কবি জীবনানন্দ দাশের কালজয়ী কবিতার সেই রহস্যময়ী চরিত্র ‘বনলতা সেন’ বড় পর্দায় হাজির হয়েছিলেন গত ঈদুল আজহার উৎসবে। কয়েক দফা মুক্তি পেছানোর পর অবশেষে গত ঈদুল আজহায় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত এই বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমাটি। জীবনানন্দের কবিতার প্রতি পাঠকদের যে চিরন্তন আবেগ রয়েছে, তাকে কেন্দ্র করেই এই পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে। বনলতা সেন চলচ্চিত্রটি দর্শকদের মনে গভীর কৌতূহল ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। রুপালি পর্দায় জীবনানন্দ দাশের চরিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি তার কালজয়ী সৃষ্টি বনলতা সেন চরিত্রকে গভীর ব্যঞ্জনাময় করে উপস্থাপন করা হয়েছে। কবির ভাবমূর্তি এবং কবিতার ভেতরের হাহাকার ফুটিয়ে তুলতে প্রধান চরিত্রের অভিনেতা কঠোর পরিশ্রম করেছেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও অনবদ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন দেশের মেধাবী একঝাঁক প্রতিভাবান শিল্পী। তাঁদের সম্মিলিত পারফরম্যান্স সিনেমাটিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। চলচ্চিত্রটি ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ৭০ লাখ টাকা অনুদান লাভ করেছিল। পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল এই প্রজেক্টটি নিয়ে দীর্ঘসময় ধরে কাজ করেছেন এবং তাঁর পরিকল্পনা ছিল ২০২৪ সালেই এটি দর্শকদের সামনে নিয়ে আসা। তবে দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার কারণে কয়েক দফায় সিনেমাটির মুক্তির তারিখ পিছিয়ে দিতে হয়েছিল।
অবশেষে সব জটিলতা কাটিয়ে কোরবানির ঈদের বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে এটি মুক্তি পায়। কবিতার সেই রূপক ও দর্শনের মিশেলে নির্মিত এই সিনেমাটি বাংলা চলচ্চিত্রের সৃজনশীল দর্শকদের জন্য এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য, স্বচ্ছতা এবং সৃজনশীলতার বিকাশকে গুরুত্ব দিয়ে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, সরকার রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চায় এবং সেই লক্ষ্যেই চলচ্চিত্রসহ সৃজনশীল খাতকে জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জাতীয় চলচ্চিত্র সংসদ সম্মেলন ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেছেন।
এজন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দের ঘোষণা এসেছে। আমাদের সমাজ, সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে মেধা ও মননশীলতার চর্চাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।এর ফলশ্রুতিতে সমাজের কলুষতা, কুসংস্কার, গোঁড়ামি, বিকৃতি, সন্ত্রাস,মাদকাসক্তি, হিংসা বিদ্বেষ, অপরাধ প্রবণতা দূর হয়ে সুস্থ সুন্দর রুচিশীল সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। এক্ষেত্রে চলচ্চিত্র হতে পারে শক্তিশালী মাধ্যম। স্রেফ বিনোদন দেয়া নয় আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ধারাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চলচ্চিত্র জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারে। উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, প্রগতির পথে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে চলচ্চিত্রের বিকল্প আর কিছু হতে পারে না।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চলচ্চিত্র শিল্পে যেখানে নতুন নতুন দিগন্তের উন্মোচন হচ্ছে সেখানে আমাদের চলচ্চিত্র তার অতীত ঐতিহ্য ও সাফল্যের গৌরবগাথা হারিয়ে রুগ্ন, দুর্বল, মুমূর্ষু এবং দুস্থ অবস্থায় পৌঁছেছে। এখন আর ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকা নয়, একেবারেই শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প। কেবলমাত্র দুই ঈদ উৎসবের সময় সাত আটটি নতুন সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে আসছে। কয়েকদিন হয়তো দাপটে ব্যবসা করে হারিয়ে যাচ্ছে সবার সামনে থেকে। সারাবছরে হয়তো কিছু ছবি মুক্তি পাচ্ছে, তবে সেগুলো সম্পর্কে অধিকাংশ দর্শকের আগ্রহ কৌতূহল একেবারেই নেই। নীরবে-নিভৃতে এসব চলচ্চিত্র মুক্তি পায়, যা মোটাদাগে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য পজিটিভ কিছু বয়ে আনতে পারছে না। দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা কমে যাওয়া চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
আজকাল আমাদের চলচ্চিত্র ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরের কতিপয় সিনেপ্লেক্সে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সিনেমা হলের সংখ্যা কমতে কমতে মাত্র গুটিকয়েকে এসে পৌঁছেছে । একেরপর এক বড় বড় শহরগুলোর বহু প্রাচীন,পুরনো , ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে নির্মিত হয়েছে সুপার মার্কেট কিংবা শপিং মল। বিদ্যমান একক সিনেমা হলগুলো টিকিয়ে রাখা ও আধুনিকায়নের জন্য সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।
