বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো সাধারণ নাগরিক কোনো ভুল করলে দ্রুত আইন তার সামনে হাজির হয়, কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় শাস্তির পরিবর্তে বদলি, ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা বা নীরব প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফলে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে- সরকার কি সত্যিই অসহায়, নাকি রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে এমন এক ক্ষমতার বলয় তৈরি হয়েছে, যার সামনে রাজনৈতিক কর্তৃত্বও অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে?
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনগণের করের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রের কর্মচারী। তাঁরা জনগণের সেবক, রাষ্ট্রের মালিক নন। কিন্তু বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রশাসনের একটি অংশ নিজেদের এমন অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে জবাবদিহির চেয়ে প্রভাব ও ক্ষমতার উপস্থিতি বেশি দৃশ্যমান। এ কারণেই কোনো ডিসি, ইউএনও, সচিব বা যুগ্মসচিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সাধারণ মানুষ প্রায়ই জানতে চায়, “শাস্তি কোথায়?”
আইনগতভাবে কিন্তু সরকারের হাতে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতার অভাব নেই। ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইন এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালায় অসদাচরণ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দায়িত্বে অবহেলা, অসততা, শৃঙ্খলাভঙ্গসহ নানা অপরাধের জন্য তিরস্কার থেকে শুরু করে পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরিচ্যুতি এবং বরখাস্ত পর্যন্ত বিভিন্ন শাস্তির বিধান রয়েছে। অর্থাৎ আইন নেই- এ কথা বলা যাবে না। বরং আইন যথেষ্ট কঠোর। সরকারি চাকরি আইনের বিধান অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা ফৌজদারি মামলায় এক বছরের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে চাকরি থেকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত হওয়ার বিধানও রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, আইনে এত বিধান থাকার পরও বাস্তবে কেন মানুষ বদলি ছাড়া বড় কোনো শাস্তি খুব কম দেখতে পায়?এর উত্তর খুঁজতে হলে বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির দিকে তাকাতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি প্রশাসনে একটি অলিখিত সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যেখানে সহকর্মীকে রক্ষা করার প্রবণতা প্রবল। অভিযোগ উঠলে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বদলি দেওয়া হয়, কারণ এটি রাজনৈতিক চাপ কমায়, গণমাধ্যমের আলোচনাও কিছুটা স্তিমিত করে। কিন্তু বদলি কোনো শাস্তি নয়। একজন কর্মকর্তা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গেলেই তাঁর দায়বদ্ধতা শেষ হয়ে যায় না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন জেলা প্রশাসক, পুলিশ কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, কর কর্মকর্তা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ, অনিয়ম বা ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি হয়েছে, কিন্তু তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ হয়নি। এতে জনগণের মধ্যে ধারণা জন্মেছে যে তদন্ত কমিটি অনেক সময় সত্য উদ্ঘাটনের চেয়ে সময়ক্ষেপণের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি আলোচিত এক যুগ্মসচিবকে ঘিরে পারিবারিক পরিচয় অস্বীকারের অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে। ঘটনাটি শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলে। কারণ একজন সাধারণ নাগরিকের আচরণ এবং রাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আচরণের সামাজিক প্রভাব এক নয়। উচ্চপদে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে জনগণ অধিকতর নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতা প্রত্যাশা করে।
এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে; সরকার কি সরকারি কর্মচারীদের ভয় পায়? ভয় শব্দটি হয়তো পুরোপুরি সঠিক নয়, কিন্তু বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের প্রশাসন রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। সরকার পরিবর্তন হয়, মন্ত্রী পরিবর্তন হয়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলায়; কিন্তু প্রশাসন স্থায়ী থাকে। ফলে যে কোনো সরকারই আমলাতন্ত্রের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার আগে বহুবার হিসাব-নিকাশ করে। কারণ প্রশাসনিক অসহযোগিতা বা অনীহা রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই অনেক সময় সরকার কঠোর শাস্তির বদলে আপসকামী প্রশাসনিক ব্যবস্থা বেছে নেয়। কিন্তু এর একটি ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। যখন একজন কর্মকর্তা দেখেন যে তাঁর সহকর্মী বড় ধরনের বিতর্কের পরও কেবল বদলি হয়ে অন্যত্র দায়িত্ব পেয়েছেন, তখন তাঁর কাছে একটি বার্তা যায়- ঝুঁকি খুব বেশি নয়। আর এই মানসিকতাই শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করে।
শাস্তিহীনতা শুধু দুর্নীতি বাড়ায় না; এটি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে। একজন স্কুলশিক্ষক, একজন পুলিশ সদস্য, একজন উপজেলা কর্মকর্তা কিংবা একজন সচিব- সবার জন্য যদি সমান জবাবদিহি না থাকে, তাহলে আইন তার নৈতিক শক্তি হারায়।
বাংলাদেশে বহু বছর ধরে দুর্নীতিবিরোধী নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ডিজিটাল সেবা চালু হয়েছে, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দৃশ্যমান শাস্তির সংখ্যা এখনও জনগণের প্রত্যাশার তুলনায় কম বলেই মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। এই বাস্তবতা সরকারও বুঝতে পেরেছে বলেই সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি চাকরি আইন আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে সরকারি চাকরিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত শাস্তি, বাধ্যতামূলক অবসর এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণের মতো প্রস্তাব সামনে এসেছে। সরকারিভাবে বলা হয়েছে, দায়িত্বে অবহেলা বা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। এটি প্রমাণ করে যে সরকার নিজেও স্বীকার করছে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় কার্যকর জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। তবে শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আইনের সমান প্রয়োগ। একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ; কিন্তু একজন অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব, ডিসি বা প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একই কঠোরতা দেখাতে না পারলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হবে না।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বহু সময় এসেছে যখন জনগণ প্রশাসনের ওপর আস্থা হারিয়েছে। আবার এমন সময়ও এসেছে যখন সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তারা নিজেদের কর্মদক্ষতা দিয়ে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছেন। তাই পুরো প্রশাসনকে এক কাতারে ফেলা অন্যায় হবে। অসংখ্য সৎ কর্মকর্তা এখনও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার অপকর্মের দায় শেষ পর্যন্ত পুরো প্রশাসনের ওপর এসে পড়ে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা তাঁর ক্ষমতা থেকে নয়, তাঁর জবাবদিহি থেকে আসে। একজন কর্মকর্তা যত বড় পদেই থাকুন না কেন, তিনি সংবিধানের ঊর্ধ্বে নন। জনগণের করের অর্থে বেতন নেওয়া একজন কর্মচারী যদি আইনের বাইরে অবস্থান করেন, তাহলে গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
আজ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যে প্রশ্ন করছে, দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে বদলি কেন, শাস্তি কেন নয়? এটি আসলে শুধু প্রশাসনিক প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রশ্ন। কারণ মানুষ দেখতে চায়, আইন সবার জন্য সমান কি না। যদি একজন রিকশাচালক, দোকানদার বা সাধারণ সরকারি কেরানি ভুল করলে দ্রুত জবাবদিহির মুখোমুখি হন, তাহলে একজন ডিসি, সচিব বা যুগ্মসচিব কেন ভিন্ন সুবিধা পাবেন? রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন পদমর্যাদা নয়, অপরাধই হবে বিচারের একমাত্র মানদণ্ড। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো, জিডিপি বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের বিশ্বাসের ওপর। আর সেই বিশ্বাস গড়ে ওঠে তখনই, যখন জনগণ দেখে- প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা সত্যিই প্রজাতন্ত্রের সেবক; তারা আইনের ঊর্ধ্বে কোনো বিশেষ শ্রেণি নয়। শাস্তিহীনতা যেখানে নিয়ম হয়ে যায়, সেখানে দুর্নীতি ব্যতিক্রম থাকে না; সেটিই সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।
লেখক : ন্যাশনাল এসোসিয়েট এন্ড কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (বাংলাদেশ), আইএসএইচআর


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









