হামাস তাদের গাজা উপত্যকার জরুরি সরকারি কমিটি বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেয়। প্রায় দুই দশকের শাসনের পর এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক মোড়। ২০০৭ সালের জুনে হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর থেকে গাজার প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও সামাজিক কাঠামোর উপর তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের ফলে এই শাসন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়। এই চুক্তির দ্বিতীয় পর্যায়ে গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নির্ধারণের কথা ছিল। হামাসকে তাদের ক্ষমতা একটি প্রশাসনিক কমিটির হাতে তুলে দিতে হবে। ৬ জুলাইয়ের ঘোষণার মাধ্যমে হামাস তাদের প্রশাসনিক ক্ষমতা জাতীয় গাজা প্রশাসন কমিটির হাতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করল।
গাজা সরকারের মিডিয়া অফিসের প্রধান হিসেবে ইসমাইল আল-থাওয়াবতা আল-আকসা হাসপাতালের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন। তিনি জানান জরুরি কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আল-ফার্রা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। কমিটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, প্রশাসনিক ও সরকারি পরিবর্তনের সুবিধার্থে।
হামাস স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তাদের প্রশাসনিক কমিটি বিলুপ্ত হচ্ছে। কারিগরি ও পেশাদার কর্মচারীরা তাদের পদে থাকবেন জনসেবার ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে। সকল সরকারি কর্মচারী ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য এডমেনিটেশন অফ গাজা’ ( NCAG)-এর অধীনে কাজ করতে প্রস্তুত।
হামাসের ঐতিহাসিক ভূমিকা
১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদার সময় ফিলিস্তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের একটি শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় হামাস। সংগঠনের নাম হারাকাত আল-মুকাওামাহ আল-ইসলামিয়্যাহ যার সংক্ষিপ্ত রূপ হামাস। আরবি ভাষায় হামাস শব্দের অর্থ উদ্দীপনা, শক্তি বা সাহসিকতা। প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আহমাদ ইয়াসিন। ২০০৪ সালে ইসরায়েলি হামলায় তিনি শহীদ হন।
হামাসের জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি হল তাদের সামাজিক কার্যক্রম। অবরুদ্ধ গাজায় যেখানে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সেবা পৌঁছাত না সেখানে হামাস মসজিদ, স্কুল, হাসপাতাল, দারিদ্র্য সহায়তা ও যাকাত কমিটির মাধ্যমে জনসেবা পরিচালনা করে আসছে। হামাস-সমর্থিত ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলো গাজার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়েছে। মসজিদ-ভিত্তিক স্কুল ও ধর্মীয় শিক্ষা ও নানান মাত্রিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছে। যাকাত ও দানের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারকে নগদ অর্থ ও খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হওয়া বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ করেছে। দরিদ্র যুগলদের জন্য গণবিবাহের আয়োজন করেছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (International Crisis Group) মনে করে, হামাসের সামাজিক কল্যাণ কার্যক্রম সংগঠনটির বৃদ্ধি ও জনপ্রিয়তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
রাজনৈতিক অর্জন ও নির্বাচনি বিজয়
২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাস ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে। হামাস পরিবর্তন ও সংস্কার নামে অংশটি নির্বাচনে ৭৪টি আসন পায়। ভোটের শতাংশ ছিল ৪৪.৪৫। ফাতাহ পায় ৪৫টি আসন। ভোটের শতাংশ ছিল ৪১.৪৩। অন্যান্য দল পায় ১৩টি আসন। ভোটের শতাংশ ছিল ১৪.১২। ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৪.৬৪ শতাংশ। ১৩ লাখ ৩২ হাজার ২৯৬ জন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ১০ লাখ ১১ হাজার ৯৯২ জন ভোট দেন। কার্টার সেন্টার ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট সে নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বলে অভিহিত করেছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে মূল্যায়ন করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন কোয়ার্টেট হামাস-নেতৃত্বাধীন সরকারকে বয়কট করে। কারণ হামাস ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তির প্রশ্নটি সম্পূর্ণ সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সশস্ত্র প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করে।
