছে—এ কথা তিনি উল্লেখ করেন।

এবার দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছেন স্প্যানিশ লেখক ও চিত্রনাট্যকার সেরহিও এরনান্দেস। তার ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘লা আনোরানসা’–র জন্য তিনি পেয়েছেন দুই লাখ ইউরো।
শেষ পর্যন্ত আয়েন্দের এই পুরস্কারজয় শুধু একটি সাহিত্যিক প্রতিযোগিতার ফল নয়। এটি এমন এক লেখকের ফিরে আসা, যিনি নিজের দেশ হারিয়েছেন, ইতিহাসের সহিংসতা দেখেছেন এবং স্মৃতির ভেতর দিয়ে সেই ইতিহাসকে বারবার নতুন করে লিখেছেন। তার কাছে অতীত কোনো বন্ধ দরজা নয়। বরং তার ওপারে এখনও কেউ অপেক্ষা করে আছে—আলবা, হয়তো আরও অনেকে—যাদের গল্প শেষ হয়েছে বলে মনে হলেও আসলে শেষ হয়নি।
পরিচিতি
ইসাবেল আলেন্দে চিলির প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক। লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে জাদুবাস্তবতার ধারাকে জনপ্রিয় করে তোলা লেখকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তার লেখায় ইতিহাস, রাজনীতি, পারিবারিক স্মৃতি, প্রেম, নির্বাসন ও নারীর জীবন গভীর মানবিকতায় উঠে এসেছে।
১৯৮২ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য হাউস অব দ্য স্পিরিটস’ তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে রাজনীতি ও অতিপ্রাকৃত উপাদান মিশিয়ে লেখা এই উপন্যাস তার সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক। চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর তিনি ভেনেজুয়েলায় নির্বাসিত জীবন কাটান। ব্যক্তিগত স্মৃতি ও লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তার লেখায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে।
‘ইভা লুনা’, ‘অফ লাভ অ্যান্ড শ্যাডোজ’ এবং ‘পলা’ তার উল্লেখযোগ্য বই। তার রচনায় প্রান্তিক মানুষের জীবন, নারীর স্বাধীনতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









