ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি দলের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি বিএনপি। তলাবিহীন ঝুড়ির দুর্নাম ঘুচিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করেছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে দেশনেত্রী খালেদা জিয়াও সেই পথ ধরে এগিয়ে নিয়েছেন। ক্ষমতায় গেলে বিএনপি দুর্নীতির সঙ্গে আপস করবে না।
তখন তারেক রহমান বলেছিলেন, আমরা আমাদের ৩১ দফার মাধ্যমে একটি প্রস্তাব জাতির সামনে অনেক আগেই দিয়েছিলাম। সেই প্রস্তাবটি হচ্ছে— যিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন, তার পদের মেয়াদ ১০ বছরের বেশি হবে না। তারেক রহমান আরও বলেছিলেন, ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই বিএনপি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করে।
কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বেগম খালেদা জিয়ার সরকার তৎকালীন ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’কে সরকারের হস্তক্ষেপমুক্ত সম্পূর্ণ স্বাধীন সংস্থা হিসেবে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ গঠন করে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বিএনপি সরকারের নানাবিধ পদক্ষেপের কারণে প্রথম বছর থেকেই দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ অগ্রগতি লাভ করতে শুরু করে। ফলে ২০০২ সালে প্রকাশিত টিআইবি রিপোর্টে বাংলাদেশের স্কোর ০.৪ থেকে উন্নীত হয়ে ১.২ হয়। ২০০৩ সালে ১.৩, ২০০৪ সালে ১.৪, ২০০৫ সালে ১.৫ এবং ২০০৬ সালে ২.০। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশে দুর্নীতি কমতে থাকে।
পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের লাগামহীন দুর্নীতির ফলে ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশের স্কোর আবারও কমতে থাকে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জনগণের রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই হবে সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার। বিএনপি দুর্নীতির সাথে কোনো আপস করবে না। ইনশাআল্লাহ আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হলে অবশ্যই দেশের আইনের মধ্যে এই বিষয়টি প্রবর্তন করবো যে, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দশ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকতে পারবেন।
আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে ২০০১ সালের জুন মাসে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছিল— রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মন্তব্য করেছিলেন।
এ বিষয়ে বলতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, পরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্নীতি দমনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়।দেশে দুর্নীতি দমনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ইতিবাচক ‘ট্র্যাক রেকর্ড’ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির মতে, ২০০১ সালের জুনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা ছাড়ার সময় বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন অবস্থায় রেখে যায়। পরে ওই বছরের অক্টোবরে দায়িত্ব নিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন প্রণয়ন করে। এসব উদ্যোগের ফলেই বাংলাদেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্তি পায়।
২০০৬ সালের অক্টোবরের আগেই দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘এশিয়ার ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে শুরু করে। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে জনগণের সরাসরি ভোটে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো পুনর্গঠনের জন্য ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রেও দুর্নীতি দমন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নই প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের কোনো কমিশন নেই। অথচ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অবনমন ঘটেছে। এই বাস্তবতায় দেশের প্রধান দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাড়ে তিন মাস ধরে কমিশনহীন অবস্থায় থাকাটা কেবল গভীর উদ্বেগের নয়, দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেওয়ারও শামিল। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে রাজনৈতিক বিবেচনায় রদবদলের যে অঘোষিত রেওয়াজ চালু রয়েছে, দুদকের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম দেখা যায়নি।