সামরিক শাখা
ইয্যাদ্দিন আল-কাসাম ব্রিগেড ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি হামাসের সব থেকে শক্তিশালী সামরিক শাখা। গাজার সবচেয়ে বড় ও সর্বাধিক সুসজ্জিত সশস্ত্র গোষ্ঠী। যাদের ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে কাসাম রকেট, গ্র্যাড রকেট, ফজর-৫, জে-৮০ ক্ষেপণাস্ত্র, মর্টার শেল। সুদীর্ঘ্ সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য ৩৫০ থেকে ৪৫০ মাইল এবং যার গভীরতা ২০ থেকে ২৫ মিটার। ৫ হাজারের বেশি সুড়ঙ্গ শাফট রয়েছে এতে। নির্মাণ ব্যয় ছিল প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এটি গাজা মেট্রো হিসেবে পরিচিত। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর আল-কাসাম ব্রিগেডের সদস্যরা গাজার সীমানা অতিক্রম করে ইসরায়েলে হামলা চালায়। এই হামলায় ১ হাজার ১৮৯ জন ইসরায়েলি নিহত এবং কমপক্ষে ২৫১ জনকে বন্দী করা হয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
হামাসের মিত্র রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে রয়েছে কাতার, তুরস্ক, ইরান, মিশর। কাতার ১.৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে দলটিকে। রাজনৈতিক ব্যুরোর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করেছে। তুরস্ক রাজনৈতিক ও আর্থিক সমর্থন দিয়েছে। এরদোয়ান হামাসকে সমর্থন জানিয়েছেন। ইরান সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। প্রতিরোধ অক্ষের অংশ হিসেবে কাজ করেছে। মিশর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রেখেছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। হামাসের বিরোধী রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইসরায়েল, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান। ২০১৮ ও ২০২৩ সালে জাতিসংঘে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব তোলা হলেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও পায়নি।
গাজায় শাসন ও উন্নয়ন
২০০৭ সালের জুনে ফাতাহ থেকে ক্ষমতা দখলের পর হামাস প্রায় দুই দশক গাজা শাসন করে। ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ইসমাইল হানিয়া গাজা প্রধান হিসেবে প্রথম সরকার গঠন করেন। ২০০৮, ২০১২, ২০১৪ যুদ্ধের সময় নেতৃত্ব দেন। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইয়াহিয়া সিনওয়ার গাজা প্রধান ছিলেন। ২০২১ যুদ্ধ ও ২০২৩ থেকে ২০২৫ বিধ্বংসী যুদ্ধের সময় নেতৃত্ব দেন। ২০২৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোহাম্মদ ওদেহ গাজা প্রধান হিসেবে শান্তি চুক্তি ও ৬ জুলাই ২০২৬ কমিটি বিলুপ্তির নেতৃত্ব দেন।
জনমত ও জনপ্রিয়তা
PCPSR-এর জরিপ অনুসারে অক্টোবর ২০২৫ সালে হামাসের গাজায় হামাসের জনসমর্থন গাজায় ৪৯ শতাংশ। পশ্চিম তীরে ৫৯ শতাংশ। এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় ফিলিস্তিনি দল। ফাতাহের সমর্থন হামাসের চেয়ে কম। ৭০ শতাংশ ফিলিস্তিনি হামাসের নিরস্ত্রীকরণের বিরোধিতা করে। ৬০ শতাংশ হামাসের সমর্থনে সন্তুষ্ট। ৮০ শতাংশ মাহমুদ আব্বাসের পদত্যাগ চায়। মে ২০২৫ জরিপ অনুযায়ী হামাসের সমর্থন ৫৭ শতাংশ ছিল যা ২০২৪ সালে ৭৫ শতাংশ থেকে কমেছে। গাজায় হামাসের সমর্থন ৪৩ শতাংশ। ৭ অক্টোবর হামলার সমর্থন করে ৫০ শতাংশ গাজাবাসী। গাজার ৪৩ শতাংশ বাসিন্দা দেশ ছেড়ে যেতে চায়। যুদ্ধের ক্লান্তি সত্ত্বেও হামাস ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় সংগঠন হিসেবে এখনও টিকে আছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতামত
স্টিমসন সেন্টার মনে করে ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে আরো সহিংসতার ঝুঁকি রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সংক্ষিপ্ত সহিংসতার নীতি এবং পশ্চিম গোলার্ধের প্রতি তাদের আগ্রহ এ অঞ্চলকে নতুন বড় সংঘাত থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করবে। কিন্তু প্রতিটি মোর থেকে ইরান থেকে ইয়েমেন, লেবানন থেকে সিরিয়া, গাজা এবং পশ্চিম তীরে আরও মানুষ মারা যাবে। শান্তির পরিকল্পনা প্রথম পর্যায়েই আটকে আছে। হামাস গাজার অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করছে। কোনো স্বতন্ত্র ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী নতুন করে দাঁড়াতে পারেনি।
‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য এডমেনিটেশন অফ গাজা’ (NCAG) গাজায় প্রবেশ করতে পারছে না। হামাসের বিকল্প কিছু উঠে আসতে পারছে না। এটি হামাসকেই শক্তিশালী করছে। চ্যাথাম হাউস মনে করে (NCAG)-এর গাজায় অনুপস্থিতি সংগঠনটির অক্ষমতার ধারণাকেই শক্তিশালী করেছে। ইসরায়েল ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য এডমেনিটেশন অফ গাজা (NCAG)-কে গাজায় প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে কোনো ভূমিকা পালন করতে না দিয়ে অঞ্চলটিকে আইনহীন ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে। এটি হামাসকে শক্তিশালী করছে কারণ কোনো বিকল্প উঠে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। ইরান ও লেবাননের যুদ্ধগুলো হামাস ও ইসরায়েলের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করেছে। ইরানি রেজিম ও হিজবুল্লাহর বেঁচে থাকার ক্ষমতা হামাসকে তাদের বিরোধিতার অবস্থানে আরও উৎসাহিত করবে। কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস (CFR)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী ট্রাম্পের রোর্ড অফ পিস একটি বিতর্কিত কাঠামো। ৩৫টি দেশ যোগ দিলেও কোনো G7 দেশ এতে যোগ দেয়নি। বোর্ডের প্রথম সভায় ট্রাম্প ১০ বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি দিলেও বিশ্বব্যাংক গাজা পুনর্গঠনের জন্য ৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রয়োজন বলে অনুমান করেছে। বোর্ডের চার্টারে এর সুযোগ-সীমা গাজায় সীমাবদ্ধ নয়। সমালোচকরা আশঙ্কা করছে এটি জাতিসংঘের ভূমিকার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠবে বা জাতিসংঘকে দুর্বল করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
ট্রাম্প প্রশাসনের গাজা শান্তি পরিকল্পনার মাধ্যমে এই বিষয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজা একটি অস্থায়ী সম্মিলিত প্রশাসনিক, অরাজনৈতিক ফিলিস্তিনি কমিটির অধীনে শাসিত হবে। ‘বোর্ড অব পিস’ নামক আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন করা হয়। ট্রাম্প এই বোর্ডের চেয়ারম্যান। বোর্ডে ৩৫টি দেশ যোগ দিয়েছে কিন্তু কোনো G7 দেশ এখনও যোগ দেয়নি। বোর্ডের পরিচালক নিকোলাই ম্লাদেনভ। তিনি বুলগেরিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি দূত। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি দ্বিতীয় পর্যায় শুরুর ঘোষণা দেন। এই পর্যায়ে গাজার অস্ত্রমুক্তি ও পুনর্গঠন অন্তর্ভুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। যদিও ২০১৮ ও ২০২৩ সালে জাতিসংঘে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনুমোদন পায়নি। যুক্তরাষ্ট্র NCAG-কে সমর্থন করে কিন্তু হামাসের নিরস্ত্রকরণকে শর্ত হিসেবে হাজির করে। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সংস্কার ও পরবর্তীতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলো পরিকল্পনাটিকে নিরাপত্তা-প্রথম, পুঁজি-চালিত বিদেশি নিয়ন্ত্রণের মডেল বলে সমালোচনা করেছে।
ইসরায়েলের অবস্থান
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তিনি ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য এডমেনিটেশন অফ গাজা (NCAG)-কে গাজায় প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না হামাস নিরস্ত্র হওয়া পর্যন্ত।
নেতানিয়াহু বলেছেন, পুনর্গঠন হামাসের অস্ত্রমুক্তির আগে শুরু হতে দেওয়া হবে না। তিনি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিরোধিতা অব্যাহত রেখেছেন। ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট ইসাক হারজগ সৌদি আরবের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সম্ভাবনা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সৌদি আরবের অবস্থান দূরে সরে গেছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা হামাসের কমিটি বিলুপ্তিকে প্রচারণা বলে অভিহিত করেছেন।
তাদের মতে, প্রকৃতপক্ষে সকল কর্মকর্তা তাদের পদে বহাল আছেন এবং হামাস শাসন অব্যাহত রেখেছে। ইসরায়েলি সেনা এখনো গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি হামলায় ইতিমধ্যে ১ হাজার ৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই শিশু ও নারী। ইসরায়েলি সেনা রাফাহ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে।
ইসরায়েলের শর্ত হলো- হামাসকে অবশ্যই সশস্ত্র সংগ্রাম পরিত্যাগ করতে হবে। NCAG সদস্যদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি নিরস্ত্রীকরণের পর দেওয়া হবে। ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পর হবে। ইসরায়েলি মিডিয়া কান নেটওয়ার্ক জানায়, হামাস আলোচনা ঝুলিয়ে রেখেছে কারণ তারা মনে করে ইসরায়েলি সরকার অক্টোবরের নির্বাচনের আগে কোনো চুক্তি করতে চায় না।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর চিন্তাধারা
