কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলেই তদন্ত কমিটি গঠন, কারণ দর্শানোর নোটিশ কিংবা ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস সবই দেখা যায়। কিছুদিন চলে তৎপরতা, সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়, কর্তৃপক্ষও সক্রিয় থাকার বার্তা দেয়। তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু স্তিমিত হয়ে আসে। তদন্তের ফল কী, দায়ী কে, সুপারিশ বাস্তবায়িত হলো কিনা এসব প্রশ্নের উত্তর আর মেলে না। এভাবেই জবাবদিহির আনুষ্ঠানিকতা বজায় থাকে, অথচ দায়মুক্তির বাস্তবতা অটুট থাকে।
জবাবদিহি মানে শুধু কাউকে তলব করা বা তদন্তের ঘোষণা দেওয়া নয়। এর অর্থ হলো সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া, অনিয়মের দায় নির্ধারণ, ক্ষতির প্রতিকার এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ। এসব নিশ্চিত না হলে জবাবদিহি জনঅসন্তোষ সামাল দেওয়ার আনুষ্ঠানিক কৌশলে পরিণত হয়।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠলে শুধু ঠিকাদারকে দায়ী করলেই চলে না; প্রকল্পের মান যাচাই, ব্যয়ের হিসাব এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকাও পরীক্ষা করতে হয়। হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা কিংবা সরকারি দপ্তরে নাগরিক হয়রানির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ব্যক্তির পাশাপাশি সেই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে, যেগুলো অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে একজনকে বদলি করা কিংবা সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়াকেই ব্যবস্থা গ্রহণের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু বদলি শাস্তি নয়, আর পদ পরিবর্তন মানেই দায় নির্ধারণ নয়।
নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণ যাচাই ও সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা মূল্যায়ন ছাড়া প্রকৃত জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠলেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না; আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগসহ ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবেদন জমা পড়েছে কিনা, সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে কিনা, বিলম্বের কারণ কী- এসব তথ্য নাগরিকের জানার সুযোগ থাকা উচিত, আইনগত সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে। তদন্তের ঘোষণা যতটা দৃশ্যমান, তার অগ্রগতি যদি ততটাই অস্পষ্ট থাকে, তাহলে জনমনে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তদন্তের উদ্দেশ্য সত্য উদ্ঘাটন, নাকি সাময়িক বিতর্ক প্রশমন এ প্রশ্ন তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে। জবাবদিহির অভাব শুধু একটি ঘটনার বিচার ব্যাহত করে না; অনিয়মের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিও বাড়ায়। দায়িত্বে অবহেলা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের পরিণতি যদি সাময়িক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে নিয়ম মানার প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনা দুর্বল হয়ে পড়ে। বিপরীতে, নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায্য শাস্তির নিশ্চয়তা দায়িত্বশীল আচরণকে উৎসাহিত করে। তাই জবাবদিহি কেবল অতীতের ভুলের বিচার নয়, ভবিষ্যতের অনিয়ম প্রতিরোধেরও শর্ত।
রাজনৈতিক প্রভাব, প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাত কিংবা ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের হস্তক্ষেপ তদন্তকে প্রভাবিত করলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়। একই ধরনের অভিযোগে ভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা নষ্ট করে। পদমর্যাদা বা প্রভাব নয়, প্রমাণ ও প্রযোজ্য বিধিই হতে হবে ব্যবস্থা গ্রহণের ভিত্তি। ক্ষমতাবান ও সাধারণ কর্মীর জন্য আলাদা মানদণ্ড থাকলে জবাবদিহি বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।
এই পরিস্থিতি বদলাতে অভিযোগ নিষ্পত্তি ও তদন্তের সময়সীমা নির্ধারণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের ভূমিকা স্পষ্ট করা এবং অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা জরুরি। তদন্ত শেষে আইনগত বাধা না থাকলে প্রতিবেদন বা সুপারিশের সারসংক্ষেপ প্রকাশ করতে হবে। সুপারিশ বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে তার কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগকারী ও তথ্যদাতাদের হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। তবে, জবাবদিহির নামে নির্বিচার শাস্তিও গ্রহণযোগ্য নয়।
অনিচ্ছাকৃত ভুল, দায়িত্বে অবহেলা ও ইচ্ছাকৃত অনিয়মের মধ্যে পার্থক্য করে প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করতে হবে। ন্যায়সংগত শুনানি ও আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করলেই প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নির্দোষ ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। সবচেয়ে জরুরি হলো, জবাবদিহিকে ঘটনাভিত্তিক তৎপরতা থেকে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া। সংবাদমাধ্যমে আলোচনা থাকলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আর আলোচনা থেমে গেলে সবকিছু থেমে যাবে- এমন সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নিয়মিত নিরীক্ষা, কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি, নিরপেক্ষ তদারকি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পর্যালোচনা নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা আশ্বাসে নয়, কাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। তদন্ত কমিটি গঠন বা নোটিশ জারির সংখ্যা দিয়ে জবাবদিহির সাফল্য মাপা যায় না। দেখতে হবে, অনিয়ম কমেছে কিনা, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি প্রতিকার পেয়েছেন কিনা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা। জবাবদিহির অভিনয় সাময়িকভাবে জনরোষ প্রশমিত করতে পারে, কিন্তু দায়মুক্তির সংস্কৃতি বদলাতে পারে না।
প্রকৃত জবাবদিহি তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন ক্ষমতা ও পদমর্যাদা নির্বিশেষে প্রত্যেককে নিজের কাজের জন্য জবাব দিতে হবে এবং সেই জবাবের ভিত্তিতে দৃশ্যমান পরিণতি নিশ্চিত হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









