সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি হলো মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের সমষ্টি, যা সমাজকে মানবিক বা পশ্চাৎপদ করার ক্ষেত্রে সরাসরি ভূমিকা রাখে। এটি সামাজিক সম্পর্কঅর্থনীতি ও আইনব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আবার এভাবে বলা যায় যে, দৃষ্টিভঙ্গি হলো মানুষের চিন্তা, অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ ও বিশ্বাস থেকে গড়ে ওঠা একটি মানসিক প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমেই মানুষ কোনো পরিস্থিতি, ঘটনা বা বিষয় অনুধাবন করে। মানুষের মনোজগত দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ন্ত্রন করে। মনোজগৎ হলো মানুষের চিন্তারাজ্য, অন্তর্ভূমিক বা সমস্ত মানসিক ব্যাপারের এক সমষ্টিগত রূপ।
এটি মূলত মানুষের আবেগ, অনুভূতি, বিশ্বাস, স্মৃতি এবং অবচেতন মনের অভ্যন্তরীণ জগতকে নির্দেশ করে যা বাইরে থেকে দৃশ্যমান নয়, কিন্তু মানুষের আচরণ ও ব্যক্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। এর প্রভাবে যেহেতু দৃষ্টি ভঙ্গি প্রভাবিত তাই দেখা যায় যে, দৃষ্টিভঙ্গি হলো মানুষের মানসিক চশমা। আমাদের চিন্তা, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, এবং পারিপার্শ্বিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এটি গড়ে ওঠে। মনোজগত সরাসরি এই দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ন্ত্রণ করে, যার ফলে একই ঘটনা বা পরিস্থিতি ভিন্ন ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করে।
মনোজগতের প্রভাব নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় মানুষের সত্য দেখার ক্ষমতাকে আড়াল করে। আবেগপ্রসূত ও অবচেতন মনস্তাত্ত্বিক পক্ষপাতদুষ্টতার কারণে মানুষ অনেক সময় ভুল ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। বায়াস একটি মানসিক প্রবণতা, যা নিছক পূর্বনির্ধারিত ধারণা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণকে প্রভাবিত করে। যথাযথ বিশ্লেষণ করে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়ার বদলে মানুষ একদিকে হেলে পড়ে। একে অন্ধ বিশ্বাসও বলা যায়, অন্ধ বিশ্বাস হলো কোনো প্রকার তথ্য, প্রমাণ বা যুক্তি ছাড়াই কোনো ধারণাকে চোখ বুজে সত্য বলে মেনে নেওয়া।
এটি মানুষের স্বাভাবিক যুক্তিবোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং অনেক সময় কুসংস্কারে রূপ নেয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর প্রভাব মারাত্বক । রাজনীতিতে অন্ধ বিশ্বাস বা অন্ধ আনুগত্য হলো যুক্তি, সত্য ও নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট নেতা বা দলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন। এটি সমাজে ব্যক্তিপূজা, মেরুকরণ এবং অন্ধ ভক্তি ও অন্ধ ঘৃণার একটি চক্র তৈরি করে, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য মারাত্মক হুমকি। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির গভীরে তাকালে অস্বস্তিকর, কিন্তু অস্বীকার করা যায় না এমন এক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে- আমাদের মানসিক কাঠামোর ভেতরে যেন এক ধরনের স্ববিরোধী প্রবণতা স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধে আছে। এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে আছে আমাদের চিন্তা, বিচারবোধ এবং সামাজিক আচরণের নানা স্তরে।
এদেশে মানুষ যখন কাউকে সমর্থন করে, তখন তাকে এমনভাবে মহিমান্বিত করি যেন তিনি কোনো সাধারণ মানুষ নন, যেন ত্রুটিহীন এক অতিমানব। আবার যখন কাউকে অপছন্দ করে, তখন তাকে এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করে যেন তিনিই যাবতীয় ষড়যন্ত্রের উৎস এবং সমস্ত সমস্যার মূল কারণ। বাংলাদেশের গনমাধ্যমের তথ্য বিশ্ষেণে যা পাওয়া যায় তা হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তিপূজার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। রাজনৈতিক দল বা নীতির চেয়ে ব্যক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়, ফলে একজন নেতার প্রতি আনুগত্য ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বিশ্বাসে রূপ নেয় এবং সেই বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা মানে নিজের পরিচয়কে প্রশ্ন করাÑএমন একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার সৃষ্টি হয়।
রাজনীতিতে সমাজে সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা খুব সীমিত। রাজনৈতিক কর্মীরা তথ্য বিশ্লেষণ, যুক্তি খোঁজা কিংবা ভিন্নমতকে গ্রহণ করার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। সেখানে তথ্যের চেয়ে আবেগ এবং যুক্তির চেয়ে প্রচার বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যখন কোনো ব্যক্তিকে মহিমান্বিত করে, তখন তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এক ধরনের গণ-মনস্তত্ত্ব তৈরি করে।