মিশর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কায়রোতে হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি দলগুলোর বৈঠক আয়োজন করা হয়েছে। মিশর ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য এডমেনিটেশন অফ গাজা (NCAG)-কে সমর্থন করে। তবে কমিটির সদস্যরা এখনো কায়রো থেকে কাজ করছেন। গাজায় প্রবেশ করতে পারছেন না। মিশর রাফাহ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করে। এই সীমান্ত গাজার একমাত্র বহির্গমন পথ যা ইসরায়েলে যায় না। কাতার হামাসের প্রধান আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থক। ১.৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর আশ্রয়স্থল।
কাতার ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দিয়েছে। তুরস্ক ‘বোর্ড অব পিস’-্এ যোগ দিয়েছে। এরদোয়ান হামাসকে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে নেতানিয়াহু কাতার ও তুরস্কের ‘বোর্ড অব পিস-এ যোগদান নিয়ে সমালোচনা করেছেন। কারণ এই দুই দেশ ইসরায়েলের গাজায় অবিরত হামলার সমালোচনা করে আসছে। সৌদি আরব ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দিয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য সৌদি সাহায্য ঘোষণা করেছে। কিন্তু সৌদি আরবের অবস্থান দূরে সরে গেছে। ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবীকরণের বিষয়টি তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। আরব বিশ্বের দেশগুলো ‘বোর্ড অব পিস’-কে গাজার পুনর্গঠন এগিয়ে নেওয়ার এবং সংঘাতের স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখছে। জর্ডন ও লেবানন ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা শরণার্থীদের স্থায়ী বসতি স্থাপনের বিরোধিতা করে আসছে।
চীনের অবস্থান
চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ি বলেন, ফিলিস্তিন প্রশ্নে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। প্রথমত, সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সংলাপ ও আলোচনায় ফিরতে হবে। তৃতীয়ত, একতরফা পদক্ষেপের বিরোধিতা করতে হবে। সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানাতে হবে। শক্তির প্রয়োগ প্রত্যাখ্যান করতে হবে। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। চীন পৃথক রাষ্ট্রের সমাধানের পক্ষে। ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্বকে সমর্থন করে। গাজায় ফিলিস্তিনিরা ফিলিস্তিনকে পরিচালনা করবে এই নীতির জোড়ালো সমর্থন করে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ২৮০৩ সমর্থন করে। মানবিক সাহায্য বৃদ্ধির আহ্বান জানায়। চীন ‘বোর্ড অব পিস’-এর ব্যাপক ম্যান্ডেট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। মার্কিন একতরফা নীতির বিরোধিতা করে। জাতিসংঘের ভূমিকা হ্রাসের আশঙ্কা প্রকাশ করে। পশ্চিম তীরে বেআইনি বসতি সম্প্রসারণের নিন্দা করে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রতিবাদ জানায়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার ভোটাভুটিতে চীন ও রাশিয়া নিষ্ক্রিয় ছিল। সমর্থন দেয়নি কিন্তু বাধা দেয়নিও। এটি তাদের সতর্ক ও পরিমিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।’’
রাশিয়ার অবস্থান
ক্রেমলিন জানিয়েছে পুতিন ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগদানের আমন্ত্রণে ইতিবাচকভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। পুতিন প্রস্তাব করেছেন যে, রাশিয়ার ১ বিলিয়ন ডলারের অনুদান পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে জমা থাকা রুশ জব্দ সম্পদ থেকে আসা উচিত। রাশিয়া সব পক্ষের সাথে সমান দূরত্বের নীতিতে চলছে। হামাস ও ফাতাহ উভয়ের সাথে যোগাযোগ রাখে। মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা দাবি করে। মানবিক সাহায্য দেয়। পৃথক রাষ্ট্রের সমাধান জোড়ালোভাবে সমর্থন করে। রাশিয়ার চ্যালেঞ্জ হলো ইউক্রেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত প্রভাব। ইসরায়েলের সাথে সম্পর্কের অবনতি। আঞ্চলিক প্রভাব হ্রাস। ‘বোর্ড অব পিস’ ICC সমস্যা। পুতিনের আমন্ত্রণ বিতর্কিত।
IFRI বিশ্লেষণ অনুযায়ী রাশিয়ার ফিলিস্তিনি নীতি প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক চর্চার সাথে প্রয়োজনীয় অভিযোজনের সমন্বয়। মস্কো মূলত নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। সংঘমুক্তি ও মানবিক সাহায্যের পক্ষে কিন্তু হামাসকে সরাসরি সমর্থন না দিয়ে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছে।
