এ দেশে ১২ মাস ফসল ফলে। পাখি ফল খেয়ে মল ত্যাগ করে সেখান থেকে গাছ হয়ে আবার ফল হয় অথচ আমরা গরীব। অপরদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যাদের ৬ মাসই থাকে বরফে ঢাকা তারা ধনী। এটা কীভাবে সম্ভব? কারণ- তারা পরিকল্পিতভাবে নীতিমালা করেছে। কিন্তু আমরা ১২ মাস ফসল ফলিয়েও গরীব। এটার মূল কারণ হয়তো আমাদের নীতিগত পরিকল্পনার অভাব। তাই বিজ্ঞানীদের এসব সমস্যার সমাধান খোঁজে বের করতে হবে বলে আহ্বান জানিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
বুধবার (১০ জুন) সকালে রাজধানীর ফার্মগেটে নিজস্ব ভবনে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বার্ষিক কারিগরি কর্মশালায় তিনি এ আহ্বান জানান।
কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, বিশেষ অতিথি ছিলেন বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. হাসান জাফির তুহিন, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির মহাসচিব অধ্যাপক গোলাম হাফিজ কেনেডি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ অনুবিভাগ) মো. সেলিম খান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অবসরপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. শহীদুল ইসলাম এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. আফছার আলী।
মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘‘পূর্বপুরুষেরা আমাদেরকে দিয়ে গেছে বলে আমি সুন্দর পৃথিবী উপভোগ করছি। সুতরাং আমি বিশ্বাস করি আমরা সবাই বিশ্বাস করি আগামী প্রজন্মের জন্য আরেকটা সুন্দর বাংলাদেশ, সুন্দর পৃথিবী রেখে যেতে হবে। এটাই আমাদের সবচাইতে বড় দায়িত্ব এবং কর্তব্য। কৃষিতে অনেক সমস্যা আছে, আর আমি বিশ্বাস করি মৃত্যু ছাড়া সব সমস্যার সমাধান আছে মানুষের কাছে। আমরা চেষ্টা করতে চাই বিশেষ করে আমি ছোটকাল থেকে কৃষির সাথে জড়িত। আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি আমি একেবারে প্রকৃত কৃষক। আমি এমন কৃষক আপনি যদি আমারে ধানদাইতে বলেন আমি পারি। যদি বলেন ঘাস খাটতে হেইডও পারি। আবার যদি বলেন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টানের সাথে মিটিং করতে আলহামদুলিল্লাহ সেটাও পারবো।’’
মন্ত্রী বলেন, ‘‘এদেশের কৃষক ভালো, এদেশের মাটি ভালো, এদেশের বৃষ্টি ভালো। এদেশ নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলীয় দেশ। পৃথিবীর কোথাও তিনবার ফসল ফলে সেই ধরনের চতুর কৃষক দ্বিতীয়টা খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। খুব ছোটকাল থেকে আমার মনে একটা প্রশ্ন- পৃথিবীর যেগুলি ধনী দেশ তারা বছরে প্রায় বেশিরভাগ সময়ে বা ছয় মাস বরফ ঢাকা থাকে। আর আমাদের ১২ মাস ফসল ফলে। পাখি ফল খায়, ফল খেয়ে মল ত্যাগ করে ওখান থেকে গাছ ফুটে আবার ফল ধরে অথচ আমরা গরিব প্রশ্নটা আপনাদের কাছে রেখে গেলাম। এর সমাধান আপনাদের বের করতে হবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘আপনাদের কি মনে হয় না কোথাও আমাদের পলিসি ভুল আছে? আমি আপনাদের সহযোগিতা চাই। আমি বিশ্বাস করি কৃষি দাঁড়ালে এদেশের ৭৫ ভাগ মানুষের অর্থনীতি দাঁড়াবে। এ অর্থনীতি দাঁড়িয়ে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক খোটা ছাড়া দাঁড়ায়ে যাবে। আমি এটা বিশ্বাস করি, আমি ধারণ করি, আমি লালন করি এবং আমি বাস্তবায়ন করার জন্য আপনাদের সহযোগিতা চাই।’’
