রাজধানী ঢাকায় একদিনের ভারি বর্ষণেই জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। সড়ক, অলিগলি, আবাসিক এলাকা, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী এবং রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকেছে জলমগ্ন সড়কে। কোথাও যানবাহন বিকল হয়ে পড়েছে, কোথাও আবার হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি পার হয়ে মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে, অনেক স্কুল-কলেজে অনলাইন ক্লাসে ফিরে যেতে হয়েছে এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটেছে।
বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনায় বিলম্ব, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের চিত্র নয়; বরং রাজধানীর দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, দুর্বল অবকাঠামো এবং পরিকল্পনার ঘাটতির একটি বাস্তব প্রতিফলন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় প্রভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টিপাত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার ঘটনা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাংলাদেশও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, ভবিষ্যতে স্বল্প সময়ে অতিভারি বর্ষণের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটবে। ফলে এই জলাবদ্ধতাকে বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বরং এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা, যা নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা ও জলাশয় ভরাট, অপর্যাপ্ত ও অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের অক্ষমতা। একসময় রাজধানীতে অসংখ্য খাল, বিল, জলাধার ও উন্মুক্ত জলাশয় ছিল, যা অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু বছরের পর বছর পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন, আবাসন প্রকল্প, দখল, ভরাট এবং পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের কারণে এসব প্রাকৃতিক জলাধারের বড় অংশ হারিয়ে গেছে। অনেক খাল সংকুচিত হয়েছে, অনেকগুলো সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গিয়ে অল্প সময়ের ভারি বর্ষণেই রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
এর পাশাপাশি নগরীর বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও প্রকট হয়ে উঠেছে। বহু এলাকায় ড্রেনের ধারণক্ষমতা বর্তমান জনসংখ্যা ও নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, ড্রেনে জমে থাকা পলিমাটি ও বর্জ্য, অপরিকল্পিত ইউটিলিটি লাইন এবং অপর্যাপ্ত পাম্পিং ব্যবস্থার কারণে পানি দ্রুত অপসারণ সম্ভব হয় না। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি কয়েক ঘণ্টা নয়, বরং কয়েক দিন পর্যন্ত জমে থাকে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
দুই সিটি করপোরেশন পানি নিষ্কাশনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় পাম্প চালু করা, ড্রেন পরিষ্কার এবং জরুরি টিম মোতায়েনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, প্রতি বর্ষা মৌসুমেই প্রায় একই ধরনের আশ্বাস দেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান এখনও দৃশ্যমান নয়। সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে নেওয়া সমস্যার মূল সমাধান নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সমন্বিত পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে রাজধানীর সামগ্রিক জলব্যবস্থাপনা নতুনভাবে সাজানো হবে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে সর্বপ্রথম খাল, নদী ও প্রাকৃতিক জলাধার পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, পর্যাপ্ত রেইনওয়াটার ড্রেন নির্মাণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালু করা এবং প্রয়োজনীয় স্থানে শক্তিশালী পাম্পিং স্টেশন স্থাপন সময়ের দাবি। পাশাপাশি নতুন নগর উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় রেখে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ না করলে ভবিষ্যতের সংকট আরও গভীর হবে।
এ সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। নাগরিকদের একটি বড় অংশ এখনও যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলে ড্রেন বন্ধ করে দেয়। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই পানি নিষ্কাশনের পথ বাধাগ্রস্ত হয়। তাই শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি—সবকিছুর সমন্বয়েই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব।
এ ছাড়া বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও জলাবদ্ধতা সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক বিভাগ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা ও তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা জরুরি। একটি সংস্থা রাস্তা নির্মাণ করছে, অন্য সংস্থা পাইপলাইন বসানোর জন্য তা আবার খুঁড়ে ফেলছে—এ ধরনের সমন্বয়হীনতা নগর ব্যবস্থাপনাকে আরও দুর্বল করে তুলছে। তাই সমন্বিত নগর পরিচালনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, উৎপাদনশীলতা কমে যায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি হয় এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতার কারণে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত ও মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ এটি কেবল অবকাঠামোগত সমস্যা নয়; বরং জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বিশ্বের অনেক বৃষ্টিপ্রবণ শহর আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাধার সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা এবং স্মার্ট সিটি পরিকল্পনার মাধ্যমে সফলভাবে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে এনেছে। ঢাকার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীকে ধীরে ধীরে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা সম্ভব।
ঢাকা দেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। এই শহর বারবার জলাবদ্ধতায় অচল হয়ে পড়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় নগর ব্যবস্থাপনাকে আরও বিজ্ঞানভিত্তিক, পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও কার্যকর করতে হবে। এখনই সময় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধান দূর করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও তীব্র বর্ষণ রাজধানীর মানুষের দুর্ভোগকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে এবং অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হবে। তাই একটি জলাবদ্ধতামুক্ত, নিরাপদ, টেকসই ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তুলতে সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক—সবার সম্মিলিত উদ্যোগই হতে পারে একমাত্র কার্যকর সমাধান।
লেখক : কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









