ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে। ২৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের নির্বাচনে জয়লাভ করেছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তিনি ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার বিজয় প্রকৃতপক্ষে একটি জাতির আত্মার প্রত্যাবর্তন। একটি গণতন্ত্রের দীর্ঘ নিঃশ্বাস। আশি বছর বয়সী এই নেতা প্রথম পর্বে পরাজিত হয়েও দ্বিতীয় পর্বে অলৌকিক প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছেন। প্রথম পর্বে ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছিলো প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোট। লুলা পেয়েছিলো ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি ভোট। কিন্তু চূড়ান্ত পর্বে লুলা পেয়েছে ৫১.৮ শতাংশ। বলসোনারো পেয়েছে ৪৮.২ শতাংশ। এই সামান্য ব্যবধান রাতের অন্ধকারে জ্বলে ওঠা প্রদীপের মতো। যে প্রদীপ ব্রাজিলের গণতন্ত্রের পথ দেখিয়েছে।
এই ফলাফল প্রতিটি প্রাক-নির্বাচনী জরিপকে বিভ্রান্ত করেছে। বিশ্লেষকরা লুলার পরাজয়কেই সম্ভাব্য বলে মনে করছিলেন। কিন্তু রাজনীতি কখনো সংখ্যার হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাজনীতি হলো মানুষের আশা, ক্ষোভ ও স্মৃতির সমষ্টি। লুলা প্রথম পর্বে প্রায় ১০.৪ মিলিয়ন ভোট বাড়িয়েছে। বলসোনারো বাড়িয়েছে মাত্র ৩.৭ মিলিয়ন ভোট। জনগণ শেষ মুহূর্তে সংশয় ছাড়িয়ে আস্থার পথ বেছে নিয়েছে। ব্রাজিল লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম একটি দেশ। দেশটি বৈশ্বিক রাজনীতির এক গভীর অক্ষ। এখানকার নির্বাচন প্রভাবিত করে আমাজন, খাদ্যনীতি, জলবায়ু ও দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা। তাই লুলার বিজয় বৈশ্বিক গণতন্ত্রের সংগ্রামের বিজয়। এই বিজয় দক্ষিণ গোলার্ধের সার্বভৌমত্বের পক্ষে এক সুস্পষ্ট ভোট। এই বিজয় এমন এক কণ্ঠস্বর, যা সাম্রাজ্যের দমন-পীড়নকে প্রত্যাখ্যান করে। প্রথম পর্বের পরাজয় লুলা শিবিরে ভীষণ ধাক্কা দিয়েছিল। সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্য ছিল দৃশ্যমান। তবু ভোটারদের মনে অসন্তোষ ছিল। জীবনযাত্রার ব্যয়, ঋণের বোঝা ও অনলাইন জুয়া ছিল কঠিন বাস্তবতা। অসন্তোষ ছিল সত্য, কিন্তু সেই সত্যকেই লুলা শেষ তিন সপ্তাহে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিয়েছেন। পরাজয়ের ছাই থেকে তিনি আশার অগ্নিশিখা জ্বালিয়েছেন।
লুলা সরকারের অর্থনৈতিক নথি দুর্বল ছিল না। ২০২৩ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ব্রাজিলের অর্থনীতি সঞ্চিতভাবে প্রায় ৯.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিবেশী দেশগুলোর গড় প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৫.৬ শতাংশ। অর্থনীতি বাস্তব জীবনে পৌঁছালে তা ভোটে রূপ নেয়। আবার সংখ্যা জীবনে রূপ নিলে তা ইতিহাসে পরিণত হয়।
বেকারত্বের হ্রাস ছিল আরো উল্লেখযোগ্য। ২০২২ সালে বেকারত্বের হার ছিল ৯.৩ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ৫.৪ শতাংশে। যা ব্রাজিলের ইতিহাসে বেকারত্ব হ্রাসের ঐতিহাসিক অভিগমন। কর্মসংস্থান মানে শ্রমজীবী মানুষের কাছে কাজের নিশ্চয়তা। পরিবারের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। সন্ধ্যার পর ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা। ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লুলার সরকার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করেছে। ২০২৫ সালে ব্রাজিল জাতিসংঘের ক্ষুধার মানচিত্র থেকে বেরিয়ে এসেছে। দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি ২.৫ শতাংশের নিচে নেমেছে। পরিসংখ্যানের হিসেবে যা লক্ষ লক্ষ পরিবারের থালায় ফিরে আসা খাদ্যের গল্প। ক্ষুধার্ত শিশুর চোখে ফিরে আসা আলো। রাষ্ট্রের সামাজিক দায়িত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
