আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শিল্পঘন ফতুল্লা অঞ্চল নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি এবার সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। আসনটিতে জোটের প্রার্থীর বাইরেও বিএনপির অন্তত তিনজন নেতা ভোটের মাঠে সক্রিয়। এছাড়া, গণঅভুত্থানের পর তরুণ নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আলোচিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গুরুত্বপূর্ণ এক নেতাও এ আসনের প্রার্থী। তিনি আবার সমর্থন পাচ্ছেন সদ্য জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ইসলামিক ও সমমনা ১১ দলেরও। আসনটিতে এনসিপিকে সমর্থন দিয়ে জামায়াতের নিজের প্রার্থীকেও সরিয়ে নিয়েছে।
রাজধানীর পাশের জেলা হিসেবে শিল্পসমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ জেলা দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদা বহন করে। ফলে আসনটিতে হেভিওয়েট প্রার্থীদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ভোটারদেরও আলাদা করেছে নজর এখানে। কেননা, প্রতিদ্বন্দ্বীদের একাধিকজন রয়েছেন যারা এ আসনে জনপ্রতিনিধিও ছিলেন। ভোটের মাঠ তাদের পুরোনো পরিচিত। গত শনিবার জেলার পাঁচটি আসনের বিপরীতে জমা পড়া ৫৬টি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির। এ কার্যক্রমে বাদ পড়েন ১৬ জন। বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে ১৬ জনের মনোনয়নপত্র।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি বরাবরই নির্বাচনে আলোচনায় থাকে। বিগত সময়ে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতারাই আসনটিতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আসনটিতে চারবার সংসদ সদস্য ছিলেন একেএম শামীম ওসমান। প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের এ সদস্য গত বছরের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে এখন সপরিবারে দেশান্তর। তার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলাও হয়েছে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে।
এ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন নন্দিত অভিনয়শিল্পী সারাহ বেগম কবরীও। তিনি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে অংশ নিয়েছিলেন। তার আগে বিএনপিরও দুই হেভিওয়েট নেতা আসনটিতে সংসদ সদস্য ছিলেন।
এবারও আসনটি রয়েছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এ আসনের বিপরীতেই সবচেয়ে বেশি ১৫টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। তাদের মধ্যে নয়জনের মনোনয়নপত্র বৈধ বলে ঘোষিত হয়েছে। এ তালিকায় বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমী ছাড়াও আছেন বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী, স্বতন্ত্র মো. শাহ্ আলম ও মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, জাতীয় নাগরিক পার্টির অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি ইসমাইল কাউসার, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সেলিম মাহমুদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আনোয়ার হোসেন, খেলাফত মজলিসের ইলিয়াস আহমেদ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের মো. সুলাইমান দেওয়ান।
তাদের মধ্যে মোহাম্মদ আলী ও গিয়াস উদ্দিন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। গিয়াস উদ্দিনকে সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। তিনি নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ছিলেন।
তবে, বাদ পড়া পাঁচজন প্রার্থীরা হলেন: হলফনামায় অসম্পূর্ণ তথ্য থাকায় সিপিবির ইকবাল হোসেন ও গণঅধিকার পরিষদের আরিফ ভূঁইয়া, হলফনামায় স্বাক্ষর না করায় বাংরাদেশ সুপ্রীম পার্টির সেলিম আহমেদ, গ্যাস বিল বকেয়া থাকায় জাতীয় পার্টির সালাউদ্দিন খোকা মোল্লা এবং এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে গড়মিল পাওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী ফাতেমা মনির।
ভোটের মাঠে থাকা প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন পাঁচ নেতা। তারা হলেন: জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মনির হোসাইন কাসেমী, বিএনপির সাবেক দুই সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী ও গিয়াসউদ্দিন, বিএনপি নেতা মো. শাহ আলম ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা আব্দুল্লাহ আল আমিন।
গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই আত্মগোপনে, কেউ কেউ আছেন জেলে। অধিকাংশ নেতার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলার অভিযোগে ডজনেরও অধিক মামলা। ফলে, এবার জনসমর্থনের দৌঁড়ে বিএনপি অনেকটাই এগিয়ে আছে ইতোমধ্যে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি তাদের কোনো প্রার্থী দেয়নি। তারা জোটের শরিক দলকে আসনটি ছেড়ে দিয়েছে। ফলে, এ আসনে বিএনপি-জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী।