মাটির গুণগুণ নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘‘আমি মন্ত্রিত্ব নেওয়ার পরপরই এই মৃত্তিকা বিজ্ঞানীদের সাথে একটা মিটিং করছি। তাদের জিজ্ঞেস করছিলাম যে মাটির পিএইচ লেভেল কত আছে? তারা বললো গড়ে ৪.৫। আমি জিজ্ঞেস করলাম এটা কি আমার ফসল উৎপাদনের যথেষ্ট? তারা বললো না, ৬.৫ প্লাস হতে হবে। সেটা কিভাবে করতে হবে সে ব্যাপারে সহযোগিতা চাই।’’
মন্ত্রী বলেন, ‘‘এ ব্যাপারে এক বিঘা জমিতে গবেষণা করে প্রতিবেদন দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অনেকগুলি সমস্যা আছে, সমস্যাগুলোর সমাধানে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম বলেই জনগণ আমাদেরকে ভোট দিয়েছে। সুতরাং আমাদেরকে এটার বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, কীটনাশককে পরিবেশ, মাটি, মানুষ ধ্বংস হচ্ছে। দেশটা ও পৃথিবীটা আমাদের। সবাই মিলে পৃথিবীকে সাজাতে হবে। কীটনাশকের ব্যবহার বিষয়ে একটি মিটিং করেছি আরেকটি অচিরেই করবো।’’
রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, ‘‘দেশে মৃত্তিকা বিজ্ঞানীর সংখ্যা কম। নতুন চরাঞ্চলের হিসাব করে প্রকৃত জমির পরিমাণ নির্ণয় করতে হবে। মৃত্তিকার পাহাড়াদার সেনাবাহিনী, বিজিবির দায়িত্ব। আর মাটির গুণগত মান দেখার দায়িত্ব বিজ্ঞানীদের। মৃত্তিকাকে রক্ষা করতে হলে পারস্পরিক কোন্দল থাকতে পারবে না। বর্তমানে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে কোন কোন্দল নেই। তিনি সকলের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। ইউনিটির উদাহরণে তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমআ, ঈদের ও হজের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বছরে ১.৯৯ শতাংশ হারে জমি অকৃষিখাতে চলে যাচ্ছে। ভর্তুকির বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ হয় রাসায়নিক সারে। অথচ এসব সার মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট করে। মাটির গুণাগুণ ঠিক রাখতে পারলে সারের ব্যবহার কমবে।’’
ড. মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘‘সুস্থ মাটি, সমৃদ্ধ কৃষি এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। মো. আব্দুর রহিম বলেন, আদর্শ মাটিতে ৫ শতাংশ অম্ল থাকতে হয়। ফসল ফলানোর জন্য ২ শতাংশ অম্লের প্রয়োজন কিন্তু দেশের মাটিতে তা আছে দেড় শতাংশ। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে দেশে দানাদার খাদ্য উৎপাদন হতো দেড় কোটি মেট্রিক টন। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি টনে।’’
গোলাম হাফিজ কেনেডি বলেন, ‘‘২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ব্যানারে কৃষি নিয়ে কাজ করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। কৃষির প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অনুরাগ অনেক। সেটিকে কাজে লাগিয়ে কৃষিখাতে উন্নয়ন করতে হবে। বাংলাদেশে কৃষি বিজ্ঞানীদের ইনসেপটিভ নেই।’’
মো. হাসান জাফির তুহিন বলেন, ‘‘কৃষির মত এতো সাফল্য অন্যকোনকাতে নেই। মো. সেলিম খান বলেন, ৭১ শতাংশ জমিতে জৈব প্রদার্থ নেই। অথচ ফসল উৎপাদনে প্রয়োজন ২ শতাংশ। রাসায়নিক সার ব্যবহার করে মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে। প্রতি কেজি সারে ৩৫ টাকা করে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ১৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু মৃত্তিকার কোন প্রকল্প নেই। গত সময়ে এমন প্রকল্প হয়েছে সেখানে শুধু লুটপাট হয়েছে।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









