বাঙালির জাতিসত্তা, আত্মমর্যাদা, সংস্কৃতি আর দ্রোহের এক অবিনাশী ও চিরন্তন সমার্থক নাম কাজী নজরুল ইসলাম। কবি নজরুল একজন বাঙালীস্্েরষ্ঠ। একজন বাঙালী বোদ্ধা, সর্বপরি তিনি বাংলাদেশের মানুষের বলা না বলা সমস্থ কিছু বুঝতে পারতেন, পড়তে পারতেন। সেই অর্থে তিনি বাংলাদেশের মন।
তিনি কেবল একজন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক বা সংগীতস্রষ্টা ছিলেন না; তিনি ছিলেন চূর্ণ-বিচূর্ণ, শৃঙ্খলিত এবং শতাব্দী ধরে শোষিত একটি জাতির অবদমিত কণ্ঠস্বর। বিশ শতকের প্রথমার্ধে যখন এই উপমহাদেশ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট, যখন মানুষের মৌলিক অধিকার লুণ্ঠিত, ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের অন্ধকারে সমাজ নিমজ্জিত আর শোষিতের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী, ঠিক তখনই ধূমকেতুর মতো দীপ্ত আলো ছড়িয়ে বাংলা সাহিত্যের আকাশে তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল।
সমকালীন বাংলা সাহিত্যে যখন রোমান্টিকতা, অভিজাত নাগরিকতা আর সুদূরপরাহত নান্দনিকতার চর্চায় মগ্ন ছিলেন অনেক যুগান্তকারী দিকপাল, তখন নজরুল চাইলেন অন্য এক পথে। তিনি তাঁর দৃষ্টিকে প্রসারিত করলেন একেবারে মাটির কাছাকাছি, ধুলোবালির পৃথিবীতে, যেখানে জীবনের কঠিন বাস্তবতা প্রতিদিন মানুষকে রক্তাক্ত করে।
তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে তৎকালীন বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির চেনা পরিমণ্ডল ভেঙে এক নতুন, অভূতপূর্ব জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি লাঙল হাতে মাঠে কাজ করা কিষাণ, কলকারখানার ঘর্মাক্ত মজুর, কুলি, জেলে এবং সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের সুখ-দুঃখকে সাহিত্যের মূল বেদিতে পরম মর্যাদার সাথে আসন দিয়েছিলেন।
সমাজের যে খেটে খাওয়া মানুষগুলো সবসময় অবহেলিত, অধিকারবঞ্চিত ও জুলুমের শিকার হয়েছে, তাদের অন্তরের গভীরে লুকিয়ে থাকা নীরব হাহাকার এবং পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেভাবে নজরুলের লেখায় এক একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে ফুটে উঠেছে, তা অন্য কোনো সাহিত্যিকের কলমে বা ভাবনায় এমন জীবন্ত, বলিষ্ঠ এবং সংক্ষুব্ধ রূপে খুঁজে পাওয়া যায় না।
তিনি শোষকের চোখে চোখ রেখে, অন্যায়ের বুকে পা দিয়ে বলতে পেরেছিলেন:
“মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না—
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।”
নজরুল ইসলাম কেবল ভাবের ঘোরে কবিতা লেখা কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন সুনির্দিষ্ট এবং আপসহীন রাজনৈতিক মতাদর্শের এক অকুতোভয় সৈনিক। তাঁর রাজনীতি কোনো সংকীর্ণ দলীয় সীমারেখা বা ক্ষমতার লোভের মধ্যে আবদ্ধ ছিল না; তাঁর রাজনীতি ছিল আপামর সাধারণ মানুষের সার্বিক ও চূড়ান্ত মুক্তির রাজনীতি। তিনি সাম্যবাদের মূল মন্ত্রে গভীরভাবে দীক্ষিত হয়ে এক শ্রেণীহীন, শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে- সে মানুষ, অন্য কোনো কৃত্রিম পরিচয় নয়। ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় তাঁর সেই রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের চূড়ান্ত ও কালজয়ী রূপ প্রকাশ পায়, যেখানে তিনি সমস্ত বিভেদের দেয়াল ভেঙে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন:
