উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ভয়াবহ ও মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্ণ হলো আজ (২১ জুলাই)। গত বছরের এই বিভীষিকাময় দুপুরে মুহূর্তেই হাসি-আনন্দে মুখর পুরো ক্যাম্পাস পরিণত হয়েছিল মৃত্যু, আগুন আর আর্তনাদের এক জনপদে। বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানটি ভেঙে পড়ে পাইলট, শিক্ষিকা ও ২৮ কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ ঝরে যায় মোট ৩৬টি তাজা প্রাণ। দগ্ধ ও আহত হন বহু শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারী। শোক ও পরম শ্রদ্ধায় ভয়াবহ এই ট্র্যাজেডির প্রথম বর্ষপূর্তি স্মরণ করছে মাইলস্টোন পরিবারসহ পুরো দেশ।
মর্মান্তিক এই ঘটনার প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ দুই দিনের স্মারক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম জানান, কর্মসূচির প্রথম দিন গত সোমবার (২০ জুলাই) দিয়াবাড়িসহ প্রতিষ্ঠানের সব ক্যাম্পাসে বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাহিত নিহত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কবর জিয়ারত করা হয়। ট্র্যাজেডির দিনটিকে স্মরণ করে আজ মঙ্গলবার মাইলস্টোনের সব শাখায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে দিয়াবাড়ি দুর্ঘটনাস্থল ক্যাম্পাসে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে সশ্রদ্ধ সালাম, শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
ঘটনার পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার নয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। প্রায় তিন মাস ধরে ১৫০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও ১৬৮টি তথ্য উদ্ঘাটন করে ৩৩টি সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উড্ডয়নজনিত ত্রুটির কারণে প্রশিক্ষণ চলাকালে পরিস্থিতি পাইলটের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি প্রতিরোধে বিমানবাহিনীর সব প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে বরিশাল ও বগুড়ার রানওয়ে সম্প্রসারণ করে সেখানে পরিচালনার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি প্রতিবেদনে উঠে আসে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি রাজউকের বিল্ডিং কোড না মেনে তৈরি করা হয়েছিল; নিয়ম অনুযায়ী ভবনে অন্তত তিনটি সিঁড়ি থাকার কথা থাকলেও ছিল মাত্র একটি, যা হতাহতের সংখ্যা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
দুর্ঘটনার পর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়া দগ্ধ শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ চিকিৎসা চলে। এর মধ্যে আগুনে বিকৃত হয়ে যাওয়া পাঁচজনের মরদেহ সিআইডি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে। ভয়াবহ এই ঘটনার মাঝে আশার প্রতীক হয়ে ওঠে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র নাভিদ নাওয়াজ দীপ্ত। শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া নাভিদ ৯৭ দিন হাসপাতালে থেকে ৩৬টি অস্ত্রোপচার ও আটবার স্কিন গ্রাফটিংয়ের পর শেষ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও স্বজনহারা পরিবার ও বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মনের গভীর ক্ষত আজও শুকায়নি। শারীরিকভাবে অনেকে সুস্থ হলেও মানসিকভাবে সেই তাড়া করে ফেরা বিভীষিকা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। নিহতদের স্মৃতি আর পোড়া ক্ষত নিয়ে আজ বহু পরিবার বয়ে বেড়াচ্ছে এক অপূরণীয় বেদনার ভার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









