মহাবিশ্বে যতগুলো প্রাণীর প্রজাতী আছে তার মধ্যে মানুষ প্রজাতীটি নিঃসন্দেহ অমূল্য সম্পদ। যদিও বিশ্ব ভারসাম্য ঠিক রাখতে বা পৃথিবী ও মহাবিশ্ব টিকিয়ে রাখতে এবং বাস্তুসংস্থান নীতির ভারসাম্য বজায় রাখতে সকল প্রকার উদ্ভিদ ও প্রাণীসহ অন্যান্য উপাদানেরও বিকল্প নেই। তবুও মানুষ সৃষ্টি সত্যিই বিস্ময়কর ব্যাপার। তার কারণ আমরা যদি বিভিন্ন প্রাণীগুলোর দিকে তাকায় তো দেখতে পায় তাদের সীমাবদ্ধতা অনেক।
বিশেষ করে ভাষার মত একটা অমূল্য সম্পদের অধিকারী এই মানব প্রজাতী। যারা নিজেরা নিজেরা সেটাকে টিকিয়ে রাখতেও লিখনি পদ্ধতির পাশাপাশি আনুষাঙ্গিক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেটাকে দিনকে দিন সমৃদ্ধ করে চলেছে। অন্যান্য ভাষার সাথে সেটার সহজলভ্য বিনিময়কেও তারা ডিজিটাল পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হচ্ছে। এরপর তো আছে সংস্কৃতি যা ভাষা ও সম্পর্কের গভীর যোগসূত্র।
আচরণগত বিষয়কে দীর্ঘসূত্রিতায় আবদ্ধ করতেই এই সংস্কৃতির উদয় যা মানবীয় দিকটি চর্চা করতে শেখায়। যদিও এটার খারাপ দিকের প্রয়োগটাও বর্তমানে কালচারাল টেরোরিস্টরা ইউজ করে নিজেদের আগ্রাসী মনোভাবটাকে বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে। এছাড়া বাকিটাকে তো মোটামুটি সম্প্রীতি সৃষ্টির প্রধান নিয়ামকই বলা চলে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, মানুষ আজ বড়ই অদ্ভূত স্বভাবের হয়ে যাচ্ছে। অথচ এদের সংখ্যা টিকানোটাকে মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে নেওয়া উচিৎ ছিল। আমরা জানি, সকল প্রাণীরাই নিজেদের বংশীয় ধারাবাহিকতা টিকাতে যখন চরমভাবে তৎপর আমরা মানুষেরা তখন সেটা সীমাবদ্ধ করে ফেলতে বদ্ধপরিকর। এটা আসলে প্রকৃত অর্থে বড়ই তাজ্জবের বিষয়। ইতোপূর্বের আট লাখ বছর আগের ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা জানতে পারি, সেবার মানুষের সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোটায় চলে এসেছিল। মানব প্রজাতী বিলুপ্ত হতে চলেছিল। সে ধাক্কা সামাল দিয়ে যখন আমরা আজকে সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যায় উত্তীর্ণ হতে চলেছি তখন আর বাঁধা কেনো ? যারা খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা সংকটের দোহাই দিয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে শূন্যের কোটায় আনার জন্য সদা-সর্বদা স্বচেষ্ট হয়ে কাজ করছে তারা কি সারা বিশ্বে দূর্ভিক্ষে-রোগে-শোকে জরজর্ণ হয়ে অকালে প্রায়াত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ সহকারে কাজ করছেন ? নিশ্চয়ই করছেন না।
আজকে আফ্রিকা, ইয়ামেন, ইরাক, সিরিয়া হয়ে ফিলিস্তীনে যখন লাখ লাখ লোক না খেতে পেয়ে ক্ষুধার তাড়নায় অকালে জীবনলীলা সাঙ্গ করে পরপারে পাড়ি জমাচ্ছে তাদের প্রতি কি কেউ সহানুভূতি নিয়ে পাশে দাঁড়াচ্ছে ? নিশ্চয়ই না, কারণ তাদেরকে আর দশটা অন্য প্রাণীর মতই সরলভাবে দেখা হচ্ছে। মরলে মরুক, থাকলে থাকুক বা যাতে না থাকে সেজন্য আলাদাভাবে সকল প্রকার কূটকৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিশেষ করে, কৃত্রিম দূর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে মেরে ফেলা হচ্ছে বা জন্ম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গতিরোধ করা হচ্ছে। এগুলোর কোনোটাই ভালো কথা নয়। কারণ মানুষ জীনগত অবস্থা থেকে কোষের মাধ্যমে অঙ্গগতভাবে যে চরম বৈচিত্র্য সৃষ্টির গভীর রহস্যে ভরা একটা প্রজাতী তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তাই এটার অমূল্য মূল্য সম্মন্ধেও আমাদেরকে জানতে হবে। আমাদেরকে মানুষের বেঁচে থাকার গুরুত্ব ও তাৎপর্য্য সম্মন্ধে সম্যক অবগত হতে হবে। শুধুমাত্র “মানব জনম অমূল্য সম্পদ” এ প্রবাদ-প্রবচন মুখে আওড়ালেই চলবে না।
