ঢাকায় প্রতিনিয়ত মানুষ বাড়ছেই। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। তাই ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগরে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘের মতে, দুটি মহানগরে আগামী ২৫ বছর জনসংখ্যা ৫ শতাংশ হারে বাড়বে। এর একটি ঢাকা, অন্যটি সাংহাই। ঢাকা যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা। আর ২৫ বছর পর বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল মহানগর হবে ঢাকা। জাতিসংঘ বলছে, ২০৫০ সালে ঢাকার চেয়ে বড় শহর বিশ্বের আর কোনো দেশে থাকবে না।
ঢাকা শহরের একটা বিশাল সংখ্যার মানুষ আসলে কোনো রকম নাগরিক সুবিধা পান না। বিশ্বের বসবাসযোগ্য শহরের তালিকার তলানিতে থাকা শহরের বাসিন্দার জন্য এমন হওয়াটা খুব অস্বাভাবিকও নয়। ঢাকা একদিকে যেমন বসবাসের অযোগ্য, ঠিক তেমনি ব্যয়বহুল শহর। এই শহরে টিকে থাকতে নাগরিকদের প্রতিনিয়ত মানসিক ও শারীরিক শক্তির চরম পরীক্ষা দিতে হয়। অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার এই শহরে টিকে থাকাটাই অস্বাভাবিক। এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে ঢাকা বসবাসের অনুপযোগী ও পরিত্যক্ত নগরীতে রূপ নেবে।
নাগরিক পরিষেবা, নগরের উন্নয়নে এলাকাভিত্তিক সাম্যতা, পরিবেশ সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, যানজট, বিদ্যুৎ, গ্যাস, নির্মল বায়ু, নিরাপদ পানিসহ পরিবেশ দূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার টেকসই সমাধান বের করতে না পারলে ঢাকা বাসযোগ্য হবে না। এই শহরে নাগরিকদের জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তা নেই। নির্মাণাধীন ভবন থেকে ইট পড়ে, জলাবদ্ধ সড়কে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, পরিবারের সঙ্গে রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে অগ্নিকাণ্ডে, ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকার সময় বাসচাপায় কিংবা দুই বাসের পাল্লাপাল্লির মাঝে পড়ে এই শহরের বাসিন্দারা মারা পড়তে পারেন যে কোনো সময়। অস্বাভাবিক মৃত্যুই এখন ঢাকার স্বাভাবিক ঘটনা।
গত কয়েক দশকে ঢাকা মহানগরের আয়তন ও মানুষ যেভাবে বেড়েছে, শহরটি সেভাবে বসবাসের উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি। শহরটি অপরিকল্পিত ও অগোছালো। দুর্ভোগ পরিবহনে, আবাসনে পরিকল্পনার ছাপ নেই। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের মতো পরিষেবা নিম্নমানের। শহরে সবুজ পরিসর নেই। নেই ফুটপাত। আছে শব্দ ও বায়ুদূষণ। সমস্যার তালিকা দীর্ঘ।
মহানগরজুড়ে ব্যবস্থাপনার সংকট। এদিকে রাজধানী বা দেশের প্রধান শহর হলেও ঢাকা থেকে অব্যবস্থাপনা দূর হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে হাট বসে। ঢাকার আকার বেড়েছে, মান বাড়েনি। এই শহরের অনানুষ্ঠানিক খাতে বহু মানুষ জড়িত, শহরের মানুষের উৎপাদনশীলতা কম। তাই ঢাকা শহর বড় হওয়ার অর্থ হচ্ছে দুর্বল অর্থনৈতিক ভূগোলের বিস্তার। ঢাকা আজও আধুনিক মেট্রোপলিটন শহর হয়ে উঠতে পারেনি।
প্রতি বছর বাসযোগ্যতাসহ কিছু মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিশ্বের বসবাসযোগ্য শহরের তালিকা তৈরি করে দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো, পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মতো বিষয়গুলোর ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করা হয়। বাসযোগ্যতায় উন্নতি বা অবনতি এক দিনে হয় না। ধীরে ধীরে তা দৃশ্যমান হয়।
