দুর্গাপূজা এলে অনেক মুসলমানের মনে একটি প্রশ্ন আসে এ সময় হিন্দু প্রতিবেশীর বাড়িতে যাওয়া যাবে কি না, তাকে শুভেচ্ছা জানানো যাবে কি না, কিংবা পূজামণ্ডপে উপস্থিত হওয়া কতটা সংগত? বড়দিন বা বুদ্ধপূর্ণিমার সময়ও একই প্রশ্ন ওঠে। কেউ বলেন, প্রতিবেশীর উৎসবে একটু সময়ের জন্য গেলে অসুবিধা কোথায়!
আবার কেউ মনে করেন, যে অনুষ্ঠানে আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কারও উপাসনা করা হয়, সেখানে মুসলমানের যাওয়াই উচিত নয়। ঈদের সময় অমুসলিম প্রতিবেশীরা আমাদের বাড়িতে আসেন, শুভেচ্ছা জানান তাহলে তাঁদের উৎসবে আমরা যাব না কেন? প্রশ্নগুলো নতুন নয়, কিন্তু প্রতি বছর উৎসব এলেই নতুন করে আলোচনায় আসে।
এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে রাখতে হবে, ইসলাম শুধু সামাজিক সম্পর্কের ধর্ম নয়; এটি বিশ্বাস ও ইবাদতেরও ধর্ম।
একজন মুসলমানের কাছে তাওহিদ আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে মানা ঈমানের মূল কথা। তাই অন্যের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার প্রশ্নে যেমন কোরআনের নির্দেশনা রয়েছে, তেমনি নিজের বিশ্বাসের সীমা রক্ষার বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না; এ ছাড়া অন্য পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮)
লুকমান (আ.) তার সন্তানকে বলেছিলেন, হে আমার প্রিয় সন্তান! আল্লাহর সঙ্গে শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক চরম জুলুম।
(সূরা লুকমান, আয়াত: ১৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-কেও সবচেয়ে বড় পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করাকে সবচেয়ে বড় পাপ হিসেবে উল্লেখ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৪৭৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৬)
এই বিশ্বাস থেকেই একজন মুসলমানের জন্য অন্য ধর্মের উপাসনা বা শিরকপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পূজার আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দেওয়া, উপাসনার অংশ হওয়া কিংবা অন্য উপাস্যের উদ্দেশে নিবেদন করা আর কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করা এক বিষয় নয়। সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কাজে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
আল্লাহ তাআলা বলেন, সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে তোমরা পরস্পরকে সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না। (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ২)
কোনো ধর্মীয় উৎসবে উপস্থিত হলেই আল্লাহর গজব নেমে আসবে এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার আমাদের নেই। গজব কখন, কার ওপর এবং কী কারণে নেমে আসবে, তা আল্লাহই জানেন। তবে শিরক থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে এমন কাজ এড়িয়ে চলা একজন মুসলমানের দায়িত্ব। তাই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকা ঈমানি দায়িত্বেরই অংশ। এ সতর্কতার অর্থ এই নয় যে অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, যারা ধর্মের কারণে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে তিনি নিষেধ করেন না। (সূরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত: ৮)
একইভাবে আল্লাহ সতর্ক করেছেন, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন ন্যায়বিচার থেকে সরিয়ে না দেয়। (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৮)।
আমাদের আশপাশে এমন অনেক হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান পরিবার রয়েছে, যাদের সঙ্গে মুসলমানদের বহু বছরের প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক। তাদের বিপদে খোঁজ নেওয়া, অসুস্থ হলে পাশে দাঁড়ানো, কর্মস্থলে সহযোগিতা করা কিংবা সামাজিক প্রয়োজনে সাহায্য করা এসবের সঙ্গে ধর্মীয় উপাসনায় অংশ নেওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। কারও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও তাঁকে অসম্মান করার কারণ নেই।
ঈদের প্রসঙ্গেও একই পার্থক্য মনে রাখা দরকার। কোনো অমুসলিম প্রতিবেশী ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে এলেন, বাড়িতে খাবার খেলেন কিংবা ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিলেন এতে তাঁর ধর্মীয় পরিচয় বদলে যায় না। আবার তাঁদের সৌজন্যের প্রতিদান দিতে গিয়ে একজন মুসলমানকে অন্য ধর্মের উপাসনায় অংশ নিতেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতাও নেই।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) কে তাঁর মুশরিক মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে বলেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬২০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০০৩)
এ ঘটনা ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার গুরুত্ব বোঝায়; তবে এটি অন্য ধর্মের উপাসনায় অংশ নেওয়ার নির্দেশ নয়।
শুভেচ্ছা জানানোর প্রশ্নে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ ধর্মীয় উৎসবের শুভেচ্ছা জানানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন, আবার কেউ ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুমোদন না দিয়ে সামাজিক সৌজন্য প্রকাশের সুযোগ রাখেন। মিসরের দারুল ইফতা শর্তসাপেক্ষে অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে শুভেচ্ছা জানানোর অনুমতি দিয়েছে। এ বিষয়ে নিজের অনুসৃত আলেমের মত ও সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করা উচিত। তবে মতভেদকে কেন্দ্র করে কাউকে অপমান করা বা তার ঈমান নিয়ে চূড়ান্ত রায় দেওয়া থেকে বিরত থাকা দরকার।
মুসলমানের নিজস্ব উৎসবের কথাও এখানে প্রাসঙ্গিক। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনাবাসীর আগের দুটি উৎসবের দিনের পরিবর্তে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার কথা বলেছেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১১৩৪; সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১৫৫৬)
সহিহ বুখারির ৯৫২ নম্বর হাদিসে তিনি বলেছেন, প্রত্যেক জাতিরই উৎসব আছে, আর এটি আমাদের উৎসব। এসব বর্ণনা মুসলমানের ধর্মীয় উৎসবের স্বাতন্ত্র্য বোঝায়। অন্যের সঙ্গে সদাচরণ করা যায়, কিন্তু নিজের ধর্মীয় পরিচয় ও বিশ্বাসের সীমা ভুলে যাওয়া যায় না। বাংলাদেশে উৎসবের সময় সবচেয়ে বেশি দরকার সংযম ও দায়িত্বশীলতা।
কেউ অন্য ধর্মের উৎসবে যাবেন কি না, শুভেচ্ছা জানাবেন কি না এ নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু এ মতভেদকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ ছড়ানো, গুজব রটানো, উপাসনালয় বা মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মীয় আচার থেকে বিরত থাকা মানে কারও অধিকার অস্বীকার করা নয়; আবার সম্প্রীতির নামে নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কাজে অংশ নেওয়াও জরুরি নয়।
একজন মুসলমানের কাছে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নিজের ঈমান রক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিরকপূর্ণ উপাসনায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে ন্যায়বিচার ও সদাচরণ বজায় রাখতে হবে। বিশ্বাসের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু সেই পার্থক্য যেন অন্যায় বা শত্রুতার কারণ না হয়। নিজের ধর্মে অবিচল থাকা এবং মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করা–দুটিই ইসলামের শিক্ষা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









