জুলাই আবার ফিরে এসেছে। এই মাস এখন আর কেবল বর্ষার মাস নয়। বাংলাদেশের কোটি মানুষের স্মৃতি, ত্যাগ, রক্ত আর সাহসের মাস। ইতিহাসের পাতায় জুলাই নতুন অর্থ নিয়ে জায়গা করে নিয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা প্রশ্ন ওঠে।
২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়েও বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়। ভোট গ্রহণের আগেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করার অভিযোগ ওঠে। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে, জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ অর্থাৎ শেখ হাসিনার সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। কিন্তু মানুষের মনে সন্দেহ থেকেই যায়।
২০২৪ সালের নির্বাচনও বিতর্ক এড়াতে পারেনি। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অনেক দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। সরকারি দলের প্রার্থীদের বিপরীতে একই দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অংশগ্রহণকে ঘিরে 'ডামি নির্বাচন' শব্দটি জনমনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
এরই মধ্যে মানুষের ক্ষোভ জমতে থাকে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তোলে। ব্যাংক খাত, অর্থপাচার, দুর্নীতি এবং আর্থিক অনিয়ম নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসে। শেয়ারবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত হন অসংখ্য ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী। অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। একই সময়ে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। বহু পরিবার আজও তাদের প্রিয়জনের খোঁজের অপেক্ষায়। পরে আলোচনায় আসে কথিত "আয়নাঘর"। এসব ঘটনা মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ তৈরি করে।
এই জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। জুলাইয়ের প্রথম দিনে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। শুরুতে দাবিটি ছিল বৈষম্য দূর করার। কিন্তু আন্দোলনের প্রতি শাসক শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে দ্রুত বদলে দেয়। একটি ছোট্ট আগুন যেমন দাবানলে রূপ নেয়, তেমনি ছাত্রদের আন্দোলনও অল্প সময়ের মধ্যে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন মত, বিভিন্ন শ্রেণি, বিভিন্ন পেশার মানুষ এক কাতারে দাঁড়াতে শুরু করেন। তখন পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে একটি দাবি; ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও গণতন্ত্র।
১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যু দেশকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর সেই ছবি মানুষের হৃদয়ে অমোচনীয় হয়ে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সেই দৃশ্য। কোটি মানুষের চোখে তখন ক্ষোভ, বেদনা আর প্রতিবাদের আগুন। সেদিন আমিও লিখেছিলাম তার লাইনের ছোট্ট একটি ছড়া —
বুক চিতিয়ে হাত বাড়িয়ে
মৃত্যুকে যে করল বরণ,
জয়ের পরে এই সাথীকে
সব সাথীরা রাখিয়ো স্মরণ।
ছড়াটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। অসংখ্য মানুষ সেটি শেয়ার করেছিলেন। অনেকে নিজের টাইমলাইনে কপি করে প্রকাশ করেছিলেন। শিল্পীরা রঙতুলিতে এঁকেছিলেন আবু সাঈদকে। কবিতা, গান, পোস্টার আর দেয়ালচিত্র আন্দোলনের শক্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এরপর আন্দোলন আর থেমে থাকেনি।
দেশের বিভিন্ন শহর, জেলা ও উপজেলা মানুষের ঢলে ভরে যায়। রাজপথ হয়ে ওঠে প্রতিবাদের মঞ্চ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। গুলিবর্ষণ, সহিংসতা এবং প্রাণহানির ঘটনাও বাড়ে। প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হন। হাজার হাজার মানুষ আহত হন। অনেকে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান। কারও হাত-পা হারাতে হয়। অনেকেই এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন। এইসব প্রতিটি মৃত্যুই এক-একটি পরিবারের স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। প্রতিটি আহত মানুষ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী।আন্দোলনের একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা 'হাসিনার পদত্যাগের' এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। তখন আন্দোলনের লক্ষ্য আর শুধু কোটা সংস্কার ছিল না। তা পরিণত হয় সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দেশের নানা স্থানে সংঘর্ষ চলতে থাকে। রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে পৌঁছে যায়। ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) লাখ লাখ মানুষ রাজধানীর দিকে অগ্রসর হন। গণভবন অভিমুখে মানুষের স্রোত ইতিহাসের অন্যতম বড় গণসমাবেশে পরিণত হয়। সেই দিন শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটে।
এরপর সারাদেশে শুরু হয় উল্লাস। আবার কোথাও কোথাও প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। ইতিহাসের এই অধ্যায় তাই যেমন বিজয়ের, তেমনি বেদনারও। আজ দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই আন্দোলনের স্মৃতি এখনো জীবন্ত। অনেক পরিবার এখনো তাদের প্রিয়জন হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছে। বহু আহত মানুষ এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। তাঁদের আত্মত্যাগ কখনো ভোলা যাবে না। জুলাই আমাদের শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা মনে করিয়ে দেয় না। জুলাই মনে করিয়ে দেয়, জনগণের শক্তি কত বড় হতে পারে।
তরুণদের সাহস একটি জাতির ইতিহাস বদলে দিতে পারে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ একসঙ্গে দাঁড়ালে পরিবর্তন সম্ভব। তবে ইতিহাসের আরেকটি শিক্ষা আছে। শুধু স্বৈরাচারের পতনই যথেষ্ট নয়। গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে আইনের শাসন, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতা যেন আর কখনো এক ব্যক্তি বা এক দলের হাতে সীমাহীনভাবে কেন্দ্রীভূত না হয়। যেটা করে রেখেছিল ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। সেটা যেন বাংলাদেশে আর কখনোই কোন সরকার বা সরকার প্রধান না করেন, সেটিই হতে হবে ভবিষ্যতের অঙ্গীকার।
২০২৬ সালের জুলাই শুরু হয়েছে। এই মাস আমাদের শুধু অতীত স্মরণ করার জন্য নয়। ভবিষ্যৎ গড়ারও মাস। শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে হলে বিভেদ নয়, ঐক্য দরকার। প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার দরকার। ধ্বংস নয়, রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতি দরকার। জুলাই এসেছে মাথা উঁচু করে। বিজয়ের প্রতীক হয়ে। এই মাস আমাদের সাহস শেখায়। আশা শেখায়। দায়িত্বও শেখায়।
আসুন, আমরা সেই আত্মত্যাগকে সম্মান জানাই। আহতদের পাশে দাঁড়াই। শহীদদের স্বপ্নকে বুকে ধারণ করি। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ি, যেখানে মানুষের ভোটের অধিকার থাকবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, আইনের শাসন থাকবে এবং রাষ্ট্র হবে সবার। জুলাইয়ের চেতনা তখনই সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