১৯৭৬ সাল থেকে সিনেমা নির্মাণের জন্য সরকারি অনুদান দেওয়া হয়ে থাকে। বেশ কয়েকবার অনুদান প্রদান বন্ধ থাকলেও, ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে নিয়মিতভাবে আবার চলচ্চিত্র অনুদান প্রদান করা হচ্ছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যখন সুদিন ছিল, সেই ১৯৭৬ সালে প্রথম সরকারি অনুদান পেয়েছে মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী পরিচালিত ‘সূর্য দীঘল বাড়ি'। তখন অনুদান নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠতো না। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো এবারও রাষ্ট্রীয় অনুদান প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশে সরকারি অনুদানে চলচ্চিত্র নির্মাণের ইতিহাস প্রায় পাঁচ দশকের। এ তালিকায় রয়েছে 'গোলাপী এখন ট্রেনে' ,‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী', ‘দহন', ‘আগুনের পরশমনি'র মতো ছবি। দেশীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানবিক মূল্যবোধ তুলে ধরা আর নতুন নির্মাতাদের উৎসাহিত করতে নান্দনিক ও নিরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য প্রতিবছর অনুদান দিচ্ছে সরকার।
মাঝে কয়েক বছর বন্ধ থাকলেও ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে আবারও নিয়মিত হয় অনুদান। তখন থেকেই এতে রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এখনও অনুদান সেই স্বজনপ্রীতির দূষণ থেকে মুক্ত হতে পেরেছে কিনা প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম অনুদানপ্রাপ্ত সিনেমা ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ র পর থেকে এখন পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকটি সিনেমা ছাড়া বেশিরভাগই ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ। বিশেষ করে গত এক দশকে একটি সিনেমাও দেখেনি সফলতার মুখ। এর মধ্যে বিতর্ক তো রয়েছেই। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অনুদান তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরও শুরু হয় তুমুল আলোচনা-সমালোচনা।
প্রশ্ন তুলে অনেকেই বলছেন, নীতিমালা অবজ্ঞা করে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অনেকেই সরকারি অনুদান পাচ্ছেন। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যদি একটু হিসাব করা হয়, তাহলে বিগত ৫০ বছরে এসব সিনেমা নির্মাণে সরকারের তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে প্রায় কয়েকশ কোটি টাকা। সরকারি অনুদানে নির্মিত সিনেমার সংখ্যাও প্রায় চার শতাধিক। প্রশ্ন হলো, এর মধ্যে কয়টি সিনেমা ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়েছে বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে? আন্তর্জাতিক হিসাব বাদ দিলে, দেশেও এসব সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানতে ব্যর্থ হচ্ছে। কেন মুখ থুবড়ে পড়ছে এ অনুদানের সিনেমা?
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অনুদান প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে মাত্র কয়েকটি সিনেমা বিশ্বস্বীকৃতি পেয়েছে ও পুরস্কার অর্জন করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’। ১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এ সিনেমাটি ১৯৮০ সালে মস্কো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল পুরস্কৃত হয়েছে। ‘গাড়িওয়ালা’ নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা ২৬টি দেশের ৭৮টি ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয় এবং স্পেনের পিকনিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা সিনেমার পুরস্কার এবং টেক্সাস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সাতটি পুরস্কার অর্জন করে। ‘মাটির প্রজার দেশে’ নামে একটি সিনেমা ২০১৮ সালে দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, শিকাগোর সাউথ এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ইতালির কারাওয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ও ইন্দোনেশিয়ার রয়্যাল বালি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালসহ ২০টির বেশি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেয়। এর মধ্যে শিকাগোর সাউথ এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দর্শক পছন্দে সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার পুরস্কার লাভ করে। ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ নামে একটি সিনেমা ২০১৪ সালে দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। এটি ২০১৬ সালের শ্রীলংকার কলম্বোয় অনুষ্ঠিত সার্ক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয়। এ ছাড়া কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও অংশ নেয়।
গত কয়েক বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত অনুদানের সিনেমার দিকে নজর দিলে দেখা যায়, এগুলো শুধুই যে ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হয়েছে তা নয়, ব্যাপকভাবে সমালোচিতও হয়েছে। এসব সিনেমা নিয়ে দর্শকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদেরও কোনো ধরনের আগ্রহ নেই। বিষয়টি এমন যে, নিয়ম রক্ষার্থে বানাতে হবে, তাই বানানো। যার মান নিয়েও বরাবরই প্রশ্ন ওঠে। ফলে, এসব ‘মানহীন’ সিনেমা দর্শক অনাগ্রহ সৃষ্টি করছে। শুধু তাই নয়, অনুদানের সিনেমা মানেই ‘মানহীন’ এমন একটি ধারণাও তৈরি করেছে সিনেমাপ্রেমী সাধারণ দর্শকদের মধ্যে। গত তিন বছরের সিনেমাগুলোর দিকে তাকালে একটিও সফল সিনেমা পাওয়া যায়নি। অনুদানের সিনেমার প্রতি এত অনাগ্রহ কেন বা কেনই এগুলো ব্যর্থ হচ্ছে?
