সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, দেশের বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় ইটিপি প্লান্টগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার না হওয়ায় রাজধানীসহ আশপাশের জেলার নদীগুলোতে বর্জ্য নিস্কাশন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। বর্জ্য নিষ্কাশন সমস্যা সমাধানে সবগুলো পাওয়ার প্লান্টকে অনলাইন ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনার ব্যাবস্থা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দূষণের উৎসগুলো চিহ্ণিত করা হয়েছে। নদী রক্ষায় যেসব প্রতিষ্ঠান ইটিপি ব্যবহার করছে না, সেগুলো কার্যকর করতে দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমরা জানি শীতলক্ষ্যা নদী এখন ভয়াবহ দূষণের কবলে। এখানে নারায়ণগঞ্জের ডাইং কারাখানাগুলোর বর্জ্য ও বিষাক্ত ক্যামিকেল এসে পড়ছে। ভয়াবহ দূষণের কবলে পড়ছে এতে শীতলক্ষ্যা নদী। গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন ডাইং কারাখানার বর্জ্য শুধু নদী নয়, সেখানকার খাল ডোবা-নালাও বিষাক্ত হচ্ছে। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য ডাইং কারখানা। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যারা এই নদীতে গোসল করে তাদের নানা ধরনের চর্ম রোগ হচ্ছে। পানি তো ব্যবহারই করা যাচ্ছে না। নদীটিও এখন মৃতপ্রায়। একই দশা বুড়িগঙ্গা নদীরও। আর এর আশেপাশের খালগুলো অস্তিত্ব তো খুঁজেই পাওয়া যায় না।
নদীটি এতটাই দূষিত যে এর পানি কালো রঙ ধারন করে আছে। নরসিংদীর ব্রহ্মপুত্র নদীর অবস্থাও তাই। প্রভাবশালীদের দখল তো আছেই সাথে এখানেও শিল্প কারখানার বর্জ্য পদার্থ এসে পড়ছে নদীতে। ফলে নদীর জীববৈচিত্র্য তো বটেই পানি দূষিত হয়ে লাল ও কারছে বর্ণ ধারণ করেছে। এই পানি আর ফসল ফলানোর কাজে ব্যবহার করা যায় না। যদিও এখানে নদী পাড় রক্সা, অবৈধ দখলমুক্ত করা, কলকারখানায় ইটিপি ব্যবহার করা ইত্যাদি প্রকল্প নেয়া হয়েছে।
গাজীপুরের লবলং নদের তীরবর্তী প্রায় ১৩৫টি বর্জ্য উৎপাদনকারী কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা থেকে প্রতিদিন নিয়মিত ১ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য নদীতে নির্গত হয়। এছাড়া সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় সমন্বিত ডাম্পিং স্টেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় শিল্প ও গৃহস্থালির বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার ফলে এক সময়ের লবলং নদটি বর্তমানে লবলং খালে পরিণত হয়েছে। সেই খালও এখন বিলুপ্ত হওয়ার পথে। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা মতে, এতে ১৫টি পয়ঃনিস্কাশন লাইন এবং ১১টি ডাম্পিং স্টেশন গড়ে উঠেছে। সরকারি খালে তৈরি করা হয়েছে তিনটি কালভার্ট। যা বেআইনি। কালভার্টের কারণে জমিতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। একটি তথ্য মতে এই জলাবদ্ধতার কারণে ৪০০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে পারেননি কৃষকেরা। এছাড়া তীরগুলোও দখল হচ্ছে। অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করার কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে নদ।
বাংলাদেশের ঢাকা শহরের আশেপাশের নদীগুলোতে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ চিত্র এসেছে একটি গবেষণা প্রতিবেদনে। গবেষণায় সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিকের কণা পাওয়া গেছে টঙ্গী খালের পানিতে। এরপর পরই রয়েছে বালু নদ, এরপর বুড়িগঙ্গা নদী। এখানকার জলাশয়গুলোতে প্রতি ঘনমিটার পানিতে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে ৩৬ হাজার। বিশ্বে অনেক দেশের নদীর চেয়ে এর সংখ্যা অনেক বেশি। গ্রামের নদীগুলোতেও প্লাস্টিকের দূষণ হচ্ছে। সেখানে প্রতি ঘন মিটারে ১০০ থেকে ১৫০টি প্লাস্টিক কণা। গ্রামের চেয়ে শহরের নদীতে শতগুণ বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এই প্লাস্টিক কণাগুলো মাছ খাচ্ছে। মাছ থেকে এসব প্লাস্টিক কণা যাচ্ছে আমাদের রক্তে ও মায়ের দুধে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব উপকূলীয় এলাকায় বিষাক্ত ধাতু দূষণ বাড়ছে বলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি করা হয়েছে সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট এ প্রকাশিত একটি গবেষণার ফলাফল থেকে। গবেষণাটি মাতামুহুরি নদী, বাকথালী নদী, মহেশখালী চ্যানেল, নাফ নদী, এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত হয়। এখানে প্রযুক্তির মাধ্যমে নদী ও মোহনার পলিতে জমে থাকা বিভিন্ন ধাতুর মাত্রা নির্ণয় করা হয়। এতে ক্যাডমিয়াম, কপার, ক্রোমিয়াম, নিকেল ও সীসাসহ বিভিন্ন ধাতুর মাত্রা নির্ণয় করা হয়। গবেষণায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্ণিত করা হয় বাকখালী ও মহেশখালীকে। এখানে গবেষকরা পিএলআই এর মাত্রা পাওয়া গেছে ২ এর বেশি। এটি উচ্চ মাত্রার দূষণকে বোঝায়। আর সবচেয়ে বেশি বিষাক্ত ধাতু পাওয়া গেছে ক্যাডমিয়াম। বাকখালীতে ক্যাডমিয়ামের দূষণের মাত্রা ছিল ৩৩১.৯১ শতাংশ আর মহেশখালীতে ২৯৫.৪৩ শতাংশ।
ভারী ধাতু দূষণের কারণ হিসেবে যেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে তা হলো- শিল্প কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, পয়োনিস্কাশন থেকে বর্জ্য, জাহাজ ভাঙ্গা থেকে বর্জ্য। এছাড়া নগর ও কৃষি এলাকার বিভিন্ন বর্জ্যও এসব দূষণ বাড়াচ্ছে। এর ফলে জলজ বাস্তুসংস্থান হুমকির মুখে পড়ছে। জলে থাকা ফাইটো প্লাঙ্কটন ও জুওপ্লাঙ্কটনের শরীরে এসব ধাতু যাচ্ছে। এসব প্লাঙ্কটন খেয়ে মাছের শরীরেও ভারি ধাতু যাচ্ছে। এর ফলে মাছের রোগ বেড়ে যাচ্ছে। প্রজনন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। মাছের শরীর থেকে এসব ভারী ধাতু মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে।
ইটিপি হলো এফ্লুয়েন্ট ট্রিটম্যান্ট প্ল্যান্ট। এর মাধ্যমে শিল্প কারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য পদার্থ পরিশোধন করা হয়। কারখানা থেকে বের হওয়া দূষিত পানিকে রসায়নিক ও জৈবিক প্রক্রিয়ায় বিশুদ্ধ করা হয়। এর মাধ্যমে টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানার কাপড়ে রং ও ধোয়ার ফলে দূষিত পানি শোধন করা হয়। ফামাসিটিক্যালস কোম্পানির ওষুধ তৈরির সময় ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত তরল পরিশোধন করা হয়। চামড়া শিল্প বা ট্যানারির নির্গত লবণ ও রাসায়নিক মিশ্রিত পানি শোধন করা হয়। এছাড়া রাসায়নিক কারখানা, পেপার মিল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বর্জ্য পানি শোধন করা হয়।
ইটিপির মূল কাজ হলো এমন একটি শোধন ব্যবস্থা তৈরি করা যার মাধ্যমে শিল্প কারখানা থেকে বের হওয়া বর্জ্য ধাপে ধাপে পরিশোধিত হয়। পরে পরিবেশে নিঃসরণ করা হয়। শিল্প কারখানার বর্জ্যে সিসা, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, অ্যামোনিয়া, সালফাইড ও বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ থাকে। ইটিপির মাধ্যমে পানি দূষণ যেমন কমিয়ে আনা যায় তেমনি সামগ্রিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কিন্তু চিত্র উল্টা। বাস্তবে অনেক কারখানায় ইটিপি থাকলেও চালু রাখা হয় না সব সময়। ইটিপি যেভাবে পানি পরিশোধন করে সইে পানি প্রাকৃতিক পানির মতই। নদী বা জলাশয়ের কোন ক্ষতি করে না। অথচ এর ব্যবহার নেই। পরিচালনা ব্যয় ও বিদ্যুত খরচ কমাতে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে না। কোন কোন কারখানায় নিম্ন মানের ইটিপি ব্যবহৃত হয়। এই অবস্থায় সরকারের উচিত তদারকি বৃদ্ধি করা। এছাড়া বর্তমানে বিশ্ববাজার টেকসই উন্নয়নের দিকে ঝুঁকছে। পোশাক শিল্পে বিদেশিরা এখন পরিবেশ সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে কিনা তা দেখে ক্রয় করছে। তাই সরকারের তদারকি ও উদ্যোগের পাশাপাশি শিল্প মালিকদেরও সচেতন হওয়ার সময় এসেছে।
লেখক : পরিবেশ বিষয়ক লেখক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