বিএনপি সরকার গঠনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া দুদকের চেয়ারম্যান আব্দুল মোমেনসহ আরও দুই কমিশনার পদত্যাগ করেন। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, পদত্যাগের ৩০ দিনের মধ্যে কমিশন পুনর্গঠনের বিধান থাকলেও সেটা মানা হয়নি। চেয়ারম্যানসহ কমিশনাররা পদত্যাগ করায় কার্যত দুদকের কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন পাঁচ–ছয়টি নতুন দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়লেও কমিশনের অনুমোদন না হওয়ায় সেগুলোর অনুসন্ধান হচ্ছে না।
মামলা দায়ের, তদন্ত প্রতিবেদন অনুমোদন, অভিযোগপত্র দাখিল, সম্পত্তি জব্দ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো নিয়মিত কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির তথ্য বলছে, চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ থেকে ২৬০ বিলিয়ন ডলার বা ২৯ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই তথ্যই বলে দেয় দুর্নীতি কতটা সর্বব্যাপী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে যেসব রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও শীর্ষ পদে থাকা কর্মকর্তা দুর্নীতির মাধ্যমে দেশে–বিদেশে অগাধ সম্পদের মালিক হয়েছেন, তাঁদের সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। দুদক অকার্যকর অবস্থায় থাকায় আওয়ামী লীগ আমলের বড় দুর্নীতিগুলোর অনুসন্ধান ও তদন্তও থেমে আছে।
দুদক নিষ্ক্রিয় থাকা মানে হচ্ছে দুর্নীতিবাজদের কাছে এমন বার্তা যাওয়া যে দুর্নীতি ও অপরাধ করলেও পার পাওয়া যায়। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, অভিযোগ তদন্তে বিলম্ব হলে অনেক ঘটনার আলামত যেমন নষ্ট হতে পারে, আবার অনেক দুর্নীতিবাজ তাদের অবৈধ সম্পদ বিক্রি করে দিতে পারে। এটি নিঃসন্দেহে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার ক্ষেত্রে সরকারের অঙ্গীকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এই বাস্তবতায় দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের আরও অবনতি হতে পারে। সরকারকে তার গুরুত্ব উপলব্ধি করা জরুরি বলে আমরা মনে করছি। সরকারকে সার্চ কমিটি পূর্ণাঙ্গ করে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের মধ্য দিয়ে দুদকের স্থবিরতা কাটাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি।
টিআইয়ের সর্বশেষ ধারণাসূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দুর্নীতির ক্ষেত্রে কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের নিচে ছিল। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো, বিগত সরকারগুলো দুদককে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল এবং প্রতিষ্ঠানটিকে ‘নখদন্তহীন বাঘে’ পরিণত করেছিল। দুদককে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের এই চক্র থেকে বের করে আনা না গেলে দুর্নীতির পাগলা ঘোড়াকে লাগাম পরানো সম্ভব নয়। একমাত্র একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দুদকই সেই ভূমিকা পালন করতে পারে।
দুঃখজনক হলেও সত্যি, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুদক সংস্কারে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদন অনেকটাই কাটছাঁট করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের আমলে দুদক সংস্কারের অধ্যাদেশটি সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন না করায় সেটি আর আইনে পরিণত হয়নি। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, দুদক সংস্কারে একটি নতুন আইন করা হবে। তবে এর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
বাংলাদেশে দুর্নীতি দমনের নৈতিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার বিষয়েও কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু দুর্নীতি প্রতিরোধের নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা কিংবা মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত করার বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মূল কথা হলো, দুর্নীতি দমন করতে হবে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষা করে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়। অতীতে দুর্নীতি দমন একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। আমার দলের হলে ছেড়ে দাও, প্রতিপক্ষের হলে শারীরিক-মানসিকভাবে নাজেহাল কর, এটাই ছিল মূলমন্ত্র।
