প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রাণীর ভূমিকা আমরা অনেক সময় যতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখি, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি গভীর ও বিস্তৃত। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী কোনো না কোনোভাবে খাদ্যশৃঙ্খল, পরাগায়ন, বীজ বিস্তার, মাটির উর্বরতা, প্রাকৃতিক বালাই নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। মৌমাছি ফুলে ফুলে ঘুরে পরাগায়নে সহায়তা করে, পাখি ও বাদুড় বীজ ছড়িয়ে দেয়, ব্যাঙ ও মাকড়সা ক্ষতিকর পোকা খায়, কেঁচো মাটির গঠন উন্নত করে এবং অসংখ্য অণুজীব জৈব পদার্থ ভেঙে পুষ্টি উপাদান পুনর্চক্রায়নে সহায়তা করে। অর্থাৎ প্রকৃতিতে কোনো প্রাণীই সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় নয়। ৪ অক্টোবর বিশ্ব প্রাণী দিবস। প্রাণীর কল্যাণ ও সুরক্ষার বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই দিনটি পালিত হয়।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘See the World Through Their Eyes’ বা ‘তাদের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখুন’। মানুষের প্রয়োজন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার বাইরে প্রাণীদেরও যে নিজস্ব জীবন, আবাস, খাদ্য ও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে, এই প্রতিপাদ্য সেই দৃষ্টিভঙ্গিই সামনে আনে। প্রাণী রক্ষার এই ভাবনা শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, প্রকৃতির স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। প্রকৃতি একটি আন্তঃনির্ভরশীল ব্যবস্থা। একটি প্রজাতির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে তার প্রভাব খাদ্যশৃঙ্খলের অন্য স্তরেও পৌঁছাতে পারে। পরাগায়নের বিষয়টি এর একটি সহজ উদাহরণ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮৭.৫ শতাংশ ফুলধারী উদ্ভিদ প্রাণীর মাধ্যমে পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বে ২৫ হাজারের বেশি মৌমাছির প্রজাতি রয়েছে এবং মৌমাছির পাশাপাশি প্রজাপতি, মথ, মাছি, বোলতা, বিটল, পাখি ও বাদুড়ও পরাগায়নে ভূমিকা রাখে। এফএও বলছে, পরাগবাহীরা বিশ্বব্যাপী ফসল উৎপাদনের প্রায় ৩৫ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত এবং প্রায় ৭৫ শতাংশ খাদ্যশস্যের ধরন কোনো না কোনো মাত্রায় পরাগবাহীর ওপর নির্ভরশীল। ফলে, একটি মৌমাছিকে শুধু মধু উৎপাদনকারী পোকা হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। একটি মৌমাছি কৃষকের অদৃশ্য সহযোগী, একই সঙ্গে প্রকৃতির ভারসাম্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু মানুষের কর্মকাণ্ডেই প্রাণীদের এই স্বাভাবিক ভূমিকা ক্রমশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট, আবাসস্থল খণ্ডিত হওয়া, একফসলি কৃষির বিস্তার, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত অনেক প্রাণীর খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয় সংকুচিত করছে। বিশেষ করে, পরাগবাহীদের জন্য আবাসস্থল হারানো ও কৃষিতে রাসায়নিক ব্যবহারের বিস্তার বড় উদ্বেগের বিষয়। এফএও-এর তথ্য অনুসারে, পরাগবাহীদের আবাসস্থল ধ্বংস, নিবিড় কৃষি, একফসলি চাষ, কীটনাশক, রোগবালাই এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রভাব পড়ছে। এর অর্থ হলো, প্রকৃতিকে জয় করার নামে আমরা এমন অনেক প্রাণীর অস্তিত্বকে সংকটে ফেলছি, যাদের সেবা ছাড়া কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উন্নয়ন তাই শুধু মানুষের জন্য জায়গা তৈরি করা নয়, সেই জায়গায় অন্য প্রাণীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সক্ষমতাও নিশ্চিত করা।
কৃষির সঙ্গে প্রাণীর সম্পর্ক আরো বিস্তৃত ও গভীর। মাঠের ফসলের ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে পাখি, ব্যাঙ, মাকড়সা ও অন্যান্য প্রাণী প্রাকৃতিকভাবে কাজ করে। ফলে, কৃষকের কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। একইভাবে কেঁচো, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব মাটির জৈবপদার্থ পচন, পুষ্টি উপাদানের পুনর্চক্রায়ন এবং মাটির গঠন উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা শুধু বীজ, সার, সেচ ও কীটনাশকের ওপর নির্ভরশীল নয়, মাটির ভেতর ও মাঠের চারপাশে সক্রিয় একটি জীবন্ত ব্যবস্থার ওপরও নির্ভরশীল। কৃষিজমিকে শুধু উৎপাদনের ক্ষেত্র বা একটি কারখানা হিসেবে দেখলে এই বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়। এটি একই সঙ্গে একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা, যেখানে প্রাণী, উদ্ভিদ, মাটি, পানি ও অণুজীব পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই স্বাভাবিক সম্পর্ক ও জীববৈচিত্র্য যত বেশি বজায় থাকবে, কৃষির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তিও তত শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টির গুরুত্ব আরো বেশি। সীমিত জমিতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে কৃষির ওপর চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষিকে নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাই প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে কৃষির প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং মাঠের পাশে স্থানীয় গাছপালা রাখা, খাল-বিল ও জলাভূমি রক্ষা, ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ানো, ফসল পর্যায়ক্রম অনুসরণ, জৈবপদার্থের ব্যবহার এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা কৃষি ও প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
একই সঙ্গে স্থানীয় ধান, ডাল, শাকসবজি, ফল, মাছ ও গবাদিপশুর জাত সংরক্ষণও জরুরি। এসব স্থানীয় জাতের অনেকগুলোর মধ্যে খরা, লবণাক্ততা, রোগ বা অন্যান্য প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীলতার বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় এসব বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতের কৃষির জন্য মূল্যবান জিনগত সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। প্রাণী রক্ষার দায়িত্ব অবশ্য শুধু কৃষকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিসংগত নয়। কৃষককে উৎপাদন করতে হয়, আয় করতে হয় এবং পরিবারের জীবিকা নিশ্চিত করতে হয়। তাই পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাকে কৃষকের জন্য বাস্তবসম্মত ও লাভজনক করতে হবে।
ক্ষতিকর কীটনাশকের বিকল্প, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, জৈবসার ও জৈব-বালাইনাশক, নিরাপদ কৃষিপ্রযুক্তি, কৃষক প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর কৃষিপরামর্শ সহজলভ্য করা প্রয়োজন। কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রেও শুধু প্রতি হেক্টরে সর্বোচ্চ ফলনকে সাফল্যের মাপকাঠি না ধরে মাটির স্বাস্থ্য, পানি ব্যবহারের দক্ষতা, উৎপাদন খরচ, কৃষকের নিট আয় এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব বিবেচনা করা দরকার। কোনো প্রযুক্তি যদি স্বল্পমেয়াদে ফলন বাড়ায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মাটি, পানি ও উপকারী প্রাণীর ক্ষতি করে, তাহলে তার প্রকৃত অর্থনৈতিক লাভও নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিশ্ব প্রাণী দিবসের ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কথা বলে।
‘তাদের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখুন’- মানে শুধু প্রাণীর প্রতি মায়া বা সহানুভূতি দেখানো নয়, বরং মানুষের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব অন্য প্রাণীর জীবনে কীভাবে পড়ে, তা বিবেচনা করা। একটি জলাভূমি ভরাট করার আগে ভাবতে হবে, সেখানে কত মাছ, পাখি, উভচর ও জলজ প্রাণীর জীবনচক্র জড়িয়ে আছে। কীটনাশক ব্যবহারের আগে ভাবতে হবে, ক্ষতিকর পোকার পাশাপাশি কত উপকারী পোকা ও পরাগবাহী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একটি পুরনো গাছ কাটার আগে ভাবতে হবে, সেটি কত পাখি, পতঙ্গ ও অন্যান্য প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয়ের উৎস। এভাবে দেখলে প্রাণী সংরক্ষণ আর আলাদা কোনো পরিবেশগত কর্মসূচি থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে আমাদের কৃষি, নগরায়ণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ভূমি ব্যবস্থাপনার অংশ। বিশ্ব প্রাণী দিবসের শতবর্ষ পেরিয়ে আজকের এই আহ্বান তাই আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রাণীর ভূমিকা স্বীকার করা মানে মানুষের উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া নয়, বরং উন্নয়নের ধরনকে আরো দায়িত্বশীল করা। মানুষ প্রকৃতির বাইরে নয়, প্রকৃতিরই একটি অংশ। আমরা খাদ্য, পানি, মাটি, বন, নদী, পরাগায়ন ও অসংখ্য প্রতিবেশগত সেবার ওপর নির্ভরশীল। সেই ব্যবস্থার প্রাণীগুলো দুর্বল হলে শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনও নিরাপদ থাকে না। তাই প্রাণী সংরক্ষণকে শুধু প্রাণীপ্রেমীদের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষির স্থায়িত্ব, পরিবেশের সুস্থতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমানের সঙ্গে জড়িত। বিশ্ব প্রাণী দিবসে আমাদের ভাবনার জায়গাটি তাই হওয়া উচিত আরো বিস্তৃত।
আমরা প্রকৃতিকে কতটা ব্যবহার করতে পারি, শুধু সেই প্রশ্ন নয়; প্রকৃতির সঙ্গে কতটা ভারসাম্য রেখে চলতে পারি, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে প্রাণীর জীবন ও ভূমিকার প্রতি সম্মান দেখাতেই হবে। প্রাণী বাঁচলে প্রকৃতির জীবন্ত সম্পর্কগুলো বাঁচবে, আর সেই সম্পর্কগুলো টিকে থাকলেই মানুষের ভবিষ্যৎ আরো নিরাপদ হবে।
লেখক : কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









