রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে ভোররাত থেকে গ্যাসের চাপ থাকে না বললেই চলে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, সেহরির সময় চুলা জ্বলে না, আর ইফতারের ঠিক আগে গ্যাসের চাপ হঠাৎ কমে যায়। ফলে রান্না অসম্পূর্ণ রেখে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
পবিত্র রমজানে সেহরি ও ইফতারের সময় যখন ব্যস্ত থাকার কথা রান্নাঘর, ঠিক তখনই চুলায় আগুন জ্বলছে না—গ্যাসের তীব্র সংকটে এমন দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। নির্ধারিত সময়ের বাইরে গ্যাস এলেও চাপ এত কম যে রান্না সম্পন্ন করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। এতে রোজাদারদের দৈনন্দিন জীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কথা বলে জানা যায়, এক সিলিন্ডারের দাম কয়েকশ’ টাকা বেড়ে যাওয়ায় মাসিক ব্যয় তালগোল পাকিয়ে গেছে। অনেকেই বলছেন, বিদ্যুৎ ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পর গ্যাসের দাম বাড়ায় পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়েছে।
সেহরিতে ভোগান্তি, ইফতারে হতাশা
রাজধানীর খিলগাঁও এর বাসিন্দা মিতু আক্তার। গ্যাস সংকটে ভুগছেন অনেকদিন ধরেই। এদিনকে তিনি বলেন, সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে হয় আমাদের। এর আগের মাসে সিলিন্ডার সাপ্লাই বন্ধ ছিল। তার আগে ডাবল দামে কিনতে হয়েছে। তারপর কিনলাম ইলেক্ট্রিক চুলা। বিদ্যুৎ বিলও ডাবল। এত ভোগান্তির পর এই মাসে আবার সিলিন্ডার পেলেও সেহরির সময় গ্যাসের চাপ একদমই নেই। আবার সন্ধ্যায় চাপ কমে যায়। এভাবে কতদিন চলব?’
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা জুথি পাল। এদিনকে তিনি বলেন, ‘ছোট দুইটা বাচ্চা নিয়ে আমার সংসার। তাদের জন্য প্রায় সারাদিনই টুকটাক কিছু না কিছু রান্না করতে হয়। কিন্তু দিনের কিছু সুনির্দিষ্ট সময়ে গ্যাস থাকে না। বিশেষ করে বিকালের পর থেকে। এটা আমাদের জন্য খুবই ভোগান্তির। একটা কারি কুকার কিনেছি। কিন্তু এতে একটা আইটেম রান্না করা যায়। অনেক সময় লাগে সবার রান্না করতে।’
বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কাকরি করেন দিশা আফরোজ। এদিনকে তিনিও বলেন আক্ষেপের কথা। তিনি বলেন, ‘ভোর ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছি, কিন্তু লোডশেডিং হলে সেটাও সম্ভব হয় না। পুরো রমজান কিভাবে যাবে, কে জানে।’
মিরপুরে থাকেন মাহমুদা লাবণী। পেশায় সরকারি চাকরিজীবী। এদিনকে তিনি বলেন, ‘সারাদিন অফিস করে এসে একটু শান্তিমতো রান্না করব, সেই উপায় নেই। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে চারজনের সংসার আমার। লাইনের গ্যাস হলেও চুলা জ্বলে না বললেই চলে। আমি সিলিন্ডার ব্লাস্ট হয়ে যাওয়ার ভয় পাই। তাই এভাবেই চলছি। ইলেক্ট্রিক চুলার দামও কম না। তবুও ভাবছি একটা কিনতেই হবে। আগে যে টাকায় বাজার করতাম, এখন সেই টাকায় শুধু গ্যাসই কিনতে হচ্ছে। প্রতি মাসে সিলিন্ডার কিনতে এখন আগের চেয়ে বেশি টাকা লাগছে। অন্য খাতে খরচ কমাতে হচ্ছে।’
বিকল্পের খোঁজে বাড়তি খরচ
গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার এলপিজি সিলিন্ডার বা ইন্ডাকশন চুলার দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু এতে মাসিক খরচ বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এই সংকট তৈরি হচ্ছে। রমজান মাসে স্বাভাবিকভাবেই গ্যাসের ব্যবহার বেড়ে যায়, কিন্তু সেই অনুযায়ী সরবরাহ বাড়ানো না হলে এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ চলছে এবং কিছু এলাকায় পাইপলাইনের মেরামত কার্যক্রম চলছে। তারা আশ্বাস দিয়েছেন, রমজানের মধ্যে পরিস্থিতি উন্নত হবে।
সমাধানের দাবি
ভুক্তভোগীরা বলছেন, অন্তত সেহরি ও ইফতারের নির্দিষ্ট সময় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জরুরি।
রমজান সংযম ও ইবাদতের মাস। কিন্তু গ্যাস সংকটে প্রতিদিনের মৌলিক চাহিদা পূরণই যখন কঠিন হয়ে পড়ে, তখন সেই আধ্যাত্মিক পরিবেশও ব্যাহত হয়। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গ্যাস সিলিন্ডারের বাড়তি দাম
এলপিজির মূল্যবৃদ্ধিতে রান্নাঘরে চাপ; নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যাখ্যা—আন্তর্জাতিক বাজার ও ডলারের প্রভাব দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের দাম আবারও বেড়েছে। ফলে শহর ও গ্রাম—দুই জায়গাতেই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পড়েছে নতুন সংকটে। মাসিক বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ায় অনেক পরিবার খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
দাম কত বাড়ল?