তাছাড়া রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মানুষ অনেক সময় একটি শক্তিশালী নেতৃত্বের মধ্যে নিরাপত্তা খোঁজে। তারা বিশ্বাস করতে চায় যে একজন ব্যক্তি থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। এই মানসিকতা থেকে জন্ম নেয় সেই পরিচিত স্লোগান- ‘আপনি যতদিন আছেন, ততদিন দেশ নিরাপদ।’ এই বাক্যটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নেতাকে কেন্দ্র করে উচ্চারিত হয়েছে, কিন্তু এর ভেতরের মানসিকতা একই থেকেছে।
এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, এটি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহিতা, সমালোচনা এবং অংশগ্রহণ। কিন্তু যখন কোনো নেতাকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয়, তখন তার কার্যক্রমের ওপর কোনো কার্যকর নজরদারি থাকে না। ভুল সিদ্ধান্তগুলোও তখন প্রশংসিত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে অস্বাস্থ্যকর রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়। বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে মানুষের দৃষ্টি ভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ ঘটে যেমন সম্প্রতি পুশ ইন নিয়ে , ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক জোরপূর্বক বাংলাদেশিদের নিজ দেশে ঠেলে দেওয়ার (পুশ-ইন) ঘটনাকে বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং ভারতের একতরফা ও আগ্রাসী আচরণের বহিঃপ্রকাশ। তারপরও দেখা যায় কিছু ভারতের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসী মানুষ পুশ ইনকে অপরাধ হিসাবে দেখে না। তারা এটা রাজনৈতিক বিষয় বা ইস্যু বলে মনে করে।
ভারতে গরু কোরবানি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বহুমুখী বিষয়। ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন ভিন্ন। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির কিছু দিক নিন্মে তুলে ধরা হলো,১. অধিকাংশ সনাতন ধর্মাবলম্বীর কাছে গরুকে 'গোমাতা' বা পবিত্র প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয়। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতির সাথে গরুর পবিত্রতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ কারণে, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তারা গরু কোরবানি এবং গোহত্যাকে অত্যন্ত পাপের কাজ মনে করেন। ২. মুসলিম সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে ঈদুল আজহার সময় পশু কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
দেশের অন্যান্য গবাদিপশুর পাশাপাশি অনেকেই গরু কোরবানি করে থাকেন। তবে ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যে গবাদিপশু বা গরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে। ফলে, আইনি জটিলতা ও অনেকসময় উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হামলার ভয়ে মুসলিমরা বিকল্প পশু (যেমন: ছাগল বা ভেড়া) কোরবানি দিতে বাধ্য হন। এছাড়া, কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গের মতো কিছু রাজ্যে গোহত্যা বৈধ হওয়ায় সেখানকার দৃষ্টিভঙ্গি তুলনামূলক উদার। তবে এ বছরের ঈদে পশ্চিম ভঙ্গে গো হত্যায় কঠোর বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ৩. রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গরু অনেক সময়ই একটি শক্তিশালী প্রচারণার বিষয়বস্তু।
বিশেষ করে ডানপন্থী দলগুলো 'গোহত্যা বিরোধী' আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নে বিশ্বাসী। তবে অর্থনীতি ও কৃষির ক্ষেত্রে অনেক হিন্দু কৃষক গরু বিক্রি করতে বাধ্য হন, কারণ বয়োবৃদ্ধ বা দুধ না দেওয়া গরু পালন করা তাদের জন্য আর্থিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে। ৪. শিক্ষিত ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষদের একটি বড় অংশের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, খাদ্যাভ্যাস এবং ধর্মীয় আচার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। তারা মনে করেন, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাস অন্যের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয় এবং গরুর মাংস খাওয়া বা কোরবানি দেওয়াকে তারা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের অংশ হিসেবে দেখেন।
দৃষ্টি ভঙ্গির অন্ধত্বের কারণে কুসংস্কারের জন্ম নেয়। আর এই কুসংস্কারের প্রভাবে সমাজ পিছিয়ে পড়ে। দেশের মানুষের উদার দৃষ্টি ভঙ্গি সৃষ্টির লক্ষে নৈতিক শিক্ষার উপর অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে। তবে নৈতিক শিক্ষার নামে ধর্মীয় গোড়া বানানোর চেষ্টাটাও যৌক্তিক নয়।
লেখক : কলামিষ্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









