সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সংসদে উপস্থাপন করতে যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, যেসব জাতীয় বিষয় মনোযোগ দাবি করে, সেগুলো জাতীয় বাজেটে যথাযথ আর্থিক বরাদ্দের মাধ্যমে গুরুত্ব পাবে। স্বাস্থ্য এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত, যা বাজেটে যথাযথ মনোযোগ পাওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্যখাতে সঠিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হলে এর আর্থিক প্রতিফলনও ইতিবাচক হবে।
কারণ, সুস্থ মানুষ জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে, আর অসুস্থ মানুষ অর্থনীতি ও সমাজের ওপর বোঝা হয়ে থাকে। স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে কাজ করছে। এসডিজি-৩ ভালো স্বাস্থ্য ও কল্যাণের ওপর গুরুত্বারোপ করে, যেখানে সব বয়সের মানুষের সুস্থ জীবন ও কল্যাণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশে কুষ্ঠ অন্যতম একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সমস্যা। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি অবহেলিত ছিল।
সময়মতো ও মানসম্মত চিকিৎসা নিলে এটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও এখনো এটি একটি সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। দেশের সর্বত্র কুষ্ঠরোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসা বিনামূল্যে পাওয়া যায়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং কুষ্ঠরোগী শনাক্তে উদ্যোগের ঘাটতিকে এ রোগ নির্মূলে প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অনেক বাংলাদেশির কাছে কুষ্ঠ অতীতের কোনো রোগ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি এখনো বিদ্যমান।
বাংলাদেশ এখনো কুষ্ঠরোগের জন্য বিশ্বের ২৩টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশের মধ্যে রয়েছে, যেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হয়। ২০২৩ সালে দেশে ৩,০০০ এর বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশ শিশু এবং গ্রেড-২ প্রতিবন্ধিতার হারও এখনো বেশি। দ্য লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ (টিএলএমআই-বি) এর তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত ব্যক্তিরা যদি প্রাথমিক পর্যায়ে সময়মতো ও মানসম্মত চিকিৎসা না নেন, তাহলে তারা প্রতিবন্ধিতার শিকার হতে পারেন। প্রায় ১০ শতাংশ কুষ্ঠরোগী পরে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন, মূলত সময়মতো ও মানসম্মত চিকিৎসার অভাবে।
তাই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী শনাক্ত করে তাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কুষ্ঠ নিয়ে প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কার এর কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা শিক্ষা ও চাকরি থেকে বঞ্চিত হওয়াসহ নানা ধরনের সামাজিক বর্জনের শিকার হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, “শূন্য কুষ্ঠরোগ”- অর্থাৎ শূন্য সংক্রমণ, শূন্য প্রতিবন্ধিতা, শূন্য কুসংস্কার ও বৈষম্য- অর্জনে বৈশ্বিক ও জাতীয় বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি। তা সত্ত্বেও, বাংলাদেশের জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটে কুষ্ঠরোগের জন্য আলাদা বরাদ্দ খুবই সীমিত। সরকার যখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রস্তুত করছে, তখন স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী, কুষ্ঠজয়ী ব্যক্তি ও উন্নয়ন অংশীদাররা রোগ সংক্রমণ বন্ধে নির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের দাবি জানাচ্ছেন।
বাংলাদেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। বছরের পর বছর ধরে রোগীর সংখ্যা কমেছে এবং সামাজিক কুসংস্কার কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। ডব্লিউএইচও সরকারকে নতুন কৌশলগত পরিকল্পনা ও দেশীয় মালিকানাধীন “জিরো লেপ্রসি রোডম্যাপ” বাস্তবায়নে সহায়তা করছে। কিন্তু টেকসই অর্থায়ন ছাড়া এই অগ্রগতি দ্রুত থেমে যেতে পারে। ডব্লিউএইচও বিনামূল্যে মাল্টিড্রাগ থেরাপি (এমডিটি) সরবরাহ করে, যা দিয়ে কুষ্ঠরোগ নিরাময় সম্ভব। আসল ব্যয় হয় দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ার কারণে। যাদের গ্রেড-২ প্রতিবন্ধিতা হয়- যেমন হাতের আঙুল বাঁকিয়ে যাওয়া, পায়ে সমস্যা বা অন্ধত্ব- তারা আয়ের উৎস হারান, আজীবন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় এবং শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হন। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি প্রতিবন্ধিতা ঠেকানোর খরচ, আজীবন একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে সহায়তা করার খরচের তুলনায় অনেক কম। তাই কুষ্ঠরোগে বাজেট বরাদ্দ দান নয়; এটি অর্থনৈতিক বিচক্ষণতা।