“গাহি সাম্যবাদের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রিস্টান।”
তিনি খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা কাগজের ওপর শাসনক্ষমতার পরিবর্তন ততদিন পর্যন্ত অর্থহীন ও অন্তঃসারশূন্য, যতদিন না সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের অবসান ঘটে।
এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে বাংলার প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দিতে তিনি ‘লাঙল’, ‘ধূমকেতু’ এবং ‘নবযুগ’-এর মতো প্রগতিশীল পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। এসব পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যা ছিল ব্রিটিশ রাজশক্তির ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো একেকটি রাজনৈতিক ইশতেহার। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিল গণমানুষের অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে নেমে আসা। আর এ কারণেই রাজদ্রোহের অপরাধে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। কিন্তু কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ, লোহার শিকল কিংবা ঔপনিবেশিক আদালতের রক্তচক্ষু কোনো কিছুই তাঁর ভেতরের বিপ্লবী সত্তাকে দমন করতে পারেনি।
বরং তিনি কারাগারের সেই অন্ধকারকেই বানিয়েছিলেন শৃঙ্খল ভাঙার গান রচনার অনন্য এক মঞ্চ।
শিকল পরেই তিনি গেয়েছিলেন মুক্তির গান:
“শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল।
এই শিকল প’রেই শিকল তোদের করব রে বিকল।”
বাঙালির মনস্তত্ত্ব, তাদের সুপ্ত আবেগ এবং ভেতরের শক্তির উৎসকে নজরুল যত গভীরভাবে বুঝেছিলেন, তা বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে সত্যিই এক বিস্ময়কর ঘটনা। তিনি জানতেন এ দেশের মানুষ যেমন শান্ত, পলিমাটির মতো কোমল ও প্রেমময়, তেমনই নিজের অধিকার ও আত্মমর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে তারা রুখে দাঁড়াতে জানে, প্রয়োজনে মহাপ্রলয় সৃষ্টি করতে পারে।
আর তাই বাঙালির জীবনের প্রতিটি জাতীয় আন্দোলন, ঐতিহাসিক সংগ্রাম ও ক্রান্তিলগ্নে নজরুলের লেখা কবিতা আর গান হয়ে উঠেছে রাজপথের অবিনাশী স্লোগান এবং অধিকার আদায়ের প্রধানতম মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে চব্বিশের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান- প্রতিটি গণজাগরণেই নজরুলের গান ও কবিতা মানুষকে স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মরণজয়ী প্রেরণা জুগিয়েছে। যখনই এ দেশের তরুণ প্রজন্ম কিংবা সাধারণ মানুষ কোনো জল্লাদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে, তখনই তাদের কণ্ঠে অবধারিতভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে:
“বল বীর-
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারী’ আমারি, নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!”
কিংবা স্বৈরাচারের কারাগার যখন মুক্তিকামী মানুষকে বন্দি করতে চেয়েছে, তখন রাজপথ কেঁপে উঠেছে তাঁর এই অবিনাশী পঙ্ক্তিতে:
“কারার ঐ লৌহ-কপাট,
ভেঙে ফেল কর রে লোপাট,
রক্ত-জমাট
শিকল-পূজার পাষাণ-বেদী!”
