নিত্যপণ্যের বাজারে সংকট যেন এখন আর কেবল চাহিদা-জোগানের স্বাভাবিক ফল নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর একটি পুরনো কৌশল। বাজার থেকে পণ্য ‘উধাও’, এরপর কৃত্রিম সংকট, ক্রেতার হাহাকার এবং শেষ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর দাবি- এই চক্র বারবার ফিরে আসছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দাম বাড়ানোর পরই আবার সেই ‘উধাও’ পণ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারে ফিরে আসে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, সংকটটি কি সত্যিই ছিল, নাকি সংকটকে পুঁজি করে ভোক্তার পকেট কাটার আয়োজন?
জ্বালানি তেল, এলপিজি, ভোজ্যতেল, চাল, ডাল, চিনি কিংবা মসলার বাজারে সরবরাহ নিয়ে হঠাৎ অস্থিরতা তৈরি হওয়া এবং পরে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে গভীর তদন্তের দাবি রাখে। বিশেষ করে, কোনো পণ্যের পর্যাপ্ত আমদানি বা মজুত থাকার পরও যদি খুচরা বাজারে তার সংকট দেখা দেয়, তাহলে সরবরাহব্যবস্থার কোন স্তরে পণ্য আটকে আছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি। কারণ, বাজারে পণ্য থাকার পরও ভোক্তা যদি তা না পান, তাহলে সেটিকে নিছক বাজারব্যবস্থার স্বাভাবিক আচরণ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এখানে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। আয় না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে। একটি পণ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব অন্য পণ্যের ওপরও পড়ে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ও বিপণন ব্যয় বাড়ে, শেষ পর্যন্ত তার বোঝা গিয়ে পড়ে ভোক্তার ঘাড়ে। এভাবে মূল্যস্ফীতির একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্যও একেবারেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, এলসি-সংক্রান্ত জটিলতা, পরিবহন খরচ কিংবা উৎপাদন ঘাটতি- এসবই পণ্যের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু এসব বাস্তব কারণের আড়ালে কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে কিনা, সেটিই রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে। ‘সিন্ডিকেট নেই’- এমন দাবি যেমন যথেষ্ট নয়, তেমনি প্রমাণ ছাড়া সবাইকে সিন্ডিকেটের অংশ বলাও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক তদন্ত।
কেবল বাজারে অভিযান চালিয়ে দু-একজন খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং কোথা থেকে পণ্য আমদানি হচ্ছে, কারা মজুত করছে, কোন পর্যায়ে সরবরাহ কমছে, কতদিনের মজুত রয়েছে এবং কী দামে কোন পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে- এসব তথ্যের একটি কার্যকর ও স্বচ্ছ ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বড় আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের মজুত ও সরবরাহের তথ্য নিয়মিত প্রকাশের আওতায় আনাও জরুরি।
একই সঙ্গে প্রতিযোগিতা কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং বাজারে নতুন ও ছোট ব্যবসায়ীদের প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে। আমদানিতে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে বাজারে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। তাই প্রতিযোগিতামূলক আমদানি ব্যবস্থা, শক্তিশালী বাজার তদারকি এবং দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত বাজার নজরদারি। সিন্ডিকেটের মূল হোতারা যদি প্রভাবশালী হওয়ায় বারবার পার পেয়ে যায়, তাহলে অভিযান ও জরিমানা লোকদেখানো কার্যক্রমে পরিণত হবে। রাষ্ট্রকে তাই খুচরা বিক্রেতার বদলে সরবরাহব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রকদের দিকে নজর দিতে হবে।
পণ্য উধাও হওয়ার পর দাম বাড়িয়ে আবার বাজারে ফিরে আসার এই অস্বাভাবিক চক্র বন্ধ করতেই হবে। বাজার অর্থনীতির নামে ভোক্তার অসহায়ত্বকে ব্যবসার হাতিয়ার হতে দেওয়া যায় না। সরকারের দায়িত্ব শুধু দাম নির্ধারণ করা নয়; বাজারে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। নিত্যপণ্যের বাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ এখন আর বিকল্প নয়- এটি রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









