মানুষ বেঁচে থাকার জন্য খাবার খায়, অথচ সেই খাবারই যদি মানুষের অসুস্থতা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ কিংবা অকালমৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এর চেয়ে নির্মম পরিহাস আর কী হতে পারে! খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা, সুস্থ জীবনের ভিত্তি এবং রাষ্ট্রের নাগরিকের প্রতি অন্যতম প্রধান দায়িত্বের ক্ষেত্র। কিন্তু সেই খাদ্য যখন মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর প্রতারণা, অসাধু উৎপাদকের কারসাজি, কৃষিতে রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কিংবা তদারকির দুর্বলতার কারণে অনিরাপদ হয়ে ওঠে, তখন সংকটটি আর কেবল বাজারের অনিয়মে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পরিণত হয় জাতীয় জনস্বাস্থ্যের গভীর সংকটে।
২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত দৈনিক এদিনের ‘জাল-ভেজাল খাবারে ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি আমাদের সামনে এমনই এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে পানি, দুধ, মাছ, মাংস, শাকসবজি, ফলমূল, মসলা ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ভেজালের বিরুদ্ধে অভিযান, জরিমানা ও আইনি পদক্ষেপ চলমান থাকার পরও সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান দৃশ্যমান নয়। তাই প্রশ্ন ওঠে- খাবারে ভেজাল প্রতিরোধ করে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব কার? সরকারের, উৎপাদকের, ব্যবসায়ীর, নাকি ভোক্তার? বাস্তবতা হলো, দায়িত্ব সবার থাকলেও প্রধান দায় রাষ্ট্রের তদারকি ও কার্যকর আইন প্রয়োগের। কারণ, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার মতো ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতেই ন্যস্ত।
খাদ্যে ভেজালের সমস্যা বাংলাদেশে নতুন নয়, কিন্তু এর ধরন ও বিস্তার নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য পরিস্থিতির গুরুত্ব আরো স্পষ্ট করেছে। দৈনিক এদিনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সংগৃহীত খাদ্য নমুনার ৫২ শতাংশ দূষিত পাওয়া গেছে। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, ৮২টি খাদ্যপণ্যের পরীক্ষায় গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহনীয় মাত্রার চেয়ে তিন থেকে বিশ গুণ বেশি নিষিদ্ধ ডিডিটি ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান শনাক্ত হয়েছে। ফলমূল ও শাকসবজির নমুনায় কীটনাশকের উপস্থিতি, চালের কিছু নমুনায় অতিমাত্রায় আর্সেনিক ও ক্রোমিয়াম, হলুদের গুঁড়ায় সিসা এবং লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা পাওয়ার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এসব তথ্য খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। তবে, পরিসংখ্যানগুলোর যথাযথ ব্যাখ্যার জন্য নমুনা সংগ্রহের স্থান, পণ্যের ধরন, পরীক্ষার পদ্ধতি, দূষণের মাত্রা এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণার সময়কাল বিবেচনা করা জরুরি। কোনো নির্দিষ্ট গবেষণায় পরীক্ষিত নমুনার ফলাফলকে দেশের প্রতিটি খাদ্যপণ্যের অবস্থা হিসেবে ধরে নেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়। তবু, একাধিক ধরনের খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত হওয়ার তথ্য স্পষ্ট করে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, প্রয়োজন নিয়মিত বৈজ্ঞানিক নজরদারি ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাব্যবস্থা।
জাতীয় পর্যায়ের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান পাওয়া যায় ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরীক্ষিত ১ হাজার ৭১৩টি খাদ্য নমুনার মধ্যে ৫৭১টিতে ভেজাল, দূষণ কিংবা পুষ্টিমানসংক্রান্ত ত্রুটি পাওয়া যায়, যা মোট নমুনার প্রায় ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এর আগের দুই অর্থবছরে এই হার ছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ ও ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষিত নমুনায় অনিরাপদ বা মানগত ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তবে, এই পরিবর্তনকে সরাসরি সারা দেশের খাদ্যদূষণ বৃদ্ধির চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যাবে না; নমুনা নির্বাচনের ধরন, পরীক্ষার আওতা ও পদ্ধতির পরিবর্তনও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তা সত্ত্বেও সংখ্যাগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ, পরীক্ষার আওতায় আসা খাদ্যপণ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশেই যখন সমস্যা শনাক্ত হচ্ছে, তখন খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে আরো শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। একই প্রতিবেদনে পরীক্ষিত কিছু চিপসে অ্যাক্রিলামাইডের উপস্থিতি, সরিষার তেলে অন্য তেল মেশানোর ঘটনা এবং কিছু ভোজ্যতেলের পুষ্টিমানসংক্রান্ত অসংগতির বিষয়ও উঠে এসেছে। এসব তথ্য প্রমাণ করে, খাদ্যের নিরাপত্তা যাচাই করতে শুধু চোখে দেখা ভেজাল শনাক্ত করলেই চলবে না; প্রয়োজন পরীক্ষাগারভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং পুষ্টিমান যাচাইয়ের ব্যবস্থাও।
