বাংলাদেশের পরিচয় কোনো একক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় জীবনের বিকাশে সব ধর্মের মানুষের অবদান রয়েছে। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের একক সম্পদ নয়, বরং সব নাগরিকের সমান অধিকার। এই চেতনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হলো, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার।
২০২৬ সালের শারদীয় দুর্গোৎসব এই মূলমন্ত্রকে নতুন করে সামনে এনেছে। পূজামণ্ডপে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতি, সরকারের উদ্যোগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা উৎসবকে ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক সম্প্রীতির মিলনমেলায় পরিণত করেছে। তবে এই ইতিবাচক অভিজ্ঞতার প্রকৃত তাৎপর্য নির্ভর করবে উৎসবের আবহকে কতটা স্থায়ী সামাজিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়া যায়, তার ওপর।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের তথ্য অনুসারে, এবার সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত জনপদ পর্যন্ত প্রতিমা দর্শন, পূজা অর্চনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সামাজিক বন্ধনের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। কারণ, অন্যের ধর্মীয় উৎসবে অংশ নেওয়া কিংবা তার বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়, এটি বহুত্ববাদী সমাজে স্বাভাবিক সহাবস্থানের প্রকাশ।
একটি দেশের সামাজিক শক্তি শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে না, ভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা কতটা দৃঢ়, তার ওপরও নির্ভরশীল। সে বিবেচনায় এবারের দুর্গোৎসবের আনন্দের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতা প্রকাশের দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের দুর্গোৎসবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের এক প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। তিনি রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, মহাখালীর রক্ষাকালী মন্দির ও বনানীর পূজামণ্ডপে গিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরে ২০ অক্টোবর মহানবমীতে রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। রংপুরের পাগলাপীরে এক পথসভায় তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সব ধর্মের মানুষের ঐক্যবদ্ধ অবদানের কথা স্মরণ করে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। রাজধানী থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর এই উপস্থিতি এবং সব নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদার ওপর গুরুত্বারোপ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। এসব কর্মসূচি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে রাষ্ট্রের যোগাযোগ জোরদার এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের এমন উদ্যোগ সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের যে বার্তা দেয়, তা প্রশংসার দাবিদার। এই উদ্যোগের তাৎপর্য আরো গভীর হবে যখন এর প্রতিফলন ঘটবে সারা বছর নাগরিকের নিরাপত্তা, সমান অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে।
সরকারি উদ্যোগেও এবারের দুর্গোৎসবে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। পূজা উপলক্ষে ২০, ২১ ও ২২ অক্টোবর তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং পূজামণ্ডপের জন্য সরকারি বরাদ্দ চার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ কোটি টাকা করা সরকারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে পূজার ছুটি বাড়ানোর যে দাবি হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন জানিয়ে আসছিল, ছুটি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সেই দাবির প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার পাশাপাশি ধর্মীয় উৎসবের গুরুত্বের স্বীকৃতিও বহন করে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, দূরদূরান্ত থেকে বাড়ি ফেরা এবং ধর্মীয় আচার যথাযথভাবে পালনে এই ছুটি সহায়ক হয়েছে। একই সঙ্গে উৎসব নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখতে পুলিশ, আনসার, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রশংসার দাবি রাখে। এসব উদ্যোগ ধর্মীয় উৎসব পালনের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং সব নাগরিকের প্রতি সমান ও বৈষম্যহীন দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক প্রতিফলন। তবে, এসব উদ্যোগের প্রকৃত সার্থকতা নিশ্চিত করতে উপাসনালয়ের সুরক্ষা, সম্পত্তির অধিকার এবং অভিযোগের ন্যায়সংগত প্রতিকারসহ সব নাগরিকের সমান অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা সারা বছর বজায় রাখতে হবে।
দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণও সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা দিয়েছে। সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা পূজামণ্ডপে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর আমিরসহ বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মতবিনিময়ও পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলেও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিক যেন নিজেকে বিচ্ছিন্ন বা অনিরাপদ মনে না করেন, সে বিষয়ে সব দলের ঐকমত্য থাকা জরুরি।
সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। অতীতে বিভিন্ন সময়ে পূজামণ্ডপ, মন্দির, হিন্দুদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সংকলনের ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কয়েক হাজার হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। ২০২১ সালের দুর্গাপূজাকেন্দ্রিক সহিংসতা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগও আমাদের মনে রাখতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে এবারের দুর্গোৎসবে রাষ্ট্রের সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা ও প্রশাসনিক তৎপরতায় কোনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বা উল্লেখযোগ্য অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটাকে একটি প্রশংসনীয় ও উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে এমন শান্তিপূর্ণ উৎসব উদ্যাপন সম্প্রীতি রক্ষায় কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের দৃষ্টান্ত। এই অর্জনকে স্থায়ী করতে হলে ভবিষ্যতেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অতীতের সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের জবাবদিহি এবং সব নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় ধারাবাহিক উদ্যোগ নিতে হবে।
বর্তমান সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, বিভ্রান্তিকর ছবি ও উসকানিমূলক প্রচারণা। যাচাইহীন তথ্য মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস ও উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। তাই এ ধরনের অপপ্রচার প্রতিরোধে দ্রুত তথ্য যাচাই, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে অপপ্রচার প্রতিরোধের নামে প্রকৃত অভিযোগ অস্বীকার করা যাবে না। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হামলা, ভয়ভীতি, সম্পত্তি দখল কিংবা বৈষম্যের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। অপরাধীর ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতেই বিচার হওয়া উচিত। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীল আচরণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার অপরিহার্য শর্ত। রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের পরিচয় হওয়া উচিত তার অধিকার ও মর্যাদা, কোনো ধর্মীয় বিভাজন নয়।
বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে, কিন্তু এর সামাজিক শিক্ষা শেষ হয়নি। উৎসবের সময় যে সৌহার্দ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার পরিচয় পাওয়া গেছে, তা দৈনন্দিন জীবনেও বজায় রাখতে হবে। একজন হিন্দু নাগরিকের উপাসনার স্বাধীনতা, একজন মুসলমানের ধর্মীয় অধিকার, একজন বৌদ্ধের নিরাপত্তা কিংবা একজন খ্রিস্টানের মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সমান দায়িত্ব। একইভাবে প্রতিবেশীর বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং অন্যায়ের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানো সমাজের প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।
সম্প্রীতির প্রকৃত পরীক্ষা পূজামণ্ডপ বা উৎসবের মঞ্চে নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে, আইনের সমান প্রয়োগে এবং ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের অধিকার রক্ষায়। এবারের দুর্গোৎসব আমাদের সামনে আশাব্যঞ্জক একটি ছবি তুলে ধরেছে। এখন সেই অভিজ্ঞতাকে স্থায়ী বাস্তবতায় রূপ দেওয়াই সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। বাংলাদেশ সবার, তাই এই দেশের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকারও সবার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলেই সম্প্রীতির নতুন বার্তা সৌহার্দ্যের পথে বাংলাদেশকে আরো দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিতে পারবে।
লেখক: কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক ও উপদেষ্টা, মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি, ঢাকা


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









