এক : প্রত্যেকদিন স্কুল ছুটি হলে ছাতা মাথায় সহপাঠীরা যার যার বাড়ি চলে গেলেও পপি স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে বৃষ্টি থেমে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। পপির সবগুলো সহপাঠীর ছাতা থাকলেও তার কোনো ছাতা নেই। বাবার কাছে ছাতার আবদার তোলার সাহস পাচ্ছে না। বাজারে সবজি বেচাকেনা করে যে পয়সা আসে, তাতে সংসারের অভাব পুরোপুরি দূর হয় না।
এখন ভরা বর্ষার দিন। যখন তখন বৃষ্টি নামে। ক্লাসের সবগুলো শিক্ষার্থী ছাতা নিয়ে রোজ স্কুলে আসে। বৃষ্টি নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। মাথাব্যথা পপির। বৃষ্টি থামলেই সে বাড়ি যায়। চোখের সামনে একে একে ক্লাসের সবগুলো মেয়ে ছাতা মাথায় বাড়ি যাবার দৃশ্য দেখে আগে কষ্ট লাগলেও এখন আর পপির কষ্ট লাগে না। অভাব অনটন যে জীবনের অংশ, ছোট্ট পপি এইটুকু বয়সে এই চিরন্তন রীতিনীতি বুঝে গেছে।
দুই : আজ আকাশের কোলে দীঘল কালো মেঘের রেখা। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। থামবার কোনো লক্ষণ নেই। একে একে স্কুলের সবগুলো সহপাঠী চলে গেল ছাতা মাথায়। পপির খারাপ লাগতে শুরু করেছে। বৃষ্টি না কমলে তবে যে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামবে। বাড়ি যেতে ভয় পাবে সে। পপির মনের অবস্থা টের পেল নিরা। এগিয়ে এসে পপির কাছে জানতে চায় ছাতা নেই কেনো! পপি তাদের পারিবারিক টানাপোড়েনের কথা শোনায়। শুনে নিরার মন খারাপ হয়। নিরার বাবা অনেক বড় ব্যবসায়ী। অভাব কি জিনিস সে জানে না। তবে নিরার খুব মানবিক একটা মন আছে। পপির এই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাড়ি যাবার দুর্গতি দেখে নিরা তাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার আবদার করে। প্রথমে না করে দেয় পপি। পরে নাছোড়বান্দা নিরার একান্ত সহানুভূতির কাছে হেরে যায় পপি। নিরার নীল রঙের ছাতার তলে আশ্রয় নিয়ে পপি আর নীরা পাশাপাশি হেঁটে রওনা দেয় পপিদের পালপাড়া গ্রামের দিকে।
তিন : নিরা যখন বাড়ি আসে, তখন সন্ধ্যা আসি আসি করছে। মেয়েকে এত দেরি করে বাড়ি ফিরতে থেকে রাবেয়া বেগম এগিয়ে আসেন।
- তুমি আজকে এত দেরি করে ফিরলে কেন?
- আমাদের ক্লাসের পপিকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছি আম্মু। বৃষ্টিতে ও আটকা পড়েছে।
- ওর ছাতা নেই?
- না। ওরা খুব গরীব। ছাতা কিনে দেওয়ার মত সামর্থ্য পপির বাবার নেই।
- ওকে তুমি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে খুব ভালো কাজ করেছ।
- আচ্ছা আম্মু, আমরা কি পপিকে একটা ছাতা কিনে দিতে পারি না? আব্বুকে বললে কিনে দিবে না?
- আচ্ছা আমি তোমার আব্বুকে বলে দেখব।
দুদিন পর কামাল হোসেন মেয়ে নিরার হাতে একটা লাল রঙের ছাতা দিয়ে বলল, 'এটা পপির জন্য। বর্ষায় তুমি ওকে এটা উপহার দিও। তোমার আম্মুর কাছে সব শুনেছি আমি। তুমি যে খুব দয়ালু মনের, সেটা বুঝতে পেরেছি মা। শুধু নিজের কথাই না, মানুষের কথাও ভাববে এভাবে। তাহলে মানুষে মানুষে আর কোনো ভেদাভেদ থাকবে না।
নিরা বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবা সব সময় তাকে খুব সুন্দর সুন্দর কথা শোনায়। লাল রঙের ছাতাটা পপির জন্য বাবা কিনে এনে প্রমাণ করেছেন তিনিও নিরার মত মানবিক মানুষ।
লেখক : জোবায়ের রাজু


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