আমাজনের প্রসঙ্গও একই রকম তাৎপর্যপূর্ণ। লুলার আমলে বন উজাড় কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমেছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বন উজাড় ছিল গত দশকের সর্বনিম্ন। যা কিনা পরিবেশগত সাফল্যের অন্যতম রূপ। যা কিনা পৃথিবীর শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রশ্ন। আমাজন ক্ষতিগ্রস্ত হলে জলবায়ুর ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়বে। তাই ব্রাজিলের নির্বাচন বৈশ্বিক জলবায়ু-ন্যায়ের নির্বাচনও বটে। সবুজ প্রান্তরের প্রতিটি গাছ এই বিজয়ের সাক্ষী। এ কথাও সত্য, লুলার শাসনামল কোনো স্বর্গরাজ্য ছিল না। কোটি মানুষ এখনো ক্রেডিট-কার্ডের ঋণে আটকে আছে। সুদের হার ছিল অত্যন্ত উচ্চ।
অনলাইন জুয়ার বিস্তার পরিবারের আয় ও শান্তি ধ্বংস করেছে। এই বাস্তবতা নির্বাচনী ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে। জনগণ সরকারের সাফল্য অস্বীকার করেনি। কিন্তু তারা নিজেদের দৈনন্দিন কষ্টও অস্বীকার করেনি। জনগণের ক্ষোভ ছিল বজ্রের মতো। কিন্তু সেই বজ্র ধ্বংস চায়নি। সে চেয়েছে ন্যায়। লুলা এই অসন্তোষকে অস্বীকার করেননি। তিনি সাহসী নীতির পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি ব্যাপক ঋণ অবকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি অনলাইন বাজির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছেন। সামাজিক সুবিধা বাড়িয়েছেন। জ্বালানি ভর্তুকি দিয়েছেন। ছয়দিনের কর্মসপ্তাহকে পাঁচদিনে রূপান্তরের পথ খুলেছেন। এসব পদক্ষেপ ছিল বৃহৎ অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র জীবনের মধ্যে সেতু। এই সেতু দিয়ে হেঁটেই জনগণ সরকারের কাছে ফিরে এসেছে।
বলসোনারোর প্রস্তাব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি ব্যয় হ্রাস, বেসরকারিকরণ ও কর হ্রাসের কথা বলেছেন। তিনি অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি এল সালভাদরের কুখ্যাত কারাব্যবস্থার আদলে পাঁচটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কারাগার নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি সশস্ত্র অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের অনুমতি চেয়েছেন। এই প্রস্তাব ভয়কে রাজনীতির জ্বালানি বানায়। ভয় যখন শাসন করে, তখন স্বাধীনতা কারাগারে বন্দি হয়। আরো বিতর্কিত ছিল তার ক্ষমা প্রার্থনার অঙ্গীকার। তিনি তার পিতা জাইর বলসোনারোর মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জাইর বলসোনারোকে ২০২২ সালের নির্বাচন উল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের দায়ে ২৭ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। তিনি ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে হামলার দোষীদেরও ক্ষমার আশ্বাস দিয়েছেন।
এটি ছিল বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এক বিপজ্জনক সংকেত। অপরদিকে লুলার প্রচারণা তরুণদের উদ্বুদ্ধ করেছে। তারা রাস্তায়, ক্যাম্পাসে ও ডিজিটাল পরিসরে সংগঠিত হয়েছে। তারা কেবল একজন প্রার্থীর পক্ষে দাঁড়ায়নি। তারা গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। তারা সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও স্বৈরতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। তরুণদের পদধ্বনি ছিল ইতিহাসের নতুন সুর। ডিজিটাল প্রচারণার ক্ষেত্রেও লুলা বাধার মুখে পড়েছিলেন। মেটা-জাতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অ্যালগরিদম বলসোনারোর পক্ষে অনুকূল ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়া এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়।