বাংলাদেশের সংবিধানে স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। জাতীয় কুষ্ঠ কৌশল এসডিজি ৩.৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কুষ্ঠরোগে অর্থায়ন না করা এই দুই প্রতিশ্রুতিরই পরিপন্থী। অধিকাংশ নতুন রোগী নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধার মতো উত্তরাঞ্চলীয় জেলায় পাওয়া যায়- যেগুলো আগেই দারিদ্রের চাপে রয়েছে। একটি লক্ষ্যভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ সরাসরি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপকারে আসবে। অর্থায়ন অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দেয়। যখন কুষ্ঠরোগকে “সংক্রামক রোগ” খাতের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয় এবং আলাদা বরাদ্দ থাকে না, তখন জেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সক্রিয় রোগী শনাক্তকরণ, সংস্পর্শ অনুসন্ধান বা জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিকল্পনা করতে হিমশিম খান। এখনো কুষ্ঠজয়ী অনেক ব্যক্তি বাসস্থান ও চাকরি থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করেন।
ডব্লিউএইচও’র রোডম্যাপে স্পষ্টভাবে “সামাজিক কুসংস্কার মোকাবিলা ও মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ”-এর কথা বলা হয়েছে। এসব কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশিক্ষক, উপকরণ ও গণমাধ্যম প্রচারণা দরকার- যা সবই বাজেটের বিষয়। যক্ষ্মা, ডেঙ্গু বা ডায়াবেটিসের তুলনায় বছরে ৩,০০০ কুষ্ঠরোগীর সংখ্যা হয়তো কম মনে হতে পারে। নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই বেশি মৃত্যুহারের রোগগুলোর দিকে অর্থ সরিয়ে দেন। কিন্তু কুষ্ঠরোগ উচ্চমাত্রার প্রতিবন্ধিতা ও সামাজিক কুসংস্বার বহনকারী একটি রোগ।
প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধিতার বোঝা বিশাল, এবং এটি নির্দিষ্ট এলাকায় কেন্দ্রীভূত হওয়ায় স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। দশকের পর দশক ধরে এমডিটি ওষুধ, কারিগরি সহায়তা ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম দাতানির্ভর ছিল। ডব্লিউএইচও, সাসাকাওয়া লেপ্রসি ইনিশিয়েটিভ এবং বিভিন্ন এনজিও এই ঘাটতি পূরণ করেছে। এর ফলে একটি চক্র তৈরি হয়েছে- দাতারা অর্থ দেওয়ায় জাতীয় বাজেটে কখনো আলাদা বরাদ্দ গড়ে ওঠেনি। এখন বৈশ্বিক অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ (এনটিডি) খাতে অর্থায়ন কমে আসায় বাংলাদেশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৯৯৮ সালে নির্মূল অবস্থার স্বীকৃতির পর কুষ্ঠরোগকে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে একীভূত করেছে। কিন্তু এই একীভূত ব্যবস্থা তখনই কার্যকর হয়, যখন জনবল, প্রশিক্ষণ ও নজরদারিতে অর্থায়ন থাকে। সুরক্ষিত বাজেট বরাদ্দ না থাকলে উপজেলা হাসপাতালগুলোতে সংকট দেখা দিলে কুষ্ঠরোগ কার্যক্রমই প্রথমে বন্ধ হয়ে যায়।
কুষ্ঠরোগ এমন কোনো রোগ নয়, যা মহামারির মতো শিরোনাম হয়। এটি ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়। বাজেট বিতর্কে এ রোগের পক্ষে শক্তিশালী কোনো জনমত নেই। আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত দরিদ্র ও প্রান্তিক হওয়ায় তাদের কণ্ঠও সীমিত। সরকার বারবার “কাউকে পেছনে ফেলে না রাখার” অঙ্গীকার করেছে। খসড়া অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও ভিশন ২০৪১ সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কুষ্ঠরোগ নির্মূলও ঘোষিত লক্ষ্য। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ ছাড়া এসব লক্ষ্য কেবল ইচ্ছা হয়েই থাকবে। ডব্লিউএইচও (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) স্পষ্ট করেছে যে, তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অংশীদার হিসেবেই থাকবে, তবে জাতীয় বিনিয়োগ অপরিহার্য। সরকারের নতুন কৌশলগত পরিকল্পনা কেবল সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে চলতে পারে না।
বাংলাদেশ যখন আগামী বাজেট প্রস্তুত করছে, তখন নাগরিক সমাজ, চিকিৎসক ও কুষ্ঠজয়ীরা তিনটি বিষয় দাবি করছেন: জাতীয় কুষ্ঠ কর্মসূচির জন্য আলাদা পরিচালন বাজেট, ২০৩০ সাল পর্যন্ত মধ্যমেয়াদি অর্থায়ন এবং স্বচ্ছ ব্যয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। বাংলাদেশ পোলিও নির্মূল করেছে। কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণেও সফলতার পথে রয়েছে। কুষ্ঠরোগও পরবর্তী সাফল্য হতে পারে। তবে তার জন্য আমাদের রোগটিকে গুরুত্ব দিতে হবে, অর্থায়ন করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত নির্মূল করতে হবে। এর ব্যয় খুব বেশি নয়। কুষ্ঠ নির্মূলে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা এবং রোগী শনাক্তে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীদের সক্রিয়ভাবে নিয়োজিত করা অত্যন্ত জরুরি।
পাশাপাশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কুষ্ঠ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া, জটিলতায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, কুষ্ঠজনিত প্রতিবন্ধীদের যথাযথ পুনর্বাসন এবং কুষ্ঠরোগ নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার দূর করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতে কর্মরত অধিকারকর্মীরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, নীতিনির্ধারকেরা বাজেট উপস্থাপনের সময় জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









