মানুষের আশ্রয়ের নিরাপত্তা পাওয়ার আইনগত ও মানবাধিকারিক স্বীকৃতিকে বোঝায়। এছাড়া অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষিতে এটি নিরাশ্রয় বা গৃহহীন মানুষের জন্য সরকারি আশ্রয় ও পুনর্বাসনের আইনি অধিকারকে নির্দেশ করে। এই বিষয়টি আর্ন্তজাতিকভাবে গৃহিত যা জাতি সংঘভুক্ত প্রতিটিদেশকেই পালন করতে হেব। সম্প্রতি ভারত তার দেশ থেকে উদ্বাস্ত , গৃহহীন, ভবঘুরে বা বেকার ,ভিক্ষুক , অন্য ধর্ম পালনকারী কিছু মানুষ করে ধরে ধরে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে। বিষয়টি অত্যান্ত নীতি গর্হিত একটি কাজ যা আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার সনদএর সাথে সাংঘর্ষিক।
হতে পারে তারা ভারতের নিবন্ধিত ভোটা না,তার কারণ হয়ত যে কোন সমস্যার জন্য তারা নিবন্ধিত হয় নাই , তাই বলে তাদেরকে বাংলাদেশী আখ্যা দিয়ে পুশ ইন করাটা কি যৌক্তিক। জাতি সংঘের মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র, ১৯৪৮ এ ঘোষণায় অধিকারসমূহে বলা আছে , গোত্র, ধর্ম, বর্ণ, শিক্ষা, ভাষা, রাজনৈতিক বা অন্যবিধ মতামত, জাতীয় বা সামাজিক উৎপত্তি, জন্ম, সম্পত্তি বা অন্য কোন মর্যাদা নির্বিশেষে প্রত্যেকেরই সমান অধিকার থাকবে। তাছাড়া এই ঘোষনার ধারা-১৫ এ উল্লেখ আছে , ক. প্রত্যেকেরই একটি জাতীয়তার অধিকার রয়েছে। খ. কাউকেই যথেচ্ছাভাবে তার জাতীয়তা থেকে বঞ্চিত করা অথবা তাকে তার জাতীয়তা পরিবর্তনের অধিকার অস্বীকার করা চলবে না। তবে বর্তমানে উদ্বাস্ত মানুষ নিয়ে ভারত যা করছে তা সম্পুর্ণ আইন পরিপন্থি একটি কাজ।
ভারত থেকে বাংলাদেশে গত কয়েকদিন একাধিকবার লোক ঠেলে পাঠানোর বা 'পুশইন'-এর চেষ্টা দেখা গেছে। বিভিন্ন সীমান্তে একাধিকবার এমন চেষ্টা প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সম্প্রতি বাংলাদেশের লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, নীলফামারী, নেত্রকোনা, মেহেরপুরসহ নানা জেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ দুই শতাধিক মানুষকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী - বিএসএফ বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভারতে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি সন্দেহে ধরপাকড় শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে পুশ-ব্যাক করে দেওয়ার বেশ কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে।
ভারতের দিক থেকে যেটা পুশ-ব্যাক, বাংলাদেশের চোখে সেটাই পুশ-ইন। সীমান্তে পুশ-ব্যাক বা পুশ-ইন আসলে এমন একটা পদ্ধতি যেখানে ধরা পড়া ব্যক্তিদের সীমান্তে নিয়ে গিয়ে অন্য দেশের সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়ার কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই ভারতে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এই পদ্ধতি চলে আসছে, যেটা আনুষ্ঠানিকভাবে কেউই স্বীকার করে না। ভারতের মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ভারত থেকে এভাবে পুশ-ব্যাক করে দেওয়া সম্পূর্ণই আইন বহির্ভূত কাজ। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা পাচারের শিকার হওয়া নারীদের অনেক ক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দিয়ে থাকে বিএসএফ।
এই পদ্ধতির অবশ্য আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি রয়েছে। সীমান্তে 'পুশইন' (লোক ঠেলে দেওয়া) প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক আইন এবং মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানোর অজুহাতে রাষ্ট্রগুলোর নেওয়া এই পদক্ষেপ তীব্র মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দেয়। এর মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রধান ক্ষেত্রগুলো হলো, ১. আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, নিপীড়িত মানুষের অন্য দেশে আশ্রয় চাওয়ার অধিকার রয়েছে। পুশইনের মাধ্যমে সেই আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ ও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়। শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন: পুশইন বা পুশ-ব্যাকের কারণে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ অসহায় মানুষদের নো-ম্যানস-ল্যান্ড বা শূন্যরেখায় তাঁবু খাটিয়ে মানবেতর জীবন কাটাতে হয়। ২. কথিত নাগরিক দাবির ভিত্তিতে কোনো প্রমাণ ছাড়াই অনেক সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে মানুষদের ঠেলে দেওয়া হয়। ৩. শূন্যরেখায় আটকে পড়া মানুষ পর্যাপ্ত খাবার, সুপেয় পানি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন।৪. পুশইন প্রক্রিয়ার শিকার ব্যক্তিদের প্রায়ই শারীরিক ও মানসিক হেনস্থার সম্মুখীন হতে হয়। নাগরিকত্ব নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকলে তা আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার নিয়ম।
মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপ গ্রহণ না করে উভয় পক্ষের মানবিক দিক বিবেচনা করা জরুরি। নানা পর্যবেক্ষণে বুঝা যায় যে, ভারত থেকে অবৈধ উপায়ে বাংলাদেশে মানুষজনকে পুশ-ইন (বা পুশ-ব্যাক) করার প্রধান কারণ হলো, ১. ভারতে বসবাসরত মুসলিম ও অভিবাসীদের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ, দেশটির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান এবং বাংলাদেশের প্রতি ভারতের বিরূপ আচরণ। ২. অর্থনৈতিক কারণ এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগও এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। পুশ-ইন কেন বাড়ছে এবং এর পেছনের মূল কারণগুলো হলো: ক, ভারতের বিভিন্ন রাজ্য (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ) ও কেন্দ্রীয় সরকারের কট্টর নীতি ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণে বহু মুসলিম পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। খ. সেখানে বসবাসরত বাংলাভাষী মুসলিম বা অন্যান্য অভিবাসীদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে অনেক সময় জোরপূর্বক আটক রাখা হয় এবং পরে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। গ. বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ঢাকার সাথে দিল্লির টানাপোড়েনও ক্ষেত্রবিশেষে এই পুশ-ইন বাড়ার পেছনের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ঘ. অনেক ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কোনো বৈধ আইনি প্রক্রিয়া বা ট্রায়াল ছাড়াই ভারতীয় ভূখণ্ডে আটককৃত ব্যক্তিদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে সোজা বাংলাদেশের সীমান্তে নিয়ে আসে। এই পুশ-ইন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে।
আন্তর্জাতিক আইনে জোরপূর্বক বা অবৈধভাবে মানুষকে স্থানান্তর করা প্রধানত মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এই ধরনের কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়। আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধভাবে মানুষ স্থানান্তরকে যেসব অপরাধের অধীনে বিবেচনা করা হয় তা হলো: ১. মানবতাবিরোধী অপরাধ: আইসিসি (আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত)-এর রোম সংবিধি অনুযায়ী, কোনো বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বা সুপরিকল্পিত আক্রমণের অংশ হিসেবে জোরপূর্বক স্থানান্তর বা নির্বাসন করা হলে তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় ।
২. যুদ্ধাপরাধ: জেনেভা কনভেনশন এবং আইসিসি-এর নিয়ম অনুযায়ী, সশস্ত্র সংঘাত বা যুদ্ধকালীন সময়ে বেসামরিক নাগরিকদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা বা নিজ ভূখণ্ড থেকে অন্য কোথাও স্থানান্তর করা একটি সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ । ৩. জাতিগত নিধন (ঊঃযহরপ ঈষবধহংরহম): অবৈধভাবে জনসংখ্যা স্থানান্তরের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা থেকে নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম বা বর্ণের মানুষকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে অঞ্চলটিকে একজাতীয় করার চেষ্টা করা হলে তা আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধের অন্তর্ভুক্ত হয় ।
৪. আগ্রাসন ও বেআইনি দখল: কোনো দখলদার শক্তি যদি তাদের নিজেদের দেশের বেসামরিক নাগরিকদের জোরপূর্বক অন্য কোনো দখলকৃত ভূখণ্ডে স্থানান্তর বা পুনর্বাসন করে, তবে তাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং যুদ্ধাপরাধের শামিল। সুতরাং ভারত যা করছে তা মানবতা বিরুদ্ধি অপরাধ। কারণ আর্স্তজাতিক মানবতার যে আইন রয়েছে ভারত তার পরিপন্থি কাজ করছে। আইসিসি (আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত) তে ভারতের বিরুদ্ধে মামলা করা জরুরী।
লেখক: কলামিষ্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









