বাংলা থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কানু বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক নাম, যাঁর অভিনয় শুধু পর্দায় নয় দর্শকের স্মৃতিতেও স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। ১৯০৫ সালে জন্মগ্রহণ করা এই অভিনেতা অভিনয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনের সুখ–দুঃখ, বিশ্বাস ও ভাঙনকে অসামান্য সংবেদনশীলতায় তুলে ধরতে পেরেছিলেন। এই গুণী অভিনেতার ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
১৯২৬ সালে কৃষ্ণকান্তের উইল ছবির মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয় । এটি ছিল বাংলা সিনেমার নির্বাক যুগের একটি উল্লেখযোগ্য ছবি। পরের বছরেই তিনি অভিনয় করেন দুর্গেশনন্দিনীতে। যদিও তাঁর সিনেমার যাত্রা শুরু হয় বেশ আগেই, প্রকৃত খ্যাতি ও শিল্পীসত্তার স্বীকৃতি তিনি অর্জন করেন মূলত মঞ্চনাটকের মাধ্যমে। সেই সময়ের প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব শিশির ভাদুড়ীর মতো মানুষ তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এমনকি শোনা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্র দেখে মন্তব্য করেছিলেন যা তাঁর শিল্পমানের একটি বড় স্বীকৃতি।
কানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় শুরু হয় সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে। ‘অপু ট্রিলজি’র প্রথম দুই পর্ব-পথের পাঁচালি (১৯৫৫) ও অপরাজিত (১৯৫৬) সিমেমায় তিনি অপু ও দুর্গার পিতা হরিহর রায়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। দারিদ্র্যক্লিষ্ট অথচ স্বপ্নমগ্ন এক মানুষ, হরিহরের সহজ বিশ্বাস, ব্যর্থতা, লজ্জা ও স্নেহ কানুবাবুর অভিনয়ে এক গভীর মানবিক রূপ পায়। এই দুটি ছবিই তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের ঘরের মানুষ করে তোলে।
তাঁর আরেকটি স্মরণীয় ও আলোচিত অভিনয় হলো ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণ (১৯৫৫) ছবিতে রামকৃষ্ণ পরমহংসের চরিত্রে রূপদান। এই ছবিতে কানু বন্দ্যোপাধ্যায় যে রামকৃষ্ণকে নির্মাণ করেন, তা ছিল একেবারেই অভিনব। তাঁর উচ্চারণ, কণ্ঠস্বর ও চলনে ছিল এক ধরনের ‘ন্যালা-খ্যাপা’ ভাব। যেন কলকাতায় বসবাসকারী কোনও রংপুরিয়া সাধক। ঐতিহাসিকভাবে গদাধর চট্টোপাধ্যায় ছিলেন কামারপুকুরের মানুষ, কিন্তু কানুবাবুর অভিনীত রূপটি দর্শকের মনে এতটাই গভীর ছাপ ফেলে যে পরবর্তীকালে রামকৃষ্ণ চরিত্র মানেই এই ভঙ্গিমার অনুকরণ হয়ে দাঁড়ায়। আশ্চর্যভাবে, হরিহর রায় ও গদাধর এই দুই চরিত্র যেন তাঁর অভিনয়ে একে অপরের প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠে। দু’জনেই দরিদ্র, সংসারবিমুখ, অথচ অন্তরে অটুট বিশ্বাসে ভরপুর।
জীবনের শেষ পর্বে কানু বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনয় করেন আলো আমার আলো (১৯৭১) ছবিতে, যেখানে তিনি অতশীর পিতার চরিত্রে দর্শকের সামনে উপস্থিত হন। এখানেও তাঁর চরিত্র নির্মাণের নিপুণতা চোখে পড়ে। অভিনয়গুণের বিচারে তাঁকে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, তুলসী লাহিড়ি বা তুলসী চক্রবর্তীর মতো অভিনেতাদের সঙ্গে তুলনা করা যায় যাঁরা অভিনয় করতেন না, বরং চরিত্র হয়ে উঠতেন।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রসমূহ- চাণক্য, যোগাযোগ, মানদণ্ড, পণ্ডিত মশাই, পল্লী সমাজ, বিন্দুর ছেলে, নতুন জহুরি, সদানন্দের মেলা, মন্ত্র শক্তি, দুঃখীর ঈমা, মর্মবাণী, কঠিন মায়া, মহাশ্বেতা, বনজ্যোৎস্না, আলো আমার আলো, এই করেছো ভালো, অগ্নিভ্রমর প্রভৃতি।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, ১৯৮৩ সালের ২৭ জানুয়ারি কানু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত হন নিঃস্ব অবস্থায়। ঠিক যেন পর্দার হরিহর রায় বাস্তব জীবনে ফিরে এসেছিলেন। শিল্পীর জীবন যে সবসময় সম্মানে ভরপুর হয় না, তাঁর শেষ অধ্যায় তারই সাক্ষ্য বহন করে। তবুও, তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো আজও বেঁচে আছে। বাংলা থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কানু বন্দ্যোপাধ্যায় এক উজ্জ্বল, মানবিক ও চিরস্মরণীয় নাম।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









