বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার ভিত্তি এখনো কৃষি। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে শিল্প ও সেবা খাতের দ্রুত বিকাশ ঘটলেও কৃষির গুরুত্ব কোনোভাবেই কমে যায়নি। বর্তমানে দেশের মোট জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রায় ১১ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ এখনো এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।
কৃষি শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি ক্ষেত্র নয়, বরং ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। একসময়ের খাদ্যঘাটতির বাংলাদেশ আজ ধান, শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, ডিম ও দুধ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান দেশের কৃষকদের। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমই বাংলাদেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, যে কৃষক দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন, তিনিই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
প্রতি বছর জাতীয় বাজেট ঘোষণার সময় কৃষির গুরুত্ব নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কৃষিবান্ধব বাজেটের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হয় প্রশাসনিক কার্যক্রম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং সার ভর্তুকির মতো অপরিহার্য কিন্তু প্রচলিত খাতে। এসব ব্যয় অবশ্যই প্রয়োজনীয়, তবে কৃষির মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর ও যুগোপযোগী উদ্যোগের ঘাটতি থেকে যায়।
বাংলাদেশের কৃষির বর্তমান সবচেয়ে বড় সংকট উৎপাদন নয়, বরং বাজারব্যবস্থা। কৃষক উৎপাদন করতে জানেন, কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারেন না। বাংলাদেশের কৃষির সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাজার ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। উৎপাদন পর্যায়ে কৃষক যতটা দক্ষতা অর্জন করেছেন, বিপরীতে সেই উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ততটা শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। গ্রামীণ হাটবাজার থেকে শুরু করে শহুরে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে মধ্যস্বত্বভোগীদের দীর্ঘ শৃঙ্খল কৃষকের প্রাপ্য আয়ের বড় একটি অংশ কেড়ে নিচ্ছে।
একই সঙ্গে বাজার তথ্যের সীমিত প্রাপ্তি, সংরক্ষণ সুবিধার ঘাটতি এবং কার্যকর বাজার পূর্বাভাস ব্যবস্থার অভাবে কৃষক প্রায়ই মৌসুমের সবচেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। আবার কোনো কোনো সময় অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে বাজারে মূল্য ধস নামে। অন্যদিকে আমদানি নির্ভরতা কিংবা কৃত্রিম বাজার সংকট স্থানীয় উৎপাদককে আরও অসহায় করে তোলে। ফলে কৃষি ক্রমেই একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অথচ তুলনামূলক কম লাভজনক খাতে পরিণত হচ্ছে।
এই অস্থিতিশীল বাজারব্যবস্থা কৃষকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমিয়ে দেয়, উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতে নিরুৎসাহিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে কৃষি পেশার প্রতি আগ্রহও হ্রাস করে। তাই কৃষির টেকসই উন্নয়নের জন্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজার সংস্কারকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সরাসরি কৃষক ও বাজারের সংযোগ বৃদ্ধি, আধুনিক সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলা, স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করা এবং নির্ভরযোগ্য বাজার তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
কৃষি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। একজন কৃষক যখন প্রতি মণ ধান উৎপাদনে প্রায় ১,৪০০ টাকা ব্যয় করেন, তখন অনেক ক্ষেত্রে তাকে সেই ধান ১,০০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়। শ্রমিকের মজুরি, বীজ, সার, সেচ ও অন্যান্য খরচ বিবেচনায় নিলে এই পরিস্থিতি কৃষকের জন্য শুধু লোকসানই নয়, কৃষির প্রতি তার আস্থা হারানোরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অথচ কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে দেশের কৃষি উৎপাদন আরও ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ কৃষক লাভের নিশ্চয়তা পেলে উৎপাদনে আরও বিনিয়োগ করবেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন এবং কৃষিকে দীর্ঘমেয়াদি পেশা হিসেবে গ্রহণ করবেন। বর্তমানে কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে উৎপাদক নয়, মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর বেশি লাভবান হয়। ফলে কৃষক উৎপাদনের ঝুঁকি বহন করলেও লাভের অংশ থেকে বঞ্চিত হন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করলে কি ভোক্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে? বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, খাদ্য সহায়তা কিংবা উন্মুক্ত বাজারে খাদ্য বিক্রির মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো ন্যায়সঙ্গত বা টেকসই সমাধান হতে পারে না।