নজরুলের এই পঙক্তি গুলো কেবল কাগজের বুকে অক্ষরের সাধারণ বিন্যাস নয়; এগুলো বাঙালির জাতীয় চরিত্রের একেকটি জীবন্ত ও সক্রিয় উপাদান, যা প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী ও আপসহীন করে তোলে। নারীর অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নেও নজরুলের রাজনীতি ও দর্শন ছিল সমকালের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক ও প্রগতিশীল। তিনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভণ্ডামিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গেয়েছেন নারীর সাম্যের গান:
“সাম্যের গান গাই-
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।
বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
বাংলাদেশের ইতিহাসের এই মহান আলোকবর্তিকা, আমাদের চেতনার মূল চালিকাশক্তি কাজী নজরুল ইসলামকে বর্তমান যুগেও সমান প্রাসঙ্গিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
কেবল সাধারণ মজলুম মানুষের মাঝে না, নজরুল প্রভাব বিস্তার করেছেন দেশের সকল স্তরের মানুষের মাঝে। এই তালিকায় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানও আছেন। আজ তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আসনে আসীন হয়েছেন ঠিক, তবে তিনিও মজলুমদের একজন ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছেন, কারাবাস করেছেন, নির্বাসিত হয়েছেন। এই নির্বাসন কারাবাস ছিল নজরুলের জীবনেও। যে কারণে কবি নজরুলের বোধের প্রভাব প্রধান মন্ত্রীর ভেতরে বিদ্যমান। আর এই কারনেই তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, কর্ম, দর্শন ও মূল্যবোধের ব্যাপক ও গভীর প্রসারের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিয়েছেন। তার নির্দেশে শুরু হয়েছে বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’-এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। এই আয়োজনের জাতীয় গুরুত্ব অনুধাবন করে রাষ্ট্রীয়ভাবে কবির সাহিত্য ও দর্শনের মূল সুরকে কেবল সরকারি অফিসের ফাইল, প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা বা কোনো নির্দিষ্ট বুদ্ধিজীবী মহলের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
কবি নজরুল যে এ দেশের মানুষের কতটা গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আবেগে সিক্ত, তা পুনর্ব্যক্ত করে স্মরণ করা হয় ১৯১৪ সালের সেই স্মৃতিময় ও ঐতিহাসিক অধ্যায়কে, যখন এক কিশোর বয়সে তিনি দারিদ্র্যের কষাঘাত উপেক্ষা করে প্রথমবারের মতো ময়মনসিংহের ত্রিশালে এসেছিলেন।
প্রধান মন্ত্রীর নির্দেশে কবির সেই অনন্য স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালকে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনাও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে সরকার।
পাশাপাশি ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কালকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে কবির কালজয়ী সাম্যবাদী ও মানবিক দর্শনকে নতুন প্রজন্মের মননে ও মগজে গেঁথে দেওয়ার এক মহতী ও যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা ভীষণ সময়োপযোগী।
বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে কাজী নজরুল ইসলামের প্রাসঙ্গিকতা এবং এই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে তাঁর অবদানের গভীরতা ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান প্রধান মন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, দূরদর্শী ও রাজনৈতিক ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেছেন। তিনি যথার্থই বলেছেন, জাতিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই দেশের ভুখন্ডে জন্ম্রগ্রহণ করেননি ঠিকি, তবে তিনি এই দেশের মানুষের চিন্তা-চেতনা নিজের ভেতরে ধারন করেছেন সবচে বেশি।
“বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, দ্রোহের কবি, তারুণ্যের কবি, বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কবি, কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় সাহিত্য সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত, পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তাঁর আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো।”
এবং সেই বক্তব্যের শুরুতেই প্রধান মন্ত্রী বলেন- আমি এই উদ্ভোধন অনুষ্ঠানটাকে একটু ভিন্নভাবে আশা করেছিলাম। আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি সকল বিভাগীয় জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে নজরুল গবেষক নজরুল শিল্পী, লেখক ও নজরুলপ্রেমী গন সংযুক্ত থাকবেন, তাহলে বোধহয় আরো যৈাক্তিক ও সামঞ্জস্যপূর্ন হবে।
