সমগ্র বিশ্ব এবং বাংলাদেশের সংকটকালীন মুহূর্তে জাতীয় সংসদে জাতীয় বাজেট পেশ করা হলো। বাজেটটি সংকটকালীন বাজেট হলেও বেশ উচ্চবিলাসী বাজেট বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার ঘটিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এটি দেখে অনেকেরই মনে হতে পারে যে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগেভাগেই আত্মসমর্পণ করা হয়েছে। কারণ বছর শেষে চাকরিজীবীদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হয়ে থাকে ৫ শতাংশ বা তার সামান্য বেশি।
সুতরাং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ অনেকটা দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে হতে পারে। তবুও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জন করতে পারলে তা হবে জাতির জন্য মঙ্গলজনক। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দীর্ঘদিন ধরেই, বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় থেকে, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এর নিয়ন্ত্রণ বা স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে আসা গেলে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবে।
মূল্যস্ফীতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ মূল্যস্ফীতি এক ধরনের পরোক্ষ কর, যার প্রভাব পড়ে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনযাপনের ওপর। আরও সহজভাবে বললে বোঝা যায়, কোনো সেবা বা পণ্য ক্রয় করতে গত বছরের তুলনায় এ বছর কতটুকু বেশি মূল্য দিতে হলো। তবে জাতীয় বাজেটের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। জাতীয় বাজেটে সরকার তার আয়-ব্যয় সমন্বয় করার জন্য বেশ কিছু পণ্যে নতুন করে কর বা ভ্যাট আরোপ করে থাকে। যার কারণে কিছু পণ্যের মূল্য হ্রাস পায়, আবার কিছু পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে অনেক সময় মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেওয়া হয়। তবে এবারের জাতীয় বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যে কর অব্যাহতি দেওয়া হলেও সন্দেহ থেকে যায়—কাঙ্ক্ষিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে তো?
৬ জানুয়ারি ২০২১, দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়, ‘২০২০ সালে গড় মুল্যস্ফীতি ৫.৬৯, ৩ বছরে সর্বোচ্চ’। মূলত মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে ২০২৩ সাল থেকে, যা আজও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়েছে। আবার ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
অপরদিকে, যখন তারা ক্ষমতা ছাড়েন এবং বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন ‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাধারণ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতির হার ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা জানুয়ারিতে ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ’ (৮ মার্চ, ২০২৬, বাসস); অর্থাৎ ঊর্ধ্বমুখী। ‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আবার জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ’ (১১ জানুয়ারি ২০২৬, প্রথম আলো)। যেখানে মে মাসে বাংলাদেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৪২ শতাংশে, আবার খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.০৬ শতাংশ।
সাধারণত প্রকৃত অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বাংলাদেশে করোনা মহামারির সময় থেকে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করেছে, সঙ্গে যোগ দিয়েছিল ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। যার ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায় এবং দেশের রিজার্ভ তলানিতে নামে। কর্মসংস্থান হারিয়ে অনেকেই বেকারত্ব বরণ করেন। নতুন করে যোগ হয়েছে ইরান, ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ। এ যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সংকটের কারণে সমগ্র বিশ্বই অর্থনৈতিক মহাসংকটে পড়েছে। যেখানে বাংলাদেশও নিজেকে আড়াল করতে পারবে না। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আপনার লক্ষ্য যদি ছোট হয়, তাহলে আপনি কতটুকু অর্জন করতে পারবেন?
তবে সাধারণ জনগণ বাজেট না বুঝলেও অন্তত এতটুকু বোঝেন যে বাজেট প্রণয়নের ফলে কিছু পণ্যের ওপর সরকার ভ্যাট ও ট্যাক্স বৃদ্ধি করে, যার ফলে কিছু পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়, আবার কিছু পণ্যের মূল্য কমেও যায়। সরকার চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি কিংবা জাতীয় বাজেটের রাজস্ব ব্যয় সংগ্রহের জন্য বেশ কিছু ক্ষেত্রে নতুন করে কর আরোপ করে। তবে সে সমস্ত পণ্যে সরাসরি প্রভাব না পড়লেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, বিশেষত সরাসরি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
যার প্রভাব পড়বে সমগ্র বাজারেই। সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের কারণে দেশের অর্থনীতিতে প্রান্তিক পর্যায়ে অর্থের যোগান বৃদ্ধি পেলেও তা সরাসরি বেসরকারি বিনিয়োগে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু এই সুরক্ষা ব্যয়ে ইতিমধ্যেই অনিয়মের ছাপ লক্ষ্য করা যায়। যদি তাই হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত মূল্যস্ফীতিও যেমন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আসবে না, বিপরীতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাবে না। তাই সুশাসন খুবই প্রয়োজন হবে। আবার সামাজিক নিরাপত্তা বিবেচনায় কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং বেকার ভাতার ফলে, এবং বেসরকারি খাতেও বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করার কারণে সমগ্র বিষয় বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, মানুষের কাছে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ জনবহুল ছোট্ট একটি দেশ হওয়ায় পণ্যের ঘাটতি সর্বদা লেগেই থাকে। তাই অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি মানে মূল্যস্ফীতিকে উৎসাহিত করা। আবার ছোট্ট একটি উদাহরণ দেখা যাক; ইতিমধ্যেই ২০ টাকা রিক্সা ভাড়া ৩০ টাকায় পরিণত হতে পারে। রিকশাওয়ালাও বলবে, আপনাদের বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে, সুতরাং জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, রিকশা ভাড়া ১০ টাকা বাড়িয়ে দিন; তা না হলে আমাদের সংসার চলছে না। বিষয়টি বাস্তবতার নিরিখে স্বাভাবিক মনে হলেও প্রশ্ন থেকে যায়, জিনিসপত্রের দাম কে উসকে দিচ্ছে নাতো? যার প্রভাব সরাসরি দ্রব্যমূল্যে বাজারে পড়বে, তথা মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পাবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনভাতা নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার। এই জন্য যে, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কোনোভাবে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করা যায় কি না অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি যতটুকু বেতনভাতাও তথটুকুই বৃদ্ধি পাবে। যেখানে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের নিচে নামলেও বেতনভাতার ক্ষেত্রে ন্যূনতম বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশই থাকবে। তাহলে পাঁচ–দশ বছর পরপর এভাবে জাতীয় বাজেটে প্রভাব পড়বে না। প্রয়োজন পড়বে না মহার্ঘ ভাতার। জাতীয় বাজেট প্রণয়নে অতিরিক্ত চাপের বিষয়টিও ভাবতে হবে না। নতুন করে মূল্যস্ফীতিকেও উসকে দেবে না।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করার জন্য শুধুমাত্র কর অব্যাহতি দিলেই চলবে না, একই সঙ্গে বাজার সিন্ডিকেট দূর করতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুষম বণ্টনের পাশাপাশি প্রয়োজন হবে সুশাসনের। তবেই হয়তো বাজারের প্রতিটি পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে আসবে। তাহলেই খুব সহজেই ধরা দেবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। ২০২০–২১ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বিগত দুই অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। সুতরাং এবারের লক্ষ্যমাত্রা একটু কম হয়ে গেল কি না? যদি আপনার লক্ষ্যই থাকে কম, তাহলে অর্জন আরও কম হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। তবুও আশায় থাকবে দেশের প্রতিটি নাগরিক, যেন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়। যদি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়, তাহলে দেশের সরকারের সঙ্গে সফল হবে দেশের জনগণ এবং স্বস্তিতে থাকবে দেশের জনগণ।
ব্যাংকার ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









