সংঘাত জ্ঞানচর্চার পথকে রুদ্ধ করে- তা হোক ধর্মীয়, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক। শিক্ষা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনোটিই আমাদের দ্বন্দ্ব, সংঘাত, হানাহানির পথে ধাবিত করে না বা সেই পথকে সমর্থনও করে না। ধর্ম- যার অর্থ হলো ধারণ করা। মানুষ নিজের অন্তরে যে ন্যায়, নীতিবোধ, বিশ্বাস ধারণ করে থাকেন তা-ই তার ধর্ম। এটি কখনোই কেবল বদ্ধমূল ধারণা কিংবা নির্দিষ্ট কোনো আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সকল ধর্মই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানুষকে মানবিকতার ধর্মে উদ্বুদ্ধ করে। নৈতিক, দায়িত্বশীল ও মানবিক হতে অনুপ্রাণিত করে। সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মের মূল উদ্দেশ্যই কল্যাণ, দয়া ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা।
আমাদের শিক্ষার সাথে কিছু পারিপার্শ্বিক বিষয়বস্তুও জড়িত থাকে। তার মধ্যে অন্যতম হলো সামাজিকতা, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ ধর্মীয় নানাবিধ মনস্তত্ত্ব। কিন্তু একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যখন প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি শিক্ষার গুরুত্বকে অতিক্রম করে আলোচনা সমালোচনার কেন্দ্রে চলে যায় তখনই ঘটে বিপত্তি। সেখানে শিক্ষা অনিবার্যভাবে তার গুরুত্ব হারায় আর শিক্ষার্থীরা বিচ্যুত হয় তাদের জ্ঞান অর্জনের মূল উদ্দেশ্য থেকে। শিক্ষার সাথে প্রত্যক্ষভাবে বা সরাসরি সম্পর্কিত নয় এরূপ বিষয়ের বিরূপ প্রভাব শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে শুরু করে। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই তখন শিক্ষা তার মূল সৌন্দর্য ও উদ্দেশ্য হারায়।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল উচ্চতর ডিগ্রি, সার্টিফিকেট প্রদান করাই নয় বরং একজন শিক্ষার্থীকে আমাদের সমাজের মানবিক ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। একজন মানুষ জন্মগতভাবে কোনো একটি নির্দিষ্ট সাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে পৃথিবীতে আসে না, বেড়ে ওঠে না। এটি পর্যায়ক্রমে পরিবেশ তথা সমাজ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অর্জন করে। সেখানে শিক্ষা আমাদের মনোভাব, চিন্তাধারাকে যুক্তিভিত্তিক করে তোলে। জ্ঞান অর্জনের দ্বারা যখন একজন ব্যক্তি বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি নিয়ে জানতে পারে, তখন তার মন থেকে অপ্রাসঙ্গিক ভয়, কুসংস্কার দূরীভূত হয়। ব্যক্তি অনুধাবন করতে পারে, ধর্মীয় দিক থেকে রকমভেদ থাকলেও প্রতিটি মানুষ অধিকার ও মর্যাদার দিক থেকে একই। এই শিক্ষা কেবল জিপিএ বা ডিগ্রির মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়।
আমাদের মতো দেশে যেখানে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম, মত ও পথের চর্চা হয় সেখানে শিক্ষা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিপরীতমূখী কোনো বিষয় হতে পারে না। বরং তারা একে অপরের পরিপূরক। একদিক থেকে শিক্ষা যেমনিভাবে সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপন করে, ঠিক তেমনি একটি অনুকূল ও অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ ছাড়া মানসম্মত জ্ঞান লাভ করাও অসম্ভব প্রায়। পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনে সহনশীলতার অভাবে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সর্বদা সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় থাকলে তরুণরা নানান চরমপন্থী প্রোপাগান্ডার ফাঁদ থেকেও রেহায় পায়। এক সময় আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল ভিত্তিই ছিল একটি স্থিতিশীল, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় সংঘাত মূলত আমাদের সেই জাতীয় চেতনা ও সংবিধান পরিপন্থী যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই বাংলাদেশে ধর্মীয় বিশ্বাসের মতো একটি সংবেদনশীল বিষয়কে কেন্দ্র করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সৃষ্ট বিভেদ বা সংঘাতের ফলে নিঃসন্দেহে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়।
পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের বহুদিনের অর্জিত মর্যাদা বা ঐতিহ্য ক্ষুন্ন হতে পারে। অন্যদিকে, উদ্দেশ্যেপ্রণোদিতভাবে এই সংবেদনশীল বিষয়টিকেই কাজে লাগাতে মরিয়া আভ্যন্তরীণ কিছু পক্ষ বা দলও। ক্রমেই এই সাধারণ ঘটনা বৃহৎ আকার ধারণ করে রাজনৈতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ছে। যখন ক্লাসে বসে জ্ঞান অর্জন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার কথা, তখন তাকে প্রাতিষ্ঠানিক নানা বিরোধ বা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। ফলস্বরূপ, মূল্যবান সময়ও অপচয় হয়ে যায়।
মানবজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে ছাত্রজীবনই হলো ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনের সর্বাধিক উপযুক্ত সময়। এই সময় মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিস্বার্থ ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা গড়ে তোলে । অশিক্ষা থেকেই সমাজে গোঁড়ামি ও উগ্রবাদের সূত্রপাত ঘটে। পক্ষান্তরে, প্রকৃত শিক্ষা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ন্যায় ও নীতিবোধ জাগ্রত করে। বিভিন্ন সময়ে আসা নানা ধরনের প্রোপাগান্ডার সত্যতা যাচাইয়ের সক্ষমতা দেয়। একটি শিক্ষিত সমাজ কখনোই কেবল ধর্মীয় আবেগের ওপর ভিত্তি করে বিভ্রান্ত হয় না। এর ফলে, স্বার্থান্বেষী মহলগুলোও সহজে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা সংঘাতকে উস্কে দিতে পারে না। বর্তমান সময়ে এসে শিক্ষাক্ষেত্রে ধর্মীয় নানা ধরনের ইস্যু আমাদের তরুণ সমাজের সামনে একই সঙ্গে একটি বড় প্রশ্ন ও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে দলাদলি, সংঘাত, হুমকি, ক্ষমতার প্রদর্শন, মিছিল কিংবা বিভিন্ন ধরনের চাপ শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনায় বাধা সৃষ্টি করে। তাই এই প্রজন্মের সুষ্ঠু মানসিক বিকাশ, একতা ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যেখানে সবসময় হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা। এরূপ বৈচিত্র্যময় পরিবেশের সংস্পর্শে থাকলে আধুনিকতার যুগেও আমাদের শিক্ষার্থীদের মানবিকতার সঠিক বিকাশ ঘটবে।
একটা সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে সেই সমাজের বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একসাথে মিলিত হয়। এই সহাবস্থান তাদের মধ্যে গড়ে তোলে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও বন্ধন। এ যুগে প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এমন কিছু বিষয় যেমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটিক) শিক্ষার্থীদের বেশি প্রভাবিত করছে। সেসব মাধ্যমে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল বা অপশক্তির দ্বারা ছড়ানো ধর্মীয় গুজব, প্রোপাগাণ্ডা বা ভুয়া তথ্য তরুণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে দ্রুত উস্কে দেয়। তাই ক্যাম্পাসগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা বা সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার আগেই সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। একইভাবে কোনো শিক্ষক যখন ক্লাসরুমে কোনো ধর্মের উদ্দ্যেশ্যে কটূক্তি অথবা পক্ষপাতমূলক আচরণ করেন, স্বাভাবিকভাবেই তখন সম্প্রীতির ভিত নড়ে যায়। তাই শিক্ষকরা যদি নিজেরাও অসাম্প্রদায়িক ও নিরপেক্ষ আচরণ বজায় রাখেন তাহলে সেখানে শিক্ষার্থীরাও সমানভাবে সকলপ্রকার চরমপন্থা বা উগ্রবাদ থেকে নিজেদের দূরে রাখে।
যে কোনো সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন সম্প্রীতি গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী চারণভূমি হতে পারে, তেমনি এর অবহেলার কারণে তা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের শক্তিশালী উৎসেও পরিণত হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, সহপাঠীদের মধ্যকার সামান্য ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকেও বড় কোনো সাম্প্রদায়িক ইস্যু হিসেবে রূপ দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়, যা নিঃসন্দেহে সেখানকার পরিবেশ বিষাক্ত করে তুলতে পারে। অর্থাৎ একদিকে শিক্ষার ফল হিসেবে যেমন সম্প্রীতিকে বিবেচনা করা হয়, তেমনি শিক্ষার প্রসারের একটি পূর্বশর্ত হলো এই সম্প্রীতি। আমাদের সমাজে বা কোনো শিক্ষাঙ্গনে যদি সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরি হয় তবে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশও বিঘ্নিত হয়। এরূপ সংঘাতময় পরিবেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক বিষন্নতার কারণে পড়াশোনার স্বাভাবিক গতিধারা নষ্ট হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে জড়িত থাকার ফলে ভবিষ্যতেও দীর্ঘমেয়াদে ভোগান্তির স্বীকার হয় স্কুল, কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের একাংশ। এমনকি সামগ্রিকভাবে শিক্ষাব্যবস্থার অবকাঠামোও হুমকির মুখে পড়ে যায়।
সুশিক্ষা আমাদেরকে অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানে, সংকীর্ণতা থেকে মুক্তচিন্তায়, অন্ধকার থেকে আলোতে এবং পশ্চাৎপদতা থেকে প্রগতির পথে ধাবিত করে। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো এর আধার। একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে বিদ্যালয়, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকেই। ভবিষ্যতের অসংখ্য স্বপ্ন পরম যত্নে লালিত হয় এখানে। পারিপার্শ্বিকতা ও জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়েই সেই স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবতার রূপ নেয়। তাই একটি নৈতিক মূল্যবোধসমৃদ্ধ, সুদৃঢ় জাতি গঠনের জন্য হলেও শিক্ষাঙ্গনের ও এর সম্পৃক্ত সবকিছুই হওয়া উচিত শান্ত, নিরাপদ, স্বাধীন ও সৃজনশীল। সেখানে ধর্মীয় হানাহানি ও কুসংস্কার দূরে সরিয়ে সদাসর্বদা শান্তিপূর্ণ আবহ বিরাজমান থাকা আবশ্যক। অন্যথায়, নিঃন্দেহে তা ভবিষ্যৎ দেশ ও সমাজের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
যদি তা কোনো দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখন আরো জটিল সমস্যায় রূপ নেয়। এমনকি শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তার পরিধি সংকুচিত হয়ে যায়। পরিশেষে, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে আমরা সকলে বাংলাদেশের নাগরিক। প্রতিটি ধর্মেরই নিজস্ব রীতিনীতি, কৃষ্টি, সংস্কৃতি রয়েছে। সাথে রয়েছে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার। তবে, নিজ ধর্মের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান পোষণের পাশাপাশি অন্য ধর্মের প্রতিও ইতিবাচক, সহানুভূতিশীল ও সম্মানজনক মনোভাব পোষণ করতে হবে। অন্যথায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা কোনো প্রকার জ্ঞান অর্জনই ব্যক্তিপরিসর থেকে শুরু করে বৃহৎ পরিসর তথা দেশ ও সমাজের জন্য সার্বিকভাবে ফলপ্রসূ হবে না।
লেখক: কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