মাননীয় প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের এই নিপুণ মূল্যায়ন নজরুলের বহুমাত্রিক রূপকে অত্যন্ত সার্থকভাবে ধারণ করে। তিনি আরও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন, “অন্যায়, শোষণ, বৈষম্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কবির কলম ছিল শানিত অস্ত্র। প্রেম, প্রকৃতি থেকে শুরু করে ইসলামী মূল্যবোধ কিংবা শ্যামা সংগীত প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুল আমাদের শুদ্ধ প্রকাশের নামান্তর।”
এই বক্তব্যটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, নজরুলকে কোনো একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি, ধর্ম বা রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে বন্দি করা কেন অসম্ভব। এই সার্বিক বিষয় এটা অনুধাবন এটা বলাই যায় যে প্রধান মন্ত্রী জনাব তারেক রহমান নজরুলের লেখা ও চিন্তা চেতনায় কতটা প্রভাবিত।
কাজী নহরুল ইসলাম একদিকে যেমন তাঁর কালজয়ী গজল, হামদ ও নাতের মাধ্যমে মুসলিম হৃদয়ে ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার সুধা ঢেলেছেন, অন্য দিকে তেমনই অনন্য সব শ্যামা সংগীত ও কীর্তনের মাধ্যমে এ দেশের আবহমান অসাম্প্রদায়িক ও মিশ্র সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।
তিনি যখন লেখেন:
“মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।”
তখন তাঁর এই বাণী কেবল ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা বলে না, বরং তা হয়ে ওঠে এই ভূখণ্ডের মানুষের মিলেমিশে থাকার এক শাশ্বত দলিল। তাঁর কলম যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে খড়গের মতো নেমে আসত, তেমনই শোষিত মানুষের দুঃখ নিবারণে তা হয়ে উঠত এক পরম সান্ত্বনা। কবি নিজে চরম দারিদ্র্য ও কষ্টের মুখোমুখি হয়েও কখনো সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলতে ভোলেননি। ‘দারিদ্র্য’ কবিতায় তিনি তাই দুঃখকে বরণ করে নিয়েছেন এক মহান শিক্ষকের মতো:
“হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান।
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিষ্টের সম্মান
কণ্টক-মুকুট শোভা- দিয়াছ, তাপস,
অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস।”
কাজী নজরুল ইসলাম আজীবন যে বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত এবং স্বৈরাচারমুক্ত মানবিক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন,
চব্বিশের জুলাই পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের মানুষও আজ ঠিক সেই একই আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যয় নিয়ে বুক বেঁধেছে। জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই নতুন পরিমণ্ডলে নজরুলের দর্শন আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, শোষিতের পক্ষে তাঁর দৃঢ় অবস্থান এবং সাধারণ মানুষের সার্বিক মুক্তির লড়াই আজ আমাদের ভাঙা রাষ্ট্রকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রধানতম পথপ্রদর্শক।
বছরব্যাপী ঘোষিত ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনের মাধ্যমে যদি আমরা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে ডুবে না থেকে কবির সেই শানিত, আপসহীন ও প্রগতিশীল চেতনাকে আমাদের যাপন ও রাজনীতিতে ধারণ করতে পারি, তবেই কবির প্রতি প্রকৃত এবং সার্থক শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হবে।
কাজী নজরুল ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট কাল, যুগ বা ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ থাকার মতো সাধারণ কোনো ব্যক্তিত্ব নন; তিনি হলেন এক কালজয়ী চেতনা। যতদিন এই বাংলাদেশে অন্যায়ের কালো ছায়া থাকবে, যতদিন শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের নীরব আর্তনাদ আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হবে, ততদিন কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের হৃদয়ের গভীরে, আমাদের রাজপথের উত্তাল স্লোগানে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের উত্তোলিত মুষ্টিতে এবং আমাদের সামগ্রিক জাতীয় চেতনার দেদীপ্যমান মশাল হয়ে চিরকাল জাগ্রত থাকবেন। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন- বাংলাদেশের স্পন্দনে, বাঙালির মনে ও মননে।
লেখক : কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









