দলকানা বা লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বলতে বোঝায় জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর অন্ধ আনুগত্য মেনে নিয়ে ক্যাম্পাসে তাদের প্রভাব বিস্তার করা এবং নিজস্ব সুবিধা বা স্বার্থ অর্জনে ব্যস্ত থাকা। সুস্থ ও গঠনমূলক ছাত্র রাজনীতি যেখানে শিক্ষার্থীদের অধিকার, মুক্তচিন্তা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ শেখায়, সেখানে দলকানা রাজনীতি শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ ধ্বংস করে।
মূলত, দলকানা ছাত্র রাজনীতির প্রধান কুফল হলো শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট ও সেশনজট অর্থাৎ পড়াশোনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করা। তারা মিছিল-মিটিং ও রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে না। বরং কারণে অকারণে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। বিভিন্ন দলের কিংবা একই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ঘনঘন সংঘর্ষ ঘটে, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এর ফলে গেস্টরুম-গণরুম সংস্কৃতি ও আবাসন সংকটও সৃষ্ট হয়। হলে সিট দখলের রাজনীতিকরণ হয়।
তখন মেধার ভিত্তিতে হলে সিট না দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ে সিট দেওয়া হয়। বিষয়টি এখানে ক্ষ্যান্ত দিলেও তো হতো। অবশেষে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনও অব্যাহত রেখে হলে থাকার নামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হয় জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে। না গেলে মানসিক নিপীড়ন (গেস্টরুম কালচার) ও হল থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে প্রতিনিয়ত। ফলে, সাধারণ ছাত্রদের মেধা বিকাশ ও স্বাধীন চিন্তার পথও রুদ্ধ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, তখন মুক্তচিন্তা ও গঠনমূলক সমালোচনার পথও বন্ধ হয়ে যায়। কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তাকে ‘বিরোধী মতাদর্শের’ তকমা দিয়ে লাঞ্ছিত বা নির্যাতন করা হয়।
এতে পড়ালেখা ও গবেষণার চেয়ে দলীয় বড় ভাইদের তোষামোদ করা ক্যারিয়ার গড়ার মাধ্যম হিসেবে প্রাধান্য পায়, যা মেধাবী শিক্ষার্থীদের হতাশ করে। এছাড়াও সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা তো ঘটেই। এর অন্যতম কারণ হলো ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে তারা অস্ত্র ও পেশিশক্তির ব্যবহার করে। এতে অনেক তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যায় এবং তাদের পরিবারগুলোও ধ্বংস হয়। আর থাকে নৈতিক অবক্ষয় ও অপরাধপ্রবণতার কথা। ক্ষমতার আশ্রয়ে থেকে অনেক ছাত্রনেতা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি জালিয়াতি, প্রশ্নফাঁস এবং সিট বাণিজ্যের মতো অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে। তারা রাজনৈতিক প্রশ্রয় পাওয়ার কারণে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করে বহাল তবিয়তে টিকে থাকে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনেও অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ করতে দ্বিধা বা সংকোচ করে না।
দলীয় ছাত্রনেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অবৈধ চাপ সৃষ্টি করে, যা প্রতিষ্ঠানের মান নামিয়ে দেয়। অথচ ছাত্র রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন এবং দেশের কল্যাণে ভূমিকা রাখা। কিন্তু এটি যখন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অন্ধ লেজুড়বৃত্তিতে পরিণত হয়, তখন তা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকেই ভেস্তে দেয়। এ জন্য ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতির বদলে সচল ছাত্র সংসদ (যেমন: ডাকসু, জাকসু ইত্যাদি) ব্যবস্থা কার্যকর করার দাবি শিক্ষাবিদদের মাঝে জোরালো হচ্ছে। ইদানিং দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণ সমাজ, বিশেষ করে জেন জি, সাম্প্রতিক সময়ে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। প্রথাগত লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক বলয় ভেঙে তাদের এই উপস্থিতি দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মূলত, জেন জি প্রজন্ম তাদের সুনির্দিষ্ট চিন্তা, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং নির্ভীক অবস্থানের মাধ্যমে রাজনীতিতে বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন এনেছে।
ফলে, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে জেন জি প্রমাণ করেছে, দলীয় পরিচয় ছাড়াও শুধু সাধারণ মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে দীর্ঘদিনের অপশাসন উল্টে দেওয়া সম্ভব। তারা টিকটক, ফেসবুক এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে খুব দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে তারা অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে। তারা এটাও প্রমাণ করেছে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা মার্কার প্রতি অন্ধ অনুগত না থেকে, অধিকার আদায় ও ন্যায়ের প্রশ্নে সাধারণ শিক্ষার্থী ও জনগণকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা সম্ভব। প্রচলিত বয়স্ক রাজনীতিবিদদের ওপর নির্ভর না করে নিজেরাই আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করে এবং নীতি নির্ধারণে অবদান রেখে নিজেদের দাবি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে তা আদায়ে সক্রিয় হওয়া উচিৎ।
আমরা জানি, ইতিহাসজুড়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রশক্তি সবসময়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। আমরা এও জানি, ছাত্ররা সমাজের সবচেয়ে মুক্তচিন্তার অধিকারী গোষ্ঠী। তারা ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সহজেই যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে পারে। শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার (যেমন: দুর্নীতি দমন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ)-এর দাবিতে ছাত্রশক্তি সবসময়ই সোচ্চার থাকে। যখন তারা নিজেদের দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে কথা বলে, তখন দেশের সর্বস্তরের জনগণ তাদের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়। এজন্য প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে সৎ ও চরিত্রবান নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠা। মাদক, দুর্নীতি ও অপসংস্কৃতি থেকেও দূরে থাকা।
পরিশেষে বলা যায়, আজকের তরুণসমাজ ও জেন জি রাজনীতিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। তারা চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মুক্তচিন্তা। আর ছাত্র সংগঠনগুলো যদি নিজস্ব পেশিশক্তি ও দলীয় স্বার্থ ত্যাগ করে শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, নৈতিকতা গঠন এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করে, তবেই তা দেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে।
লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