এটি রাজনৈতিক চিন্তা গঠনের ক্ষেত্র। যখন অ্যালগরিদম পক্ষপাতী হয়, তখন গণতন্ত্রের তথ্য-পরিবেশও বিকৃত হয়। লুলার বিজয় এই বাস্তবতাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে। সত্য কখনো চুপ থাকে না। সে অ্যালগরিদমের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা এই নির্বাচনকে আরো জটিল করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন লুলার শাসনামলে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। জাইর বলসোনারোর বিচারের সঙ্গে জড়িত এক সুপ্রিম কোর্ট বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রার্থিতাকে স্পষ্টভাবে সমর্থন দেওয়া হয়েছে।
মে মাসে ট্রাম্প ফ্লাভিও বলসোনারোকে ওভাল অফিসে গ্রহণ করেন। মাত্র দুই দিন পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ব্রাজিলের দুটি বৃহত্তম অপরাধচক্রকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করেন। ফ্লাভিও এই ব্যবস্থার জন্য প্রকাশ্যে আবেদন করেছিলেন। এই ঘটনাগুলো নির্বাচনী রাজনীতিকে ছাড়িয়ে ভূরাজনীতির পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এটি ছিল কূটনীতির মুখোশে হুমকির নৃত্য। এই সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকাভুক্তির অর্থ শুধু কূটনৈতিক বার্তা নয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের দরজা খুলে যেতে পারে। ওয়াশিংটন তার সম্প্রসারিত ‘নার্কোটেররিজম’ যুদ্ধের নামে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
ভেনেজুয়েলায় এমন একটি সন্ত্রাসী ঘোষণাকে সামরিক হস্তক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তাই ব্রাজিলের ভোটাররা জানতেন, এই নির্বাচন শুধু দেশের ভবিষ্যৎ নয়। এটি জাতীয় স্বাধীনতারও প্রশ্ন। লুলা এই প্রশ্নকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে সহযোগিতা জাতীয় সার্বভৌমত্বকে সম্মান করতে হবে। তিনি ব্রাজিলকে ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনার অধীন করতে রাজি নন। তিনি চান ব্রাজিল নিজের পথে চলুক। তিনি চান বহুপাক্ষিকতা, আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক সমতার পথে দেশ এগিয়ে যাক। এই অবস্থানই তার নির্বাচনী বার্তার কেন্দ্রে ছিল। সার্বভৌমত্ব তার কাছে কোনো স্লোগান নয়। সে তার জাতির প্রাণ।
এই নির্বাচন ছিল দুটি ব্রাজিলের সংঘাত। একটি ব্রাজিল চায় সার্বভৌম, স্বাধীন ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র। অন্যটি চায় বাজারের স্বাধীনতা, কঠোর নিরাপত্তা ও বিদেশি শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোট। লুলার বিজয় প্রথম ব্রাজিলের বিজয়। এটি এমন এক জাতির বিজয়, যারা নিজেদের ভাগ্য নিজের হাতে রাখতে চায়। এটি এমন এক জাতির বিজয়, যারা নিজের পতাকার নিচে দাঁড়াতে চায়। লুলার এই বিজয় লাতিন আমেরিকার ডানপন্থী ঢেউয়ের গতিও থামাতে পারে। ট্রাম্পের ফিরে আসার পর হন্ডুরাস, চিলি ও বলিভিয়ায় ডানপন্থীরা নির্বাচনী সাফল্য পেয়েছে। এই ধারা অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছিল।
