আদিবাসী কোডা বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার তানোর, মোহনপুর ও পুঠিয়া উপজেলায় বসবাস করে। বাঙালিদের কাছে তারা আদিবাসী সাঁওতাল ও হিন্দু বলে পরিচিত। কোডা সম্প্রদায় মূলত কোরা নামে পরিচিত, তাঁরা ভারত এবং বাংলাদেশে পাওয়া একটি মুন্ডা-ভাষাভাষীর গোষ্ঠী। তাঁরা একটি বিপন্ন ভাষাগত সম্প্রদায়, তাদের ভাষা কোড়া যা কোরা নামেও পরিচিত। বাংলা ভাষার প্রভাবের কারণে তাঁদের ভাষা ক্রমহ্রাসমান। ভারতে তারা মূলত পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা এবং ঝাড়খন্ডে অবস্থিত।
কোডা নিজেদেরকে হড় বা আদমি বলে পরিচয় দিয়ে থাকে। নৃতত্ত্ববিদগণের মতানুসারে কোডা সম্প্রদায় আদি-অস্টোলয়েড শ্রেণিভুক্ত এবং ভাষার দিক দিয়ে কোডা ভাষাকে মুন্ডারী ভাষার শ্রেণিতে সংযুক্ত করা হয়েছে।
দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩ সালে বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের, রাজশাহী জেলার তানোর, মোহনপুর ও পুঠিয়া উপজেলায় কোডা ভাষাভাষী মোট ১৩৯টি পরিবার এবং প্রায় ৯০০ জনের উপরে জনসংখ্যার বসবাস ছিল বলে উল্লেখ করেছে। কিন্তু ২০২৫ সালে ন্যাশনাল এজেন্সি ফর গ্রিন রিভ্যুলেশন-এর সার্ভে অনুসারে এ অঞ্চলে মোট পরিবার সংখ্যা ১৪৫টি এবং জনসংখ্যা প্রায় ৫০৮ জন পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে যে সকল নৃ-গোষ্ঠী বসবাস করে কোডা সম্প্রদায় তাদের মধ্যে একটি। এরা সংখ্যায় খূবই সীমিত। বাংলাদেশে কোডা জনগোষ্ঠী রাজাশাহী জেলার তানোর উপজেলার কোন্দাইন, মোহনপুর উপজেলার নাওনগর ও বেলনা, বাগমারা উপজেলার মচমইল এবং পুঠিয়া উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামে বসবাস করছে। আমরা সকলই অবগত আছি, বাংলাদেশে ৪৫টির বেশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে, যেমন- সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা, চাকমা, মারমা, গারো, মনিপুরি, মুরং, খাসি, হাজং, রাজবংশী প্রভৃতি। এসব সম্প্রদায়ের মতোই কোডা সম্প্রদায়েরও নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি, কালচার, ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ, রাজনৈতিক সংগঠন ও পেশা রয়েছে।
আদিবাসী কোডারা যেমন বৈচিত্র্যময় জীবনধারার অধিকারী, ঠিক তেমনি রহস্যময় তাদের নৃতাত্ত্বিক দেহধারার মৌলিক পরিচয়। পন্ডিতেরা বহু যুগের জ্ঞান-গবেষণার পরও তাদের সঠিক নৃ-তত্ত্ব সম্পর্কে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ, বহু যুগের বহু মিশ্রণ ও মিলন এবং ঐতিহাসিক বহু উত্থান ও পতনের ফলে আজ মহাকালের এই পর্যায়ে কোনো প্রাচীন জাতির বা গোষ্ঠীর নৃতত্ত্বের মৌলিক অস্থিত্ব নিঃশেষে নিশ্চিহ্ন না হয়ে গেলেও নানাভাবে তার স্বরূপ বিকৃত বা প্রক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া মোটেই বিচিত্র নয়।
