টানা ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়িঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চরাঞ্চল ও নিচু এলাকাসহ চট্টগ্রাম বিভাগের পার্বত্য জেলাগুলোতে অনেক এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়িঢলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলেরও কয়েকটি জেলার নিচু এলাকায় আকস্মিক বন্যাও দেখা দিয়েছে।
সিলেট, চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগের কিছু নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় সব মিলিয়ে ১৮টি জেলায় স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ খবর অনুসারে, দেশের ছয়টি বিভাগের এসব জেলায় ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিতে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আবার চট্টগ্রামের চার জেলায় পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ আবহাওয়া বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি আরো শক্তিশালী হয়ে পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও দেশের উপকূলীয় এলাকায় দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
কক্সবাজারে পানিবন্দি লাখো মানুষ
কক্সবাজার ও পাশের অঞ্চলে টানা ছয়দিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ঢলে বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জেলার মাতামুহুরি, বাঁকখালী, ফুলেশ্বরী, কোহেলিয়া, রেজু ও নাফনদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে ফসলিজমি, পুকুর, চিংড়িঘের, সড়ক, রেলপথসহ বিস্তৃর্ণ এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। বিশেষ করে কক্সবাজার শহর ও মাতারবাড়িতে অপরিকল্পিত নগরায়নে খাল, ছড়া বন্ধ থাকায় মানুষের দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়েছে জেলার নয়টি উপজেলার অন্তত ৪১টি ইউনিয়ন। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ২৩ জনের। কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো জলামগ্ন। চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকার অন্তত ১৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। রামুর অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে শত শত ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে, তলিয়ে গেছে গ্রামীণ সড়ক। ব্যাহত হয়েছে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও। সব মিলে পানিবন্দি হয়েছেন অন্তত এক লাখ মানুষ। ব্যাহত হচ্ছে সড়ক যোগাযোগ। বন্ধ রয়েছে কয়েকটি নৌ-পথ।
বিশ্বের বৃহৎ শরণার্থী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তৈরি হয়েছে মানবিক সংকট। দুর্ভোগে পড়া লোকজন ও জনপ্রতিনিধিরা জানান, বৃহস্পতিবারের সারাদিনের ভারি বর্ষণে মাতামুহুরি, ঈদগাঁওর ফুলেশ্বরী, কক্সবাজার শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাঁকখালীসহ ছোট-বড় সকল নদী-খালে পাহাড়িঢল নেমেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে সমতলে পড়া বৃষ্টির পানি। সাগর উত্তাল ও ঝড়োহাওয়া অব্যাহত থাকায় জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৩/৪ ফুট বেড়ে যাওয়ায় উপকূল-সমতলে জমে থাকা পানি অত্যন্ত ধীর গতিতে নামছে। ফলে পানি নামতে বেগ পেতে হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে পানি লোকালয়ে জমে দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। কক্সবাজার সদরের পিএমখালী, বাংলাবাজার, খরুলিয়া, খুরুশকুল,দক্ষিণ মিটাছড়ি, চৌফলদন্ডী, ভারুয়াখালী, রামুর ফতেখাঁরকুল, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, গর্জনিয়া, খুনিয়াপালং, ঈদগড়, মিঠাছড়ি, জোয়ারিয়ানালা, রশিদনগর, উখিয়ার হলদিয়াপালং, রাজাপালং, রত্মাপালং, পালংখালী, জালিয়াপালং, ঈদগাঁও সদর, ইসলামপুর, ইসলামাবাদ, পোকখালী, জালালাবাদ, চকরিয়া উপজেলার বরইতলী, বমু বিলছড়ি, কাকারা, লক্ষ্যারচর, ফাঁসিয়াখালী, চিরিঙ্গা ও হারবাং ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে।
একইভাবে নবগঠিত মাতামুহুরি উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া,বদরখালী কোনাখালী, বিএমচর ও সাহারবিল ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে পেকুয়ার নিম্নাঞ্চলও। প্লাবিত এলাকাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, আমনের বীজতলা, সবজিখেত এবং চিংড়ির ঘের পানির নিচে চলে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। অনেক এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পানিতে কক্সবাজার-চট্টগ্রামের রেল লাইন পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ায় রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। কবে নাগাদ চালু করা হবে তা জানাযায়নি। মহেশখালী-কক্সবাজার পারাপারে সিট্রাক গত তিন দিনধরে বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে দ্বীপের সাড়ে চার লক্ষ মানুষ।
