ফুটবলে কিছু গল্পের শেষ হয় সাফল্যে, কিছু গল্প চোখের জলে। সেই গল্পগুলোর মাঝে কারো কারো গল্প হয়ে ওঠে ইতিহাস। যা যুগের পর যুগ বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে। নেইমার জুনিয়রের বিশ্বকাপ অধ্যায়ও যেন ঠিক তেমনই এক ইতিহাস।
এখানে আছে স্বপ্ন, অবিশ্বাস্য প্রতিভা, জাদুকরী মুহূর্ত, ইনজুরির কবলে পরে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ফিরে আসার গল্প। আর সবশেষে আছে নিঃশব্দ এক স্বীকারোক্তি, ‘‘আমি চেষ্টা করেছি... আমি সত্যিই চেষ্টা করেছি... এখন সব শেষ।’’
এটি বিদায়বার্তা নয় এ যেন নেইমারের পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সারসংক্ষেপ। একটি স্বপ্ন যাত্রার শেষ অধ্যায়। একটি অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প।
তার হাতের স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটি। কিন্তু পৃথিবীর কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় স্পর্শ করেছেন নেইমার। যার মূল্য কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে হিসেব হয় না। কারণ তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একটি প্রজন্মের আবেগ, ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সৌন্দর্যের প্রতীক এবং আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে নান্দনিক খেলোয়ারদের একজন। একজন কিংবদন্তি।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেকেই বিশ্ব বুঝে গিয়েছিল এক প্রতিভার আগমন ঘটেছে। তার পায়ের জাদু, চোখধাঁধানো ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস, অবিশ্বাস্য গোল এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার ক্ষমতা খুব অল্প সময়েই তাকে বিশ্বের সেরাদের কাতারে নিয়ে যায়। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন ব্রাজিলের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু, আর কোটি মানুষের বিশ্বাস।
চারটি বিশ্বকাপ, বারবার স্বপ্ন ভাঙার গল্প
২০১৪ সালে নিজের দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলতে নেমেছিলেন নেইমার। পুরো ব্রাজিলের স্বপ্ন যেন এসে জমা হয়েছিল তাকে ঘিরে। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেও ছিলেন কিন্তু কলম্বিয়ার বিপক্ষে মাঠে এক ভয়ঙ্কর ট্যাকেলের শিকার হয়ে মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাতে তার বিশ্বকাপের যাত্রা শেষ করে দেয়। অতঃপর বিশ্ব নেইমারে অভাব দেখল পরের ম্যাচেই, যেখানে জার্মানির বিপক্ষে ৭–১ গোলে বিধ্বস্ত হলো ব্রাজিল।
২০১৮ সাল ইনজুরি কাটিয়ে পরিণত নেইমার ফিরলেন রাশিয়া বিশ্বকাপে। দলকে দিলেন নেতৃত্ব। গোল করলেন, সতীর্থদের দিয়ে গোল করালেন, কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছেই থমকে গেল সোনালী কাপ ছোঁয়ার স্বপ্ন।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ। ভাগ্য যেন আরও নিষ্ঠুর হয়ে উঠল নেইমারের প্রতি। গ্রুপ পর্বে চোটে পড়লেও হাল ছাড়েননি। ফিরে আসলেন আবার। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে দুর্দান্ত এক গোল করে ব্রাজিলকে এগিয়ে দেন। মনে হচ্ছিল, বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্ন বুঝি এবার সত্যি হতে চলেছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গোল হজম, এরপর টাইব্রেকারে বিদায়। ম্যাচ শেষে মাঠেই নেইমারের শিশুর মতো কান্নায় কেদেঁছে অগণিত সমর্থক।
এরপর নানা চরাই উৎরাইয়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয়। ২০২৩ এর ইনজুরি নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ, ধরে নিয়েছিল সবাই। কিন্তু তিনি হার মানতে রাজি ছিলেন না। দীর্ঘ অস্ত্রোপচার, কঠিন পুনর্বাসন আর অসীম মানসিক শক্তি নিয়ে আবারও ফিরলেন মাঠে। লক্ষ্য একটাই দেশের জার্সি ইতিহাস গড়া। হেক্সা জেতা।
২০২৬ সাল অবশেষে সেই স্বপ্ন পূরণে বিশ্বকাপ। মাঠে নামলেন, খেললেন, পেরুলেন গ্রুপ পর্ব। এবার দেখা হলো ব্রাজিলের দুঃস্বপ্ন নরওয়ের সঙ্গে। সেই অমানিশার বাঁধায় শেষ হয়ে গেল এক ভাগ্যাহত কিংবদন্তির স্বপ্ন। দল যখন বিদায়ের সুরে মূর্ছিত তখন শেষ মুহূর্তে গোল করে জানিয়ে গেলেন, তিনি এসেছিলেন, লড়েছিলেন দেশের জন্য। শুধু ভাগ্য তাকে জিততে দেয়নি। দেয়নি পেলের নামের সঙ্গে তার নাম আজন্ম জড়িয়ে রাখতে। তবে নেইমার আবারও প্রমাণ দিয়ে গেলেন কিংবদন্তি হতে সব সময় ট্রফির প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন অদম্য মানসিকতা, ত্যাগ আর ভালোবাসা।
নেইমার শুধু আবেগে নন, সংখ্যাতেও তিনি অনন্য
ব্রাজিলের জার্সিতে ১৩০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ৮০টি গোল এবং ৫৯টি অ্যাসিস্ট। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় তিনি কতটা প্রভাবশালী ছিলেন। এখানেই আছে ফুটবল সম্রাট পেলেকে তিনি ছাড়িয়ে যাওয়া ও জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম লেখানোর এক মহাকাব্য। যে দেশের হয়ে খেলেছেন পেলে, গ্যারিঞ্চা, জিকো, রোমারিও, রোনালদো, রিভালদো ও রোনালদিনহোর মতো কিংবদন্তিরা, সে সাম্বার নৃত্যেই নেইমার সাজিয়েছেন সবাইকে ছাঁড়িয়ে যাওয়ার মহাকাব্যের কীর্তিবার্তা।
একটি যুগের নাম
ফুটবল ইতিহাসের পরিসংখ্যানে লেখা থাকবে নেইমার বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। কিন্তু যে সত্যও লেখা থাকবে না পরিসংখ্যানে তা হলো- একজন এসেছিল ব্রাজিল ফুটবলে, যিনি পেলে, রোনালদো, রোনালদিনহোর পর্ব শেষে একটি প্রজন্মকে ব্রাজিলের ফুটবলের প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছিলেন। তার মোহ ছড়িয়ে ছিলেন প্রতিটি ড্রিবলিংয়ে, প্রতিটি গোলে, ইনজুরিতে হৃদয়ভাঙার গল্পে, আর প্রতিটি প্রত্যাবর্তনে।
অবশেষে হার মানলেন নেইমার, আন্তর্জাতিক ফুটবলকে জানালেন বিদায়। অশ্রুশিক্ত নয়নে ভাসল বিশ্ব। আর তার সমর্থকরা জানান দিল অনাগত ইতিহাস বলবে, এক জাদুকরের কথা। যিনি ভাগ্যের বিপরীতে লড়েছিলেন শেষ পর্যন্ত। ভাগ্য লিখনীকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফিরে এসেছিলেন বারবার সেই চিরচেনা হলুদ জার্সিতে।
বিদায় হে, ভাগ্যাহত কিংবদন্তি।।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