২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অধীনেই অংশ নিয়েছিল বিএনপি। ওই নির্বাচনেও আসনটি জোটের শরিক দলের জন্য ছেড়ে দেয় বিএনপি। সেবারও মনির হোসাইন কাসেমী ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু এবার জমিয়তের যুগ্ম মহাসচিব কাসেমী নিজ দলের প্রতীক খেঁজুর গাছ নিয়ে নির্বাচন করবেন। ইতোমধ্যে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকে নিজের দিকে ভিড়িয়েছেন মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী। এর প্রতিফলন দেখা যায়, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়। মনির হোসাইন নিজে না গেলেও ফতুল্লার বিএনপি নেতারা তার পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।
তাছাড়া, মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর নিজ দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামেরও জ্যেষ্ঠ নেতা। তিনি হেফাজতে ইসলামেরও নেতৃত্বে আছেন। সংগঠনটির জেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্বেও আছেন তিনি। ইসলামী ঘরানায় তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বেশ। ফলে, এবার তার অবস্থান গতবারের তুলনায় বেশ শক্ত বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তবে, আসনটিতে তাকে বিএনপিরই তিনজন নেতার সম্মুখীন হতে হবে। তাদের মধ্যে মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন অন্যতম। বিএনপির এ নেতা আসনটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তিনি জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং ছিলেন দলের নির্বাহী কমিটিরও সদস্য। কিন্তু আসনটিতে তিনি জোটের প্রার্থীর বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তাকে কয়েকদিন আগে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। কিন্তু গিয়াস উদ্দিন এখনো ভোটের মাঠে আছেন। এ অঞ্চলে তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। কেননা, তিনি ২০০১ সালে আসনটিতে বিএনপির মনোনয়নেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। যদিও এক সময় তিনি কৃষক লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে, তার অনুসারী বিএনপির বড় এক কর্মী বাহিনী রয়েছে। ফলে, তিনি এ আসনে বড় একটি ফ্যাক্টর।
তবে, মাঠ ছাড়েননি বিএনপির আরও দুই প্রার্থীও। তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. শাহ্ আলম। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তিনিও দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন। শাহ্ আলমও নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। এর আগে জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
পেশায় ব্যবসায়ী শাহ আলমের ফতুল্লা অঞ্চলে বেশ প্রভাব রয়েছে। প্রতিষ্ঠিত দলীয় নেতা-কর্মীদের অনেকেই তার পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন দীর্ঘকাল। ফলে, তাদের একটি বড় অংশ কাজ করছে শাহ আলমের পক্ষে। তাছাড়া, তার পারিবারিক পরিচিতিও রয়েছে। বাবা হাজী উদ্দিনও ছিলেন বিএনপির সংসদ সদস্য।
আসনটিতে ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা দিয়েছেন ‘কিং মেকার’ খ্যাত আরেক বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আলী। ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই’র সাবেক সহসভাপতি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালের ওই নির্বাচনের পর বিএনপির সরকার বেশিদিন না টিকলেও অল্প সময়ের জন্য হলেও সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন আলী।
নারায়ণগঞ্জে রাজনীতির অঙ্গণে মোহাম্মদ আলীর নাম অনেকেই সমীহের সাথে উচ্চারণ করেন। তার ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতির মাঠে কৌশলী ভূমিকা তাকে ‘কিং মেকার’ খ্যাতি এনে দেয়। তাছাড়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমাণ্ডেরও আহ্বায়ক। তরুণদের চেয়ে প্রবীণ রাজনীতিক, কর্মীদের মাঝে তার গ্রহণযোগ্যতা বেশি। যদিও তার বিরুদ্ধে প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে।
বিএনপি ও জোটের এই চার প্রার্থীকে ছাপিয়ে আলোচনার তুঙ্গে আছেন আব্দুল্লাহ আল আমিনও। কেননা, তিনি গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণ নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এনসিপির প্রার্থী। এনসিপি নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ থাকায় এর প্রার্থী কে তাকে নিয়েও মানুষের জল্পনা-কল্পনা ছিল গত কয়েকদিন। তরুণদের নেতৃত্বের দলটি আসনটিতে তরুণ প্রার্থীই দিয়েছেন। পেশায় আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল আমিন দলটিরও গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব হওয়ার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ জেলা সমন্বয় কমিটিরও প্রধান। তাছাড়া, দলের শৃঙ্খলা কমিটির দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। দলের নেতা-কর্মীদের মাঝে তার গ্রহণযোগ্যতা বেশ।
তাছাড়া, আসনটিতে ইসলামিক ও সমমনা ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবেও আব্দুল্লাহ আল মামুনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তাকে আসনটি ছেড়ে দিতে জামায়াত তাদের প্রার্থী মাওলানা আবদুল জব্বারকে সরিয়ে নিয়েছে। যদিও আসনটিতে মাওলানা আবদুল জব্বারই ছিলেন বাকি চারটি আসনের চেয়ে জামায়াতের সবচেয়ে শক্ত প্রার্থী। অন্যদিকে, আব্দুল্লাহ আল আমিন নিজেও এক সময় ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ফলে তরুণদের সাড়ার পাশাপাশি জামায়াতের আকুণ্ঠ সমর্থনও পাবেন তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