গতকাল মহেশখালী কুতুবদিয়ার নির্বাচিত সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ জেলা প্রশাসককে ১ ঘন্টার মধ্য সী ট্রাক সার্ভিস চালু করার নির্দেশনা দিলে ও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সী ট্রাক সার্ভিস চালু হয়নি।অন্য দিকে সেন্টমার্টিনের সাথে দেশের মূল ভূ - খন্ডের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আজ ৫ দিন। ফলে সেখানে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান। কক্সবাজার ও উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৭ হাজার মাছ ধরার ফিশিং বোট গত এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন ঘাটে নোঙর দিয়েছে। তবে কিছু কিছু নৌযান আবহ সৃষ্টি সর্তকবার্তা উপেক্ষা করে সাগরে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে দূর্যোগের কবলে পড়েছে।
এর মধ্য মহেশখালী আবুল কালাম বহদ্দারের এফবি নিশান সাগরে ডুবে গেছে ১৬ জন মাঝি মাল্লা নিয়ে। সোনাদিয়ার অদূরে মাছ ধরে তীরে ফিরে আসার সময় গভীর সাগরে নৌকাটি ডুবে যায় গত ৭ জুলাই দিবাগত রাতে।এর মধ্য অন্য একটি মাছ ধরার ট্রলার সাগর থেকে ১৪ জনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তবে বাকি ২ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছে। এদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা জানাযায়নি। কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম জানান, ভারি বর্ষণে মাতামুহুরীসহ কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হয়। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে নিম্নাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
চট্টগ্রামে প্রশাসনের ছুটি বাতিল
টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরী ও আশেপাশের উপজেলার বেশিরভাগ এলাকাই এখন পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক পরিবার। বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের অধীন সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
জেলার প্রতিটি উপজেলায় এবং জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু রেখে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
ধলাই নদীর বাঁধ ভাঙনে তলিয়ে গেল ২৫ গ্রাম
টানা ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ধলাই নদীরক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীর পানির তোড়ে বাঁধের দুটি অংশ ভেঙে উপজেলার অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। তলিয়ে গেছে বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি, ভেসে গেছে ফিশারির মাছ। টিউবওয়েল তলিয়ে যাওয়ায় বন্যাকবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট।
গত বুধবার রাত নয়টায় ইসলামপুর ইউনিয়নের মোকাবিল এলাকায় এবং গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে একই ইউনিয়নের গঙ্গানগরে ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে এই দুটি বড় ভাঙন দেখা দেয়। প্রায় ১০০ মিটার এলাকার বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। এতে ইসলামপুর,আদমপুর ও মাধবপুর ইউনিয়নের ভান্ডারিগাঁও, গঙ্গানগর, শ্রীপুর, মোকাবিল, কোণাগাঁও, বেড়িগাঁও, পাতারিগাঁও, ছনগাঁও, পশ্চিম ঘোড়ামারা, বন্দেরগাঁও, ভানুবিল, উত্তরভাগ, জালালপুর, গোলের হাওর, কালারায়বিল, আধকানী, তেইতইগাঁওসহ প্রায় ২৫টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পরেন। বানের পানিতে এলাকার ফসলি জমি ৩ থেকে ৪ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং পুকুর ও ফিশারির মাছ ভেসে গেছে। মাটির ঘরবাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানিতে সম্পূর্ণ তলিয়ে যাওয়ায় বিদ্যালয়গুলোতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার নলকূপগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র হাহাকার দেখা দিয়েছে। নিরুপায় হয়ে পানিবন্দি মানুষজন উঁচু স্থানে ও আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছেন।
এদিকে পাউবোর তথ্য অনুসারে, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় মনু নদীর পানি বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার উপরে, ধলাই নদীর পানি বিপদসীমার ২১ সেন্টিমিটার উপরে, কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার নিচে ও জুড়ি নদীর পানি বিপদসীমার ২৭ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে বলে জানিয়েছে পাউবো।
বন্যার আশঙ্কা সুনামগঞ্জে
