ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর শুধু উচ্ছ্বাসের নয়, পরিবেশের ওপরও বড় প্রভাব ফেলে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের কার্বন নিরপেক্ষতার দাবি তাই এখন নতুন করে আলোচনায়। স্বাধীন কার্বন অ্যাকাউন্টিং প্ল্যাটফর্ম গ্রিনলির হিসাব অনুযায়ী, ৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ ও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর ১৬টি আয়োজক শহরজুড়ে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপ থেকে মোট প্রায় ৭৮ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমপরিমাণ নিঃসরণ হবে। এর প্রায় ৮৮ শতাংশই আসবে দর্শকদের ভ্রমণ থেকে।
কার্বন নিরপেক্ষতার ধারণা সহজ—যে কার্যক্রম থেকে কার্বন নিঃসরণ হয়, তার পরিমাণ নিরূপণ করতে হবে, যতটা সম্ভব কমাতে হবে এবং যে নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব নয়, তার পরিবেশগত ক্ষতি পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যবসা, শিল্প ও সরকারি প্রকল্পে এই নীতি এখন ক্রমেই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরগুলোর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ নেই।
বিশ্বকাপ আয়োজন মানেই বিপুল পরিমাণ মানুষ, সরঞ্জাম ও সেবার এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তর। দল, কর্মকর্তা, দর্শক, স্পনসর ও সম্প্রচারসংশ্লিষ্টদের যাতায়াতের পাশাপাশি স্টেডিয়ামে আলো, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, সম্প্রচার, নিরাপত্তা ও খাদ্যসেবায় বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। দর্শকদের আবাসন, পরিবহন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও কার্বন নিঃসরণ বাড়ায়। ফলে টুর্নামেন্টের পরিবেশগত প্রভাব বিশাল আকার ধারণ করে।
আর্থিক দিক থেকেও বিশ্বকাপের পরিসর অভূতপূর্ব। ফিফা ২০২৩-২০২৬ চক্রে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, যা পরে আরও বাড়ানো হয়। এত বড় আয়ের একটি আয়োজনে টেকসই উন্নয়নকে কেবল স্লোগান হিসেবে নয়, পরিকল্পনা ও অর্থায়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। রাজস্বের একটি অংশ জলবায়ু গবেষণা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই পরিবহন, কার্বন অ্যাকাউন্টিং এবং নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগে ব্যয় করা যেতে পারে।
দর্শকদের আচরণ থেকেও ইতিবাচক শিক্ষা নেওয়া সম্ভব। ম্যাচ শেষে অনেক সমর্থককে স্টেডিয়াম পরিষ্কার করে যেতে দেখা যায়। ছোট এই উদ্যোগ একটি বড় বার্তা দেয়—উৎসবের আনন্দ উপভোগ করলেও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। একইভাবে, ফুটবল আয়োজকদেরও নিজেদের আয়োজনের পরিবেশগত প্রভাব কমানোর দায়িত্ব নিতে হবে। স্টেডিয়ামের আসন পরিষ্কার করার চেয়ে পরিবেশগত ক্ষতি কমানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে একটি ‘স্পোর্টস ক্লাইমেট রেসপনসিবিলিটি ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ। ফিফার রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট অংশের পাশাপাশি স্পনসর, সম্প্রচারক ও অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের অবদানে এই তহবিল গঠন করা যেতে পারে। স্বাধীন তদারকির মাধ্যমে এর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
ইউইএফার ইউরো ২০২৪ ক্লাইমেট ফান্ড ইতোমধ্যে এ ধরনের উদ্যোগের একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। প্রায় ৮০ লাখ ইউরো বিনিয়োগ করে সেখানে সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি সংরক্ষণ, এলইডি ফ্লাডলাইট, বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন এবং বর্জ্য পৃথকীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়েছে। তবে এক দেশে অনুষ্ঠিত তুলনামূলক ছোট পরিসরের সেই টুর্নামেন্টের মডেলকে তিন দেশে অনুষ্ঠিত ১০৪ ম্যাচের বিশ্বকাপের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যায় না।
প্রস্তাবিত তহবিলের মূল কাজ হবে টুর্নামেন্ট-সংশ্লিষ্ট কার্বন নিঃসরণ মূল্যায়ন করা এবং তা কমানোর বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। বুদ্ধিমান সময়সূচি, কম দূষণকারী পরিবহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, জ্বালানি-সাশ্রয়ী স্টেডিয়াম পরিচালনা এবং উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নিঃসরণ কমানো সম্ভব। এরপরও যে নিঃসরণ অবশিষ্ট থাকবে, তার জন্য জলবায়ু ও গবেষণাভিত্তিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করা উচিত। একই সঙ্গে ভ্রমণ, আবাসন, খাদ্য, পরিবহন, বর্জ্য এবং স্টেডিয়ামের বিদ্যুৎ ব্যবহারের স্কোপ–১, স্কোপ–২ ও স্কোপ–৩ নিঃসরণ স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
বিশ্বকাপের আনন্দ কমিয়ে নয়, বরং আরও দায়িত্বশীলভাবে এই আসর আয়োজন করা সম্ভব। ফুটবল মানুষের আবেগ, ঐক্য ও স্মৃতির উৎস হয়ে থাকবে। তবে এই বৈশ্বিক উৎসব থেকে যারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, তাদেরও এর পরিবেশগত মূল্য স্বীকার করতে হবে। কার্বন নিরপেক্ষতা যেন কেবল একটি প্রচারণামূলক স্লোগান না থেকে বিশ্বকাপের পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও আয়োজনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে—এটাই সময়ের দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