বাসযোগ্যতার সূচকে ঢাকা শহরের তলানিতে অবস্থানের অন্যতম কারণ, অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও অধিক জনঘনত্ব। উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনঘনত্ব এবং অবকাঠামো ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার আলোকে নগরের ভারবহনক্ষমতা বিবেচনা না করা হলে যে কোনো শহর তার বাসযোগ্যতা হারায়।
দিনভর তীব্র যানজট, গণপরিবহনের সংকট, তাপপ্রবাহ-জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি, শোভন কর্মপরিবেশ ও কর্মঘণ্টা না থাকা, জানমালের নিরাপত্তাহীনতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, লাফিয়ে বাড়তে থাকা বাড়িভাড়া, ভেজাল খাবারের ছড়াছড়ি, সুস্থ বিনোদনের অভাব, উচ্চমূল্যের মানহীন শিক্ষা, ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব, দুর্নীতি-অনিয়মে পিষ্ট, আয়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়াসহ নানা সংকট-জটিলতায় একেকটি দিন পার করতে হয় ঢাকার বাসিন্দাদের। ন্যূনতম নাগরিক সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত হয়ে এই শহরে বসবাস করাই কখনো কখনো অভিশাপ মনে হতে পারে।
অবকাঠামোসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধার বিবেচনায় প্রায় ১০ গুণেরও বেশি চাপ বহন করছে ঢাকা। এমনি অবস্থায় ঢাকার পাশের জেলাগুলোকে দ্রুত উন্নয়ন, সম্প্রসারণ, অবকাঠামো, আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তুলে ঢাকার জনসংখ্যা অন্তত এক-চতুর্থাংশে কমিয়ে আনা, অফিস, আদালত, কলকারখানা, বাসাবাড়ি, ব্যাংক-বিমাসহ অন্যান্য কম গুরুত্বসম্পন্ন ভবন, স্থাপনা, যাত্রীবাহী যানবাহন কমিয়ে আনতে হবে।
এজন্য সময় দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে। কারণ, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ভৌগোলিক কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব, অবস্থান যতটা বাড়ছে, ঠিক ততটা গুরুত্ব রাজধানী ঢাকারও। এই বিবেচনায় দ্রুতই ঢাকাকে বাসযোগ্য ও আধুনিক নগরীর রূপ দিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের প্রত্যাশা আমাদের। এছাড়াও ঢাকা এখন বস্তির শহর হয়ে উঠেছে। শহরের প্রায় সব এলাকায় বস্তি চোখে পড়ে। সেখানে ঘটে নানারকম অনিয়ম ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড।
১৮ নভেম্বর, ২০২৫ জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স (ইকোসক) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগর বা মেগাসিটি ঢাকা। এই মহানগরে ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ বাস করে। বিশ্বের প্রথম বৃহত্তম মহানগর ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা। সেখানে ৪ কোটি ১৯ লাখ মানুষের বসবাস। টোকিও, নয়াদিল্লি, সাংহাই, গুয়াংজু, কায়রো, ম্যানিলা, কলকাতা ও সিউলের মতো বিশ্বের বড় সব মহানগরকে পেছনে ফেলে ঢাকা তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। ইকোসক ২০০০, ২০২৫ ও ২০৫০ সালের শীর্ষ ১০টি মেগাসিটি বা মহানগরের তালিকা ও তাদের জনসংখ্যা প্রকাশ করেছে। ২০০০ সালে ঢাকা মহানগরের জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ। তখন ঢাকা ছিল বিশ্বের নবম বৃহত্তম মহানগর। ২৫ বছরে মানুষ বেড়েছে ১ কোটি ৯২ লাখ।
অর্থাৎ প্রতি বছরে ৭ লাখ ৬৮ হাজার মানুষ বেড়েছে। এর অর্থ প্রতিদিন ঢাকা শহরে গড়ে ২ হাজার ১০৪ জন মানুষ বাড়ছে। এর মধ্যে কিছু মানুষ জন্ম নিচ্ছে, কিছু মানুষ কাঁঠালবাগান এলাকার ওই গৃহকর্মী বা তাঁর গৃহকর্তার মতো দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে ঢুকছে। ঢাকার জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার এই প্রবণতা আরো ২৫ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে অব্যাহত থাকবে বলে জাতিসংঘ মনে করছে। ২০৫০ সালে ঢাকা হবে বিশ্বের এক নম্বর বৃহত্তম মহানগর। তখন ঢাকার জনসংখ্যা বেড়ে হবে ৫ কোটি ২১ লাখ। দ্বিতীয় স্থানে নেমে যাবে জাকার্তা। জনসংখ্যা বেড়ে হবে ৫ কোটি ১৮ লাখ।