উজান থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢল ও গত দুদিন ধরে চলা অবিরাম বর্ষণে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কায় কাঁপছে সুনামগঞ্জ। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় চলতি বছরের সর্বোচ্চ ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। দ্রুত বাড়ছে জেলার সবকটি নদ-নদীর পানি। ইতোমধ্যে দিরাই উপজেলার মারকুলি পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পাহাড়ি ঢল ও জলাবদ্ধতায় প্লাবিত হয়েছে জেলার নিম্নাঞ্চল। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সার্বক্ষণিক নজরদারি শুরু করেছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃক গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ি ঢলের কারণে সুনামগঞ্জের সঙ্গে তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুরের একমাত্র সংযোগ সড়কের শক্তিয়ারখলা পয়েন্টে প্রায় ১২০ মিটার রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তীব্র স্রোতের কারণে এই সড়কে যান চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা যেকোনো সময় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া অবিরাম বৃষ্টির কারণে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের নিচু এলাকা ও প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, জেলার সবকটি পয়েন্টেই পানি দ্রুত গতিতে বিপদসীমার দিকে ধাবিত হচ্ছে। দিরাই উপজেলার কুশিয়ারা নদী (মারকুলি পয়েন্ট) এই পয়েন্টে পানি ইতোমধ্যে বিপদসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার মূল কারণ। সুরমা নদীর ষোলঘর পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় এই পয়েন্টে রেকর্ড ৫১ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে পানি বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।সুরমা নদীর ছাতক পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে পানি বিপদসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। লাউড়েরগড় ও শক্তিয়ারখলা পয়েন্টে সীমান্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ১২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বম্ভরপুরের শক্তিয়ারখলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ১১৩ সেন্টিমিটার পানি বাড়লেও তা এখনো বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস এবং উজানের বৃষ্টিপাতের ধারা বিশ্লেষণ করে পাউবো জানিয়েছে, পাহাড়ি ঢল এবং স্থানীয় ভারি বর্ষণ আগামী দুদিন অব্যাহত থাকলে জেলার সুরমা, চেলা, খাসিয়ামারা ও যাদুকাটাসহ সবকটি নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে মাঝারি মেয়াদের বন্যা পরিস্থিতির রূপ নিতে পারে। হাওরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী (২) এমদাদুল হক সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় যে ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, তা চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। উজান থেকে ঢল আসা অব্যাহত রয়েছে। আমরা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। নদী তীরবর্তী এবং হাওরাঞ্চলের বাসিন্দাদের আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে আমাদের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে।
সিলেটের ৬ নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে
টানা বৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয়, আসাম ও ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগের সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এরইমধ্যে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার ছয়টি নদীর অন্তত নয়টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চল। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সিলেট বিভাগজুড়ে আকস্মিক বন্যা ও টিলা ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবকটি জেলায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ টিলা চিহ্নিত করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে গোলাপগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মণাবন্দ ইউনিয়নের পূর্বভাগ গ্রামে টিলা ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে ময়না মিয়া নামের এক ব্যক্তির বসতঘরের বেশ কিছু অংশ ভেঙে যায়। ঘটনার সময় পরিবারের সদস্যরা দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ময়না মিয়া বলেন, হঠাৎ করেই টিলার মাটি ধসে আমার ঘরের ওপর পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে ঘরের বেশ কিছু অংশ ভেঙে যায়। আমরা প্রাণ নিয়ে বাইরে বের হতে পেরেছি। ঘরবাড়ির অনেক ক্ষতি হয়েছে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, সুরমা-কুশিয়ারাসহ সবকটি নদ-নদীর পানি গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত বিপৎসীমার নিচে অবস্থান করছিল। তবে অমলশিদ ও কানাইঘাটসহ কয়েকটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে এবং যেকোনো সময়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।
সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিলেট জেলা প্রশাসন ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। একই সঙ্গে ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের প্রধান নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমান্তঘেঁষা এলাকায় 'ফ্ল্যাশ ফ্লাড' বা স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ৭২ ঘণ্টা সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। অবিরাম বৃষ্টির কারণে পাহাড় ও টিলা ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে।