খাদ্যে ভেজালের বিপদ তাৎক্ষণিক অসুস্থতার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় না। দূষিত পানি ও খাবার থেকে ডায়রিয়া, বমি, খাদ্যবাহিত সংক্রমণ এবং বিষক্রিয়া হতে পারে। অন্যদিকে, সিসা, আর্সেনিক, কিছু কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ কিংবা অনুমোদনহীন রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে; নির্দিষ্ট পদার্থ ও সংস্পর্শের মাত্রাভেদে স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি, যকৃৎ এবং শিশুর বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিস্তারেও ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন: সব খাদ্যদূষণ ইচ্ছাকৃত ভেজাল নয়, আবার সব ভেজালের স্বাস্থ্যঝুঁকিও সমান নয়। কোনো খাদ্যে নিষিদ্ধ রং মেশানো, উৎপাদনের সময় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থেকে যাওয়া, পরিবেশ দূষণের কারণে ভারী ধাতু প্রবেশ করা এবং সংরক্ষণের ত্রুটিতে জীবাণু জন্মানো- এগুলো পৃথক সমস্যা, যদিও সব কটির ফলেই খাদ্য অনিরাপদ হতে পারে। তাই প্রতিটি ঝুঁকির ধরন শনাক্ত করে তার উপযোগী প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে, শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী, বয়স্ক মানুষ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য খাদ্যনিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন হলো, এত অভিযান ও বিধিবিধান থাকা সত্ত্বেও খাদ্যে ভেজালের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন? এর একটি বড় কারণ হতে পারে অপরাধের তুলনায় শাস্তির দুর্বল প্রতিরোধমূলক প্রভাব, অনিয়মিত তদারকি এবং উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার ওপর পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব। কোনো একটি দোকানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই সমস্যার সমাধান হয় না, যদি সেই পণ্যের উৎপাদক, সরবরাহকারী, পাইকার ও বিতরণব্যবস্থার অন্য অংশগুলো যাচাইয়ের বাইরে থেকে যায়। একইভাবে কারখানা সিলগালা করার পর সেটি অন্য নামে আবার ব্যবসা শুরু করলে আগের পদক্ষেপের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ভুয়া সনদ, ভুল লেবেল, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য নতুন মোড়কে বাজারজাত করা এবং পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ মোকাবিলায় সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন। অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ, পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন প্রস্তুত, আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আদালতে মামলা নিষ্পত্তির প্রতিটি ধাপ দ্রুত ও স্বচ্ছ হওয়া দরকার। কেবল অভিযানের সংখ্যা কিংবা জরিমানার অঙ্ক বাড়ানোকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না; বরং দেখতে হবে, কতগুলো ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার হয়েছে, কতজন অপরাধী কার্যকর শাস্তি পেয়েছে এবং পরবর্তী পরীক্ষায় সংশ্লিষ্ট পণ্যের মান উন্নত হয়েছে কিনা।
বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তার দায়িত্ব একাধিক প্রতিষ্ঠানের। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ খাদ্যনিরাপত্তা তদারকি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন পণ্যের নির্ধারিত মান ও সনদসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করে। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ভোক্তার অধিকার রক্ষা এবং বাজারের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। এ ছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও পরীক্ষাগারগুলোরও নিজ নিজ ক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান থাকলেই যে ব্যবস্থা কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। দায়িত্বের বিভাজন যদি সমন্বয়ের বদলে দায় এড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করে, তাহলে ভোক্তাকে শেষ পর্যন্ত অনিরাপদ খাবার কিনেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। তাই প্রয়োজন একটি সমন্বিত খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব স্পষ্ট থাকবে, পরীক্ষার ফলাফল তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে। খাদ্যনিরাপত্তার তথ্য জনগণের জন্য সহজলভ্য করা এবং পরীক্ষার ফলাফল নিয়মিত প্রকাশ করাও জরুরি। এতে ভোক্তা যেমন সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিও বাড়বে।
দৈনিক এদিনের প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযান ও মোবাইল কোর্টের কার্যক্রমের যে হিসাব তুলে ধরা হয়েছে, তা থেকে বোঝা যায়, আইন প্রয়োগের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ওই সময়ে মোট ৭৪৪টি অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয় এবং ২ কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। একই সময়ে কয়েকটি ক্ষেত্রে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। আগস্ট মাসে এক কোটি টাকা জরিমানা ও ৫০টি মামলা দায়েরের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এসব পদক্ষেপ প্রয়োজনীয়, কারণ আইন ভঙ্গের পরিণতি না থাকলে অসাধু ব্যবসায়ীরা অনিয়ম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন- অভিযানের পর বাজার কতটা নিরাপদ হচ্ছে? যদি বারবার একই ধরনের অপরাধ ঘটে, তাহলে বুঝতে হবে বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রতিরোধের ঘাটতি রয়েছে। জরিমানা আদায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ যোগ করতে পারে, কিন্তু সেটি নিজে থেকে জনস্বাস্থ্য রক্ষা করে না। জনস্বাস্থ্য রক্ষার প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্জিত হবে, যখন ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য বাজারে প্রবেশের আগেই শনাক্ত হবে, অপরাধী ব্যবসায়ীর পুনরায় একই অপরাধ করার সুযোগ সীমিত হবে এবং ভোক্তা নির্ভয়ে খাদ্য কিনতে পারবেন। তাই অভিযান-পরবর্তী মূল্যায়ন, পুনরায় নমুনা পরীক্ষা, লাইসেন্সের শর্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং গুরুতর অপরাধে আনুপাতিক ও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
