অপরাধী কিংবা নিরপরাধ, এই বন্দিশালায় এসে সবাই একাকার হয়ে যায় এক অদ্ভুত নিয়তির নির্মম পরিহাসে। চার দেয়ালের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি মানুষের কান্নার শব্দ কি বাইরের মুক্ত বাতাসে পৌঁছায়? লোহার শিকের ওপাশে জীবন যেন এক নিশ্চল পাথরের মতো জমে থাকে, যেখানে প্রতিটি পলক কাটে যন্ত্রণায়। মুক্তির আকুল প্রতীক্ষায় প্রহর গুনে হাজারো বন্দি প্রাণ, যাদের চোখের জল কারাগারের নির্মম মেঝেতে শুকিয়ে যায় প্রতিনিয়ত।
কারাগারের ভেতরের এই অবরুদ্ধ জীবনের ধূসর ক্যানভাসে প্রতিনিয়ত আঁকা হয় বেদনার এক মহাকাব্য। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো যেখানে শৃঙ্খলিত, সেখানে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ একবিংশ শতাব্দীতেও মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই বন্দি জীবনের করুণ আখ্যান শুধু ব্যক্তির নয়, বরং এক বৃহত্তর সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশের ৬৪ জেলার কারাগারগুলোর বন্দি ধারণক্ষমতার চিত্র অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং অপরিকল্পিত। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলা কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা ১১,৫৮০ জন।
কারাগারগুলোতে বর্তমান বন্দি সংখ্যা ২৪,৫২০ জন। শরীয়তপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুর জেলার কারাগারগুলোর অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৫,৪২০ জন। কারাগারগুলোতে এখন বন্দি রয়েছেন ১১,৩৪০ জন। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর জেলার কারাগারের মোট আসন সংখ্যা ৫,৮৪০টি। কারাগারগুলোতে বর্তমান বন্দি সংখ্যা ১৩,৬৪০ জন। নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও রাজশাহী জেলার কারাগারগুলোর সর্বমোট ধারণক্ষমতা ৫,২৬০ জন।
কারাগারগুলোতে বন্দি আছেন ১১,২৬০ জন। নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও রংপুর জেলার বন্দি ধারণক্ষমতা ৪,৬৯০ জন। কারাগারগুলোতে এখন মোট বন্দি সংখ্যা ৯,৯৮০ জন। গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও খুলনা জেলার কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ৪,৯২০ জন। কারাগারগুলোতে এখন আটক আছেন ১০,৩২০ জন। বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলার কারাগারের অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৩,৮২০ জন। কারাগারগুলোতে এখন বন্দি সংখ্যা ৮,২৪০ জন। মেহেরপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলার কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ৩,১৮৬ জন। কারাগারগুলোতে বর্তমান বন্দি সংখ্যা ৭,৯৩৩ জন।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের কারাগারগুলোতে বিনাবিচারে বন্দি মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক। আদালতের ধীরগতি ও মামলার জটলা দীর্ঘ হওয়ায় বর্তমানে মোট ৬৮,৩৩০ জন মানুষ বিনাবিচারে আটক রয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে চলা এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্দিদের জীবনের সোনালি সময়গুলোকে অন্ধকারের গহ্বরে নিমজ্জিত করছে, যা দেশের বিচার ব্যবস্থার এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলে। কারাগারে বন্দি মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষই এখন বিচারের বাণী শোনার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। কোনো রায় বা সাজা ব্যতিরেকেই শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে এই বিপুল সংখ্যক কয়েদি বন্দি জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। আইনের মারপ্যাঁচে আটকে পড়া এই মানুষগুলোর আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকারও আজ নানা প্রতিকূলতার মুখে আটকে আছে।
বিনাবিচারে বন্দি এই মানুষগুলোর অবরুদ্ধ জীবন যেন এক অন্তহীন জীবন্ত লাশের মতো কাটছে। সামান্য চুরির অভিযোগে বা রাজনৈতিক মামলায় ফেঁসে যাওয়া তরুণটি হয়ত এক দশক ধরে অন্ধকাষ্ঠে ধুঁকছে। তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো কারাগারের চার দেয়ালে পিষ্ট হয়ে মরে যাচ্ছে প্রতিদিন। কারাগারের ভেতরের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ আর অপরিসর মেঝেতে এই বিনাবিচারে বন্দিদের মানবেতর রাত কাটে। এক বিছানায় কয়েকজনকে গাদাগাদি করে ঘুমাতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গাটুকুও অবশিষ্ট থাকে না। গরমের দিনে চর্মরোগ আর শীতের তীব্রতায় এই মানুষগুলো পশুর চেয়েও অধম জীবন যাপন করে।
বাইরে থাকা তাদের পরিবারগুলোর অবস্থা আরো শোচনীয়, যেন এক অদৃশ্য কারাগারের বাসিন্দা তারা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি বন্দি হওয়ায় পুরো পরিবারটি মুহূর্তেই চরম অর্থনৈতিক অনটনের মুখে পড়ে যায়। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটে বুড়ো মা-বাবা আর অবুঝ সন্তানদের, যাদের অপরাধ কেবল একটিই, তারা এক বন্দির আপনজন। সমাজের চোখে তারা এক অচ্ছুত ও অপরাধী পরিবার হিসেবে চিহ্নিত হয়। অর্থের অভাবে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, তারা বাধ্য হয় শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়তে। কন্যাসন্তানদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দিতে হয় সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে, যা এক চরম ট্র্যাজেডি। বন্দির স্ত্রী লোকলজ্জা আর অপমানের বোঝা মাথায় নিয়ে দিনানিপাত করতে বাধ্য হন। এক বুক কান্না চেপে রেখে তিনি প্রতিদিন বেঁচে থাকার এক নির্মম যুদ্ধে অবতীর্ণ হন।
