দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য আগে আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়।
সম্পূরক প্রশ্নে সাবিকুন্নাহার বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার সম্প্রতি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উৎপাদনের বিষয়ে আলোচনা করছে। এ পদ্ধতিতে বেশি কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা থাকলেও কৃষিজমি, বসতি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও জীববৈচিত্র্যের ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। ফুলবাড়ী প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা জরুরি হলেও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কারণে কৃষিজমি নষ্ট, মানুষের উচ্ছেদ এবং পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হলে সেটিকে জনকল্যাণমূলক উন্নয়ন বলা যায় না। এ জন্য পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব সমীক্ষা প্রকাশ এবং স্থানীয় জনগণের সম্মতি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের মানুষের জন্যই সরকার কাজ করছে। ফুলবাড়ীতে থাকা কয়লাকে বিশ্বের ভালো মানের কয়লার একটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই কয়লা উত্তোলনের মাধ্যমে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশের জন্যও তা ইতিবাচক হবে।
তবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আগে স্থানীয়দের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সেখানে যেসব বসতবাড়ি ও কৃষিজমি রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। স্থানীয়দের আয়-রোজগার যাতে বন্ধ হয়ে না যায়, সে জন্য প্রকল্প নেওয়া হবে এবং তারা যাতে ওই প্রকল্প থেকে কোনো না কোনোভাবে সুবিধা পান, তা পর্যালোচনা করা হবে। একই সঙ্গে পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সংরক্ষিত আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত স্বৈরাচারের সময়ে দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে কার্যত পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল। অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানিনির্ভরতার কারণে তৈরি বর্তমান জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
তিনি জানান, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৩০টি কূপ খনন শেষ হয়েছে এবং এসব কূপ থেকে ১৪০ এমএসসিএডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। চলমান আরও ৭টি কূপের খনন শেষ হলে অতিরিক্ত ৮৫ এমএসসিএডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। বাকি কূপগুলো খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করতে দুটি করে নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাস অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অফশোর ও অনশোরে গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন মজুত পাওয়া গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
সংরক্ষিত আসনের সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে আগ্রহ তৈরি করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি জানান, সৌরপ্যানেল স্থাপনে প্রয়োজনীয় পণ্যে কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দেশে দেশীয় শিল্প ও সোলার প্যানেল শিল্প গড়ে তুলতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি লিথিয়াম ব্যাটারি দেশে উৎপাদনের জন্যও কর মওকুফ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন, তাদের গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ১৫ পয়সা দরে কিনবে। বাল্ক রেটের অতিরিক্ত অর্থ সরকার প্রণোদনা হিসেবে দেবে।
সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছাদে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপনে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে।
সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি পানি, বায়ু ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন হলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও বাড়ানো সম্ভব হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