খাদ্যনিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষি উৎপাদন থেকে ভোক্তার থালা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মাঠে অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ, অনুমোদনহীন রাসায়নিক ব্যবহার, দূষিত পানি দিয়ে ফসল উৎপাদন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মাছ ও মাংস প্রক্রিয়াজাত করা কিংবা অপরিচ্ছন্ন স্থানে খাদ্য সংরক্ষণ- এসবের যে কোনো একটি ধাপেই খাবার অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে। তাই শুধু বাজারে পৌঁছানোর পর পণ্য পরীক্ষা করে সমস্যার সমাধান করা কঠিন। কৃষকদের নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহার, সঠিক মাত্রা ও প্রয়োগের সময় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও পরিবহনে স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি চালু করতে হবে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ সংরক্ষণ, সঠিক তাপমাত্রা এবং মানসম্মত প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের নিরাপদ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে, যাতে নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা তাদের জন্য ব্যয়বহুল না হয়। উৎপাদনব্যবস্থা নিরাপদ হলে একদিকে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বাজারমূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গ্রহণযোগ্যতাও বাড়তে পারে।
রাষ্ট্র ও ব্যবসায়ীদের দায়ের পাশাপাশি ভোক্তার সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। কেনাকাটার সময় পণ্যের উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, মোড়কের অখণ্ডতা, উপাদান তালিকা, সংরক্ষণের নির্দেশনা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মানসনদ যাচাই করা উচিত। অস্বাভাবিক রং, গন্ধ বা স্বাদ সন্দেহের কারণ হতে পারে, যদিও শুধু চোখে দেখে বা ঘরোয়া পরীক্ষায় সব ধরনের ভেজাল নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করা যায় না। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত প্রতিটি কথিত পরীক্ষাকে সত্য বলে গ্রহণ করা উচিত নয়। সন্দেহজনক পণ্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো, ক্রয়ের রসিদ সংরক্ষণ এবং প্রমাণ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী হিসেবে প্রচার না করাও দায়িত্বশীল আচরণের অংশ। কিন্তু ভোক্তার সচেতনতাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এড়ানোর অজুহাত বানানো যাবে না। একজন সাধারণ ক্রেতার পক্ষে পরীক্ষাগারে রাসায়নিক বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়; তিনি কেবল বিশ্বাসযোগ্য বাজারব্যবস্থা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় হওয়া উচিত সুস্পষ্ট, পরিমাপযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি। প্রথমত: খাদ্যের ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী বাজার, কারখানা, গুদাম ও আমদানি পর্যায়ে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা করতে হবে। দ্বিতীয়ত: পরীক্ষাগারের সক্ষমতা ও স্বীকৃতি বাড়িয়ে পরীক্ষার ফলাফল দ্রুত প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত: গুরুতর ভেজাল ও পুনরাবৃত্ত অপরাধের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত: ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য শনাক্ত হলে জনসাধারণকে দ্রুত সতর্ক করা, বাজার থেকে পণ্য প্রত্যাহার এবং প্রয়োজন হলে উৎপাদন বন্ধ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। পঞ্চমত: খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, আমদানি, সংরক্ষণ ও বিপণনের তথ্য অনুসরণযোগ্য করতে হবে। ষষ্ঠত: ভোক্তার অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য সহজলভ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি, খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। এসব উদ্যোগের অগ্রগতি প্রতিবছর প্রকাশ করা হলে জনগণ বুঝতে পারবেন, শুধু অভিযান হচ্ছে, নাকি বাস্তবেই নিরাপদ খাদ্যের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
খাবারে ভেজাল প্রতিরোধের প্রশ্নটি কোনো একক প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার মতো নয়; এটি রাষ্ট্র, উৎপাদক, ব্যবসায়ী এবং নাগরিক- সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। তবে এই দায়িত্বের মধ্যে রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের জন্য খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবস্থা করে, সেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব খাদ্যটি নিরাপদ কিনা, তা নিশ্চিত করা। আর যে ব্যবসায়ী মানুষের বিশ্বাসের বিনিময়ে পণ্য বিক্রি করেন, তাঁর নৈতিক দায়িত্ব সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করা। অতএব, জনস্বাস্থ্য রক্ষার দায় সবার হলেও নেতৃত্ব দিতে হবে রাষ্ট্রকেই।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