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে অনুদানের সিনেমার প্রতি দর্শকের অনাগ্রহের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ জড়িত। এরমধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো-গল্পের দুর্বলতা ও নৈপুণ্যের অভাব, বিনোদনের মাত্রা কম, প্রচারণার অভাব, দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি, প্রযুক্তিগত ও কর্মদক্ষতার ঘাটতি ইত্যাদি। অনুদানপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোকে যদি শুধু শিল্পীকেন্দ্রিক বা উৎসব-উদ্দেশ্যমূলক না রেখে সাধারণ দর্শকের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তৈরি করা যায় এবং সেগুলোর প্রচারণা ও প্রদর্শন বাড়ানো যায়, তাহলে দর্শকের আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব।
গত অর্থবছরের মধ্যে অনুদান ঘোষিত হলো না। এখন কবে হবে তার আলামত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। চলচ্চিত্রের অনুদান প্রদানের জন্য বছর বছর অনুদান কমিটি পুনর্গঠন করে সরকার। কমিটিই অনুদানের পুরো বিষয়টি দেখভাল করে। অনুদান নীতিমালা অনুযায়ী পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য আলাদা আলাদা দুটি করে মোট চারটি কমিটি করা হয়। কমিটিগুলো হলো, বাছাই কমিটি ও অনুদান কমিটি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চলচ্চিত্রের প্রস্তাব দেখভালের জন্য এখনো কোনো কমিটিই পুনর্গঠন করেনি সরকার। প্রকৃতপক্ষে অনুদান কমিটি পুনর্গঠন না করায় অনুদানপ্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। কমিটি পুনর্গঠনের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতিও দেখা যাচ্ছে না।২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অনুদান কমিটি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেই কমিটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনুদান ঘোষণা করে। তবে অনুদান পাওয়া সিনেমার কোনোটিই দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পায়নি।
পুরনো বাছাই কমিটি এখনো আছে কি না, এটা সুস্পষ্ট নয়। নতুন কমিটি পুনর্গঠনের প্রজ্ঞাপন হওয়া পর্যন্ত ওই কমিটি কার্যকর থাকার কথা। তবে গত ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে সেই কমিটি বর্তমানে নিষ্ক্রিয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুদান কমিটি পুনর্গঠন করা জরুরি ছিল। সেটি না হওয়ায় অনুদানের জট তৈরি হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। তবে চলচ্চিত্র নিয়ে (তথ্য ও সম্প্রচার) মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। অনুদান কমিটি করাটা কোনো রকেট সায়েন্স নয়। কমিটিতে সরকারেরই ছয়–সাতজন থাকেন। চার-পাঁচজন ফিল্ম এক্সপার্ট হলেই কমিটি করা যায়। এত দিনেও সেটা করা যায়নি। কমিটি না হওয়ায় চলচ্চিত্রের প্রস্তাব বাছাইসহ প্রাথমিক কার্যক্রমই শুরু হয়নি।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে , হালে কমিটি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করেছে সরকার। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে অনুদানপ্রাপ্ত অনেক পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের নির্মাতারা প্রথম কিস্তির অর্থ পাওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। শিল্পীদের শিডিউল, লোকেশন, কর্মশালা, প্রি-প্রোডাকশন, পরিকল্পনা সব এগিয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড়ে দীর্ঘ বিলম্বে পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। চলচ্চিত্র কারখানার পণ্য নয় যে, ইচ্ছে করলে কয়েক মাস পরে একই জায়গা থেকে আবার শুরু করা যাবে। একজন শিল্পীর সময় একবার চলে গেলে আবার পাওয়া কঠিন। কোনো কোনো চলচ্চিত্র নির্দিষ্ট ঋতুতে ধারণ করতে হয়। শিশু শিল্পীরা বড় হয়ে যায়। লোকেশন বদলে যায়। ইউনিট ভেঙে যায়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীকেও হারাতে হয়।
সবচেয়ে বড় বিষয়, সময়মতো অর্থ ছাড় না হলে নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। যে লোকেশন আজ যে দামে পাওয়া যাচ্ছে, কয়েক মাস পর সেটির খরচ বাড়ে। ইউনিট পুনর্গঠন করতে হয়। শিল্পীদের পারিশ্রমিক বদলায়। নতুন করে পরিকল্পনা করতে হয়। অনেক নির্মাতা বাধ্য হয়ে ঋণ নেন, যার সুদ ও আর্থিক চাপ শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের ওপরই পড়ে। অর্থাৎ সরকার যে টাকা সাশ্রয় করছে বলে মনে করছে, বাস্তবে তার বহুগুণ বেশি ক্ষতি হচ্ছে চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়ায়। অনুদানের উদ্দেশ্য যদি মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণে সহায়তা হয়, তাহলে শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সময়মতো অর্থ ছাড় নিশ্চিত করাও সেই দায়িত্বের অংশ।এই বিষয়ে দীর্ঘসূত্রতা বা প্রশাসনিক উদাসীনতা খুবই হতাশাজনক। কারণ এর ক্ষতি শুধু কয়েকজন নির্মাতার নয়, দেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির। অনুদানকে আমরা অনিশ্চয়তার প্রকল্প নয়, কার্যকর সাংস্কৃতিক সহায়তা হিসেবে দেখতে চাই।
লেখক ; কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