ইরানের অবস্থান
ইরান হামাসের প্রধান আঞ্চলিক সমর্থকদের একজন। ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর্পস হামাসকে সামরিক প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি সরবরাহ করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েলি ইরান যুদ্ধের সময় হামাস ইরানের পক্ষে সংহতি প্রকাশ করে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দেয়।
হামাস ইরানের ওপর সিয়োনিস্ট-মার্কিনি আক্রমণকে নিন্দা ও মুসলিম ঐক্যের আহ্বান জানায়। ২০২৬ সালের নতুন বাস্তবতা হলো মার্কিন-ইসরায়েলি আক্রমণে খামেনি হত্যা। অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ ও সংকট। হামাসের সাহায্য সীমিত। প্রতিরোধ অক্ষ দুর্বল।
চ্যাথাম হাউসের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান ও হিজবুল্লাহর আধিপত্যবিরোধী অবস্থান হামাসকে তাদেরকে সাংগঠনিক ও সংগ্রামী চেতনায় উৎসাহিত করবে। কিন্তু ইরানের নিজের সংকটের কারণে হামাসের ওপর তাদের প্রভাব কমেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের অবস্থান
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দেয়নি। ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে। ICC গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পৃথক রাষ্ট্রের সমাধানকে সমর্থন করে। যুক্তরাজ্য NCAG-কে স্বাগত জানিয়েছে। ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দেয়নি। বোর্ডের ব্যাপক ম্যান্ডেট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মার্চ ২০২৬-এ আন্তর্জাতিক শান্তি তহবিল সম্মেলন আয়োজন করেছে।
ফিলিস্তিনের মুক্তির ভবিষ্যৎ বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস অনুযায়ী সফল রূপান্তরের সম্ভাবনার। NCAG কার্যকর হলেই পুনর্গঠন ও পৃথক রাষ্ট্রের সমাধান সম্ভব। হামাসের পুনরুত্থানের সম্ভাবনা কম। সামরিক শক্তি ধরে রেখে রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে পারে। ফাতাহের প্রাধান্যের সম্ভাবনা অনেকাংশেই কম। PA সংস্কার ও একীভূত শাসন সম্ভব। নতুন সংগঠনের উত্থানের সম্ভাবনা কম। তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে নতুন আন্দোলন হতে পারে। স্থায়ী সংঘাতের সম্ভাবনাও রয়েছে। অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা ও মানবিক সংকট অব্যাহত থাকতে পারে। ফিলিস্তিনি মুক্তির পথে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো সত্যিকারের ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। NCAG-কে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। নিরস্ত্রীকরণের সময়সীমা ধাপে ধাপে পারস্পরিক নিরাপত্তার গ্যারান্টিতে করতে হবে। ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের স্পষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। পুনর্গঠনের অর্থায়ন ৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি জোগাতে হবে। ফিলিস্তিনি একতা ফাতাহ-হামাস সমন্বয় ও নির্বাচনের মাধ্যমে সেটা সম্ভ করে তুলতে হবে। পৃথক রাষ্ট্রের সমাধান ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী এবং পূর্ব জেরুজালেম রাজধানী হবে। আন্তর্জাতিক তদারকি জাতিসংঘের ভূমিকা ও ICC জবাবদিহিতার মাধ্যমে করতে হবে।
হামাসের গাজা কমিটি বিলুপ্তি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু এটি ফিলিস্তিনি মুক্তির সমাধান নয়। বলা যায় এটি ফিলিস্তিনি মুক্তির নতুন সম্ভাবনার সূচনা। যেখানে সশস্ত্র প্রতিরোধের পাশাপাশি রাজনৈতিক কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় এবং জনগণের কল্যাণে নতুন কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, চীন, রাশিয়া ও ইরানের সমর্থন ও অবস্থান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনি জনগণের ইচ্ছাই নির্ধারণ করবে তাদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।
লেখক: সাংবাদিক।
তথ্যসূত্র :
Stimson Center, Chatham House, CFR, IFRI, PBS, Euronews, Asharq Al-Awsat, UK Parliament Library, Chinese Foreign Ministry, Kremlin, Palestinian Center for Policy and Survey Research, Britannica, European Council on Foreign Relations, CSIS, ICRC, Konrad Adenauer Stiftung, Jerusalem Post, The Hindu, ABC News, The National, France 24, Anadolu Agency, Ahram Online


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