বাংলাদেশের প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষের ইতিহাস যেমন ঘোর তমসাচ্ছন্ন, তেমনি তার সাধারণ ইতিহাসও দুর্জ্ঞেয়। প্রত্ন-প্রস্তরও বা নব্য-প্রস্তর যুগের মানুষ কারা এবং তারা কেমন ছিল তা জানবার মতো উপায় কিছুই নাই। ঐতিহাসিকদের অনুমান তারা বহুকাল পূর্বেই ভূপৃষ্ঠ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তবুও এমন অনুমান করা হয়, আজ যারা বাংলার আদিবাসী বা উপজাতীয় নরসন্তান বলে পরিচিত, তাদের মধ্যে ঐ সব আদিম নরগোষ্ঠীগুলো কোনো কোনো ধারা রূপান্তরের পথে এখনো টিকে আছে।
আধুনিক নৃবিজ্ঞানীদের মতে, যে কটি মূল মানবগোষ্ঠীর সূত্র থেকে এই উপমহাদেশীয় জনধারা সৃষ্ট তার মধ্যে একটি বিশিষ্ট ভাগের নাম ‘আদি অস্ট্রোলয়ড’ নরগোষ্ঠী। এক সময় সমগ্র ভারতজুড়ে এরা প্রসার লাভ করেছিল এবং ঐতিহাসিক উষালগ্নেই উচ্চভূমি বরেন্দ্র, রাঢ়, রাঙ্গামাটি ছাড়াও অন্যান্য এলাকাতে ছিল এদের প্রাচীন বসবাস। এরা পুণ্ড্র, কিরাত, নিষাদ, সাঁওতাল, কোল, কোডা, ওঁরাও, মুন্ডা, মাহালী ইত্যাদি বিভিন্ন গোত্র ও বিচিত্র রক্ত মিশ্রিত নরসন্তান হলেও এক কথায় তারা অষ্ট্রিক নামে কথিত। কার্যত অষ্ট্রিক একটি ভাষাগোষ্ঠী।
আদিবাসী কোডারা দেশজ সন্তান বা মাটির মানুষ কিনা- এর বাস্তব সূত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে, যদি কোডাদের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুসন্ধান চালান যায়। আদিবাসী কোডারা নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য ও কম্বিদন্তীতে; সারা বছরের অসংখ্য উৎসব অনুষ্ঠানে; সামাজিক কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক অনুশীলনে। তাদের কৃষিকাজ, শিকার ছাড়াও বিভিন্ন জীবন নিবার্হী পেশা এবং প্রাত্যহিক জীবন ব্যবস্থার নানা পদ্ধতির মধ্যে জাতীয় সত্ত্বার যে আন্তঃসম্পর্ক বিদ্যমান দেখা যায়, তাকে কোনো ক্রমেই প্রবাসী মনের পরিচয় বলা চলে না। সে পরিচয় এত সুস্পষ্ট ও সুদৃড় যে, দেশজ বৃক্ষাদি থেকে উৎপন্ন ফল-ফসলাদির মতই তা যেন নিজস্ব সম্পদ।
কোডাদের ঘরগুলো ছোট আকারের এবং মাটি দিয়ে তৈরি। ঘরে সাধারণত কোনো জানালা থাকে না। কোডারা সাঁওতালদের মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার দাবি করলেও বেশির ভাগই অপরিষ্কার দেখা গেছে। কোডা পুরুষরা এখনও মাঝে মধ্যে সাদা থান কাপড়ের ধুতি পরতে দেখা যায়। তবে বর্তমানে কোডারা লুঙ্গি, গেঞ্জি ও গামছা ব্যবহার করতে শিখেছে। কোডা নারীরা আগে ধূতির সাদা থান দিয়ে শাড়ির মতো করে পরত। বর্তমানে সকল নারী শাড়ি ব্যবহার করে। এদের গায়ের রং পীতবর্ণ থেকে উজ্জ্বল শ্যামলা পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের উচ্চতা মাঝারি ধরনের।
