দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সব প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। ব্যালটের গোপনীয়তার চেয়ে স্বচ্ছতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এবারের নির্বাচনে ভোটাররা কে কাকে ভোট দিচ্ছেন, তা উপস্থিত সবার কাছে দৃশ্যমান থাকবে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সামনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘নির্বাচনী কর্তা’ এ এম এম নাসির উদ্দীন। সাধারণত নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব ব্রিফ করলেও আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে সিইসির ওপর দায়িত্ব থাকায় এবার তিনি নিজেই পুরো বিষয়টি তুলে ধরেন।
সিইসি জানান, নির্বাচন কমিশন, জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের সমন্বয়ে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর একই দিন এ বিষয়ে ক্যাবিনেট ডিভিশন থেকে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরপর সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করে নির্বাচন কমিশন।
সিইসি বলেন, ১৯৯১ সালের পর সংসদীয় পদ্ধতিতে বাংলাদেশে এবারই প্রথম একাধিক প্রার্থীর মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতায় কিছুটা ঘাটতি থাকলেও প্রয়োজনীয় মহড়া ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠা হয়েছে। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করেই পুরো প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় সংসদ বর্তমানে নিয়মিত অধিবেশনে না থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী সিইসি নিজেই সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করেছেন। গত ১১ আগস্ট ন্যূনতম সাত দিনের সময় রেখে এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়।
সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে ভোটার তালিকা ও তফসিল প্রকাশ করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র দাখিলের দিনে মোট তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে।
এর মধ্যে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষে ড. অলি আহমদের নামে দুটি এবং বিএনপির পক্ষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে একটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। ১৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সহযোগিতায় মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার দিনের মূল স্বাক্ষর রেজিস্টারের সঙ্গে প্রস্তাবক ও সমর্থকদের স্বাক্ষর মিলিয়ে তিনটি মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করা হয়।
তবে একই প্রার্থীর দুটি বৈধ মনোনয়নপত্রের মধ্যে একটি অতিরিক্ত হিসেবে গণ্য হওয়ায় শেষ পর্যন্ত দুই প্রার্থীর মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনেও কোনো প্রার্থী নাম প্রত্যাহার করেননি।
সিইসি জানান, ভোটার তালিকার ক্রমে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। সংসদীয় সীমানার সিরিয়াল অনুযায়ী সাধারণভাবে পঞ্চগড়-১ থেকে শুরু হয়ে বান্দরবানে ৩০০ আসন শেষ হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদের ‘বিভক্তি নম্বর’ অনুযায়ী ভোটগ্রহণ হবে।
চট্টগ্রাম-৪ আসনের উপনির্বাচন বা আসন শূন্য থাকার কারণে বিভক্তি নম্বরে কিছুটা অসংলগ্নতা তৈরি হয়েছে। তবে নিয়ম অনুযায়ী তা সমাধান করা হয়েছে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ৩৪৯ জন।
আগামী ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা ও সংসদ সদস্যরা ভোটার হিসেবে এতে অংশ নেবেন।
সিইসি বলেন, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর বিকেল ৫টার পরপরই ভোট গণনা শুরু হবে এবং গণনা শেষে তিনিই আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করবেন।
গোটা প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে বলে জানান তিনি। ভোটগ্রহণ ও গণনার সময় সংসদ সদস্যরা কক্ষে উপস্থিত থাকতে পারবেন। ব্যালট পত্রে ভোটার ও প্রার্থীদের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকায় কে কাকে ভোট দিচ্ছেন, তা উপস্থিত সবার কাছে দেখা যাবে।
এ ছাড়া ভিআইপি ভোটারদের ভোটদান এবং ভোট গণনার দৃশ্য বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, সংসদ ভবনের ভেতরের পরিবেশ ও বিধিমালা বজায় রাখার দায়িত্ব স্পিকারের। সংসদ নিজস্ব আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হবে। তবে ভোটের দিন সংসদ ভবনের ভেতরে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত বা কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের যে আলোচনা রয়েছে, সেটিকেও গুজব বলে উল্লেখ করেন সিইসি। তিনি জানান, সংসদের বৈঠক আহ্বানের মতো নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি কিছু ব্যালট ও স্টেশনারি ছাড়া নির্বাচন কমিশনের আলাদা বড় কোনো আর্থিক ব্যয় বা অতিরিক্ত বাজেট তৈরি হয়নি।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশ ও আন্তর্জাতিক মহল এই নির্বাচনের দিকে বিশেষ নজর রাখছে উল্লেখ করে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন আশা প্রকাশ করেন, সবার আন্তরিক সহযোগিতায় নির্বাচন কমিশন একটি সুন্দর, স্বচ্ছ ও ঐতিহাসিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে পারবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









