ঈদ মানেই আনন্দ। পরিবারে ফেরা। প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো। কিন্তু আমাদের দেশে ঈদের যাত্রা যেন ধীরে ধীরে আরেকটি ভয়ের নাম হয়ে উঠছে। প্রতিবছর ঈদ আসে। আবার প্রতিবছরই আসে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দীর্ঘ তালিকা। একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে দেখলাম, এবারের ঈদুল আজহার যাত্রায় ১০ দিনে ২০০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রাণ হারিয়েছেন ২২৩ জন। আহত হয়েছেন কতজন, তার সঠিক হিসাবও পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এইসব মৃত্যুর দায় কে নেবে? প্রতিবার দুর্ঘটনার পর আমরা সংখ্যা গুনি। কতজন মারা গেলেন, কতজন আহত হলেন, কতটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হলো; এসব তথ্য প্রকাশিত হয়। তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। পরের ঈদে আবার একই দৃশ্য। এভাবে কি চলতে পারে?
একজন মানুষের মৃত্যু শুধু একটি সংখ্যা নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার। একজন উপার্জনক্ষম মানুষ মারা গেলে পুরো পরিবার অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। আবার অনেকেই বেঁচে থাকেন, কিন্তু পঙ্গুত্ববরণ করেন। তাদের কষ্টের হিসাব কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।
দুর্ঘটনার জন্য শুধু একজন চালককে দোষ দিলেই দায় শেষ হয়ে যায় না। এটি একটি সামগ্রিক ব্যর্থতার চিত্র। যদিও একটি বড় বিষয় অদক্ষ ও বেপরোয়া গাড়ি চালোনা । অনেক চালক যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া সড়কে যানবাহন চালাচ্ছেন। লাইসেন্স ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও বহু অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বড় যানবাহনের পাশাপাশি বর্তমান সময়ে মোটরসাইকেলের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। তরুণদের একটি অংশ মোটরসাইকেলকে গতির বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে। হেলমেট ব্যবহার না করা, এক মোটরসাইকেলে তিনজন বা চারজন আরোহী, ঝুঁকিপূর্ণ চালনা; এসব এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। তারপরেও আছে, সড়কের ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনা। কোথাও গর্ত, কোথাও ভাঙা রাস্তা, কোথাও অপর্যাপ্ত সাইনবোর্ড। অনেক স্থানে সড়ক নির্মাণ বা সংস্কারের কাজ চলে, কিন্তু নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকে না। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
এখানে সড়ক নির্মাণকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদেরও দায় রয়েছে। একটি সড়ক শুধু নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সেটি কতটা নিরাপদ, সেটিও নিশ্চিত করতে হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমাদের দেশেও এমন উদ্যোগ আরও জোরদার হওয়া দরকার।
গবেষকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কোথায় বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে, কেন ঘটছে, কোন ধরনের যানবাহন বেশি ঝুঁকিতে আছে, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কার্যকর সুপারিশ দিতে হবে। গবেষণা শুধু সেমিনার বা প্রতিবেদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তা বাস্তব নীতিনির্ধারণে কাজে লাগতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। আইন প্রয়োগে কঠোরতা দরকার। অযোগ্য চালককে সড়কে নামতে দেওয়া যাবে না। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি বাড়াতে হবে।
তবে শুধু রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে থাকলেও হবে না। সমাজকেও সচেতন হতে হবে। যাত্রী হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে। বেপরোয়া চালনা দেখলে প্রতিবাদ করতে হবে। হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। কয়েক মিনিট সময় বাঁচানোর জন্য জীবনের ঝুঁকি নেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। স্বস্তির বিষয়, এবারের ঈদে এখন পর্যন্ত বড় কোনো লঞ্চডুবি বা নৌ দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু সড়কে যে প্রাণহানি ঘটেছে, সেটিও কোনো অংশে কম নয়। আমরা আর কতদিন শুধু মৃত্যুর সংখ্যা গণনা করব? আর কত পরিবারকে শোকের ভার বহন করতে হবে? আর কত শিশু বাবাকে হারাবে, কত মা সন্তানকে হারাবে?
সড়ক দুর্ঘটনা কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়। এটি প্রতিরোধযোগ্য। সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ, নিরাপদ সড়ক নির্মাণ, দক্ষ চালক তৈরি এবং জনসচেতনতা, এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানি অনেক কমানো সম্ভব। ঈদের আনন্দ যেন আর কোনো পরিবারের জন্য শোকের কারণ না হয়। মৃত্যুর মিছিল থামাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ প্রতিটি জীবন মূল্যবান। প্রতিটি মৃত্যু আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার স্মারক।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক
সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









