ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের একটি বড় অংশ ঋণগ্রহীতা—এমন পরিসংখ্যান সামনে আসার পরই গভীর রাতে ফলাফলের গেজেট প্রকাশকে কেন্দ্র করে নতুন করে আইনি ও নৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) অভিযোগ তুলেছে, অযোগ্যতা, ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত গুরুতর প্রশ্নের তদন্ত না করেই নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি গেজেট প্রকাশ করেছে। তবে কমিশনের বক্তব্য, সবকিছু আইনানুগ প্রক্রিয়ায় ও নির্ধারিত সময়েই সম্পন্ন হয়েছে; তড়িঘড়ির কোনো প্রশ্নই নেই।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য, তারা যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তাহলে নির্বাচনের ফলাফলের সমীকরণ বদলে যায়। তখন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।’ তার দাবি, এমন প্রশ্ন ওঠার পর তদন্ত করার সাংবিধানিক ও আইনি সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন তা প্রয়োগ করেনি।
বিজয়ীদের প্রায় অর্ধেকই ঋণগ্রহীতা:
সুজনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে বিজয়ী ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৪৭ জনই ঋণগ্রহীতা—শতাংশের হিসাবে প্রায় ৫০ শতাংশ। তাদের মধ্যে ৩৬ জনের ঋণের পরিমাণ পাঁচ কোটি টাকার বেশি। ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে ১২৬ জনই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে নির্বাচিত।
সংগঠনটি জানায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঋণগ্রহীতার হার ছিল ৪৫ শতাংশ; অর্থাৎ এবার তা বেড়েছে। নির্বাচনের আগে ৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, মোট ২০২৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫১৯ জন (২৫.৬২ শতাংশ) ঋণগ্রহীতা ছিলেন। তাদের মধ্যে ৭৫ জনের ঋণ পাঁচ কোটির বেশি। সর্বোচ্চ ঋণগ্রহীতা প্রার্থী ছিল বিএনপির—সংখ্যা ১৬৭।
দ্বৈত নাগরিকত্ব ও হলফনামা নিয়ে প্রশ্ন:
সুজনের অভিযোগ, একাধিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন উঠেছিল। কেউ কেউ প্রয়োজনীয় নথি ছাড়া অথবা আদালতের ‘স্টে অর্ডার’ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। এসব অভিযোগের তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর গেজেট প্রকাশের অনুরোধ করা হলেও কমিশন তা আমলে নেয়নি বলে দাবি সংগঠনটির।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-এর ৯১ ধারায় গেজেট প্রকাশের পরও তদন্তের সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনে ফলাফল বাতিল বা পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও কমিশনের হাতে আছে। তার ভাষায়, ‘এখনো সময় আছে—ইসি চাইলে আইন প্রয়োগ করতে পারে।’
১১ দলীয় জোটের অভিযোগ, ইসির পাল্টা জবাব:
১৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটও একই অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনে লিখিত আপত্তি জানায়। অভিযোগ নাকচ করে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘গেজেট প্রকাশে তড়িঘড়ির প্রশ্নই আসে না। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় দ্রুত ও নির্ভুলভাবে ফলাফল প্রস্তুত করা হয়েছে।’
তিনি দাবি করেন, কমিশন সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাত-দিন পরিশ্রম করে যথাসময়ে গেজেট প্রকাশ করেছেন। বড় ধরনের সহিংসতা বা ভোট স্থগিতের ঘটনা না ঘটায় নির্বাচন প্রত্যাশার চেয়েও ভালো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আইনি বিতর্কের কেন্দ্রে আরপিও:
নির্বাচন সহিংসতামুক্ত হলেও প্রার্থীদের যোগ্যতা, হলফনামার সত্যতা ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার পরিসর শুধু ভোটগ্রহণে সীমাবদ্ধ নয়; প্রার্থিতার বৈধতা ও তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করাও তাদের দায়িত্বের অংশ।
এ অবস্থায় আরপিওর ৯১ ধারা প্রয়োগ করে কমিশন তদন্তে যাবে কি না—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তদন্ত হলে বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে; আর না হলে গেজেট প্রকাশই চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