এদের চুল কালো ও কোঁকড়ানো। এরা আদি মঙ্গোলীয় থেকে অপেক্ষাকৃত উন্নত নাসিকার অধিকারী। এরা বর্তমানে সাঁওতাল ও বাংলা ভাষার সংমিশ্রণের অন্তর্ভুক্ত। গ্রামবাসীদের ভাষ্য অনুসারে, আদিকাল থেকেই তারা যাযাবর জীবন যাপনে অভ্যস্ত। তাদের নির্দিষ্ট এলাকায় স্থায়ী আবাস ছিল না। বাংলাদেশের বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বতে পশু-পাখিও খুবই জনপ্রিয় শিকার। এক সময় গুইসাপ শিকার করে তাদের পূর্বপুরুষেরা জীবন যাপন করত। এরা হচ্ছে জরাবেদ বংশের অন্তর্গত। ভারতের কিছু জায়গায় তাদের পূর্বপুরুষেরা বসবাস করত বলে কেউ কেউ অভিমত পোষন করেন। মতান্তরে, কোডা সম্প্রদায়ের পূর্ব-পুরুষেরা বনে জঙ্গলে বসবাস করত এবং বিভিন্ন জীব-জন্তু, পশু-পাখি শিকার করায় ছিল তাদের একমাত্র পেশা।
এই জীব-জন্তু, পশু-পাখি তারা খেত এবং বিক্রি করত। যখন একটি এলাকায় শিকারের সংখ্যা কমে যেত তখন তারা অন্য এলাকায় শিকারের সন্ধানে চলে যেত। এইভাবে তারা জীবন যাপন করত। বর্তমান কোডা সম্প্রদায়ের ভাষ্য অনুসারে, পূর্বে কোডা সম্প্রদায় যখন পাহাড় জঙ্গগলে বসবাস করত তখন তাদেরকে কোডা নামে অভিহিত করা হতো না। কালের আবর্তে তারা যখন পাহাড় জঙ্গল থেকে জীবিকার সন্ধানে লোকালয়ে আসে তখন তারা যাযাবরভাবে বসবাস করত।
রেলস্টেশন, পরিত্যক্ত বাড়ি, বৈঠকখানা, বড় গাছের নিচে তারা রাত্রীযাপন করত। এভাবে মানুষের ঘরের (কুডাম) চালিতে তারা বসবাস করত বলে তাদের কোডা নামকরণ করা হয়। কোডাদের কোনো কোনো স্থানে সাঁওতাল বলেও অভিহিত করা হয়। ঐতিহাসিক কারণ পেছনে রয়েছে বলেই আদিবাসী কোডারা চির যাযাবর জাতি। নীড়হারা পাখির মতো তারা যে সব কারণে বাধ্য হয়ে স্থান থেকে স্থানান্তরে ঘুরে বেড়ায় তার নিগুড় কথা খুব অস্পষ্ট নয়।
অতীতকাল থেকেই তাদের অনেকের নিজস্ব জমিজমা ও বাড়িঘর ছিল। এখনো তারা অনেকে কিছু জমিজমা ও পর্ণকুটিরতুল্য কিছু বাড়িঘরের মালিক। কিন্তু এ সব সম্পদ ও সম্পত্তির উপর তাদের কোনো মৌরসী স্বত্ব নাই। তাই তারা কোনো কালে কোথাও স্থিতবসতি হবার সুযোগ ও সৌভাগ্য পায়নি। কোনো কালের সরকারী নীতিও তাদের অনুকূলে নেই। আর্থিক ও নিবাসিকভাবেও তারা পায়নি কোথাও কোনো সামাজিক নিরাপত্তা। কাজেই স্বদেশের মধ্যে প্রবাসীর মতো করে গড়ে উঠেছে আদিবাসীদের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস।
এ রূপ অবস্থায় এদের মতো সম্প্রদায়ের জাতীয় সঞ্চয় ও সম্পদের ভাণ্ডার শূন্য হওয়াই স্বাভাবিক। তবু স্বীকার করতে হয়, শত দৈন্যদশার মধ্যে থেকেও এই সম্প্রদায় এত দিনেও ভূপৃষ্ঠ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। বরং ইতিহাসকে স্তম্ভিত করে টিকে আছে আপন বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য নিয়ে।
লেখক : উন্নয়নকর্মী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