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) মাসভিত্তিক সমন্বয়ের মাধ্যমে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম ঘোষণা করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই সমন্বয় করা হয়েছে।
ভোক্তাপর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা ২১ পয়সা। ২ ফেব্রুয়ারি সোমবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই নতুন দাম ঘোষণা করেন। সেদিন সন্ধ্যা ছয়টা থেকে নতুন দাম কার্যকর হবে বলে জানানো হয়।
চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। গত মাসে (জানুয়ারি ২০২৬) দাম ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৫০ টাকা। গত মাসে দাম বেড়েছিল ৫৩ টাকা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) মাসিক সমন্বয়ের মাধ্যমে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন মূল্য ঘোষণা করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন—আন্তর্জাতিক বাজারে, এলপিজির দাম বৃদ্ধি ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, পরিবহন ও সরবরাহ খরচ বেড়ে যাওয়া—এই তিন কারণে দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে কি একইভাবে দ্রুত কমে খুচরা পর্যায়ে?
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য
এদিকে বিইআরসি প্রতি মাসেই এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। তবে বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে না। এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে। তবে গত এক মাসের বেশি সময় ধরে এলপিজির সরবরাহ–সংকট চলছে। প্রতি সিলিন্ডারে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দাম নিচ্ছেন এলপিজি বিক্রেতারা। এলপিজি ডিলার ও পরিবেশকরা বলছেন, আমদানি খরচ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দাম সমন্বয় না করলে লোকসান গুনতে হয়। তাদের দাবি, বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। রামপুরার এক সিলিন্ডার ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী এদিনকে বলেন, “কোম্পানিগুলো গ্যাস সাপ্লাই কমিয়ে দিয়েছে। আবার দামও বেশি রাখছে। তাই ১,৩০০ টাকার গ্যাস ১,৭০০-২৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। এখন গ্যাস আছে। তবে কতদিন থাকবে, সেটা বলা যায় না।”
একটা সিন্ডিকেট কি না জানতে চাইলে এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘এটা হতে পারে। কোম্পানি থেকে যদি গ্যাস সাপ্লাই না দেয় এবং বেশি দাম রাখে, তাহলে দাম বেশি নেয়া ছাড়া তো আমাদের উপায় নেই ।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়ে। রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি খাদ্যপণ্যের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
বিকল্প ও করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজি আমদানিতে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি বা বিশেষ সহায়তা চালু করা,দীর্ঘমেয়াদে পাইপলাইনের গ্যাস সম্প্রসারণসহ এলপিজির দাম বৃদ্ধি সাময়িক হলেও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—কীভাবে বাজার স্থিতিশীল রেখে সাধারণ মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করা যায়।
বাজার ঘুরে যা দেখা গেল
রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ঘোষিত দামের চেয়েও বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো ডিলার অতিরিক্ত পরিবহন খরচের অজুহাতে ৫০-১০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভোক্তারা বলছেন, বাজার তদারকি দুর্বল হওয়ায় এই সুযোগ নিচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।
ভিশনের একটি শোরুমে গিয়ে দেখা যায়, ইনফ্রারেড চুলু কিনছেন এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ইনডাকশনে নন স্টিক ফ্রাইপ্যান ছাড়া ব্যবহার করা যায় না। সেগুলো ব্যয়বহুল। এটার দাম একটু বেশি হলেও সব পাত্র ব্যবহার করা যায়।
শোরুমের এক বিক্রেতা বলেন, গত মাস থেকেই আমাদের ইনডাকশন এবং ইনফ্রারেড চুলা ভালোই বিক্রি হয়েছে। এটি বিকল্প হিসেবে নিচ্ছেন অনেকেই। আমরাও স্টকে রাখছি যেন কোনো ক্রেতা ফেরত না যায়।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ
অর্থনীতিবিদদের মতে, এলপিজির দাম বৃদ্ধি সরাসরি খাদ্যদ্রব্যের ওপর প্রভাব ফেলে। হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতে খরচ বাড়ে। বেকারি ও ছোট খাদ্য উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। গ্রামাঞ্চলে কাঠ বা বিকল্প জ্বালানিতে ঝুঁকতে পারে মানুষ, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকরফলে এটি কেবল জ্বালানির ইস্যু নয়, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির অংশ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