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্টের গবেষণা শাখা ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামোর মতো সূচক নিয়ে বিশ্বের ১৭৩টি শহরের ওপর একটি জরিপ ফলাফল প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ১৭১ নম্বরে। এ ছাড়া প্রায় প্রতিদিন সবচেয়ে বায়ুদূষণের শীর্ষ শহরের যে তথ্য পাওয়া যায় তাতেও দেখা যায়, ঢাকা মহানগরের অবস্থান তালিকার শীর্ষ পর্যায়ে। ঢাকা মহানগর বলতেই চোখের সামনে দানব আকৃতির একটি ঘিঞ্জি শহরের চেহারা ভেসে ওঠে। যানজটের কারণে এই শহর মন্থর, শহরের মানুষের গতি কম। রাতের ভারী বর্ষণে রাজধানীর অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সকালে রাস্তায় নেমেই ভোগান্তিতে পড়তে হয় শিক্ষার্থীসহ নগরবাসীকে।
এ ধরনের সমস্যাগুলো মোকাবিলায় দৃশ্যমান কোনো বড় কাজ নেই। অল্প বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হয়, রাজপথ তলিয়ে যায়। বন্যার ভয়ে থাকে মহানগরের মানুষ। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না, ব্যবস্থাপনা মানসম্পন্ন না হওয়ায় নগরময় বর্জ্য ছড়িয়ে থাকে। বছরজুড়ে নির্মাণকাজ চলে, শহরে ধুলা আর ধুলা। শহরটা অনুজ্জ্বল, মলিন। এর সঙ্গে আছে দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, স্বাস্থ্যসেবার সংকট। তারপরও মানুষ ঢাকাতেই আসছে, ঢাকাতেই থাকতে চাইছে। এখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, নির্মাণ, পরিবহন এবং এমনকি অনানুষ্ঠানিক খাতও কেন্দ্রীভূত। বিশ্বব্যাংকের টুওয়ার্ড গ্রেট ঢাকা শিরোনামের প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ঢাকা হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তিকেন্দ্র। জিডিপিতে ঢাকার অবদান ২০ শতাংশ, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের ৪৪ শতাংশ ঢাকাতেই, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশ ঢাকা মহানগর এলাকায়। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক মেট্রোপলিটন শহরগুলোর বাসযোগ্যতার কতগুলো মাপকাঠি আছে।
এর মধ্যে আছে- সেবা ও সুযোগ-সুবিধার প্রাপ্যতা, বসবাস ও চলাচলের আর্থিক সামর্থ্য, অর্থবহ জীবিকার সুযোগ, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন জীবন, পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সামাজিকভাবে ন্যায্য, নগরবাসীর মধ্যে কমিউনিটির চেতনা, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা, আকর্ষণীয় ও পর্যাপ্ত জনপরিসর, হাঁটার যোগ্য, স্বাস্থ্যকর প্রাকৃতিক পরিবেশ, আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং জন অংশগ্রহণের সুযোগ।
এসব মাপকাঠির বিচারে ঢাকা মহানগরের অবস্থান তলানির দিকে। একটি শহরকে 'মহানগর' বা উন্নত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে উন্নত অবকাঠামো (রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন), আধুনিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, উন্নত যোগাযোগ (ইন্টারনেট), বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক সুযোগ এবং একটি সুপরিকল্পিত পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগ ও নাগরিক সুবিধা একটি শহরকে আধুনিক বাসযোগ্য করে গড়ে তোলে। ঢাকাকে আধুনিক ও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এখন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
লেখক : কলাম লেখক ও সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