টানা ভারি বর্ষণে ডুবে গেছে লামা
টানা পাঁচ দিনের ভারি বর্ষণে বান্দরবানের লামা উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি ঘটছে। উপজেলার পৌর শহরের বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় বাজার ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, ফলে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে।
ইতিমধ্যে অবিরাম বর্ষণের কারণে উপজেলার আজিজনগরে পাহাড়ধসে এক পরিবারের শিশুসহ দুই পরিবারের মোট ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একইসাথে পৌর এলাকা, ফাঁসিয়াখালী, সরই ও রূপসীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নতুন করে আরও পাহাড়ধসের আশঙ্কায় সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে প্রশাসনিকভাবে সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় পৌর শহরের ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষকে প্রয়োজনীয় মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য মাইকিং করেছে উপজেলা প্রশাসন। সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সবাইকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন। জানা যায়, টানা বৃষ্টিতে অনেক সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। নিম্নাঞ্চল এলাকা ও নদী-খালের আশপাশে বসবাসকারী মানুষজন সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। আবহাওয়া অনুকূলে না এলে এবং ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চন্দনাইশে চরম ভোগান্তিতে লাখো মানুষ
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বড়পাড়া এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ওপর দিয়ে তীব্র বেগে পানির স্রোত বইছে। এতে পুরো অঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে এবং মহাসড়কে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মহাসড়কের বড়পাড়া অংশে কোথাও হাঁটু সমান, আবার কোথাও তার চেয়েও বেশি উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তীব্র স্রোতের কারণে ছোটখাটো যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। দূরপাল্লার ভারি যানবাহনগুলো অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে ধীরগতিতে চলাচল করছে, যার ফলে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে বা ভ্যান-রিকশায় চড়ে পারাপারের চেষ্টা করছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হঠাৎ করে মহাসড়ক উপচে পানি আসায় চন্দনাইশের বিস্তীর্ণ এলাকার বাড়িঘর, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান এবং ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। গ্রামীণ সড়কগুলো ডুবে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। তলিয়ে গেছে অসংখ্য মাছের ঘের ও পুকুর, যার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় খামারিরা।
দশমিনায় বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত
টানা সাত দিনের ভারি বর্ষণে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অব্যাহত বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। অনেক এলাকায় বাড়িঘরের আঙিনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে যাওয়ায় মানুষকে নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে বের হতে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। যানবাহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এছাড়া নিম্নাঞ্চলের কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আমনসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দুর্ভোগে মহেশখালীর জনজীবন
টানা কয়েক দিনের বৈরী আবহাওয়া, অবিরাম বর্ষণ এবং ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেতের প্রভাবে কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ বিপর্যয়, শিশুর মৃত্যু এবং টানা তিনদিন নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় দুই উপজেলার লাখো মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
টানা চারদিন ধরে মহেশখালী-কক্সবাজার ও কুতুবদিয়া নৌরুটে সি-ট্রাকসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শত শত যাত্রী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও জরুরি চিকিৎসাপ্রার্থী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
অন্যদিকে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাতারবাড়ি গ্রিড থেকে গোরকঘাটা ৩৩ কেভি সঞ্চালন লাইনের স্কাই-ওয়ার ছিঁড়ে যাওয়ায় মহেশখালীর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা ত্রুটি শনাক্ত করে মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