বিগত সরকারগুলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কতটা আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক নীতিমালার ভেতরে থেকে পরিচালনা করেছে, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। প্রশ্নটি জরুরি। কারণ, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের জন্য দুর্নীতি দমন যেমন জরুরি, তেমনই তা আইনের আওতায় মানবাধিকার রক্ষা করে করাও আবশ্যক। এক্ষেত্রে অনিয়ম হলে আইনের শাসনের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হবে। আইনে দুর্নীতি দমন কমিশনের পদত্যাগের ৩০ দিনের মধ্যে পুনর্গঠনের কথা বলা হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সম্ভব না হলে কী হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। ফলে নতুন কমিশন গঠনের পুরো প্রক্রিয়া সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। জানা গেছে, নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আইন অনুযায়ী কমিশন নিয়োগের জন্য আগে পাঁচ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করতে হয়। এ লক্ষ্যে ২ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের একজন করে বিচারককে মনোনয়নের জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। সার্চ কমিটির জন্য আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের দুজন বিচারপতিকে এরই মধ্যে মনোনীত করা হয়েছে। বাকি তিনজনকে দ্রুতই মনোনীত করা হবে।
এরপর সার্চ কমিটি কাজ শুরু করবে। বর্তমান বাস্তবতা হলো,কমিশনের পদত্যাগের আগে যেসব অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু হয়েছিল, সেগুলোর কিছু কাজ চলমান; কিন্তু বিভাগীয় পরিচালক ও মহাপরিচালক পর্যায়ে ফাইল প্রস্তুত হলেও কমিশন না থাকায় সেগুলো অনুমোদনের জন্য আর এগোচ্ছে না। এতে শত শত ফাইল আটকে আছে। অতি সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে সার্চ কমিটি গঠন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। তিনি এটিকে একটি ‘মধ্যবর্তী ব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, আরও শক্তিশালী দুদক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন আইন করা হবে, সে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে দুদকে কমিশন না থাকায় দুর্নীতিবাজদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে । বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলের বড় বড় দুর্নীতির অনুসন্ধান ও মামলার তদন্ত চলছে। এমন পরিস্থিতিতে সাড়ে তিন মাস ধরে দুদকের কমিশনহীন না থাকা মানে অনেক দুর্নীতিবাজ পার পেয়ে যেতে পারেন। দুদক অকার্যকর থাকায় দুর্নীতিবাজেরা তাঁদের অবৈধ সম্পদ বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছেন। বিলম্বিত হওয়ার কারণে অনেক সময় মামলার আলামতও নষ্ট হয়ে যায়।
এর সুযোগ নেন আসামিরা। এভাবে চলতে থাকলে দুর্নীতির ধারণাসূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান খারাপের দিকে যাবে। তাই শূন্য পদ দ্রুত সময়ের মধ্যে পূরণ করাটা জরুরি হয়ে উঠেছে । নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ফলে দেশের প্রধান দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটির কার্যক্রম কবে পুরোপুরি সচল হবে, সে প্রশ্ন আমাদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের পরিবেশ সরকারই সৃষ্টি করেছে। ৩০ দিনের মধ্যে কমিশন পুনর্গঠন করার বিষয়টিও সরকারের অজানা নয়। জেনে–বুঝে সরকার দুদককে স্থবির করে রেখেছে। বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে।
তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের ৩১ দফায় দুর্নীতিবিরোধী যে অবস্থান নেওয়ার কথা বলেছিল, এখন সেটি ফাঁকা বুলি মনে হচ্ছে। তাহলে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার কী স্রেফ লোকদেখানো ? দুদক স্থবির রাখার মাধ্যমে বার্তা যাচ্ছে যে দুদক অকার্যকর আছে, তোমরা দুর্নীতি করো। দুর্নীতির লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। আরেকটা বার্তা যাচ্ছে—দুর্নীতি স্বাভাবিক ঘটনা, এর জন্য প্রতিষ্ঠানের কী দরকার। কেন কমিশন দেওয়া যাচ্ছে না, সে বিষয়ে একটি বক্তব্য সরকারের দেওয়া দরকার ছিল। দুর্নীতিকে রুখতে হলে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদককে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।
আমাদের প্রত্যাশা, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে পেশাদার, সৎ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে দুদক কমিশন পুনর্গঠন করা হবে। ইদানিং ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার মোটাদাগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেই পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা,বিএনপি অতীতে নিজেদের অনাচারের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের ত্যাগকে স্মরণে রেখে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতে তাদের নিজস্ব অঙ্গীকার অনুযায়ী অগ্রসর হবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও কিলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









