আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জেলাজুড়ে ভোট গ্রহণের কার্যক্রম শুরু হলেও রাজশাহীর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো গণভোট সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। কী বিষয়ে গণভোট হবে, কিভাবে তাদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে হবে, কেন এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে কিংবা ভোট প্রদানের পদ্ধতি এসব প্রশ্নের উত্তর জানেন না গ্রাম, চর ও বস্তি এলাকার অধিকাংশ ভোটার। সরকারের সচেতনতা কার্যক্রম কেবলমাত্র শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় এই অজ্ঞতা রয়ে গেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
রাজশাহী জেলার পবা, মোহনপুর, তানোর ও বাগমারা উপজেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ থাকলেও গণভোট বিষয়টি তাদের কাছে নতুন ও অস্পষ্ট। অধিকাংশ ভোটার জানেনই না যে সংসদ নির্বাচনের ব্যালটের পাশাপাশি তাদের আরেকটি বিষয়ে ভোট দিতে হবে। এছাড়াও নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচার থাকলেও গণভোট বিষয়ে কোনো কার্যকর করতে দেখা যায়নি।
বাগমারা উপজেলার দামনাশ বাজারের ভোটার শহিদুল ইসলামের কাছে গণভোট সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি বলেন,“ভোট হবে জানি, কিন্তু গণভোট কী জিনিস তা কেউ বলেনি। ব্যালটে আলাদা কিছু থাকবে নাকি, সেটাও জানি না।” একই গ্রামের গৃহবধূ মোসাম্মৎ রাশেদা বেগম বলেন, “আমরা শুধু মার্কা দেখে ভোট দেই। গণভোট যদি আলাদা হয়, তাহলে আগে থেকে জানানো দরকার। না হলে ভুল হয়ে যাবে।”
পবা উপজেলার চর খিদিরপুরের দিনমজুর শফিকুল ইসলাম জানান,“নির্বাচনের কথা মাইকে শোনা যায়, কিন্তু গণভোটের কথা কেউ বলে না। এটা কী দেশের জন্য ভালো না খারাপ সেটাই বুঝি না।”
একই উপজেলার এক আদিবাসী পল্লীর ভোটার রামেশ টুডু বলেন,“আমাদের এলাকায় ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে যারা থাকেন, তারাও এখনো কিছু বোঝাননি। গণভোটের বিষয়টা যদি বুঝিয়ে বলা হতো, তাহলে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম।”
জানা গেছে, ‘দেশের চাবি আপনার হাতে’ স্লোগান সামনে রেখে সাংবিধানিক গণভোট উপলক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ডিজিটাল বিলবোর্ড ও ভোটের গাড়ির মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে। তবে রাজশাহী শহরে দু-একটি বিলবোর্ড চোখে পড়লেও উপজেলা বা গ্রামাঞ্চলে মাইকিং বা অন্য কোনো প্রচার কার্যক্রম নেই বললেই চলে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলেও পর্যাপ্ত প্রচার ও জনসচেতনতার অভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এতে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বলেন,“গণভোট সম্পর্কে অনেকেই জানে না। গণভোট কি, কেন দিতে হবে, কিভাবে দিতে হবে; এগুলো বিষয়ে সাধারণ ভোটাররা অজ্ঞত। গণভোট সর্ম্পকে জানাতে ভোটারদের হাতে কলমে শিখাতে হবে। এছাড়ও গ্রামে মসজিদে মসজিদে জুম্মার দিনে সবাইকে জানাতে হবে। বড় রাজনৈতিক সমাবেশে গণভোট সর্ম্পকে সচেতনতা তৈরী করা যেতে পারে। জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে ও হাটবাজারে মাইকিং এর মাধ্যমে গণভোট সর্ম্পকে বিস্তারিত জানাতে হবে। তাহলে মানুষ গণভোট সর্ম্পকে জানতে পারবে।”
এ বিষয়ে জেলা নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, গণভোট বিষয়ে প্রচার কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, তত দ্রুত মাঠপর্যায়ে স্পষ্ট ও সহজ ভাষায় গণভোট সম্পর্কে জানানো জরুরি।
ইউনিয়ন পর্যায় থেকে সিটি কর্পোরেশন পর্যন্ত গণভোটের প্রচারণা চলছে জানিয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক ও রির্টানিং অফিসার আফিয়া আখতার বলেন,“গণভোট সর্ম্পকে আমাদের প্রচারণ চলছে। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে সিটি কর্পোরেশন পর্যন্ত আমাদের প্রচার কার্যক্রম অব্যহত রয়েছে। ভোটের গাড়ি ও ডিজিটাল মাধ্যমেও প্রচারণ চলছে। আশা করছি নির্বাচনের আগেই এই অঞ্চলের ভোটাররা গণভোট সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবে এবং তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।” এছাড়াও গণভোট সর্ম্পকে প্রচারণার জন্য জেলা প্রশাসক গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা চেয়েছেন।
তবে নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, প্রান্তিক ভোটারদের গণভোট সম্পর্কে অজ্ঞতা শুধু ভোট প্রদানে বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করবে না, বরং গণভোটের গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তাই অবিলম্বে গণমাধ্যম, প্রশাসন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