কিন্তু ব্রাজিলের ফলাফল দেখাল, সেই ঢেউ অনিবার্য নয়। জনগণের ইচ্ছা যখন সংগঠিত হয়, তখন রাজনৈতিক স্রোতও বদলায়। ঢেউ কখনো স্থায়ী নয়। তীরের বালু তার স্মৃতি মুছে দেয়। এই ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে এসেছে। তাই এর প্রভাব কেবল ব্রাজিলে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপরও প্রশ্ন তুলবে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই লুলার নিয়মিত সমালোচক। তিনি বলসোনারোর পক্ষে পূর্ণ শক্তিতে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু তার জনপ্রিয়তা ক্রমে কমছে। চিলিতেও প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্তের জনসমর্থন দ্রুত পতনের পথে।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমের জন্য লুলার বিজয় স্বস্তির খবর। লুলার পরাজয় হলে তিনি ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হতে পারতেন। কিন্তু এখন লাতিন আমেরিকার দুই বৃহত্তম দেশ ও বৃহত্তম অর্থনীতি বামপন্থী নেতৃত্বেই থাকবে। এই দুই দেশের হাত একসঙ্গে থাকলে অঞ্চলের ভাগ্যও বদলাতে পারে। একতার এই সুর নতুন আশার জন্ম দেয়। তবে, এই বিজয়কে চূড়ান্ত বিজয় বলা যাবে না। লাতিন আমেরিকার ডানপন্থী ঝোঁক একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। ব্রাজিলের রাজনীতি এখনো গভীরভাবে বিভক্ত। বলসোনারো ফলাফল মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন। তাই লুলার সামনে রয়েছে রক্ষণশীল কংগ্রেস, আইনি জটিলতা ও সামাজিক অসন্তোষ। কিন্তু বিজয়ীর পথ কখনো মসৃণ হয় না।
বিজয়ীর পথ দিয়েই ইতিহাস হাঁটে। তবু এই বিজয় একটি মোড় নির্দেশ করে। ব্রাজিল ট্রাম্পের ‘শিল্ড অব দি অ্যামেরিকাস’-এ যোগ দেবে না। ‘ডনরো ডকট্রিন’ এখনো হুমকি হয়ে রয়ে গেছে। কিন্তু তার সর্বোচ্চ উত্থানের মুহূর্ত সম্ভবত পেরিয়ে গেছে। ইতিহাস শেখায়, সাম্রাজ্যের আকাঙ্ক্ষা যত বড়ই হোক, জাতির ইচ্ছাকে দীর্ঘদিন দমন করা যায় না। সূর্য যতই মেঘে ঢাকা থাকুক, তার আলো ফিরে আসে।
লুলার জীবন নিজেই এক রাজনৈতিক দলিল। তিনি ধাতুশ্রমিক থেকে রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন। তিনি কারাগারেও গেছেন। তিনি রাজনৈতিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতাও নিয়েছেন। তবু তিনি সমাজের প্রান্তিক মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন। তার বিজয় তাই শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়। এটি নিপীড়িত, বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের প্রত্যাশার বিজয়। এটি সেই মানুষের বিজয়, যারা কখনো ইতিহাসের পাতায় নাম লেখেনি। এই বিজয়ের তাৎপর্য ব্রাজিলের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষের জন্য এটি এক শক্তিশালী বার্তা।
বহুপাক্ষিকতা, আন্তর্জাতিক আইন, পরিবেশ রক্ষা ও দক্ষিণ গোলার্ধের সার্বভৌমত্বের পক্ষেও এটি বার্তা। এই বার্তা বলছে, উগ্র ডানপন্থার অগ্রযাত্রা অনিবার্য নয়। এটি অপ্রতিরোধ্যও নয়। ইতিহাসের দেয়ালে এই কথা খোদাই হয়ে গেছে। ব্রাজিলের ভোটাররা প্রমাণ করেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ভয়কে নয়, আশাকে বেছে নিতে পারে। তারা প্রমাণ করেছে, অর্থনৈতিক সাফল্য যদি সামাজিক ন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তা টেকসই রাজনৈতিক শক্তি হয়। তারা প্রমাণ করেছে, বিদেশি চাপের মুখে জাতীয় মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব। লুলার বিজয় তাই ব্রাজিলের বিজয়। এটি গণতন্ত্রের বিজয়। এটি সার্বভৌমত্বের বিজয়। এবং এটি সমগ্র দক্ষিণ গোলার্ধের জন্য এক অনুপ্রেরণার বার্তা।
লেখক : গবেষক ও সংগঠক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









