জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীদের ফৌজদারি দায়মুক্তি দিতে একটি অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে উপদেষ্টা পরিষদ। এই অধ্যাদেশ আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়ে আইনে পরিণত হবে।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অধ্যাদেশটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ’ সরকারের একটি ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি সরকারের যে অঙ্গীকার ছিল, এই অধ্যাদেশ তারই প্রতিফলন। ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংগঠিত কর্মকাণ্ডের জন্য কাউকে ফৌজদারি মামলায় জড়ানো যাবে না।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সংগঠিত কার্যাবলী থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিরোধ বলতে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে পরিচালিত কর্মকাণ্ডকে বোঝানো হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট কোনো ফৌজদারি দায়-দায়িত্ব থেকে অংশগ্রহণকারীদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
আইন উপদেষ্টা জানান, অধ্যাদেশ অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সংগঠিত কর্মকাণ্ডের কারণে যদি কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়ে থাকে, সেগুলো প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেবে সরকার। একই সঙ্গে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য নতুন করে কোনো মামলা দায়ের করা যাবে না।
তবে রাজনৈতিক প্রতিরোধের নামে ব্যক্তিগত বা সংকীর্ণ স্বার্থে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বা সহিংসতার ক্ষেত্রে এই দায়মুক্তি প্রযোজ্য হবে না বলে স্পষ্ট করেন তিনি। আইন উপদেষ্টা বলেন, লোভ, প্রতিশোধ কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থে সংঘটিত কোনো হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে না এবং সে ক্ষেত্রে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, কোন হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হয়েছে এবং কোনটি ব্যক্তিগত ও সংকীর্ণ স্বার্থে করা হয়েছে—তা নির্ধারণের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। কোনো ভুক্তভোগীর পরিবার যদি মনে করে যে তাদের স্বজন ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এবং এর সঙ্গে ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের কোনো সম্পর্ক ছিল না, তাহলে তারা মানবাধিকার কমিশনে আবেদন করতে পারবেন। কমিশন তদন্ত করে যে প্রতিবেদন দেবে, তা আদালতে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনের মতোই গণ্য হবে।
আইন উপদেষ্টা আরো জানান, মানবাধিকার কমিশন যদি মনে করে কোনো হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ হলেও ভুক্তভোগীর পরিবার আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য, সে ক্ষেত্রে সরকারকে সে বিষয়ে সুপারিশ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
মানবাধিকার কমিশন প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যেই নতুন কমিশন গঠিত হবে। এটি হবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, গত ১৫ বছরে রাজনৈতিক হয়রানিমূলকভাবে দায়ের করা প্রায় ২০ হাজার মামলা ইতিমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি আলাদা সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আইন উপদেষ্টা বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবুপরবর্তী সময়ে এ ধরনের দায়মুক্তির বিধান দেখা গেছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদেও এ ধরনের আইন প্রণয়নের সুযোগ রয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ হত্যাসহ যেকোনো সহিংস ঘটনার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হবে। রাজনৈতিক প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কহীন কোনো হত্যাকাণ্ড দায়মুক্তির আওতায় পড়বে না।
ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।



সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