মামলা চালাতে গিয়ে অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে ভিটামাটি ও শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দেয়। আইনজীবীর ফি আর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে তাদের পকেট শূন্য হয়ে একসময় ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিতে হয়। ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় তারা দালালের খপ্পরে পড়ে আরো বেশি নিঃস্ব ও দেউলিয়া হয়ে যায়। সামাজিকভাবে এই পরিবারগুলো চরম একাকীত্ব ও তীব্র মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে বাধ্য হয়। পাড়া-প্রতিবেশীরা তাদের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ ছিন্ন করে এবং তাদের অপরাধীর পরিবার বলে গালি দেয়।
আত্মীয়স্বজনরাও বিপদের দিনে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ফলে, তারা এক গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে পড়ে। অসুস্থ বুড়ো মা-বাবা বিনা চিকিৎসায় বিছানায় পড়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বন্দি সন্তানকে শেষবারের মতো দেখার আকুতি বুকেই থেকে যায়, যা পূরণ হয় না কখনো। সন্তানদের মনে সমাজের প্রতি এক তীব্র ক্ষোভ ও চরম ঘৃণা তৈরি হতে থাকে প্রতিনিয়ত। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও নিষ্ঠুরতা একটি পুরো প্রজন্মকে অপরাধের অন্ধকার জগতের দিকে ধাবিত করে। কারাগারের ভেতরে অসুস্থ হলে এই বিনাবিচারে বন্দিরা ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত হতে বাধ্য হয়। নামমাত্র ওষুধ আর চিকিৎসকের অভাবে ছোটখাটো রোগও একসময় তাদের শরীরে মরণব্যাধিতে রূপ নেয়। প্রতি বছর বহু বন্দি বিনাবিচারে চিকিৎসাহীন অবস্থায় কয়েদখানায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
এই ভয়াবহ মানবিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধানে দেশের বিচার ব্যবস্থার দ্রুত সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি। বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। বিচারকদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আদালতের কার্যদিবস বাড়ানোর মাধ্যমে মামলার জট কমানো সম্ভব। বিনাবিচারে দীর্ঘকাল ধরে বন্দি থাকা আসামিদের অবিলম্বে জামিনে মুক্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেসব অপরাধের সাজা কম, সেসব মামলায় আসামিদের হাজতবাসের মেয়াদ বিবেচনা করে খালাস দেওয়া উচিত। জামিন প্রক্রিয়াকে আরো সহজ করতে হবে। আইনি জটিলতা কমিয়ে বন্দিদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করা এখন সময়ের দাবি।
দরিদ্র ও অসহায় বন্দিদের জন্য সরকারি খরচে বাধ্যতামূলক আইনি সহায়তা সেল গঠন করতে হবে। প্রতিটি কারাগারে আইনি পরামর্শক নিয়োগ দিয়ে বন্দিদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। বিনামূল্যে আইনজীবী নিয়োগের মাধ্যমে অসহায় পরিবারগুলোকে আইনি শোষণের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। কারাগারগুলোর আধুনিকায়ন এবং ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা জরুরি। বন্দিদের থাকার জায়গা, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং উন্নত মানের খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারাগারকে শাস্তির জায়গার বদলে একটি আধুনিক সংশোধনাগার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
বন্দিদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত কাউন্সিলিং এবং বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। কারাগারে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে তাদের কর্মক্ষম নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। বন্দি অবস্থায় উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি করে সেই অর্থ তাদের পরিবারকে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে করে বন্দি ও তার পরিবার উভয়ই অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে। সামাজিকভাবে বন্দিদের পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা যেতে পারে। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং তাদের সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। অপরাধী নয়, অপরাধকে ঘৃণা করার মানসিকতা সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে।
নিবন্ধের এ পর্যায়ে এসে আমার মনে পড়ে গেল দুই বাংলার কালজয়ী ও বিখ্যাত গান ‘আমি বন্দি কারাগারে’ গানটি। বন্দি কারাগারে, আছি গো মা বিপদে,বাইরের আলো চোখে পড়ে না মা, জেলখানার সম্বল, থালা-বাটি কম্বল, এছাড়া অন্য কিছু মেলে না মা। এ যেন বাংলাদেশের এ সময়ের কারাগারের সমার্থক। এ গানটি গেয়ে দুই বাংলাজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী মুজিব পরদেশী। শিকলের ওই গান গেয়ে ওঠে অবরুদ্ধ ওই প্রাণ, অন্ধকার এই কক্ষ মাঝে আলোর সন্ধান। বিচারের বাণী ডুকরে কাঁদে নীরব চার দেয়ালে, কত শত জীবন ঝরে যায় ভাগ্যের খেয়ালে। আমি আশাবাদী মানুষ হয়ে বলছি- মুক্তির ওই সুপ্রভাতে আসুক নতুন ভোর, কেটে যাক জীবনের সব কালো আঁধার ঘোর।
বাংলাদেশের কারাগারের এই অবরুদ্ধ বন্দি জীবন আজ মানবিকতার এক চরম পরীক্ষা। চারদেয়ালের ভেতরের এই হাহাকার আর বাইরের পরিবারের কান্না রাষ্ট্রকে এক বড় বার্তা দেয়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক কারাগার গঠন না হলে এই সংকট সমাজকে গ্রাস করবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