আজকে সারা পৃথিবীতে যে একশত বিশ কোটি মানুষকে দূর্ভিক্ষ দ্বারা তিলে তিলে হত্যা করা হচ্ছে এর একটা বিহিত করতে হবে। যেসব পাশ্চাত্য দেশগুলো মানবাধিকার সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেও ফিলিস্তীনে মানুষকে না খাইয়ে অসহনীয় কষ্ট দিয়ে হত্যা করছে তাদেরকে এখনই অস্বীকার করার উপযুক্ত সময়। সারা দুনিয়ায় সাম্প্রদায়িকতার দাবানল জ্বালিয়ে দিয়ে যারা মানব জাতীর চরম সর্বনাশ ডেকে আনছে তাদেরকে এখনই পরিত্যাজ্য। যুদ্ধ-বিগ্রহ, মারামারি-কাটাকাটির দ্বারা যারা সারা দুনিয়াকে সাবাড় করে দিতে চাচ্ছে তাদেরকে এখনই মানব জাতীর চিরশত্রু বলে প্রত্যাখ্যান করা জরুরি। এরা তো তারা, যারা সংখ্যায় অল্প সংখ্যক বলে অন্য ধর্ম-মত-পথের মানুষগুলোর সংখ্যা মেনে নিতে পারছে না। সেই লেজ কাটা শেয়ালের গল্পের মত বিষয়টি, যেখানে নিজের লেজ নেই বলে অন্যের লেজও যাতে না থাকে সেই বন্দোবস্ত করা।
আরেকটা কথা, এই বাংলায়ও ৭৬ এর মনন্তর তথা ১৯৪৩ সালের দূর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়েছিল কৃত্রিমভাবে এদেশের জমিজমা খালি করার জন্য যাতে জনশূন্য করে সকল কিছু নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যায়। শুধু তাই নয়, ইতোপূর্বে প্বার্শবর্তীদেশ ভারতের জরুরি অবস্থার সময় (১৯৭৫-১৯৭৭) সংঘটিত জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচিটিও তেমন একটা ব্যাপার যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে হয়েছিল। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা। এই সময়ে, বিশেষ করে ১৯৭৬ সালে, প্রায় ৬০ লক্ষ (৬ মিলিয়ন) পুরুষকে জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ (Vasectomy) করা হয়েছিল। কিছু সূত্র অনুযায়ী, এই পুরো জরুরি অবস্থার সময়কালে মোট ৮০ লাখের (৮ মিলিয়ন) বেশি পুরুষকে জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ করা হয়েছিল যার মধ্যে এই কর্মসূচিতে প্রায় ২ হাজার মানুষের ভুল অস্ত্রোপচারের কারণে মৃত্যুও হয়েছিল।
এসব চিন্তা-ভাবনা উদয় হয় মূলতঃ দুষ্টু বস্তুবাদী বুদ্ধিজীবিদের গোবুরে মাথা থেকে। পৃথিবীতে কি সম্পদ কম ? নিশ্চয়ই আলো-বাতাস-মাটি-পানির মত সেগুলোও পর্যাপ্ত। কিন্তু পুঁজিবাদীরা সম্পদগুলো কুক্ষিগত করে রেখেছে বলে আজকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দূর্ভিক্ষ দেখা দিচ্ছে। শত কোটি মানুষ না খেয়ে মরছে। এরজন্য শুধুই দায়ী পুঁজিবাদী ব্যবস্থাপণা। তাই সাধারণ মানুষকে সোচ্চার হতে হবে পুঁজিতন্ত্রের বিপক্ষে। জনসংখ্যা কমানোর জন্য অস্থির হওয়ার কিছু নেই। বিশেষ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে খাদ্যে ভেজাল বা বিষ মিশিয়ে কিংবা করোনার টীকা দিয়ে বা অন্য উপায়ে জন্মহার বৃদ্ধিকে যে শূন্যের কোটায় আনার গভীর ষড়যন্ত্র করছে পুঁজিবাদী নিউ ওয়াল্ড অর্ডার বাস্তবায়নকারীরা সে বিষয়ে জন সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। “দু’টি নয়, একটা সন্তানই যথেষ্ট” এই সব শয়তানী কথাবার্তা মেনে নেওয়া যাবে না। কারণ স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রীক মানুষগুলোই আজকে পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় শয়তান। তারা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে, মানুষকে ভুলভাল তথ্য-উপাত্ত এবং ভয়ভীতি পরিদর্শন করে নিজেদের হাতের কব্জায় রাখতে চায়। সুতরাং চলমান সময়ে আমাদেরকে হতে হবে বিচক্ষণ।
একদিকে, বিষ দিয়ে অসুখ-বিসুখ ও বিভিন্ন কায়দায় মানুষকে মারার কূটকৌশল প্রয়োগ করছে। অন্যদিকে, ‘বাড়তি জনসংখ্যা দেশ-জাতীর জন্য বোঝা স্বরুপ” বলে নীতি-নৈতিকতার আজগুবি কথাবার্তা শুনাচ্ছে। সারা দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গায় দূর্ভিক্ষ ও যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে মানুষ মারার পায়তারা করেও তাদের স্বাদ মিটছে না বলে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের দাম বাড়িয়ে দিয়ে মানুষের সংসার খরচ সাধ্যের বাইরে নিয়ে গিয়ে খরচের লাগাম দীর্ঘায়িত করে মানুষকে কুক্ষিগত করে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি রোধ করে দিচ্ছে। অথচ “একটা প্রাণ একটা সম্ভাবনা, একটা বিরাট পৃথিবীর আশা-আকাঙ্খা ও স্বপ্ন”।
লেখক : গবেষক ও দার্শনিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