বাংলাদেশ বর্তমানে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির কথা বলছে। কিন্তু দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষক প্রান্তিক এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কৃষক ভূমিহীন বা ক্ষুদ্র চাষি। তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি না করে কৃষিকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া কঠিন। কৃষকের জন্য সহজ ঋণ, উৎপাদন সহায়তা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাজেট আলোচনায় এই বিষয়গুলো এখনও পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। কৃষকের আরেকটি বড় দুর্ভোগ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বন্যা, অতিবৃষ্টি, খরা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা আকস্মিক বন্যায় ফসলহানির ঘটনা এখন নিয়মিত। ক্ষতির পর কৃষকদের কিছু বীজ ও সার সহায়তা দেওয়া হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। একজন কৃষক যদি এক মৌসুমে সম্পূর্ণ ফসল হারান, তাহলে পরবর্তী পুরো বছর তার জীবিকা কীভাবে চলবে, সেই প্রশ্নের উত্তর বর্তমান ব্যবস্থায় অনুপস্থিত।
এই বাস্তবতায় শস্যবিমা বা ক্রপ ইনস্যুরেন্সকে কৃষি নীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসা জরুরি। সরকার যদি প্রিমিয়ামের একটি অংশ ভর্তুকি হিসেবে বহন করে, তাহলে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। এতে কৃষকের ঝুঁকি কমবে এবং কৃষি পেশায় স্থায়িত্ব আসবে। হাওরাঞ্চলের ফসলহানি, অতিবৃষ্টিতে আলু ও পেঁয়াজের ব্যাপক ক্ষতি কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনাগুলো দেখিয়েছে যে কৃষকের জন্য একটি কার্যকর বীমা ব্যবস্থা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য প্রয়োজন। বাংলাদেশের কৃষির আরেকটি অবহেলিত ক্ষেত্র হলো পোস্ট হারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট।
ফসল উৎপাদনের পর সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যায়। এই ক্ষতির পরিমাণ কমানো গেলে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত জমি বা সম্পদের প্রয়োজন হবে না। বিদ্যমান উৎপাদন থেকেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এক্ষেত্রে আধুনিক গুদাম, কোল্ড স্টোরেজ, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকের পণ্য যদি দীর্ঘ সময় নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে তিনি বাজারের সবচেয়ে খারাপ সময়ে বা মূল্যপতনের মুহূর্তে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না।
এতে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের জন্য আরও ভালো মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন এবং বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকবে। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে অতিরিক্ত উৎপাদিত পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করা সম্ভব হবে। এর ফলে একদিকে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে কৃষিপণ্যের অপচয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এতে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশের কৃষিতে সরকার নিজেই স্বীকার করে যে মোট কার্যক্রমের প্রায় ৯০ শতাংশই বেসরকারি খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। অথচ নীতিনির্ধারণ ও বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত, কৃষি উদ্যোক্তা, কৃষি ব্যবসায়ী এবং কৃষকদের সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। কৃষির টেকসই উন্নয়নের জন্য সকল অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রয়োজন। বাংলাদেশের কৃষি আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে, কিন্তু সেই সাফল্যকে দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই করতে হলে এখন উৎপাদন বৃদ্ধির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বাজারব্যবস্থা, ন্যায্যমূল্য, বীমা, অর্থায়ন, সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে। কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কৃষক লাভবান হলে কৃষি এগোবে, কৃষি এগোলে খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে, গ্রামীণ অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের গতি আরও বেগবান হবে। তাই আগামী দিনের কৃষিনীতি ও বাজেটের মূল দর্শন হওয়া উচিত একটাই, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং কৃষির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখা।
লেখক : সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান,
ডিআরপি ফাউন্ডেশন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









